নোবেলজয়ী অ্যালিস মুনরো

জটিল গল্পের সহজ কথাকার

আপডেট : ৩১ অক্টোবর ২০১৩, ১৭:৫০
গত ১০ অক্টোবর সাহিত্যের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার নোবেল বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হয়েছে। এবারের বিজয়ী কানাডিয়ান ছোটগল্পকার অ্যালিস মুনরো। নোবেল কমিটি তাঁকে ‘সমকালীন ছোটগল্পের নিপুণ কারিগর’ হিসেবে অভিহিত করেছে। সংগত কারণেই তাঁকে নিয়ে সাময়িকীর এবারের প্রচ্ছদ আয়োজন । সাহিত্যে এবারের নোবেল ঘোষণায় বাংলাদেশের অনেকেই চমকে উঠেছিলেন। একজন অনুবাদক তো বিশ্বাসই করতে পারেননি মাত্র চার বছরের ব্যবধানে আরেকজন নারী কী করে নোবেল পুরস্কার পেয়ে গেলেন! সত্যি, কী চমকপ্রদ ভাবনা আমাদের পুরুষ সমালোচকেরা যে ব্যক্তিপ্রতিভাকে স্বীকৃতি দানের পরিবর্তে এখনো জেন্ডার ভাবনাবৃত্তের মধ্যেই আটকে আছেন, এ হলো তারই জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। কিন্তু জন আপডাইক, আমেরিকার প্রখ্যাত এই ঔপন্যাসিক, গল্পকার ও তুখোড় সাহিত্য-সমালোচক অ্যালিস মুনরো সম্পর্কে লিখেছিলেন, আমি ছোট্ট করে ছোটগল্প সম্পর্কে কিছু বলতে পারব না। তবে নিশ্চিত করে বলতে পারি, লরি মুর, অ্যালিস মুনরো আর টম জোনসের মতো গল্পকাররা ছোটগল্পকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছেন। আমেরিকার শ্রেষ্ঠ গল্পের সংকলন সম্পাদনা করতে গিয়ে ১৯৯৯ সালে এই ছিল প্রয়াত এই ঔপন্যাসিকের মন্তব্য। গল্প বলতে পো, টোয়েন, মম, মোপাসা বা চেখভীয় যুগেরও তো অবসান ঘটে গেছে সেই কবে। চেখভের গল্প ছোটগল্প যদি হয় ‘খণ্ড জীবনকাহিনি’; যে গল্পের আছে শুরু মধ্য আর শেষ, সেই গল্পও এখন আর সেইভাবে লেখা হয় না। গল্পনির্মাণের এই যে ‘আনুষ্ঠানিক কাঠামো’র কথা বলেছিলেন আরিস্তুতল, হুলিও কর্তাজারতো সেই কাঠামোও ভেঙে ফেলে অন্তঃশীল গল্প লেখার কথা বলেছেন। ভার্জিনিয়া উলফ একারণেই বলেছিলেন, ছোটগল্পে পাঠক এখন শুধু খুঁজে পাবেন ‘সত্তার মুহূর্ত’কে। ছোটগল্পে থাকবে ‘প্রতীতির ঐক্য’, পো’র এই কথা থেকেও তো গল্পকাররা অনেক সরে এসেছেন। কাফকার গল্পকে তো এই ঘরানার কোনোটাতেই ফেলা যাবে না। বহুমাত্রিক ফিকশনের তিনিই তো মহান রূপকার। এভাবেই তো বেড়ে গেছে ছোটগল্পের বিষয়আশয়ের অভাবনীয় বৈচিত্র্য। এরকম একটা প্রেক্ষাপটে মুনরো সাহিত্যে পুরস্কার পাওয়াতেই বিস্ময়ের ঘোরে বিভ্রান্ত হয়েছেন অনেকেই—এই বাংলাদেশে। কিন্তু কোনো ছকে কি কখনো সাহিত্য—সে ছোটগল্পই হোক কিংবা কবিতা উপন্যাসই হোক—আটকে থাকে? মুনরোর পুরস্কার পাওয়া তাই বিস্ময়কর কিছু ছিল না। এ কারণেই দেখি মুনরোর সাহিত্যকৃতি সম্পর্কে শুধু আপডাইক নন, মার্গারেট অ্যাটউড এবং জয়েস ক্যারল ওটসের মতো দুই ঔপন্যাসিক, নোবেল শর্টলিস্টে যাঁদের নাম ছিল, তাঁরাও মুনরোর লেখার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে পাঠক এবং সমালোচকদের একধরনের সীমাবদ্ধতা লক্ষ করছি। বিশ্বসাহিত্য বলতে তরুণ প্রজন্মের ঝোঁক দেখা যাচ্ছে লাতিন আমেরিকা বা আফ্রিকার সাহিত্যের প্রতি। কিন্তু সাহিত্যবিশ্ব যে এই দুই মহাদেশের লেখকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর বাইরেও যে বিশ্বমানের সাহিত্য রচিত হচ্ছে, সেই সংবাদ আমাদের অনেকেরই জানা নেই। ফলে চীনের মো ইয়ান যখন পুরস্কার পেলেন তখন অনেকেই বিস্মিত হয়েছেন। এই বিস্ময় যে অজ্ঞতাজনিত সেকথা না বললেও চলে। মুনরো সম্পর্কেও এই অজ্ঞতা আমাদের রয়েছে বলেই মনে হয়। মুনরোর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর পত্রপত্রিকায় তাঁর গল্পের অনুবাদের পরিবর্তে এজন্যেই লক্ষ করেছি সাক্ষাত্কার প্রকাশের প্রবণতা। কিন্তু মুনরো খুব অপরিচিত লেখক যে নন, বিশেষ করে ইংরেজি সাহিত্য পরিমণ্ডলে, মার্গারেট অ্যাটউড ‘অ্যালিস মুনরোজ বেস্ট’ শীর্ষক শ্রেষ্ঠগল্প সংকলনের ভূমিকার সূচনাবাক্যটিই সেভাবে শুরু করেছিলেন, ‘মুনরো আমাদের সময়ের একজন প্রধান ইংরেজি গল্পলেখক।’ এর পরের বাক্যটিতেই মুনরো যে কত বড় লেখক, সেকথা অকুণ্ঠভাবে ব্যক্ত করেছেন অ্যাটউড, ‘উত্তর আমেরিকা আর যুক্তরাজ্যের ডাকসাইটে সব সমালোচকের প্রশংসা পেয়েছেন তিনি, অর্জন করেছেন অসংখ্য পুরস্কার। তাঁর আছে অসংখ্য অনুরাগী আন্তর্জাতিক পাঠক।’ মুনরোর রচনা সম্পর্কে তাঁরই সমসাময়িক এবং সমপর্যায়ের একজন লেখক যখন এরকম মন্তব্য করেন, নোবেল পুরস্কারে যিনি নিজেও ভূষিত হতে পারতেন, এতেই বোঝা যায়, কতটা শিখরস্পর্শী হয়ে উঠেছিল মুনরোর রচনা। মুনরোর এই শ্রেষ্ঠ গল্পসংকলনটির সতেরোটি বাছাই গল্প গত দু-সপ্তাহ ধরে আমি পড়ছিলাম। জীবন যে কত বিচিত্র, জটিল আর বহুমুখী হতে পারে, নান্দনিক অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখার ও দেখানোর অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে মুনরোর। ফলে, ইংরেজি শ্রেষ্ঠ গল্পের সংকলন বেরিয়েছে আর তাতে মুনরোর গল্প নেই, সমকালে প্রকাশিত এমন একটি সংকলনও খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবে তাঁর এই যে শিখরস্পর্শী সাফল্য, সেটা একদিনে আসেনি। শুরু গত শতকের সেই ষাটের দশকে তাঁর প্রথম গল্পসংকলন ‘ড্যান্স অব দ্য হ্যাপি শেড্স’ প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে। এই বইটি বেরিয়েছিল ১৯৬৮ সালে। এই প্রথম বইটিই অর্জন করেছিল কানাডার সর্বোচ্চ পুরস্কার গভর্নর জেনারেলস অ্যাওয়ার্ড। এরপর সবমিলিয়ে তাঁর প্রকাশিত গল্পসংকলনের সংখ্যা চৌদ্দ। প্রকাশিত উপন্যাসের সংখ্যা একটি। গল্পের প্রতিটি সংকলনেই আছে নটা থেকে দশটা গল্প। আমার নিজের সংগ্রহেই আছে শ্রেষ্ঠ গল্পের সংকলনসহ দশটি সংকলন : ‘হু ডু ইউ থিংক ইউ আর’, ‘ফ্রেন্ড অব মাই ইয়ুথ’, ‘ওপেন সিক্রেট’, ‘দ্য লাভ অব অ্যা গুড ওম্যান’, ‘হেটশিপ, ফ্রেন্ডশিপ, কোর্টশিপ, লাভশিপ, ম্যারেজ’, ‘রানঅ্যাওয়ে’, ‘দ্য ভিউ ফ্রম ক্যাসেল রক’, ‘অ্যালিস মুনরোজ বেস্ট’, ‘টু মাচ হ্যাপিনেস’ এবং ‘দ্য প্রগ্রেস অব লাভ’। আকারে মুনরোর প্রতিটি গল্পই দীর্ঘ; কোনো কোনোটিকে প্রায়-উপন্যাস বা নোভেলাও বলা যায়। গত শতকেরই সত্তরের দশকে তিনি ছিলেন অভিজাত পত্রিকা দ্য নিউ ইয়র্কারের নিয়মিত গল্পলেখক। লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর থেকেই একধরনের বিভ্রান্তি তাঁকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন, তিনি কি ছোটগল্প লিখছেন না উপন্যাস? মুনরো এক্ষেত্রেও অনন্যতার পরিচয় দিয়েছেন, আকারে বড় বা কাহিনির কিছুটা বিস্তার থাকলেও যে তা গল্প হতে পারে, স্থাপন করেছেন সেই দৃষ্টান্ত। ভেঙে দিয়েছেন ছোটগল্পের ছোটত্বের সীমা। খ্যাতিও অর্জন করেছেন অভিনব প্রক্রিয়ায়। কানাডায় বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কোনো নামি লেখকের বই প্রকাশ পেলে বিলবোর্ড প্রচারণায় সেই বইয়ের কথা পাঠকের গোচরে চলে আসতো। কিন্তু এরকম প্রচারণা তাঁর ভাগ্যে জোটেনি। বইয়ের দোকানে গিয়ে অনেকটা আকস্মিকভাবে পাঠক তাঁকে আবিষ্কার করেছেন। আ্যাালিস মুনরো—কোন দেশের লেখক তিনি? কেন কেউ তাঁর কথা আমাকে বলেনি? কোন শূন্য থেকে এমন একজন চমত্কার লেখকের আবির্ভাব ঘটলো? এধরনের নানান প্রশ্ন, তারপর আবিষ্কারের বিস্ময়াভিভূত আনন্দ। কিন্তু কী ধরনের লেখক তিনি? কেন এত পাঠকপ্রিয়তা তাঁর—ইংরেজি পরিমণ্ডল ছাড়িয়ে যা বৈশ্বিক পরিসরে ছড়িয়ে পড়েছে? সংক্ষেপে বললে, জটিল গল্পকে মুনরো সহজ ভাষায় লিখেছেন। কোনো কোনো সমালোচক এর দ্বারাও বিভ্রান্ত হয়েছেন; মাত্র দশ-এগারোটি গল্প পড়েই বিশ্বসাহিত্যের দিকপালদের পঙিক্ততে তাঁর স্থান নিয়ে বাংলাদেশেরই একজন অনুবাদক-সমালোচক সংশয় প্রকাশ করেছেন। কিন্তু এই সংশয় যে একেবারেই অমূলক, তাঁর নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তি নিয়ে তাই কেউ কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখাননি, বরং যোগ্য লেখকের যথাযথ স্বীকৃতি জুটেছে বলে তাদের মনে হয়েছে। মুনরোর শক্তি তাঁর শেকড়ে। কানাডার ওন্টারিও প্রদেশের ছোট্ট একটা শহর সোয়েস্টোকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে তাঁর গল্পের জগত্। তীব্র আবেগ, গভীর হার্দ্রিক সংবেদনা, দুঃসহ যন্ত্রণা, অতলস্পর্শী রহস্যের গহনতা আর চমকপ্রদ ঝকঝকে সরল প্রবহমান গদ্যের বুননে গল্পগুলোকে নির্মাণ করেছেন তিনি। পাঠকের সঙ্গে সরাসরি সংযোগে বিশ্বাস করেন এই লেখক, আর সেভাবেই গড়ে তুলেছেন তাঁর গল্পগুলোকে। স্থানিকতার রূপরসগন্ধ, ইতিহাস, অনুপুঙ্খ বর্ণনা, মানুষজন, যাপিত জীবন একেবারে পাঠকের মর্মে গিয়ে লাগে। সোয়েস্টো জায়গাটা খামারপ্রধান এলাকা, সেই সঙ্গে আছে বন্যাপ্রবণ নদী, নৌকা, জলচালিত যন্ত্রনির্ভর মিল-কারখানা, টাউনহল, ডাকঘর, চার্চ, ছোট ছোট বাড়ি—এইসব। উনিশ শতকে গড়ে ওঠা এই শহরে যে পরিবারগুলো বাস করে তাদের প্রত্যেকেরই আছে এই শহরকেন্দ্রিক সমৃদ্ধ স্মৃতির সঞ্চয়। এর প্রাকৃতিক দৃশ্যে যেমন বিমুগ্ধ হতে হয়, তেমনি অবদমিত আবেগ, যৌনসংবেদনা, সহিংসতা, অপরাধ, প্রতিহিংসা, গুজব—এরকম অনেক কিছু ঘটে থাকে এখানে বাস করছে যেসব মানুষ তাদের জীবনে। ‘টার্কি সিজন’ গল্পটাতেই দেখছি, ‘সমকামী’ একটা শহর; এই শহরেরই ‘জলরংয়ে আঁকা একটা ছবির মতো’ একজন ইনটেরিয়র ডিজাইনারের কথা দিয়ে শুরু হচ্ছে গল্পটি। শিল্পের প্রতি মুনরোর আকর্ষণ অনেক তীব্র। নারীচরিত্রগুলোকে ঘিরেই এধরনের গল্পগুলো তৈরি হয়েছে। বেশকিছু গল্পে এমন কিছু নারীচরিত্র আছে যারা হয় লেখক অথবা শিল্পী। তারা হয় পিয়ানো বাজায় অথবা সংবাদপত্রে কলাম অথবা কবিতা লেখে। ‘মেনেসেতেয়ুং’ গল্পের আলমিদা রথ এরকমই একটা চরিত্র। সে কবি, পরিবারে কেউ নেই, একা থাকে। কবিতা রচনা করার প্রতিভা তাঁর আছে, কিন্তু লেখার অনুকূল পরিবেশ সে পায় না। ‘কবিতা, হ্যাঁ আবার কবিতাই। একটা কবিতা। ভাবটা এমন নয় যে একটা মহত্ কবিতা সবকিছু ধারণ করতে পারে। কিন্তু এই একটি কবিতাই অন্য কবিতার জন্ম দিতে পারে, যেগুলো সে লিখেছে, এলোমেলো বিক্ষিপ্ত, ভুল আর শুদ্ধতার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে, ছেঁড়া কম্বল যেন। ... কবিতার নামটা যেন নদী। না না, এটা আসলেই নদী, মেনেসেতেয়ুং। ... আলমিদা মনের চোখ দিয়ে গভীর গহন নদীটাকে দেখে, দেখে টেবিলক্লথটাকে। দেখে, সূচিকর্ম হিসেবে যে ফুলটাকে সে ফুটিয়ে তুলেছে সেই গোলাপটা নদীতে ভেসে চলে যাচ্ছে।’ শিল্পীর এই হচ্ছে ভবিতব্য। ছোট্ট সোয়েস্টো শহরের অখ্যাত একজন শিল্পীর মর্মন্তুদ বেদনা, নৈঃশব্দ্য, হতাশার কথা উঠে আসে গল্পে। মুনরোর গল্প একারণেই অন্য গল্পকারদের তুলনায় অনেক আলাদা। গল্প গড়ে তোলার পদ্ধতিটিও তাঁর নিজস্ব—অতীত আর বর্তমানের মধ্যে চরিত্রগুলো সঞ্চরণ করে। তাঁর গল্পের মৌলিক ঢংটা হচ্ছে চরিত্রগুলো তাদের নিজেদের এবং অন্যদের অতীতের কথা গল্পে তুলে আনে। মুনরো এজন্যে সরাসরি চরিত্রের মনস্তত্ত্বে প্রবেশ করেন এবং মানুষের জান্তব বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তোলেন। চরিত্রগুলো নিজেরাই আত্মখননের ভেতর দিয়ে কী করেছে তা বুঝতে চায়। নিজেদের আবেগ, সচেতনতাকে সূক্ষভাবে উপলব্ধি করবার ভেতর দিয়ে অস্তিত্বের নির্যাসটুকু অনুভব করে। নিজের সামাজিক শ্রেণী সম্পর্কে মুনরো অত্যন্ত সচেতন। এই সমাজকাঠামোর মধ্যেই আমরা দেখতে পাই ডাক্তার, দন্তচিকিত্সক, আইনজীবী, কারখানার শ্রমিক, যৌনকর্মী, অসফল তস্কর—এরকম নানা ধরনের চরিত্রের সমাবেশ ঘটছে। গল্পের জগতের এসব চরিত্র নিরন্তর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আত্মমুক্তি পেতে চায়। শিল্পের প্রতি নিবেদিত যেসব চরিত্রকে তিনি এঁকেছেন, তারা সফল হলে যেমন শাস্তি পায়, অসফল হলেও পায়। মুনরোর চরিত্রগুলো এভাবেই যতভাবে সম্ভব যুদ্ধ করে, নিজেদের আচরণকে যেমন তাদের নিয়ন্ত্রণ করার সংগ্রাম করতে হয় তেমনি মানবিক প্রত্যাশা পূরণের চাপও সহ্য করতে চায় না। ‘দ্য মুনস অব জুপিটার’ গল্পটির কাহিনি এরকমই। মুনরোর যৌনভাবনাও চরিত্রগুলোর সামাজিক ও প্রাকৃতিক অনুষঙ্গের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তুঙ্গস্পর্শী যৌন-আবেগের পটভূমিতে তাই পরিপার্শ্ব, বিশেষ করে যে ঘরে প্রেমিকযুগল মিলিত হয় সেই ঘর, বিছানা, ছড়ানো বস্তুপুঞ্জ, ল্যান্ডস্কেপের আনুষঙ্গিক যে বর্ণনা তিনি দেন, তা খুবই আকর্ষক। এরকম মুহূর্তে নারী ও পুরুষ একে অন্যের সম্পর্কে খুবই সচেতন থাকে—ইতিবাচক ও নেতিবাচক—দুই অর্থেই। অনুভব করতে পারে পরস্পরের প্রতি আকর্ষণের সূত্রগুলো। এক্ষেত্রে নারীর সচেতনতাই দেখা যায় বেশি। পুরুষের মধ্যে পৌরুষই প্রধান হয়ে ওঠে। প্রেমে-পড়ার বিষয়টি তাই আনন্দদায়কই হয়ে ওঠে নারী ও পুরুষের কাছে। মুনরো এমন একটা সময়ে বেড়ে উঠেছেন এবং গল্পরচনা করছিলেন যখন নারীরা নারীমুক্তির পথে এগিয়ে চলছিল। যৌনতা এইসময় নারীমুক্তির লক্ষ্য হয়ে উঠেছিল। ‘দ্য টার্কি সিজন’-এর লিলি চরিত্রের কথাগুলো লক্ষ করলেই বোঝা যাবে নারীরা কীভাবে ব্যক্তিত্ব অর্জনের মধ্য দিয়ে ব্যক্তিসত্তার অধিকারী হয়ে উঠেছিল। ওই গল্পের মেরজরিও লিলির মতোই পুরুষকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিজের কাছে ঘেঁষতে দেয়নি। ‘দ্য বেগার মেইড’-এর বিষয়ও অনেকটা এরকমই। নারীর বন্ধন ও মুক্তির ইশারা দুই-ই আছে তাঁর গল্পে। নারীপাঠকদের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তাও ঈর্ষণীয়। অ্যালিস মুনরো জন্মেছিলেন কানাডার ওন্টারিওতে ১৯৩১ সালে। এই বছরের প্রথম দিকে যখন তিনি আর লেখালেখি করবেন না বলে ঘোষণা দিয়ে অবসরে যেতে চাইছিলেন, তখনই সাহিত্যের সর্বোচ্চ সম্মাননা নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হলেন তিনি। সাড়ে চার দশক ধরে তিনি লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তির মধ্য দিয়ে তাঁর সেই সৃষ্টিশীলতা যেন পূর্ণতা পেল। সাহিত্যবিশ্বে স্থান করে নিলেন তিনি। ‘প্যারি রিভিউ’য়ের সঙ্গে সাক্ষাত্কারে মুনরো একবার বলেছিলেন, গল্প লেখার জন্যে চরিত্রের গহনলোকে অবগাহন করেন তিনি। কিন্তু কখনোই জটিল গল্পকে জটিল ভাষায় উপস্থাপন করার বিষয়ে আগ্রহ নেই তাঁর। পাঠকের হূদয়কে স্পর্শ করার আকাঙ্ক্ষাও তাঁকে অনুপ্রাণিত করে। মুনরোর গল্পগুলো পড়তে পড়তে আমাদের একদিকে আশাপূর্ণা দেবী, অন্যদিকে হুমায়ূন আহমদের কথা মনে পড়বে। সরল কিন্তু মর্মভেদী তাঁর গল্পের জগত্। চরিত্রের প্রতি তিনি যে সহমর্মিতা দেখিয়েছেন, সেই সহমর্মিতাই তাঁকে সাহিত্যবিশ্বে বিশেষ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তি উপলক্ষে তাঁকে অভিনন্দন।