এমিরেটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান কবি শামসুর রাহমান স্মরণে বলেছেন, সর্বকালে বাংলার কবিতার ইতিহাসে শামসুর রাহমানকে স্মরণ করতে হবে। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে তার কবিতা যেমন আমাদের প্রেরণা যুগিয়েছে। আজও দেশের সংকটকালে তার কবিতা আমাদের সংঘবদ্ধ করে এবং একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়তে স্বপ্ন দেখায়।
তিনি বলেন, ‘শামসুর রাহমান মহত্তম কবি বলে বিবেচিত। কবিতা তার সমগ্র সত্তায় মিশে ছিল। তার কবিতায় ব্যক্তিগত অনুভূতি যেমন পাই, তেমনি সমষ্টিগত ভাবনারও স্বাদ পাই।’
জাতীয় কবিতা পরিষদ ও কবি শামসুর রাহমান স্মৃতি পরিষদ যৌথভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের সবুজ চত্বরে গতকাল বুধবার বিকালে কবি শামসুর রাহমানের ৮৪তম জন্মবর্ষ উদযাপন অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রিয় কবির জন্মদিনটি উপলক্ষে বিভিন্ন সংগঠন নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। তবে দিনের সবচেয়ে বড় আয়োজনটি ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) সবুজ চত্বরে। ‘অশুভের মাঝে আপোষবিহীন দ্বন্দ্ব চাই’ শিরোনামে যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে জাতীয় কবিতা পরিষদ ও শামসুর রাহমান স্মৃতি পরিষদ। নৃত্যশিল্পী তামান্না রহমান পরিচালনায় ‘ভেঙ্গেছো দুয়ার এসেছ জ্যোতির্ময়’ গানের সাথে নৃত্য পরিবেশন করে নৃত্যমের নৃত্যশিল্পীরা।
স্মৃতি পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের সভাপতিত্বে আলোচনায় অংশ নেন শিল্পী কাইয়ূম চৌধুরী, কবি বেলাল চৌধুরী, নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মফিদুল হক। স্বাগত বক্তব্য দেবেন স্মৃতি পরিষদের সম্পাদক কবি ড. মুহাম্মদ সামাদ। শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেন কবিতা পরিষদের সভাপতি হাবীবুল্লাহ সিরাজী।
আলোচনায় শামসুর রাহমানের অধিকাংশ বইয়ের প্রচ্ছদশিল্পী কাইয়ূম চৌধুরী বলেন, ‘শামসুর রাহমানের প্রতিটি কাব্যগ্রন্থ যেন বাংলাদেশের ধারাবাহিক ইতিহাস বর্ণনা করে। তিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কবিতাকে তিনি ঈর্ষণীয় স্তরে নিয়ে গেছেন।
বেলাল চৌধুরী বলেন, বাংলা সাহিত্যে কবি শামসুর রাহমানের আবির্ভাব না ঘটলে, আধুনিক বাংলা কবিতার যে ভিন্ন ধারার সৃষ্টি হয়েছে, তা টিকে থাকতো না।’
রামেন্দু মজুমদার বলেন, একাত্তরে শামসুর রাহমান অবরুদ্ধ বাংলাদেশে আটকে ছিলেন। সেই সময় তার রচিত কবিতাগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্রের সমতুল্য ছিল।’
মফিদুল হক বলেন, ‘কবি শামসুর রাহমান কবিতায়, জীবনে ও মননে সুন্দরের প্রতিষ্ঠা চেয়েছিলেন। তাই নরম সম্ভাবের মানুষ হয়েও তিনি দেশের সংকটকালে মিছিলে দাঁড়িয়েছেন, আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার কবিতা যিনি পড়বেন তিনি জীবনের, মননের উপাদান পাবেন। জীবনকে নিবিড়ভাবে জানার শক্তি খুঁজে পাবেন।’
দ্বিতীয় পর্বে শামসুর রাহমানকে নিবেদিত কবিতা পাঠে অংশ নেন কবি রফিক আজাদ, রবিউল হুসাইন, অসীম সাহা, কাজী রোজী, কামাল চৌধুরী, কবি আনিসুল হক, হারিসুল হক, শিহাব সরকার, দীপিতা রাহমান প্রমুখ। আর শামসুর রাহমানের কবিতা আবৃত্তি করবেন কাজী আরিফ, ডালিয়া আহমেদ, লায়লা আফরোজ, রফিকুল ইসলাম প্রমুখ। সঙ্গীত পরিবেশন করবেন মিতা হক, সুজিত মোস্তফা, ইয়াকুব আলী খান ও আবিদা রহমান সেতু।
সকালে আলোচনা, স্বরচিত কবিতা পাঠ ও আবৃত্তির মধ্য দিয়ে শামসুর রাহমানের ৮৪তম জন্মদিন পালন করে সাংস্কৃতিক সংগঠন শিল্পিত। জাতীয় জাদুঘরের সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে ‘স্মৃতির অবগাহনে কবি তুমি চিরঞ্জীব’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গীতিকার রফিকুজ্জামান। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাকশিল্পী ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়, আওয়ামী লীগের সহ-সম্পাদক শফি আহমেদ ও প্রবাসী সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মেহেরুন নাজ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি ওসমান গণি। আলোচনা শেষে দেশের নবীন ও প্রবীণ কবিরা শামসুর রাহমানকে নিবেদন করে স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন ও আবৃত্তি করেন।
এর আগে বুধবার ভোরে শামসুর রাহমানের ৮৪তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বনানী কবরস্থানে কবির সমাধিতে পুষ্পমাল্য অর্পণ করে কবির পরিবারের সদস্যবৃন্দ, বাংলা একাডেমী, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটসহ বিভিন্ন সংগঠন ও সাংস্কৃতিক দল।
