‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’, ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়’ ফকির লালন সাঁইয়ের মাজারে ঢুকতেই কানে বেজে ওঠে। এভাবে মাজারের ভেতরে দেশ-বিদেশ থেকে আসা বাউল ভক্ত-শিষ্যরা ভাবের হাটে বসে জমিয়ে তোলে মজমা। এ যেন লাখো লালন ভক্ত আর সাধুর মিলনমেলা। দিন-রাত বেঁধে সাঁইজির ধামে বসে গুরু সেবায় ব্যস্ত সময় কাটান ভক্তবৃন্দ।
লালন ভক্ত, শিষ্য ও বাউলসহ লাখ-লাখ জনতার ঢলে কুষ্টিয়ার কুমারখালি উপজেলার ছেঁউড়িয়ার লালন আখড়াবাড়ি উত্সব মুখর ও মিলনমেলায় পরিণত হয়। গত পয়লা কার্তিক, ১৬ অক্টোবর হতে পাঁচ দিনব্যাপী লালন স্মরণোত্সবে দেশি-বিদেশি পর্যটক ও লালন ভক্ত-অনুরাগীদের, সাধুগুরুদের সমাগম ঘটে। এ সময় লালন একাডেমী চত্বরে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না।
এবারের তিরোধান দিবসে লালন স্মরণোত্সবে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা বাউলরা একতারা-দোতারা আর নানা বাদ্যযন্ত্রের সুরের তালে তালে গলা খুলে গাইলেন সাঁইজির রেখে যাওয়া মরমী গান। আখড়াবাড়িতে ঢোকার রাস্তায় পা ফেলতেই সাঁইজির উদাসী গানের সুর কানে ধরা দেয়। লালন ও তার গানই মাজারে টেনে আনছে সর্বস্তরের মানুষকে। কোন সে উদাসী ডাক? কোনো দাওয়াত নেই, পত্র নেই, তবুও সাধু-ভক্ত ছুটে আসে দলে দলে। ছেঁউড়িয়া আখড়াবাড়িতে উত্সবে চলে সাধু-গুরুর সৃষ্টির প্রকাশ ও বয়ান দান। এ সময় বাউলরা সাধন, করণ ও গানের দেশ নিয়ে ভক্তদের কাছে করেছেন ব্যাখ্যা। আত্মার মুক্তি নিয়ে ভাব-আচার বিনিময় করেছেন আগত সাধুবৃন্দ।
সরকারিভাবে বানানো মূল মঞ্চে প্রকৃত বাউলদের খুব একটা দেখা মেলেনি। তবে মূল মঞ্চে কে এল আর না এল, কে কত বড় আর ছোট এতে আগত সাধুদের কোনো যায় আসেনি। তারা সব সময় সাঁইজির ধামে ধ্যানে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন। সারারাত নির্ঘুম সাধু-ভক্তরা সাধুসঙ্গ আর মহাগুরু সাঁইজির স্মরণে ধ্যান করেছেন। খুব সকালে সাঁইজির দরবারে ভক্তি পর্ব শেষে তারা চাল-জল নিয়ে স্নান করেছেন কালী নদীতে। এরপর সেরে নিয়েছেন বাল্য সেবা (সকালের নাস্তা)। পাশাপাশি ভক্তদের নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন আস্তানায় আসনে বসে লালন সাঁইজির গান গেয়ে আরাধনায় ব্যস্ত থেকেছেন তারা। পাশাপাশি একাধারে গানের পিঠে গান করেছেন ভক্তরা। ভক্তের ভুল-ত্রুটি ধরিয়ে দিয়েছেন সাধুগুরুরা।
ছেঁউড়িয়ায় আগত সাধুদের ভাষায় মহাগুরু ফকির লালন সাঁই আত্মতত্ত্ব উপলব্ধির পথানুসন্ধান করেছেন। সাধন পথের যে ধারা, তা হলো স্রষ্টার অনুভবকে আত্মা বলে স্বীকার করে নেওয়া এবং এই স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে স্রষ্টাকে নিজের আত্মীয় জ্ঞান করা।
উল্লেখ্য, কুষ্টিয়ার কুমারখালির ছেঁউড়িয়ায় সাঁইজির ধামে প্রতিবছর দুটি উত্সব উদযাপন হয়। একটি মার্চ মাসে দোল উত্সব, অপরটি পহেলা কার্তিক ১৬ অক্টোবর সাঁইজির তিরোধান দিবস। দুটি উত্সবই ৫ দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়। মহামতি ফকির লালন সাঁই ভক্তদের নিয়ে দোল উত্সব পালন করতেন। সে কারণে এখানে প্রতিবছর দোল উত্সব উদযাপিত হয়। আর সাঁইজির তিরোধানের পর থেকে প্রতি বছর পহেলা কার্তিক লালন ভক্ত-শিষ্যবৃন্দ পালন করেন তিরোধান দিবস। মহামতি লালন সাঁইয়ের প্রতি এক উদাসী টান ও আত্মার শান্তির জন্যই কোনো দাওয়াতপত্র ছাড়া লালন-ভক্ত নিজেরাই দিনক্ষণ ঠিক রেখে প্রতিবছর দোল উত্সব ও তিরোধান দিবসে ছুটে আসেন সাঁইজির মাজারে।
পাঁচদিনের উত্সবে প্রতিদিন লালন উন্মুক্ত মঞ্চে প্রথম পর্বে আলোচনা ও দ্বিতীয় পর্বে বিভিন্ন শিল্পী ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সমন্বয়ে পরিবেশিত হয় লালনগীতি। ‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে’, ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়’সহ বিভিন্ন লালনগীতি পরিবেশন করেন দেশের খ্যাতনামাসহ স্থানীয় শিল্পীরা। উদ্বোধনী দিনে গান পরিবেশন করেন প্রখ্যাত লালন সংগীতশিল্পী ফরিদা পারভিন। এ ছাড়া লালন একাডেমির নিজস্ব সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ কুষ্টিয়া শিল্পকলা একাডেমির শিল্পীবৃন্দ পরিবেশন করেন সাঁইজির রেখে যাওয়া মরমী গান।
