ব্রিটেন অভিবাসী হটাও অভিযান!

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০১৩, ২১:৩৭
দিনে দিনে অভিবাসীদের জন্য প্রতিকূল হয়ে উঠেছে ব্রিটেন। গত জুলাইয়ে দেশটিতে অবস্থানরত অবৈধ অভিবাসীদের নিজ নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য ভ্যান গাড়িতে বিজ্ঞাপন প্রচার করেছিলো দেশটির সরকার। ভ্যানের গায়ে রঙিন পোষ্টারে সাঁটা এ ব্যানারে লেখা ছিলো ‘ব্রিটেনে অবৈধভাবে বসবাস করছেন? ফ্রি পরামর্শ এবং ট্রাভেল ডকুমেন্টের জন্য সহায়তা পেতে ‘হোম’ লিখে এসএমএস পাঠান ৭৮০৭০ নাম্বারে। কোনো ধরনের গ্রেফতার কিংবা আটক রাখা ছাড়াই আপনাকে দেশে ফিরে যেতে সাহায্য করা হবে’। স্বেচ্চায় বিদায় না নিলে অবৈধ অভিবাসীদের গ্রেফতার করে দেশে ফেরত পাঠানো হবে। সরকারের এমন পদক্ষেপে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় উঠে। পরে এ বিজ্ঞাপন বন্ধ করে ব্রিটিশ সরকার। কিন্তু অবৈধ অভিবাসীদের তাড়াতে যেন বদ্ধ পরিকর ডেভিড ক্যামেরনের সরকার। অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে দিন দিন আইন কঠোর করা হচ্ছে। গত ২২ অক্টোবর ব্রিটেনের হাউস অব কমন্সে পাস হওয়া অভিবাসী বিলের পর বাড়িওয়ালা ও ডাক্তাররা তাদের ভাড়াটিয়া ও রোগীদের অভিবাসন অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ খবর নিতে বাধ্য থাকবে। অবৈধ অভিবাসীরা যাতে ব্যাংক একাউন্ট খুলতে না পারে সে প্রক্রিয়া কঠোর করা হয়েছে। ড্রাইভিং লাইসেন্স ও ভূয়া বিয়ে বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। এছাড়া এখন থেকে আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদনের বিষয়টি শুধুমাত্র মৌলিক মানবাধিকার বিবেচনা করে প্রদান করা হবে। কোন কার্যপ্রণালীর ভিত্তিতে নয়। এ বিল হলো অভিবাসন কমাতে ব্রিটিশ সরকারের ধারাবাহিক প্রচেষ্টার অংশ। এর মাধ্যমে স্টুডেন্ট, ওয়ার্ক ভিসা ও স্পাউস ভিসার দুর্বলতার মাধ্যমে অভিবাসনের সুযোগ বন্ধ করা হয়েছে। ব্রিটেনে অভিবাসন খুবই অজনপ্রিয়। আর অবৈধ অভিবাসন তো অগ্রহণযোগ্য। যে কারণে বিরোধী লেবার পার্টি শুধু এ আইনের পক্ষে সমর্থনই দেয়নি বরং আরো কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার পক্ষে মত দিয়েছে। যে কারণে দুর্বিপাকে পড়েছে লাখ অভিবাসী। মেরি জিম্বাবুয়ের নাগরিক। ২০০৩ সালে এই নারী ব্রিটেনে আসেন। দক্ষিণ আফ্রিকার পাসপোর্ট নিয়ে ব্রিটেনে এসে তিনি আশ্রয় প্রার্থনা করেন। তার আবেদন নাকচ হয়েছে। কয়েক বছরের আপিল আবেদনের পর তার যখন দেশ ছেড়ে যাওয়ার কথা তখন তিনি নিজের হাত ব্লেড দিয়ে কেটে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তদের মত হলো মেরির ব্রিটেনে থাকার কোনো অধিকার নেই। তার কাজ করার ও সরকারী সুযোগ সুবিধা নেয়ারও কোনো অধিকার নেই। শুধু মেরি নয় এমন অবস্থা অনেকেরই। এরপরও অনেক অভিবাসী চাইবে ব্রিটেনে আশ্রয় নিয়ে থেকে যেতে। কারণ তাদের নিজ দেশের থেকে ব্রিটেন এখনো ভালো। ব্রিটেনে কত অভিবাসী অবৈধভাবে রয়েছে তার সঠিক কোনো হিসাব নেই। ২০০৯ সালে লন্ডন স্কুল অব ইকোনোমিকস একটি হিসাব দেয় তাতে বলা হয়, প্রায় ৬ লাখ ১৮ হাজার অবৈধ অভিবাসী ব্রিটেনে রয়েছেন। যা লন্ডন শহরের বাসিন্দাদের সংখ্যার ৭০ শতাংশ। রাজনীতিকরা বলছেন, মানব পাচারের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। কারণ এটি অনেক বড় অপরাধ। কিন্তু বাস্তবতা হলো মোট অবৈধ অভিবাসীদের ১০ শতাংশও পাচারের মাধ্যমে আসেনি। বরং এক দশক আগে সীমান্তে নড়বড়ে নজরদারির সুযোগেই অসংখ্য অভিবাসী ব্রিটেনে প্রবেশ করে। যদিও বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা চলাকালে ব্রিটেন বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য তার দ্বার উন্মোচন করে। কম খরচে ও কম যোগ্যতায় সেদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশুনার সুযোগ করে দেয়। পড়াশুনা ও কাজের আশায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো থেকে অনেক শিক্ষার্থী ব্রিটেনে পাড়ি জমায়। কিন্তু কিছুদিন পরই ব্রিটেন তাদের কাজ করাসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিধি-নিষেধ কঠোর করে। যে কারণে বিপাকে পড়ে অনেক শিক্ষার্থী ব্রিটেন ছেড়ে আসতে বাধ্য হয়েছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ফ্রাঙ্ক ডুভেলও এমনটাই মনে করেন। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক কারণে অবৈধ অভিবাসীর আসার সংখ্যা কমে গেছে। স্টুডেন্ট ভিসা ও পারিবারিক ভিসা প্রক্রিয়া কঠোর করায় খুব কমই আসছে যারা মেয়াদের বেশি সময় থাকার আবেদন করে। এছাড়া আশ্রয় প্রার্থীদের সংখ্যাও ২০০০ সালের চেয়ে ৭৩ শতাংশ কমে গেছে। তবে কিছু বিষয় এখনো রয়েছে। অনেক অবৈধ অভিবাসী ইউরোপিয়ান নাগরিককে বিয়ে করছে যে কারণে তারা চূড়ান্তভাবে আশ্রয় পাচ্ছে। কারো পারিবারিক বন্ধন এতোটাই শক্ত যে মানবাধিকার আইনের আওতায় তারা থাকতে পারছে। বর্তমানে ব্রিটেনে দুই ধরনের অবৈধ অভিবাসী রয়েছে। একটি হচ্ছে ভিসার মেয়াদের চেয়ে বেশি সময় অবস্থান, অন্যটি হচ্ছে আশ্রয় চেয়ে ব্যর্থ হওয়া। যদিও এদের কেউ কেউ বৈধভাবে ব্যাংক একাউন্ট করেছে এবং ড্রাইভিং লাইসেন্সও পেয়েছে। ব্রিটেনের শ্রমবাজারেও প্রভাব ফেলছে তারা। এসব অবৈধ অভিবাসীদের বেতন তুলনামূলক কম। যে কারণে ব্রিটিশদের কর্মক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে পড়েছে বলে মনে সরকার। তবে কর্মসংস্থান বাড়ানোর জন্য ব্রিটিশ সরকার যে পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে তা সুবিবেচনা প্রসূত নয়। কারণ অবৈধ অভিবাসীদের খুব কমই সম্মানজনক কাজ করে। এদের বেশির ভাগই কম বেতন পায়। আর গত কয়েক প্রজন্ম থেকে ব্রিটিশ নাগরিকরা এই মানসিকতা নিয়ে বড় হয়েছে এ ধরনের ছোট কাজ তাদের জন্য নয়। তারা আরো ভালো কিছু আশা করে। রাতারাতি ব্রিটিশদের এ মনোভাব পরিবর্তন হবে না। এমনটাও হবে না যে অবৈধ অভিবাসীরা চলে গেলে তাদের জায়গায় ব্রিটিশরা যোগ দেবে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের সাবেক চেয়ারম্যান এলান গ্রিনস্পান ২০০৯ সালের এপ্রিলে অভিবাসন বিষয়ক সিনেটের জুডিশিয়ারি সাব কমিটি এবং রিফুজি ও বর্ডার সিকিউরিটির সামনে এক শুনানিতে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবৈধ অভিবাসীরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। তারা অর্থনীতির জন্য সেফটি ভালভের মতো কাজ করছে। বিশেষ করে শ্রম চাহিদার ওঠা-নামার সময় তাদের কার্যকারিতা রয়েছে। তিনি অভিবাসন আইন সংস্কারের দাবি জানিয়ে এ বক্তব্য তুলে ধরেছিলেন। মনে হয় এ খবরটি ক্যামেরনের সরকার জানে না।