কোরবানির ঈদের পর থেকে রাজধানীর জিনজিরা, কেরানীগঞ্জ, কিল্লার মোড়, লালবাগ, শনিরআখড়া, জুরাইন, কসাইটুলি, পোস্তগোলা প্রভৃতি এলাকায় শুরু হয়েছে চর্বি (কোরবানির পশুর ফ্যাট) ফেরিওয়ালাদের আনাগোনা। কাপড় কাঁচা সাবান তৈরির অন্যতম এই উপাদানটির বেচাকেনায় এখন ব্যস্ত মৌসুমী ব্যবসায়ী আর পাইকাররা। খুচরা ফেরিওয়ালারা বাসা-বাড়ি থেকে চর্বি কিনে তা বিক্রি করছেন চর্বির দোকানির কাছে। সেখান থেকে তা পাইকারদের কাছে চলে যাচ্ছে। এভাবে মৌসুমী কর্মসংস্থানে জড়িয়ে পড়েছেন অনেকেই।
কোরবানি ঈদের পরপর এই সময়ে দেশে টনকে টন চর্বি কেনাবেচা হয় অনেকেরই অজান্তে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বিষয়টি সবাই জানলে আর সরকার সহযোগিতা বাড়ালে কাপড় কাঁচা সাবান তৈরির কাঁচামাল আমদানি ব্যয় অনেকটাই কমিয়ে ফেলা সম্ভব হবে।
বাসা-বাড়ি থেকে চর্বি সংগ্রহকারী মো. সালাউদ্দিন জানান, ঈদের তিন-চার দিন পরে তার মতো খুচরা চর্বি ক্রেতারা পাইকারদের কাছ থেকে দাদন বা টাকা নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েন। সারাদিন যা কেনা হয় তা বিকেলে পাইকারের দোকানে বিক্রি করেন। দুই হাজার টাকা দাদন নিলে ৫০০ টাকার মতো লাভ পাওয়া যায়। তিনি জানান, এ বছর খুচরা বিক্রেতারা ৩৫ - ৪০ টাকা কেজি দরে চর্বি কিনে ৪০ থেকে ৪৫ টাকায় বিক্রি করছেন। ঈদের এই সময়ে তিন-চার মাস সালাউদ্দিন চর্বির ব্যবসা করে পঞ্চাশ-ষাট হাজার টাকা আয় করেন।
কোরবানির বস্তু বিক্রি করার নিয়ম আছে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে জিনজিরার বাসিন্দা রেহানা বেগম বলেন, তিনি চর্বি ও চামড়া বেচার টাকাটা তার বাড়ির কাজের মেয়ে ও দারোয়ানকে দিয়ে দেন। তাই ওরা আগ্রহ নিয়ে চর্বি চুলায় জাল দিয়ে জমিয়ে রাখে বিক্রির জন্য। চর্বি জমাট, জাল দেয়া বা মসলা মেশানো থাক কিংবা গত বছরের পুরানো হলেও তাতে খুচরা বিক্রেতাদের দামের হের ফের হয় না।
জিনজিরার ইমাম বাড়ি এলাকার চর্বি দোকানি মো: সাদেক হোসেন সারা বছর ভাঙ্গারির ব্যবসা করলেও ঈদের এই সময় চর্বি বেচাকেনা করেন। এ বছর তিনি ২ হাজার, এক হাজার টাকা করে ৩০ জনকে দাদন দিয়েছেন। এলাকায় তার মতো ১০ থেকে ১২ জন দোকানি আছেন, যারা প্রতিদিন ৫/৬শ’ কেজি চর্বি কেনেন। কেনা চর্বি তারা পাইকারদের কাছে বিক্রি করেন। একই এলাকার দোকানি মো. দিলু মিয়া জানান, ঈদের মৌসুমে তাদের মতো ব্যবসায়ীদের সব খরচ বাদ দিয়ে দুই তিন লাখ টাকা আয় হয়।
আগের তুলনায় এখন চর্বির পরিমাণ বাড়ছে বলে জানালেন পাইকারি বিক্রেতা তাজুল ইসলাম ও মো ফিরোজ মিয়া। তারা বলেন, আগে কেউ কেউ চর্বি দিয়ে পরোটা ও অন্য খাবার তৈরি করলেও স্বাস্থ্য সচেতনতার জন্য আজকাল তা আর করেন না। প্রতি মৌসুমে তারা ২০ থেকে ৫০ টন চর্বি বিক্রি করেন। তাদের প্রতি কেজিতে ২/৩ টাকা করে লাভ হয়। এই সকল মৌসুমী বিক্রেতাদের কাছ থেকে চর্বি কিনে পাইকাররা সাবান ফ্যাক্টরিতে বিক্রি করেন।
শনির আখড়ার ইবনে সিনা ফুড এন্ড ক্যামিক্যাল ইন্ডাস্ট্রির ব্যবস্থাপনা পরিচালক নজরুল ইসলাম সরকার বলেন, তারা এই সময়টায় পাইকারদের চর্বি নেন। চর্বির সাথে পামওয়েল মিশিয়ে কাপড় কাঁচার সাবান বানান। শুধু পামওয়েল দিয়ে সাবান বানালে খরচ বেশি পড়ে। চর্বির সাবানে একটু গন্ধ থাকে। চর্বির সাথে পামওয়েল ব্যবহারে গন্ধ কমে।
চর্বিতে তৈরি সাবানের মান সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক মো. ইকবাল রউফ মামুন বলেন, সাবান তৈরির প্রধান কাঁচামাল চর্বি কিংবা পামওয়েল। এর সাথে সোডিয়াম হাইড্রো অক্সাইড বা পটাসিয়ামের রাসায়নিক বিক্রিয়ায় সাবান তৈরি হয়। এভাবে চর্বি পাওয়া গেলে আমাদের পামওয়েল আমদানি ব্যয় কমবে। আর যেহেতু এটি গরু ও খাসির চর্বি তাই এর তৈরি সাবানও হালাল।
অধ্যাপক মামুন মনে করেন, অনেকে এই বিষয়টি জানেন না বলে অনেক চর্বি অপচয় হয়। বিষয়টি সম্পর্কে সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় জনগণকে সচেতন করলে পামওয়েল আমদানি ব্যয় কমবে। এছাড়া চামড়া শিল্পের মতো মৌসুমী চর্বি ব্যবসা প্রসার লাভ করবে, অনেকের কর্মসংস্থান হবে।
