১৯৫২ সালে বাংলা ভাষার মর্যাদার লড়াইয়ে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের নির্মম রোষানলের শিকার হয়ে যারা নিজেদের জীবন উত্সর্গ করেছিলেন তাদের একজন ফেনীর গর্ব ভাষা সৈনিক আবদুস সালাম। ১৯২৫ সালের ২৭ শে নভেম্বর ফেনী জেলাধীন দাগনভূঁঞা উপজেলার অন্তর্গত লক্ষণপুর গ্রামের খোদাজান ভূঁঞা বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মো: ফাজিল মিঞা, পেশায় তিনি একজন কৃষক, মা মোসাম্মাত্ দৌলতের নেছা একজন গৃহিনী। চার ভাই দুই বোনের মধ্যে আবদুস সালাম সবার বড় ছিলেন। বর্তমানে তার ভাই বোনদের মধ্যে জীবিত রয়েছেন একমাত্র ভাই আবদুল করিম ( সামরিক বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার)।
ভাষা শহীদ আবদুস সালাম স্থানীয় দাগনভূঁঞা আতাতুর্ক হাই স্কুলে প্রথম শ্রেনী থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। দশম শ্রেনীতে ওঠার পর আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে আকস্মিক তার পড়াশুনা বন্ধ হয়ে যায়। পরিবারের অভাব অনটনের জন্য তিনি কোলকাতা চলে যান। সেখানে আগামউদ্দিন ইস্ট্রিটে জেঠাতো বোনের বাসায় আশ্রয় নেন। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ভারত পাকিস্তান বিভক্তির পর তিনি তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে আসেন। এসময় তিনি ঢাকায় মিন্টু রোডে অবস্থিত তত্কালীন ডাইরেক্টর অব ইন্ডাস্ট্রিজ অফিসে রেকর্ড কিপার পদে যোগদান করেন। তখন তিনি ৩৬/বি, সরকারী ব্যারাকে একটি ব্যাচেলর সিট নেন এবং কোন রকমে দিন যাপন করতে থাকেন।
চাকরিরত অবস্থায় পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি ওঠে এবং প্রতিদিন শহরে ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার দাবিতে মিছিল মিটিং এ তিনি অগ্রনী ভূমিকা পালন করতেন। তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার রাষ্ট্রভাষার দাবিকে দাবিয়ে রাখার জন্য ১৯৫২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে এক মাসের জন্য ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে। এর মধ্যেও ভাষা আন্দোলনকারীরা তাদের আন্দোলন অব্যাহত রাখে। ২১ ফেব্রুয়ারি সকালে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে অভিষ্ঠ লক্ষ্যে পৌঁছার উদ্দেশ্যে ১০ জনের এক একটি ছোট দল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের প্রধান ফটক দিয়ে সুসংগঠিত হয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে। এসময় পুলিশ নির্বিচারে ভাষা আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ করতে থাকে। পুলিশের গুলিতে সালাম বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে দেড় মাস চিকিত্সাধীন থাকার পর ৭ এপ্রিল তিনি মারা যান। পরে তাকে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়। সরকারের নিকট তার ভাই আবদুল করিমের আবেদন ভাষা আন্দোলনে তার ভাইসহ শহীদ বরণ করা সকলের কবর সনাক্ত করে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় সমাহিত করে যেন সংরক্ষণ করা হয়।
সরকার ভাষা শহীদ সালামের পৈত্রিক বাড়ি দাগনভূঁঞার লক্ষণপুর গ্রামকে ‘ভাষা শহীদ সালাম নগর’ হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এছাড়া ২০০০ সালে বাংলাদেশসরকার আবদুস সালামের পরিবারকে ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের একজন অমর শহীদ ও ভাষা আন্দোলনে গৌরবময় অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ভাষা শহীদ আবদুস সালামকে একুশে পদক (মরণোত্তর) ও নগদ চল্লিশ হাজার টাকা ও সনদ প্রদান করে। সালামের স্মৃতি রক্ষার্থে তার পৈত্রিক বাড়ির আঙ্গিনায় সালাম নগরে জেলা পরিষদ কর্তৃক প্রায় ৬৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ভাষা শহীদ সালাম গ্রন্থাগার ও ‘স্মৃতি জাদুঘর’ নির্মাণের উদ্যেগ গ্রহণ করেছে। ফেনী জেলার স্টেডিয়াম ও জেলা পরিষদের কমিউনিটি সেন্টারটিকে ভাষা শহীদ সালামের নামে নামকরণ করা হয়েছে।
