বাংলাদেশের দক্ষিন পূর্বাংশ অর্থাত্ ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য ঘেষা এবং বঙ্গপোসাগরের মোহনায় সমুদ্র গর্ভ থেকে জম্ম নেয়া ভূখন্ডটির নাম ফেনী । সামুদ্রিক পলি জমে সৃষ্ঠি হওয়া ৮৩২ বর্গকিলোমিটারের এ ভূখন্ডটির সঠিক সময় জানা না গেলে ভূতাত্ত্বিকদের মতে এটি কয়েক হাজারের বেশি হবে না। বহু চড়াই উতরাই পেরিয়ে ক্রমবধিষ্ণু আজকের ফেনী দু্রুত একটি আধুনিক শহরের রুপ লাভ করতে চলেছে। ভৌগলিক ভাবে অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ এ জনপদটি অচিরেই মেগা সিটিতে রুপ নেবে এমন স্বপ্ন দেখে ফেনী বাসী। আর এ স্বপ্ন বাস্তবায়নে জরুরী ভিত্তিতে নিম্ম বর্ণিত পদক্ষেপ গ্রহন করতে হবে ফেনীর বর্তমান নের্তৃত্বকে। এ ব্যাপারে কোন প্রকার অবহেলা কিংবা পদক্ষেপ গ্রহনে শিথিলতা হবে অমার্জনীয় ব্যর্থতা।
জরুরী ভিত্তিতে করনীয় বিষয় সমূহ হচ্ছে ১। ফেনী পৌরসভাকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নতি করার পদক্ষেপ গ্রহন। ফেনী পৌরসভা চর্তুপাশ্ববর্তী কাজির বাগ, ধর্মপুর, শর্শদী, পাঁচগাছিয়া, বালিগাঁও, কালিদহ, মৌটবি, পাঠান নগর ইউনিয়নকে ফেনী কর্পোরেশনে অর্ন্তভূক্ত করে সিটি কর্পোরেশনে উন্নতি করার পরিকল্পনা গ্রহন করতে হবে। ২। রাজধানী ঢাকা এবং বন্দর নগরী চট্টগ্রামের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত ফেনী শিল্প বিকাশের ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে আছে। এখানে দু’টি বিসিক শিল্প নগরী থাকলেও হাজারো সমস্যা জর্জরিত এ গুলো দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতায় ভীতিকর পরিবেশে কেউ শিল্প কারখানা গড়ে তুলতে সাহস পায়নি। তাই ফেনী কে মেগাসিটিতে রুপ দিতে হলে বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হলে সর্বপোরী সন্ত্রাসী জনপদের কালিমা মোচন করতে হবে। ফেনী পরিত্যাক্ত পুরাতন বিমান বন্দরের প্রস্তাবিত স্থানে ইপিজেড স্থাপন সর্বাক্তক উদ্ধেগ গ্রহন করা প্রয়োজন। এটি বাস্তবায়ন করা গেলে ফেনী অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আসবে অভাবনীয় পরিবর্তন। ৩। ফেনী জেলার সোনাগাজী উপজেলার দক্ষিনে বঙ্গপসাগর অবস্থিত। কর্ণফুলী নদীর মত এখানে মহুরী নদীর সংযোগ সমুদ্রগর্ভ থেকে জেগে উঠা বিশাল চর কে পরিকল্পনা মাফিক কাজে লাগিয়ে এখানে নৌবন্দর গড়ে তোলা সম্ভব। ৪। ফেনী শিক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে চলছে বেহাল অবস্থা। ভাল কিংবা উচ্চতর কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই। শর্তবষী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ফেনী কলেজে কয়েকটি বিষয়ে অনার্স ও মাষ্টাস কোর্স চালূ হলেও বহু বিষয়ে অনার্স ও মাষ্টার্স কোর্স চালূ করে বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে উন্নীত করা যায়নি। এ ব্যপারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহন করে ফেনী ছেলেমেয়েদের উচ্চ শিক্ষা সুযোগ তৈরী করার প্রয়োজন। ৫। অন্য দিকে ফেনী সদর হাসপাতাল ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে করা হয়েছে। এর অবকাঠামোগত নির্মান কাজ শেষ হলেও শুধু আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন বাকী। ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট এ হাসপাতালটিতে চট্টগ্রামের মিরশরাই, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম, খাগড়াছড়ির রামগড়, নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ, সেনবাগসহ প্রতিদিন ফেনী জেলার হাজার হাজার লোক চিকিত্সা সুবিধা নিচ্ছে। হাসপাতালটির জন্য অধিগ্রহনকৃত ১৭ একর ভুমির বিরাট অংশই খালি পড়ে আছে। অনায়াসেই এখানে মেডিকেল কলেজ চালু করা যায়। মেডিকেল কলেজ চালু করার হলে উল্লেখিত এলাকায় সহ প্রায় ৪০ লক্ষ্য মানুষের চিকিত্সা সুবিধাসহ ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে। ৬। ১৯৬৪ সালে প্রায় ১৫ একর জায়গা নিয়ে পলিটেকনিকেল কলেজ চালু হলেও ভাবা হয়নি এটাকে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় উন্নতি করার। এ বিষয়ে উদ্যোগ নেয়া জুরুরী। ৭। ফেনী গার্লস কেডেট কলেজ ও ফেনী কম্পিউটার ইন্সটিটিউটের অবস্থান ফেনীতে হলেও এ সকল প্রতিষ্ঠানের ছেলেমেয়েদের ভর্তির জন্য কোন কোটা সংরক্ষন করা হয়নি। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্দেশ্য থাকে সংশ্লিষ্ট এলাকাকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করার। কিন্তু এখানে তা হচ্ছে না। তা ফেনীবাসীর দাবী তাই এ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্থানীয় শিক্ষার্থী দের মেধাবৃত্তির ২৫% কোটা সংরক্ষন অত্যাবশ্যক। ৮। ফেনীর মানুষ যেখানে ফেনীকে মেগাসিটি হিসাবে গড়ার স্বপ্ন দেখছে সেখানে ক্রিড়াঙ্গনের পরিবেশ অত্যান্ত হতাশাব্যঞ্ছক। ফেনী বাংলাদেশের দক্ষিন পূর্বাংঞ্চলের স্থল যোগাযোগের মোহনায় বিধায় অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল বলে বিবেচিত। ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নোয়াখালী, লক্ষীপুর, খাগড়াছড়ি জেলার সাথে ফেনী জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যান্ত উন্নত ফলে এখানে আর্ন্তজাতিক মানের একটি ষ্টেডিয়াম তৈরী করা সময়ের দাবী। শহীদ মেজর ছালা উদ্দিন বীরোত্তম উচ্চ বিদ্যালয়ের উত্তর পাশে বারাহির পুর মৌজায় সরকার নির্মিত জীমনেশিয়াম এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে সরকারের অধিগ্রহন করা প্রায় ১০ একর জায়গা যা পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। ৯। ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার মুহুরী প্রজেক্ট এলাকায় পর্যটন শিল্পের সম্ভবনা অপরিসীম। ১০। প্রারম্ভেই উল্লেখ করা হয়েছে যে দ্রুত বধিষ্ণু এ জনপদের মানুষকে ব্যবসা বানিজ্য চিকিত্সা চাকরীসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে দৈনন্দিন হাজার হাজার মানুষকে রাজধানী ঢাকা যাতায়াত করতে হয়। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় যানবাহন ব্যবস্থা একে বারেই অপ্রতুল হওয়ায় প্রতিদিন অগনিত মানুষকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। ১১। অবিভক্ত ভারতের ইংরেজ শাসনকালীন সময়ে প্রতিষ্ঠিত ফেনী বিলোনীয়া ব্রাঞ্চ ট্রেন লাইনটি দীর্ঘ এক যুগের অধিক সময়ে বন্ধ রয়েছে। ফলে ফুলগাজী-পরশুরাম উপজেলার কয়েক লক্ষ মানুষের জেলা সদরে যাতায়াতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে এবং ব্যবসা বানিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ১২। রেকর্ডরুম স্থানান্তরঃ ১৯৮৪ সালের ১লা মার্চ ফেনী জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠার পর ৩০ বছর অতিক্রম হতে চললেও জন ভোগান্তি রয়ে গেছে অনেক ক্ষেত্রে। ১৩। প্রায় ৩ একর আয়তনের ফেনী রাজঝীর দীঘি ফেনী শহরের সৌন্দযের আধার। ১৪। স্বাধীনতা যুদ্ধোত্তোর ঘাতকদের হাতে মিরপুরে ঘুম হওয়া ফেনীর কৃতি সন্তান শহীদ জহির রায়হান এর নামের হলটি পরিকল্পনাহীনভাবে ভেঙ্গে ফেলেছে ফেনী জেলা পরিষদ এর এক শ্রেনীর দুনীর্তিবাজ কর্মকর্তা। সেটি কখন পূর্ণ নির্মিত হবে এমন তথ্য কারো জানা নেই । এটিকে পূর্বস্থান থেকে সরিয়ে জেলা পরিষদ পুকুরের পশ্চিম পাড়ে বর্তমানে সালাম কমিউনিটি সেন্টারের স্থানে তেরী করা হউক। জহির রায়হান হলটি পূর্বস্থানে মাত্র কয়েক গজের ব্যবধানে দক্ষিন দিকে ফেনী ডায়াবেটিকস হাসপাতালটি ফেনী আলিয়া মাদ্রাসা মসজিদটি অবস্থিত। পাবলিক ফাংসনে ব্যবহূত মাইকের বিকট আওয়াজ হাসপাতালের চিকিত্সাধীন শত শত রোগীদের জন্য নিদারুন কষ্ঠের কারন হয়ে দাঁড়ায়। তাই এটি কে পশ্চিম দিকে সরিয়ে তৈরী করা হলে হাসপাতলের রোগী এবং মসজিদে এবাদত রত মুসল্লীদের উপকার হবে।উপরন্ত মিজান রোড সড়কটি সরু হওয়ায় রাজনৈতিক সমাবেশগুলির হল উপচানো ভিড় রাস্তায় ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি করে। জহির রায়হান হলের গেট এবং ডায়াবিটিকস হাসপাতালের গেট ১০/১২ গজের মধ্যে মুখোমুখি হওয়ায় হাসপাতাল গেটটি অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে এবং জরুরী চিকিত্সায় রোগীদের হাসপতালে আনা নেওয়ার ক্ষেত্রে মারাত্নক প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়। ১৫। ফেনী মহকুমার স্থপতি কবি নবীন চন্দ্র সেন। চট্ট্রগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের পার্সোনাল এসিসট্যান্ট থাকা অবস্থায় চট্টগ্রাম নোয়াখালী ও কুমিল্লার সংযোগ স্থল ফেনীকে মহকুমা করার প্রস্তাব পেশ করেন। ১৮৭৫ সালে বাস্তব রুপ দান করেন। পরবর্তীতে মহকুমা প্রশাসক হয়ে ফেনী আসেন। ফেনী বাজার প্রতিষ্ঠা, ফেনী পাইলট হাইস্কুল, জেলখানা, দাতব্য চিকিত্সালয়, রাজাঝির দীঘির চর্তুপার্শ্বে কোট কাচারী ও প্রশাসনিক কার্যলয় স্থাপন এবং ফেনী শহরের উপর রেল লাইন নির্মান করে মহকুমা শহরের গোড়া পত্তন করেন। তারাই ধারাবাহিকতায় ফেনী আজকে মেগা শহরের রুপ লাভ করতে চলেছে। যার এত দান তার স্মৃতিকে স্মরন করার মতো এখানে কিছুই নেই। এতে অন্তত কিছূটা হলেও ফেনী বাসীর দায় মুক্তি হবে।
উপরোক্ত বিষয়গুলো বাস্তবায়নে সকল মহলের সুদৃষ্টি ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহনের আশাবাদ ব্যক্ত করছি।
লেখকঃ
সাংবাদিক, রাজনীতিক ও সমাজ কর্মী
