চলচ্চিত্রের নতুন স্বপ্ন

আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০১৩, ১৮:০৭
কিছু প্রেম কাহিনী ভালোলাগার হয়ে যায়। মিথ, পুরান কিংবা সময়ের কাঁধে ভর করে কিছু লোকপ্রথাও একসময় উদাহরণ হয়ে দাঁড়ায় প্রেমের সাজঘরে। তেমনি গল্পের নতুনত্ব, অভিনয়শিল্পীর ভিন্নতা ও ব্যবসায়িক মন্দাকে তুড়ি মেরে স্বপ্নের সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে ঢাকাই ছবিপাড়ায় উদাহরণ হতে চলেছে ‘পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী’ চলচ্চিত্রটি। এবারের ঈদে মুক্তির স্বাদ পাওয়া এই ছবিটিতে শাকিব খান-জয়া আহসান-আরেফিন শুভর অভিনয়ে দর্শক অনেকটাই তৃপ্ত হয়েছেন। প্রেক্ষাগৃহগুলো তার হাহাকারের কান্না বন্ধ করেছে মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সমাজের হলমুখী হওয়া দেখে। কি এমন প্রেম কাহিনী যা পূর্ণদৈর্ঘ্য হয়ে চলচ্চিত্রে নতুন আশা ও স্বপ্নের দ্বার উন্মোচন করেছে, সেই গল্পই বলেছেন রুদ্র মাহফুজ এবারের ঈদের লম্বা ছুটিতে ঢাকা ফাঁকা হয়ে গেলেও কিছু সিনেমা হলের সামনে ভিড় দেখে বিভ্রান্তিতে পড়েছে অনেকে। পিচঢালা পথের শূন্য ঢাকায় ছুটির আমেজে থাকা ঘরমুখী মানুষগুলো হঠাত্ কোথা থেকে এল, তা-ও আবার বছর কয়েক ধরে দর্শক নেই দর্শক নেই রব ওঠা সিনেমা হলের সামনে। পাঠক নিশ্চয় ইতোমধ্যেই অনুমান করেছেন শূন্য ঢাকার প্রেক্ষাগৃহগুলোর পূর্ণ হওয়ার আসল কারণটি। দেশীয় চলচ্চিত্রের মন্দা বাতাসে নতুন আশার সঞ্চার করল সাফিউদ্দিন সাফি পরিচালিত ‘পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী’ ছবিটি। হিন্দি-তামিল এমনকি ওপার বাংলার চলচ্চিত্রের চোখ রাঙানো হুবহু নকল কাহিনী থেকে মুক্তির নিঃশ্বাস যেন নিল ঢাকাই ছবি অনেকদিন পর। সাংবাদিক ও নাট্যকার রুম্মান রশীদ খানের সম্পূর্ণ মৌলিক কাহিনী অবলম্বনে ফ্রেন্ডস মুভিজ ইন্টারন্যাশনালের প্রযোজনায় এই ছবিটিতে প্রধান তিনটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন ঢাকার চলচ্চিত্রে বর্তমানে শীর্ষে অবস্থান করা নায়ক শাকিব খান, টিভি মিডিয়ার অসম্ভব গুণী অভিনেত্রী জয়া আহসান এবং এ সময়ে ক্রেজে পরিণত হওয়া মডেল ও অভিনয়শিল্পী আরেফিন শুভ। মূলত এই তিনজনের মিথষ্ক্রিয়ায়ই দর্শককে হলমুখী করেছে। একই নায়ক-নায়িকা ও নকল গল্পের আহাজারির মাঝে ‘পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী’ দর্শকদের তৃপ্ত করেছে বিনোদনের বিভিন্ন ব্যতিক্রমী অনুষঙ্গ দিয়ে। ঢাকার মধুমিতা, শাহীন, স্টার সিনেপ্লেক্স ও ব্লক ব্লাস্টার সিনেমাস’সহ দেশের প্রায় অর্ধশত প্রেক্ষাগৃহে দর্শকদের আনন্দঘন উপস্থিতি হল মালিকদের মুখে হাসি ফুটিয়েছে অনেকদিন পর। সাংবাদিক ও গীতিকার কবির বকুলের লেখা ও তাপসের সুর করা ‘আমি নিঃস্ব হয়ে যাবো’ গানটি এখন চলচ্চিত্রপ্রিয় মানুষের মুখে মুখে। অ্যাকশন, কমেডি, রোমান্স ও ইমোশন-নির্ভর এই ছবিটির বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন নায়ক রাজ রাজ্জাক, আনোয়ারা, সোহেল রানা, ববিতা, সুব্রত, দিতি, মিমো ও সাজু খাদেমসহ আরও অনেকে। দক্ষিণী নৃত্য পরিচালক জেমস অন্থ্যনির নির্দেশনায় মালয়েশিয়ার বিভিন্ন গানের দৃশ্যায়নে অংশ নিয়েছেন শাকিব-জয়া-শুভ। আর ছবিটির লোগো, পোস্টার ও টিচার, অডিও অ্যালবামের কাভারসহ অন্যান্য ডিজাইন করেছেন হলিউড ও বলিউডের বিভিন্ন চলচ্চিত্রের লোগো ডিজাইনার যুক্তরাজ্য প্রবাসী জাফরীন সাদিয়া। এবার বলা যাক ‘পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী’র বিভিন্ন গল্প। ছবিটির মহরত হয় গেল বছরের ১৪ জুন এফডিসির জহির রায়হান কালার ল্যাবে। মোট ২৭ বার চিত্রনাট্য পরিমার্জন-পরিবর্ধন করা হয়। অত্যন্ত ধৈর্য্যের সাথে তা করেছেন রুম্মান রশীদ খান। আর গোটা দশেক নাম থেকে বেছে নেওয়া হয় ‘পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী’ নামটি। অবশ্য প্রথমদিকে ‘মেইড ফর ইচ আদার’ নামটিও আলোচনায় ছিল। শাকিব-জয়া চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পর অ্যান্টি হিরো হিসেবে প্রথমে বেছে নেওয়া হয় ছোট পর্দার নিয়মিত অভিনেতা অপূর্বকে। এই নিয়ে বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর অবশ্য অপূর্ব তা অস্বীকার করেন। পরবর্তীতে ‘ধূসর’ চরিত্রটি করতে আগ্রহী হন হালের ক্রেজ আরেফিন শুভ। ওই বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর ছবিটির গানের মহরতে একসাথে অংশ নেন ক্লোজআপ ওয়ান তারকা শিল্পী সোনিয়া, মুহিন, রন্টি ও কিশোর। ৪ আগস্ট শাকিব খানের বাড়ি ‘জান্নাত’-এ ছবিটির শুটিং শুরু হওয়ার পর ১০ অক্টোবর মালয়েশিয়ায় চলে যায় পুরো ইউনিট। ওখানেই ছবিটির নব্বই শতাংশ দৃশ্যায়ন হয়। তারপর ভারতের প্রাসাদ কালার ল্যাব থেকে ছবিটির পোস্ট প্রডাকশনের কাজ সম্পন্ন করেন পরিচালক। ঈদের পরপরই শাকিব খান ও জয়া আহসান ব্লক ব্লাস্টার সিনেমাসে ছবিটি অসংখ্য দর্শকের সাথে বসে উপভোগ করেন। ছবিটি দেখার পর শাকিব যেমন একদিকে জয়ার প্রশংসা করেছেন। অন্যদিকে জয়াও শাকিবের গুণমুগ্ধ ভক্ত হয়ে বলেছেন অনেক কথা। ছবিটি প্রসঙ্গে শাকিব খান বলেন, ‘এবারের ঈদে আমার তিনটি ছবি মুক্তি পেয়েছে এবং ছবি তিনটির গল্প ও নির্মাণ তিন রকমের। মূল ধারার বাণিজ্যিক ছবি বলতে যা বোঝায়, তার সব উপকরণই আছে ‘পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী’তে। এখানে জয়া অসম্ভব ভালো অভিনয় করেছেন। সিনেমাটির চিত্রনাট্য থেকে শুরু করে লোকেশন ও নির্মাণে আধুনিকতার ছোঁয়া রয়েছে। ইতোমধ্যেই জেনেছি দর্শকরা ছবিটি ভালোভাবে গ্রহণ করেছে। আশা করছি ব্যবসায়িক দিক থেকে ছবিটি মাইলফলক স্পর্শ করবে।’ একই প্রসঙ্গে জয়া আহসান বলেন, ‘শাকিবের সাথে এটা আমার প্রথম কাজ। সে অনেক বিষয়েই আমাকে সহযোগিতা করেছে। কারণ দেশীয় বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্রে এটাই আমার প্রথম অভিনয়। প্রথমদিকে কিছুটা সমস্যার সম্মুখীন হলেও শাকিব ও পরিচালক সাফি ভাইয়ের সহযোগিতায় তা থেকে উত্তোরণ করতে পেরেছি। ইতোমধ্যেই চলচ্চিত্রটির গান অসম্ভব জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ছবিটিতে আরেফিন শুভ তার সাবলীল অভিনয় করেছেন—সবকিছু মিলিয়ে ‘পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী’ দর্শকদের হলমুখী করেছে বলে আমার বিশ্বাস।’ অন্য এক প্রসঙ্গে জয়া আরও বলেন, ‘যেহেতু আমি একজন অভিনেত্রী তাই সব ধরনের চলচ্চিত্রেই আমি অভিনয় করতে চাই। ভবিষ্যতে আরও বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে আমাকে দেখা যাবে। নিজেকে কখনই আর্টস ফিল্মের নায়িকা ভাবি না, ভাবতেও চাই না। শিল্পমান থাকলে যেকোনো চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে আমার দ্বিমত নেই।’ অন্যদিকে চিকিত্সার জন্য ভারতে অবস্থান করা আরেফিন শুভ ফেসবুকের মাধ্যমে জানিয়েছেন, ‘যদিও ছবিটি দেখিনি, তবে বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকে ভালো মন্তব্য পেয়েছি। আমি কখনোই কী চরিত্র কিংবা তার ব্যাপ্তিকাল কতটুকু তা নিয়ে ভাবি না। বরং চিন্তা করি কীভাবে ওই চরিত্রকে সার্থক করা যায়। ‘পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী’ ছবিটির সাফল্যের পর বেশকিছু নতুন চলচ্চিত্রের প্রস্তাব পেয়েছি।’ ছবিটিতে শাকিবের কস্টিউম ও অভিনয়ে ভিন্নতা ছিল। আর মূলধারার চলচ্চিত্রে জয়া আহসান অভিনয়-কস্টিউম-মেকআপ সবকিছুতেই নজর কেড়েছেন। তার শরীরের বিভিন্ন বাঁকের স্পষ্টতা দর্শককে বিমোহিত করেছে। যদিও অন্যান্য নায়িকার ক্ষেত্রে তা ভালগারে পরিণত হয়। অন্যদিকে আরেফিন শুভর কস্টিউম ও অভিনয় দর্শকদের মনে আগামীদিনের এক সফল নায়কের মুখচ্ছবি যেন এঁকে দিয়েছে। তারপরেও কিছু না কিছু ত্রুটি তো থাকেই। ছবিটিতে মালয়েশিয়া থেকে হুট করে হাতিরঝিলে ফিরে আসা, যেন হাতিরঝিলটাই উড়ে ঢাকা থেকে মালয়েশিয়া চলে গিয়েছে। দিতি মালয়েশিয়ায় থাকলেও ঢাকার হাসপাতালে তাকে নিয়ে আসা, আনোয়ারার স্থূল দেহের সাথে পরচুলা, ববিতার বাচনভঙ্গির দুর্বলতা, শুভ ও মিমোর চরিত্রের প্রাধান্য কম থাকা এবং পরিশেষে শুভকে উম্মাদ দেখানোটা কিছুটা হাস্যরস্যের সৃষ্টি করেছে। তারপরেও পরিচ্ছন্ন একটি চলচ্চিত্র ‘পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী’। চিত্রনাট্য, পরিচালনা, গান ও অনিভয় থেকে শুরু করে সবকিছুতেই ছিল ভিন্নধারার সৃষ্টি। যার জন্য প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘ফ্রেন্ডজ মুভিজ ইন্টারন্যাশনাল’ অবশ্যই ধন্যবাদ পেতে পারে, কারণ পরিচ্ছন্ন সুস্থ ধারার এই চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করতে তারা অর্থ বিনিয়োগে কোনো কার্পণ্য করেনি। যা আমাদের ঢাকাই চলচ্চিত্রে এই সময়ে সবচেয়ে বেশি দরকার। ‘পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী’ ব্যবসায়িক সাফল্যের যে স্বপ্ন দেখিয়েছে চলচ্চিত্র অঙ্গনকে তা যেন ক্রমশই বাড়তে থাকে, সেই শুভকামনা প্রতিটি চলচ্চিত্র অনুরাগীদের।