শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চলতি ২০১৩-২০১৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে নতুন শিক্ষাক্রম চালু হচ্ছে। এ অনুযায়ী ২০১৫ সাল থেকে এইচএসসি পরীক্ষা হবে ১২০০ নম্বরের পরিবর্তে ১৩০০ নম্বরের ভিত্তিতে। শিক্ষাক্রমে ২০০ নম্বরের ঐচ্ছিক কম্পিউটার শিক্ষার পরিবর্তে ১০০ নম্বরের আবশ্যিক ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি)’ বিষয় সংযোজিত হয়েছে, যা ছয়টি শাখার শিক্ষার্থীর জন্যই আবশ্যিক। অর্থনীতি ও বাণিজ্যিক ভূগোল উঠিয়ে দেয়া হয়েছে। সাচিবিক বিদ্যা ও অফিস ব্যবস্থাপনা বিষয়টি ২০১৫-২০১৬ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত চালু থাকবে। এ ছাড়া তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বাদে সব বিষয়ের পাঠদান হবে সপ্তাহে পাঁচটি। আইসিটি বিষয়ের ওপর পাঠদান করা হবে সপ্তাহে তিনটি। পাঠদানের ব্যাপ্তিকাল হবে এক ঘণ্টা করে।
সরকারের এ উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী বলে মন্তব্য করেছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্ট একাধিক বিদগ্ধজন। বিশেষ করে সবার জন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আবশ্যিক করায় শিক্ষার্থীরা কর্মক্ষেত্রে আরও বেশি স্বাবলম্বী হবে। তবে সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আইসিটির গুরুত্ব থাকলেও কম্পিউটার শিক্ষাকে বাদ দিয়ে আইসিটি’র প্রয়োগ সম্ভব নয় বলে অনেকে মনে করেন। তাই শিক্ষাক্রমে ২০০ নম্বরের ঐচ্ছিক কম্পিউটার শিক্ষা বিষয়টি বাতিল হওয়াটা নিয়ে অনেকের মধ্যে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে।
শিক্ষক নিয়ে আশংকা
বর্তমানে ২০০ নম্বরের কম্পিউটার শিক্ষা বিষয়টি বাতিল হয়ে যাওয়াতে এবং কম্পিউটার শিক্ষা ও আইসিটি এক নয় প্রচারিত হওয়ায় অনেক শিক্ষকবৃন্দ তাদের চাকরির বিষয়টি নিয়েও আশংকা করেন। কারণ তাদের নিয়োগ হয়েছে কম্পিউটার শিক্ষা বিষয়ের শিক্ষক হিসাবে। এখন কি তাহলে তাদেরকে বাদ দিয়ে নতুন করে আইসিটি বিষয়ের শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে? আজ থেকে বছর দশেক আগেও কম্পিউটার জানা শিক্ষকের অভাব ছিল। সেই সময় অন্য অনেক বিষয়ের শিক্ষকই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নট্রামস (বর্তমানে নেকটার) থেকে দুই মাসের একটি প্রশিক্ষণ নিয়ে কম্পিউটার বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। এখনকার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছরই কম্পিউটার সায়েন্স বিষয়ে কয়েক হাজার স্নাতক শিক্ষার্থী বের হচ্ছেন। এখন আইসিটি বিষয়টি চালু হওয়ায় আগের কম্পিউটার শিক্ষকদের কী হবে, সেটা নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। আবার পুরোনো শিক্ষকরাই যদি আইসিটি বিষয়টি পড়ানো শুরু করেন, তাহলে তাদের কি কম্পিউটার শিক্ষক হিসেবেই গণ্য করা হবে নাকি আইসিটি শিক্ষক হিসেবে? শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে একটি আদেশ জারি হওয়া উচিত বলে সবাই মনে করেন। দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে, ২০০ নম্বরের পরিবর্তে আইসিটি বিষয়ে ১০০ নম্বর থাকায় শিক্ষকদের মূল্যায়ন কম হবে বলে মনে করেন অনেক শিক্ষক। আবার বিষয়টি আবশ্যিক হওয়ায় গুরুত্ব বাড়বে বলেও ধারণা অনেকের।
আইসিটি ও কমপিউটার শিক্ষা
উচ্চমাধ্যমিক কম্পিউটার শিক্ষা বিষয়ের ১ম এবং ২য় পত্রের ২০০ নম্বর বাদ হয়ে যাওয়াতে অনেক কম্পিউটার শিক্ষক খুবই হতাশ হয়েছেন। বিষয়টি পুনর্বহাল রাখার জন্য অনেকে আন্দোলন করতে চাচ্ছেন। এ বিষয়ে আমি অনেক শিক্ষকের সাথে কথা বলে ভিন্ন ভিন্ন মতামত পেয়েছি। অনেকে প্রশ্ন করেছেন ১০০ নম্বর আবশ্যিকের সাথে যদি ২০০ নম্বরের ঐচ্ছিক বিষয়টিও থাকে, তাহলে ১০০ নম্বরের সিলেবাসের সাথে পার্থক্য রাখতে হবে। কিন্তু যেহেতু সব বিষয়গুলোই খুবই প্রাথমিক পর্যায়ের, তাই কোনটি রেখে কোনটি বাদ দেওয়া হবে সেটি নিয়ে জটিলতা তৈরি হবে। আবার যদি ১০০ নম্বরের আবশ্যিক আইসিটি’র পাশাপাশি ২০০ নম্বরের ঐচ্ছিক বিষয়টিও থাকে এবং কলেজ কর্তৃপক্ষ কম্পিউটার শিক্ষা বিষয়ের শিক্ষকের উপর চাপ কমানোর জন্য যদি আইসিটি’র জন্য আলাদা করে শিক্ষক নিয়োগ দেন এবং ১০০ নম্বরের আইসিটি (কম্পিউটার) নেওয়ার পর আবার ২০০ নম্বরের কম্পিউটার শিক্ষা ঐচ্ছিক বিষয়টি যদি ছাত্ররা না নিতে চায় কিংবা যদি অল্প সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রী নিয়ে থাকে তাহলে আগের কম্পিউটার শিক্ষা বিষয়ের শিক্ষকদের অবস্থা আরও খারাপ হবে বলেও অনেক শিক্ষক মনে করেন। অধিকাংশ শিক্ষকদের মতে ২০০ নম্বরের কম্পিউটার শিক্ষা ঐচ্ছিক বিষয়টি না থাকলেও আবশ্যিক হওয়া আইসিটি বিষয়টি কোনো অবস্থাতেই যাতে কম্পিউটার শিক্ষকদের থেকে হাতছাড়া না হয় সেদিকে জোর দাবি জানিয়েছেন। কম্পিউটার শিক্ষা বিষয়টি আসলেই রাখা যায় কিনা, রাখলে সুবিধা কী এবং না রাখলে অসুবিধা কী ইত্যাদি বিষয়গুলোর ব্যাপারে একটি কমিটি করে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞ মহল ছাড়াও শুধু শহরের নয় গ্রামের সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষকদের সাথে মতবিনিময় করে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।
বর্তমানে কম্পিউটার শিক্ষাকে সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে যে আইসিটি (তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি) বিষয়টি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে তা নিয়ে অনেকের মধ্যে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। এ নিয়ে লেখালেখিও করছেন অনেকেই। শিক্ষকদের মধ্যে অনেকেই কম্পিউটার শিক্ষা তথা কম্পিউটিং এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির মধ্যেকার পার্থক্য সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা রাখেন না। কম্পিউটার শিক্ষা বিষয়টি বিলুপ্ত করা হয়েছে এবং উক্ত বিষয়ের ২০০ নম্বরের মধ্যে ব্যবহারিক ৮০ নম্বরসহ আরও ৪০ নম্বর সাচিবিক বিদ্যায় যুক্ত করা হয়েছে। কম্পিউটার শিক্ষা আর আইসিটি বিষয় দুইটি একই কি না, সেটি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই।
অন্য সিলেবাসের সাথে তুলনা
আন্তর্জাতিকভাবে উচ্চমাধ্যমিক সমমানের এ-লেভেল কারিকুলামে কম্পিউটিং এবং আইসিটি নামে দুইটি বিষয় রয়েছে। একজন শিক্ষার্থী এ দুটির যেকোনো একটি অথবা দুটি বিষয়ই আবশ্যিক হিসেবে নিতে পারে। এ-লেভেলে কম্পিউটিং বা কম্পিউটার শিক্ষা বিষয়ে যেসব বিষয়বস্তু অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে কম্পিউটার সিস্টেম, কমিউনিকেশন্স এবং সফটওয়্যার, প্র্যাকটিক্যাল প্রোগ্রামিং টেকনিক, সিস্টেম সফটওয়্যার মেকানিজম, মেশিন আর্কিটেকচার, ডেটাবেজ থিউরি, প্রোগ্রামিং প্যারাডিগম এবং ইন্টিগ্রেটেড ইনফরমেশন সিস্টেম, কমপিউটিং প্রজেক্ট প্রভৃতি। অন্যদিকে এ-লেভেলে আইসিটি বিষয়ে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে আইসিটির প্রাথমিক ধারণা ও ক্রমবিকাশ, কম্পিউটারে কীভাবে ডেটা উপস্থাপিত হয়, কম্পিউটারে ডিজিটাল সার্কিট এবং ডিভাইস ডিজাইনে লজিক গেটের ব্যবহার, কম্পিউটারের দক্ষতা বৃদ্ধিতে মেমোরি ম্যানেজমেন্টের ব্যবহার, অপারেটিং সিস্টেম, সমস্যা সমাধানে প্রোগ্রামিং ল্যাংগুয়েজের ব্যবহার, ডেটা কমিউনিকেশন এবং নেটওয়ার্কিং টেকনোলজি, ডেটাবেজ সিস্টেম ডেভেলপ ও ডিজাইন, এইচটিএমএল ব্যবহার ও ওয়েবসাইট উন্নয়ন, সিস্টেম অ্যানালাইসিস ও ডিজাইন, বর্তমানে ব্যবসায়িক সংগঠন এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ মার্কেটপ্লেসে আইসিটির ব্যবহার, নতুন প্রবণতা এবং ভবিষ্যত নির্দেশনায় আইটিসিটি এবং প্রজেক্ট ইত্যাদি।
অন্যান্য দেশের সিলেবাস পর্যালোচনা করলেও কম্পিউটার বিজ্ঞান বা কম্পিউটার শিক্ষা এবং আইসিটি উভয়ের উপস্থিতিই দেখা যায়। আমাদের উচ্চমাধ্যমিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ের সিলেবাসে কম্পিউটিংয়ের কিছু কিছু বিষয় যা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে তা আইসিটিরই অংশ এবং পরবর্তীতে এগুলো বাদ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে উচ্চশিক্ষায় আইসিটি এবং কম্পিউটার সায়েন্স অবশ্যই আলাদা এবং সিলেবাসে অনেক কিছুর পার্থক্য দেখা যায়। তবে উচ্চমাধ্যমিকের সিলেবাসে আইসিটিতে কম্পিউটারের অনেক বিষয় অন্তুর্ভুক্ত থাকায় এর নাম ‘কম্পিউটার এ্যান্ড আইসিটি’ হলে ভালো হত বলে মনে করেন অনেক শিক্ষক।
আইসিটিতে আরও যা রাখা যেত
বর্তমান পাঠ্যসূচিতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির পরিচিতি, ইনফরমেশন সিস্টেম, ইন্টারনেট, ই-কমার্স, ই-পেমেন্ট, ই-মার্কেটিং, আউটসোর্সিং, সরকারের ই-সার্ভিস পরিচিতি, তথপ্রযুক্তির নিরাপত্তা ও নিরাপদ ব্যবহারের মতো প্রাথমিক বিষয়সমূহ অন্তর্ভুক্ত থাকলে ভালো হতো বলে বিশেষজ্ঞ অনেকে মনে করেন। সেই সাথে একে কর্মমুখি করেও তোলা যেত বলে অনেকেই মত দিয়েছেন। আর এর নম্বর ১০০ হওয়ায় সেটি কী এক বছরে সম্পন্ন হবে নাকি দুই বছরে ৫০ নম্বর করে পড়িয়ে শেষ করতে হবে, সে সম্পর্কিত নির্দেশনার ঘাটতি রয়েছে।
আইসিটি বিষয় সংযোজন নিয়ে সৃষ্ট বিভ্রান্তি যত দ্রুতসম্ভব দূর করার জন্য আলোচিত এসব বিষয় যথাযথ কর্তৃপক্ষকে দ্রুতই পরিস্কার করতে হবে।
লেখক :কম্পিউটার বিষয়ক বইয়ের লেখক এবং শিক্ষক
