বিবিসির অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

ক্ষুদ্রঋণের দায় মেটাতে কিডনি-লিভার বিক্রি!

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০১৩, ২১:৪৫
দেশে ক্ষুদ্রঋণের দায় মেটাতে ভিটেমাটি বিক্রির একাধিক ঘটনা ঘটলেও বিবিসির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে একধিক মর্মান্তিক ঘটনার চিত্র। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তরাঞ্চলীয় জয়পুরহাট জেলার গ্রাম কালাই। দারিদ্র্যের চক্র থেকে বেরিয়ে আসার জন্য এখানকার অনেক মানুষ ক্ষুদ্র ঋণ সংস্থাগুলো থেকে ঋণ নেয়। কিন্তু এই ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে অনেকেই আরও কঠিন সমস্যায় পড়েন। ক্ষুদ্র ঋণ পরিশোধ করার জন্য অনেকে তাদের শরীরের অঙ্গ পর্যন্ত বিক্রি করছেন। তেমনি এক হতভাগ্য ঋণ গ্রহীতা মোহাম্মদ আখতার আলম (৩৩)। তার পেটে ১৫ ইঞ্চি দীর্ঘ একটি কাটা দাগ। তার একটি কিডনি অপসারণ করা হয়েছিল, সেই দাগ রয়ে গেছে শরীরে। কিডনি অপসারণের অস্ত্রোপচারের পর যে পরিচর্যার দরকার ছিল, তা ঠিকমত পাননি মোহাম্মদ আখতার। ফলে তার শরীরের অর্ধেক এখন অবশ হয়ে গেছে। তিনি এখন কেবল এক চোখে দেখতে পান। ভারী কোন কাজ-কর্ম করতে পারেন না। সংসার চালাতে মোহাম্মদ আখতার এখন একটি ছোট্ট দোকান দিয়েছেন। সেখানে তিনি বিক্রি করেন চাল, ময়দা থেকে শুরু করে বাচ্চাদের জন্য নানা মিষ্টি খাবার। বছর কয়েক আগে পর্যন্ত মোহাম্মদ আখতার আলম ছিলেন ভ্যান চালক। মোট আটটি প্রতিষ্ঠান থেকে ক্ষুদ্র ঋণ নিয়েছিলেন তিনি। এসব ঋণের যে কিস্তি আসতো, ভ্যান চালিয়ে তা পরিশোধ করতে পারতেন না। এরকম সময়ে একদিন শরীরের অঙ্গ বিক্রির প্রস্তাব এলো তার কাছে। আলমের ভাষায়, ‘আমার ভ্যানগাড়িতে চড়ে লোকটি যাচ্ছিল। সে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, কেন আমি এই কাজ করি। তাকে বললাম, আমি খুবই গরীব এবং সাত-আটটা এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছি। তখন আমার ঋণের পরিমাণ এক লাখ টাকার মতো। এনজিওগুলোকে টাকা শোধ দিতে পারছি না। টাকা শোধ করার জন্য আমি বাড়ির ফার্নিচার, রান্নার হাঁড়ি-কুড়ি পর্যন্ত বিক্রির চেষ্টা করেছি’। মোহাম্মদ আখতার আলম এক ঋণের চক্রে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তিনি প্রথমে একটি প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেন। সেটা পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ার পর অন্য এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে তা শোধ করার চেষ্টা করেন। সেদিনের ভ্যানগাড়ির সেই যাত্রী ছিলেন মানুষের অঙ্গ কেনা-বেচার দালাল। লোকটি তাকে চার লাখ টাকায় একটি কিডনি বিক্রি করতে রাজি করিয়ে ফেলে। আলম জানান, এর ১৭ দিন পর তিনি ঢাকার এক বেসরকারি হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরেন। তার শারীরিক অবস্থা খুবই সংকটজনক। কিডনি বিক্রি করে যে টাকা পাওয়ার আশা তিনি করেছিলেন, পেয়েছেন তার কয়েকভাগের একভাগ। তিনি আরো জানান, ’এনজিওগুলোর কাছ থেকে যে টাকা ধার নিয়েছিলাম, সেই টাকা শোধ দিতে না পেরেই আমি কিডনি বিক্রি করি। আমরা গরীব, অসহায় মানুষ। সেজন্যেই এটা করেছিলাম। এখন আফসোস করি, কেন করলাম! ’ কালাই গ্রামেরই আরেক বাসিন্দা মোহাম্মদ মোকাররম হোসেন। ক্ষুদ্র ঋণের চক্রে পড়ে তিনিও কিডনি বিক্রি করেছেন। মোকাররম হোসেনের কিডনি অপসারণ করা হয় ভারতে। ডাক্তার তাকে জানিয়েছিল, এতে কোন ঝুঁকি নেই। কিন্তু এখন তিনি কোন ভারী কাজ করতে পারেন না। প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্ষুদ্র ঋণকে লক্ষ লক্ষ দরিদ্র মানুষের ত্রাতা হিসেবে দেখা হয়। জামানত ছাড়া ঋণ নিয়ে গরীব মানুষ যাতে আয়বৃদ্ধি মূলক কাজ-কর্মে লিপ্ত হতে পারে, সেটাই ক্ষুদ্র ঋণের মূল লক্ষ্য। কিন্তু এই ঋণ মানুষ কিভাবে শোধ করছে, সেদিকে খুব কমই নজর দেয়া হয়েছে। অনেক মানুষ একাধিক ঋণ নেয়ার পর আবার নতুন করে ঋণ নিচ্ছেন সেটা জানার কোন উপায় ক্ষুদ্র ঋণ প্রদানকারি সংস্থাগুলোর নেই। ফলে অনেক মানুষ একটা ঋণ শোধ করতে আরেক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে এক চক্রে আটকে পড়েন। এর পরিণামে তাদের কিডনি বিক্রির মতো চরম সিদ্ধান্তও নিতে হয়। বাংলাদেশে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বেচা-কেনার ব্যবসা নিয়ে গত ১২ বছর ধরে গবেষণা করছেন মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির নৃতত্ত্বের অধ্যাপক মনির মনিরুজ্জামান। তিনি বললেন, অনেক মানুষ সংকটে পড়ার পর মনে করেন, তাদের সামনে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রি ছাড়া আর কোন বিকল্প খোলা নেই। অধ্যাপক মনিরুজ্জামান তার গবেষণার কাজে মোট ৩৩ জন মানুষের সাক্ষাত্কার নিয়েছেন, যারা তাদের কিডনি বিক্রি করেছেন। এদের অনেকে তাকে জানিয়েছেন, ঋণ শোধ করতে না পেরেই তারা এই চরম সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি অভিযোগ করেন, এনজিওর কর্মকর্তারা ঋণ শোধের তাগিদ দেয়ার জন্য ঋণগ্রহীতার বাড়িতে গিয়ে বসে থাকেন। তাদের নানাভাবে হয়রানি করেন, ভয়-ভীতি দেখান। এমনকি পুলিশের কাছে অভিযোগ করবেন বলে হুমকি দেন। তার ভাষায়, একজন আমাকে জানিয়েছিলেন, ঋণ শোধ করতে না পেরে তিনি এক বছরের জন্য গ্রাম ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, যাতে তাকে এনজিও কর্মকর্তাদের মুখোমুখি হতে না হয়। অগত্যা এনজিওগুলো ঋণ আদায়ের জন্য যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছিল, তা লোকটি আর সইতে পারছিল না। শেষ পর্যন্ত সে তার একটি কিডনি বিক্রি করে দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামপ্রতিক কিছু গবেষণায় বলা হচ্ছে , ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ পরিশোধ কাঠামো এবং গ্রামের মানুষের আয়-উপার্জনের অনিশ্চয়তা এই দুয়ে মিলে সমস্যা অনেক জটিল হয়ে পড়েছে। জাপানের একটি গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপিং ইকনমিক্সের এক গবেষণায় বলা হচ্ছে, ঋণ শোধের জন্য অনেকে তাদের সম্পদ বিক্রি করে দিচ্ছে। অনেকে চড়া সুদে মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিচ্ছে, যাতে কিস্তি শোধে ব্যর্থতার দায়ে তারা ভবিষ্যতে ক্ষুদ্র ঋণ পাওয়ার অধিকার না হারায়। এদিকে দারিদ্র বিমোচনে ক্ষুদ্র ঋণের অবদান নিয়ে সন্দিহান অনেকে। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ঋণ সংস্থাগুলো যে প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ ধার করে, তাদের ২০০৬-২০০৭ সালে চালানো এক গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র সাত শতাংশ ঋণ গ্রহীতা দারিদ্র্য সীমার ওপরে উঠতে পারছে। এবছরের শুরুতে বিশ্ব ব্যাংকের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যে পরিমাণ অর্থ ঋণগ্রহীতা ধার করেছেন, সেটা তাদের অর্জন করা সম্পদের চেয়ে অনেক বেশি। তবে মাইক্রো ক্রেডিট সামিট ক্যাম্পেইনের হিসেব হচ্ছে, ১৯৯০ সাল হতে ২০০৮ সালের মধ্যে বাংলাদেশের এক কোটি মানুষকে দারিদ্র্যের চক্র থেকে মুক্ত করেছে ক্ষুদ্র ঋণ। কিন্তু বাংলাদেশে যেখানে মানব দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিয়ে অবৈধ লেন-দেন বাড়ছে, সেখানে ভালো জীবনের আশায় মিথ্যে প্রলোভনের ফাঁদে পড়বেন আরও অনেক গরীব মানুষ। জয়পুরহাটের কালাই গ্রাম থেকে অল্প দূরে আরেকটি গ্রাম মোলামগারি। এই গ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ মেহেদি হাসান ঋণের টাকা শোধ করতে তার যকৃতের অংশ বিশেষ বিক্রি করেন দেড় লাখ টাকায়। ঢাকার এক বেসরকারি হাসপাতালে মেহেদি হাসানের যকৃতের অংশ বিশেষ অপসারণ করা হয়। মেহেদি জানায়, ‘আমি ভেবেছিলাম, লিভার কেটে নেয়ার পরও আমার কোন অসুবিধা হবে না। কিন্তু মাঝে মধ্যে আমার বুকে বেদনা হয়। আমাকে দিনে ৫০ থেকে ৬০ বার প্রশ্রাব করতে হয়। তারপরও ঋণ শোধের জন্য তাকে বিক্রি করতে হয়েছে নিজের পৈতৃক বাড়ি।