ভাটির বাঘ বলে খ্যাত শমসের গাজী আনুমানিক ১৭১২ সালে বর্তমান ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া থানার ১০ নং ঘোপাল ইউনিয়নের নিজকুঞ্জরা গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। পিতার নাম পীর মোহাম্মদ, মাতার নাম কৈয়ারা বেগম। তার পিতা তত্কালীন ওমরাবাদ পরগনার আধুনিক সেনবাগ বেগমগঞ্জ বজরা কাচারীতে খাজনা আদায় করতেন। শমসের গাজী ১৭৪৮-৬০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চল বিশাল ত্রিপুরা রৌশনাবাদ রাজ্যের অধিপতি ছিলেন। এই জমিদার বাড়িটি ছাগলনাইয়ার জগন্নাথ সোনাপুর গ্রামে ছিল। শমসের গাজী তার মায়ের নামে কয়েক একর জায়গার উপরে একটি বিশাল দিঘী খনন করেন যার নাম দেয়া হয় কৈয়ারা দিঘী। ছাগলনইয়া থেকে ৪ কি.মি. দক্ষিণে চম্পক নগর ও শুভপুরের মাঝ খানে পূর্ব দিকে দুই কিলোমিটার যাওয়ার পর ভারত সীমান্তে শমসের গাজীর বাগান বাড়ির অবস্থান।
এ বাগান বাড়িতে ছিল তার প্রাসাদ। ৩৫০ বছর পূর্বের একজন শাসক কীভাবে তার সেনা দূর্গ ও রাজধানী প্রতিরক্ষার জন্য আধুনিক রণকৌশল ও দূরদৃষ্টির পরিচয় দিয়েছেন তার চিত্র মেলে এখানে। প্রাসাদের উত্তর দিকে উঁচু পাহাড়ের মাঝখানে রয়েছে একটি গভীর কুয়া, এর কিছু অংশ রয়েছে ভারত অংশে। প্রায় ৩০০ বছর পরেও কুয়াটি অনেক গভীর যা সকলের নিকট বিস্ময় হয়ে রয়েছে। এ কুয়ার পানি স্বচ্ছ ও নির্মল। পানি কতটুকু আছে বলা যায় না কারণ কেউ তা শুকাতে দেখেনি। পুকুরটি নিয়ে অনেক রহস্যজনক কথা শোনা যায়। বাড়ির পশ্চিম দিকে রয়েছে রাঙ্গা মাইট্যা পুকুর যার চতুর্দিকে রয়েছে প্রায় ৪০ ফুট উচুঁ ঢিবি, ফলে কোন দিন কেউ তাতে নামতে সাহস করেনি। বর্তমানে এ পুকুর নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে বিরোধ রয়েছে। সবচেয়ে কৌতুহল সৃষ্টি করে শমসের গাজীর বাড়ীর সুড়ঙ্গ পথটি। এটি ভারত বাংলাদেশ সীমান্তে অবস্থিত। নর্দমা দিঘির পশ্চিম পাড়ের নিচ দিয়ে ১০০ ফুট পর্যন্ত একটি সুড়ঙ্গ রয়েছে। এর আকার আয়তন নির্মাণ কৌশল দেখলে অনেকটা মোঘল আমলের প্রাসাদ অথবা প্রবেশ দ্বারের কথা মনে করিয়ে দেয়। সুড়ঙ্গ পথটি দিয়ে দুই জন লোক অনায়াসে হেঁটে যেতে পারতো। প্রাসাদের পূর্ব দিকে অবস্থিত একটি দিঘি রয়েছে এর পাড় খুব একটা উঁচু না হলেও অবিশ্বাস্য রকম চওড়া। প্রচলিত আছে নর্দমা নাকি গাড়ির অস্ত্র ভান্ডার ছিল। গাজী তার প্রধান সেনা নিবাস ও প্রাসাদকে শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য বেশ কয়েকটি কেল্লা তৈরী করেছিলেন। এদের মাঝে বল্লভপুর ও ছাগলনাইয়া দিঘির পাড়ে দুটি কেল্লা অপরটি ছিল শুভপুর থেকে সোনাপুর ঘাটে যাওয়ার পথে। এগুলো বর্তমানে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। শমসের গাজীর স্মৃতি নিদর্শনগুলো দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন ভিড় জমায়। শমসের গাজীর বাগান বাড়িকে গাছ লাগিয়ে সৌন্দর্য বর্ধন করেছেন ইসলামী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান মরহুম আলহাজ্ব মোঃ ইউনুছ। এই স্মৃতি এখন কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিদিন এই বিস্ময়কর দৃশ্য দেখার জন্য পর্যটকরা এলাকায় ভিড় জমায়।
