উত্তর আমেরিকার দেশ মেক্সিকো। অসম আয় বণ্টন ও ড্রাগ-সংক্রান্ত হিংসার ঘটনা দেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা বলে বিবেচিত। কিন্তু সেই দেশটিই এখন অভিবাসীদের জন্য উত্কৃষ্ট স্থান হিসেবে পরিণত হচ্ছে। দেশটির উত্তরে অভিবাসীর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। ২০০০ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত অভিবাসীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুন হয়েছে। এর পেছনে বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
চীনের বাজারে শ্রমের মূল্য বৃদ্ধি এবং পরিবহণ খাতে খরচের কারণে মেক্সিকোতে অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে এবং আমেরিকার বাজারে রপ্তানির ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখছে। মেক্সিকোতে শ্রমের বাজার সস্তা। ইউরোপের অর্থনীতি ধীরে ধীরে অবনতির দিকে যাচ্ছে। ফলে শ্রমিকরা এবং বাজার মেক্সিকোর দিকে যাচ্ছে। আর দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উত্তর আমেরিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র,কানাডা এবং ব্রাজিলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংস্থা বা আইএমএফ’র তথ্যমতে, ২০১১ এবং ২০১২ সালে মেক্সিকো বিশ্বব্যাপী আকর্ষণ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। দেশটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নির্বাহী কর্মকর্তা থেকে শুরু করে শ্রমিক পর্যন্ত সব শ্রেণীতেই সংখ্যা বাড়ছে। গত নভেম্বর থেকে এ পর্যন্ত নাগরিকত্বের আবেদন শতকরা ১০ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। আবেদনকারীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের। গিলাম পেস নামের একটি ফ্রান্সের কোম্পানি জানিয়েছে, তার দেশ ফ্রান্সের অর্থনৈতিক অবস্থা দিন দিন নুয়ে পড়ছে। আর কোম্পানিটি মেক্সিকোতে নতুন করে বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে। কেবল ফ্রান্সের এই কোম্পানিটিই নয়, লি হুয়ান হি নামের দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিক ইন্টারনশিপের জন্য মেক্সিকো পাড়ি জমাচ্ছেন। এই কাতারে আছেন, জাপানের চলচ্চিত্রকার, স্পেনের নির্বাহী পর্যায়ের কর্মকর্তা, আমেরিকার বিনিয়োগকারী এবং ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা। আর এরা আসছেন নতুন স্বপ্ন পূরণে এবং মেক্সিকোর জন্য নতুন স্বপ্নের বার্তা নিয়ে। কারণ এখানে ব্যবসা কিংবা বসাবাসের সেইসব সুযোগ-সুবিধা যা একজন বিনিয়োগকারী চায়। আর এর প্রমাণ পাওয়া গেল খোদ এর প্রতিবেশি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের এক বিনিয়োগকারীর মুখে। লেসলি তেলেজ নামের ওই বিনিয়োগকারী জানান, এখানে প্রয়োজনীয় সব কিছু আছে। তাই যে কোনো সময় যে কোনো সফলতা আপনার দিকে ধাবিত হতে পারে। কারণ তিনি তার রান্নাঘর সম্পর্কিত কিছু ব্যবসায় সফলতা পেয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, মেক্সিকোতে তিনি যে পরিমাণ খরিদ্দার পেয়েছেন তা কখনোই যুক্তরাষ্ট্রে পাওয়া সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্র এবং মেক্সিকোর সরকারের কাছে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র থেকেই বেশি নাগরিক মেক্সিকোয় প্রবেশ করছে। ২০০০ সালে মেক্সিকোতে আমেরিকার অভিবাসীর দুই-তৃতীয়াংশ। কিন্তু সেই ব্যবধানটা কমছে। মেক্সিকো থেকে যতো নাগরিক না যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করছে তার চেয়ে বেশি নাগরিক যুক্তরাষ্ট্র থেকে মেক্সিকোতে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রে মেক্সিকোর অভিবাসীর সংখ্যা একটা ভারসাম্য পর্যায়ে পৌছেছে। ২০০৫ সালে যারা গিয়েছিল তারা ২০১০ সালে আবার ফিরে এসেছে। অনেক আমেরিকান দেশটিতে বৈধভাবে বাস করছে। ২০০৯ সালে অভিবাসীর সংখ্যা ছিল ৬০ হাজার যা ২০১২ সালে এসে দাঁড়ায় ৭০ হাজারে। এমন না যে এদের মধ্যে কেবল শিক্ষার্থী এবং অবসরপ্রাপ্তরা ভ্রমণ ভিসায় এসেছে। ২০০৫ সাল থেকে দেশটিতে তিন লাখ ৫০ হাজার শিশু তাদের মা-বাবার সঙ্গে মেক্সিকোতে পাড়ি জমিয়েছে। অভিবাসী আসছে ভেনিজুয়েলা থেকেও।
পরিবর্তন আসছে মেক্সিকোয়: মেক্সিকোর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের অভিবাসন নীতির সাবেক পরিচালক আর্নেস্ট রদরিগুয়েজ চ্যাভেজ জানান, সকল নির্দেশকের দিক থেকেই মেক্সিকোয় একটা পরিবর্তন আসছে। আর এই পরিবর্তন আসছে সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক সব ক্ষেত্রেই। সারা বিশ্বের জন্য দুয়ার খুলে দিয়েছে। অর্থনীতিবিদ, জনসংখ্যাতাত্ত্বিক এবং মেক্সিকোর কর্মকর্তাদের মতে, মেক্সিকোতে বিদেশিদের অধিক সংখ্যকহারে আসা প্রমাণ করে বৈশ্বিক প্রবণতা বা ধারা মেক্সিকো ভাঙতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়া দেশটির প্রেসিডেন্ট এনরিক পেনা নিয়েতো মাঝে মাঝে বলেন, মেক্সিকোয় তারকারা কাতারবদ্ধ হচ্ছে। কিন্তু মেক্সিকোর এই ধারা ধরে রাখতে যে বাধা নেই তা কিন্তু নয়। বাধা দূর করা না হলে যে কোনো সময় আবার নেতিবাচক প্রভাবও ফেলতে পারে। দেশটিতে বৈষম্য রয়েছে প্রচুর। শিক্ষা ক্ষেত্রে একটা বিশৃঙ্খলা রয়েছে। অপরাধ প্রবণতাও আছে অধিক। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মেক্সিকোয় আসার ফলে দেশি কোম্পানিগুলো রপ্তানির ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে। কারণ সবার জন্য দরজা খোলা রাখাটা খুবই কঠিন। তবে গত কয়েক বছরে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর্থিক ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছে। তাই দেশটির অর্থনৈতিক এবং বিশেষজ্ঞরা এই বার্তা পেয়েছেন যে, একক কোনো কিছু দেশটির পরিবর্তন আনতে পারবে না। মেক্সিকোর এই পরিবর্তনকে বলা হচ্ছে ‘মেক্সিকান মুহূর্ত’। দেশটির অর্থমন্ত্রী ইলদেফোনসো গুজারদো বলছেন, এই পরিবর্তনের মানে এই নয় যে আমাদের ভবিষ্যত অত্যন্ত উজ্জ্বল। বরং আমাদের এই মুহূর্তটার সুবিধা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, এই মুহূর্তটার সুবিধা যেন সবাই সমানভাবে পায়। এই সুযোগ যেন নতুন আগত কিংবা কিছু সংখ্যক নাগরিকদের জন্য নির্ধারিত না হয়। অর্থমন্ত্রীর এই বক্তব্য কিন্তু যুক্তিসঙ্গত মনে হবে যদি এর ইতিহাসের দিকে তাকানো যায়। বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক কেভিন পি গ্যালেঘার বলেন, ১৯৯৪ সালে মেক্সিকোর মুদ্রার বিনিময় হারে উন্নতি লক্ষ্য করা গেছিল। ওই বছর দেশটি উত্তর আটলান্টিক সহযোগিতা চুক্তি (নাফটা) স্বাক্ষর করেছিল। এর সদস্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকো। ওই সময় দেশটির রপ্তানির ক্ষেত্রে একটা সুবর্ণ সুযোগ এসেছিল। সেই সুযোগটি এখন এসেছে। তার মতে, মেক্সিকোর ১১২ মিলিয়ন নাগরিক যদি তাদের নতুন করে শিক্ষিতদের সফলভাবে গড়ে তুলতে পারে এবং বিদেশিদের সুযোগ-সুবিধা দিতে পারে তাহলে এই পরিবর্তন তাদের জন্য সুফল বয়ে আনতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বিনিয়োগকারী চীনকে বেছে নিতে চাচ্ছে। মেক্সিকো যদি এই কোম্পানিগুলোকে সস্তা শ্রম এবং ব্যবসার সুষ্ঠু পরিবেশ দিতে পারে তাহলে দেশটির যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশের অংশীদার হতে পারে। আর দেশটির প্রেসিডেন্ট এই বিষয়ে অঙ্গিকারও করেছেন। তাই কেভিনের মতে, এটা তাদের দ্বিতীয়বারের মতো সুযোগ। তবে এটি তারা কাজে লাগাতে পারবে কিনা এটাই দেখার বিষয়।
মেক্সিকোর ১৯১৭ সালের সংবিধানে দেশি কোম্পানিকে সুযোগ-সুবিধা দেয়ার আইন ছিল। চাকরি থেকে শুরু করে সকল ক্ষেত্রে এই সুযোগ বলবত্ ছিল ১৯৮০ সাল পর্যন্ত। মেক্সািকোর দরজা কখনোই সম্পূর্নভাবে বন্ধ ছিল না। মধ্যশতাব্দীতে ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের সময় অনেকে মেক্সিকোতে এসেছিল। এমনকি আমেরিকানদের উপস্থিতিও ছিল। কিন্তু তাই বলে মেক্সিকো কখনোই বাইরের কাউকে স্বাগত জানায়নি। এমনকি সংবিধানে নন-মেক্সিকানদের জন্য উপকূলের ৩১ মাইলের মধ্যে এবং সীমানার ৬২ মাইলের মধ্যে জমির মালিকানা নেয়া নিষিদ্ধ ছিল। এই পরিবর্তনটার সূচনা হয়, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মেক্সিকোর সম্পর্ক ভাল হয়। অনেক অর্থনীতিবিদ এবং সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, মেক্সিকোর উত্তর-দক্ষিণের মধ্যে ভালবাসা সৃষ্টি হওয়ার ফলে তাদের মানসিক সঙ্কীর্ণতা দূর হয়েছে। এর ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যের অগ্রগতি হয়েছে। মেক্সিকোস সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব আরবান অ্যান্ড এনভায়রোনমেন্টাল ডেমোগ্রাফিকসের বিশেষজ্ঞ ফ্রান্সিসকো আলবা হারনান্দেজ বলেন, আমাদের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন। নির্দিষ্ট্র কিছু পণ্যের বিনিময়ের ক্ষেত্রে আমরা নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে পারছি।
দেখা গেছে, মেক্সিকোর কেন্দ্রীয় শহরে অভিবাসী বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। চীনে না গিয়ে অনেক পরামর্শক এই দেশটিতে আসছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালি থেকে আগাবে ল্যাবের প্রতিষ্ঠাতা অ্যান্ডি কিফার স্মার্টফোন অ্যাপ্লিকেশনের উন্নয়ন ঘটাচ্ছে এবং নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। গুয়ানাযুয়ানতোতে জার্মান বিনিয়োগকারীরা ভক্সওয়াগন গাড়ির ব্যবসা গড়ে তুলছেন। জাপানিরা মোটরসাইকেলের নতুন ব্রান্ড গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। খুলছে নতুন নতুন হোটেল। এছাড়া অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং শিক্ষাক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ করছেন বিদেশিরা। ফ্রান্সের বিনিয়োগকারী গেলয়সিস বলেন, বিনিয়োগকারীরা মেক্সিকোতে আসার কারণ বিনিয়োগের নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরি হওয়া। তবে বিদেশিদের সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রেও অভিযোগ আছে। মেক্সিকান এবং অন্যান্য বিদেশিদের অভিযোগ, ইউরোপীয়দের বেশি সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা কিউবান বংশোদভুত রদরিগুয়েজ বলেন, বিদেশিরা মেক্সিকোকে একটা আকৃতি দিচ্ছে। মেক্সিকোকে সামাজিকভাবে উদার হিসেবে গড়ে তুলছে। বিনিয়োগকারীদের মতে, মেক্সিকোতে বিনিয়োগ সহজ এবং সহজেই লাভবান হওয়া যায়। জীবনকে উপভোগ করা যায়। অভিজ্ঞতার একটা মাঠ হিসেবে দেশটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
