আপনি কি আমার ওপর বিরক্ত? জানতে চায় ফারিয়া।
হু। ওমর তার বিরক্তি লুকানোর চেষ্টা করে না।
মেসেজের উত্তর দিলেন না!
আপনি একবার একটা মেসেজ লেখেন। তারপর ঘণ্টাখানেক ঘুমান। তারপর ওঠেন। আবার কিছু লেখেন। হোয়াটস রং উইথ ইউ?
এখন আর ফেসবুকে চ্যাট করা নয়। কথা হচ্ছিল মোবাইলে। দোষটা ফারিয়ারই। এতক্ষণ দুই বান্ধবী তিন্নি আর নুপুরের সঙ্গে চ্যাট করায় মশগুল ছিল । ওদিকে ওমর যে মেসেজ দিয়ে রেখেছে সেদিকে কোনো খেয়ালই নেই। খেয়াল হবার পর ও রিপ্লাই মেসেজ পাঠাল। কিন্তু এবার ওই পক্ষ নীরব। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে অবশেষে ফোন করল ওমরের মোবাইলে।
আমি আসলে ফেসবুক দেখছিলাম। আমার এক ফ্রেন্ড না দারুণ একটা ছবি দিয়েছে। ফারিয়া বেশ উচ্ছ্বসিত।
কিসের ছবি?
ওমরকে খুব কৌতূহলী মনে হলো না। এখনো বিরক্ত নাকি? ফারিয়া ভাবে।
কাশবনের ছবি। পাশে শান্ত নদী। তির তির করে পানি বইছে। সাদা কাশ ফুল। কী যে সুন্দর ছবিটা, ভাবতেই পারবেন না।
আমাকে শেয়ার করেন, দেখি...
আপনি কখনো কাশফুল দেখেছেন?
দেখব না কেন? ব্রহ্মপুত্র নদীর পাশেই আমার গ্রামের বাড়ি। ছোটবেলায় সারাদিন ওখানেই পড়ে থাকতাম।
ওমা! তাই! জানেন, আমরা ফ্রেন্ডরা মিলে কী সিদ্ধান্ত নিয়েছি?
বলেন শুনি?
সবাই মিলে কাশবন দেখতে যাব।
হু...
আমিই সবাইকে অফার করলাম। প্রত্যেকে সঙ্গে সঙ্গে রাজি।
সঙ্গে সঙ্গে রাজি?
হ্যাঁ। কেমন হলো আমাদের প্ল্যান, দারুণ না?
খুব দারুণ।
আপনি মনে হয় মজা করছেন?
মজা করব কেন?
কেমন টিটকারি ভাব।
আপনাদের কোনোদিনই কাশবন দেখতে যাওয়া হবে না।
মানে?
মানে আমি ভবিষ্য গণনা করলাম। লাইক পল।
পল কে?
পল দ্যা অক্টোপাস। ওই যে বিশ্বকাপ ফুটবলের সময় ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল।
ফারিয়ার মেজাজ খুব খারাপ হলো। লোকটা নিজেকে কী মনে করে? ওরা এত উত্সাহ নিয়ে পরিকল্পনা করল। তাতে এভাবে পানি ঢেলে দেবার সে কে? আসলে উত্তরে কী বলবে বুঝে উঠতে পারছে না ফারিয়া।
ঠিক আছে রাখছি।
ওই পক্ষকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে ফোন কেটে দিল ফারিয়া।
একটু পরেই নিজের ওপর লজ্জা লাগল। এমন কেন করল ও? ও তো বলার সময় কম কথা শোনায় না। কই ওমর তো কখনো এভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় না!
মনে খচখচ ভাব নিয়ে ঘুমাতে গেল ফারিয়া। সকালে অফিসে ছুটতে হবে।
দুই মাস হলো একটা বেসরকারি ব্যাংকে জুনিয়র অফিসার হিসেবে চাকরি হয়েছে ওর। পড়াশোনা শেষ হবার পরেই চাকরি হওয়াতে বড় বাঁচা বেঁচে গেছে।
বাবা মারা যাওয়ার পর বাড়িতে নেতৃত্ব সংকট চলছে। ফারিয়া বুঝতে পারে না, এই বাড়ির প্রধান আসলে কে? মা নাকি বড় ভাইয়া। বড় ভাবিও হতে পারে। তাহলে আবার ছোট ভাই-ছোট ভাবিও বা ছাড়বে কেন? মা-ভাবিরা সারাদিন বাসায় থাকেন। দিনভর তাদের টুকটাক ঝগড়াঝাটি লেগেই থাকে।
ব্যাংকের চাকরিটা ফারিয়াকে এই সমস্যা থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। যদিও খুব বোরিং কাজ। জুনিয়র পর্যায়ে চাকরি। মাস গেলে বেতন খুব কম। তবে সেটা সময়মতো পাওয়াতে একটা পরিকল্পনা করা যায়। পরিকল্পনা মানে কেনাকাটা, বন্ধুরা সবাই মিলে আড্ডা। বেশিরভাগ সময় সেটা কারো বাসাতেই হয়। কখনো রেস্টুরেন্টে। তবে ঢাকার বাইরে যাওয়া হয়নি কখনো। না সেই সাহস কারো নেই। বাসার কাউকে না জানিয়ে যাওয়া যায়। পরে কোনো সমস্যা হলে, তখন কী হবে? কিন্তু ওর যে আসলে কখনোই কাশবন দেখতে যাওয়া হবে না, ওই লোকটা বুঝল কীভাবে?
লাইট নিভিয়ে শুয়ে পড়ার পরও ভাবনাটা যায় না। মেয়েদের জীবনটা কেমন পরাধীন। ওই রকম একটা সাদামাটা লোকও বুঝে ফেলল, আসলেই ওর কখনো কাশবন দেখতে যাওয়া হবে না।
দুই
পরদিন অফিসে লাঞ্চের সময় তিন্নিকে ফোন দেয় ফারিয়া। বলে, জরুরি কথা আছে। চল কোথাও বসি।
ফারিয়ার অফিসের কাছেই এক কোচিং সেন্টারে ক্লাস নেয় তিন্নি। ক্লাসমেটরা সবাই হন্যে হয়ে চাকরি খুঁজছে। সবাই ঈর্ষা করে ফারিয়াকে। এমনিতেও দেখতে বেশ সুন্দর। ক্লায়েন্টরা ওকে আড়চোখে দেখে, টের পায় ফারিয়া।
ওমর ওদের ব্যাংকের একজন মাঝারি সারির ক্লায়েন্ট। ব্যবসায়িক লেনদেনের জন্য প্রতিদিনই আসে। আজকেও এসেছিল। তবে দূরে দূরে থেকেছে। ফারিয়া ওভাবে ফোন কেটে দেওয়াতে রাগ করেছে হয়তো।
আমাকে আগে বল ওমর কে? নুপুর এমন জোরে কথা বলে ওঠে যে আশপাশের অনেকেই ফিরে তাকায়।
আস্তে কথা বল... লোকজন কী ভাববে? ফারিয়ার কণ্ঠে লজ্জা।
নুপুরকে এখনি বল ওমর কে? নয়তো খবর আছে তোর ফারিয়া! তিন্নির কথার ধরনে তিনজনেই হেসে ওঠে।
ইউনিভার্সিটিতে ফার্স্ট ইয়ার থেকে বন্ধুত্ব তিনজনের। দিনের ২৪ ঘণ্টা কথা বললেও যেন ওদের কথা শেষ হতে চায় না।
ওমর ভাই আমাদের ব্যাংকের একজন ক্লায়েন্ট। ওনার এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যবসা আছে। অনেকদিন দুবাই ছিলেন। একটা তেলের কোম্পানিতে চাকরি করতেন। দেশে ফেরার পর ব্যবসা শুরু করেছেন। মটর পার্টসের একটা দোকানও আছে বাংলামটরে। পাশেই আমাদের অফিস তো, তাই প্রায়ই আসেন। আজকেও এসেছিলেন। আমার ডেস্কেই বেশিরভাগ সময় কাজ থাকে।
কাজ থাকে ভালো কথা। কিন্তু দুজনের বন্ধুত্ব হলো কীভাবে? আবার নুপুরের প্রশ্ন।
এটা কোনো প্রশ্ন হলো, ভদ্রলোক আমার মোবাইলে মাঝে মধ্যে প্রয়োজনে ফোন করতেন। তারপর ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠালেন। এফবিতে চ্যাট হতো।
কী কথা হয় বল না। তিন্নি ওর কপালে আসা চুল ঠিক করতে করতে হাসে।
তেমন কিছু না... এই দেশের অবস্থা, অফিসের কথা... এসব। তোরা যা ভাবছিস, তেমন কিছু না।
আমরা কী ভাবছি, কীভাবে বুঝলি? তিন্নি এবার রহস্যময় ভঙ্গিতে হাসে।
দেখ... তোরা তো আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। এখানে ভণিতার কিছু নেই। ওনার সঙ্গে আমার কোনো বিশেষ সম্পর্কই নেই। আর তাছাড়া...
তাছাড়া কি?... একই সঙ্গে জানতে চায় নুপুর ও তিন্নি।
প্রেম করার মতো, মানে যাকে বলে যেরকম হ্যান্ডসাম-স্মার্ট লোক... উনি কিন্তু নন। ফারিয়া বলে।
স্মার্ট কিনা সেটা বুঝতে হলে একদিন ওনার সঙ্গে দেখা করতে হবে। কথা শেষ করে নুপুর মুখ টিপে হাসে।
রেস্টুরেন্টে অনেকেই ঢুকছেন। তিনজন সুশ্রী মেয়েকে এক সঙ্গে গল্প করতে দেখে কেউ কেউ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়।
ফারিয়ার খুব বিরক্ত লাগে বন্ধুদের কথা শুনে। কারো সঙ্গে মোবাইলে মাঝে মধ্যে কথা হলেই কি প্রেম হয়ে যায়? এত সহজ! ও উঠে গিয়ে একটা চিলি সস নিয়ে আসে। আসার সময় এক তরুণের সঙ্গে হালকা ধাক্কা লাগে।
টেবিলে ফিরে দেখে বন্ধুরা বিষয়টা খেয়াল করেছে। ওদের রহস্যময় হাসি আবার বিরক্ত ভাবটা ফিরিয়ে আনে।
দেখ, দাওয়াত করে বন্ধুদের সঙ্গে পরিচয় করে দেবার মতো কেউ নন তিনি। উনি গ্রামের স্কুলে পড়ে বড় হয়েছেন। ধানক্ষেতের মধ্য দিয়ে তিন মাইল হেঁটে নাকি স্কুলে যেতেন। সসের প্যাকেট খুলতে খুলতে বলে ফারিয়া। এমন একটা লোককে দাওয়াত দিয়ে আড্ডা দেওয়ার কী আছে?
যদি লোকটা তেমন কেউ না-ই হবে, গত রাতে ফোন কেটে দেওয়া নিয়ে এত কেন ভাবছিস? তিন্নি প্রশ্ন করে।
তাইতো এভাবে তো ভাবেনি ফারিয়া। আসলেই ও কেন এত ভাবছে? ওভাবে ফোন কেটে দেওয়াটা ঠিক হয়েছে কিনা! লোকটা কী ভাবল! যত্তসব। মাথা থেকে বিষয়টা সরাতে পারছে না কোনোভাবে।
তিন
সাধারণত বিকেলে ঘুমায় না ওমর। ছুটির দিন হলেও না। আজ কীভাবে যেন ঘুমিয়ে পড়ল।
ঘুম ভেঙে মনটা খুব খারাপ। টানা হরতালে ব্যবসা চাঙ্গে উঠেছে। ঢাকার বাইরে থেকে মালের জোগান ঠিকমতো আসছে না। বাংলামটরে মটর পার্টসের এক দোকানে শেয়ার আছে। ওখানেও একই অবস্থা। মাসের বেশিরভাগ দিন মার্কেট বন্ধ থাকে। এমন হলে চলবে কী করে?
দোতলার বারান্দায় এসে দাঁড়ায় ও। উঠানে ছোট এক সবজির বাগান আছে। মা সেখানে আরো নতুন চারা লাগাচ্ছেন।
মোহাম্মদপুর আদাবরের জায়গাটা বাবা কিনেছিলেন। কিন্তু বাড়ি করে যেতে পারেননি। ওমর দুবাই থেকে ফেরার পর এখানে দোতলা বিল্ডিং তুলেছে। দোতলায় মা আর ভাইকে নিয়ে থাকে। নিচতলা এক কোচিং সেন্টারকে ভাড়া দিয়েছে। হরতালে সেটাও আজ বন্ধ।
ওমর বারান্দা দিয়ে ফজলুকে ডাকে। ফজলুকে কাজের ছেলে বলা যাবে না। নিজের দুই ছেলে এত বাইরে থাকে যে মায়ের সার্বক্ষণিক সঙ্গী এখন এই ফজলুই। ওকে দিয়ে সিগারেট কিনতে পাঠিয়ে ঘরে ঢুকতেই দেখে মোবাইল বাজছে। ফারিয়ার ফোন। ওমর ধরে না।
একটু টেনশনে থাকুক মেয়েটা। ওমর ফারিয়ার ওপর রাগ করেনি। এত দ্রুত কারো ওপর রাগ করার মতো আবেগপ্রবণ ছেলে ও নয়।
ফজলু সিগারেট নিয়ে এলে আয়েশ করে ধরায়। নিজের ঘরে শুয়ে আকাশ দেখে। বৃষ্টি হবে নাকি? কেমন যেন গুমোট ভাব।
ফোন না ধরাতে ফারিয়া ভাবতে পারে ওমর রাগ করেছে। নাহ সেটা হতে দেওয়া যাবে না। রাগ করা মানে এক ধরনের পরাজয়। তাছাড়া এমন সুন্দরী একটা মেয়ের সঙ্গে রাগ করে সম্পর্ক নষ্ট করার কোনো মানে নেই।
ওমর মোবাইলটা হাতে নেয়। হঠাত্ সেটা আবার বেজে ওঠে। ওমর চমকে উঠে হাত থেকে মোবাইলটা বিছানায় ফেলে দেয়। এভাবে চমকে যাবার কারণ বুঝতে পারে না ও।
হ্যালো। ওমর গম্ভীর স্বরে বলে।
হ্যালো আমি ফারিয়া... কী ব্যাপার ফোন করলাম। ধরলেন না।
ফারিয়ার কথায় বিরক্ত হয় ওমর। ও কি সারাদিন মোবাইল হাতে নিয়ে বসে থাকে নাকি?
কী ব্যাপার কিছু বলছেন না যে ! আমার ওপর রাগ করেছেন? এবার বেশ ধীরে ধীরে কথাগুলো বলে ফারিয়া।
রাগ করার মতো বিলাসিতা আমার জীবনে নেই। ওমর বলে।
ও আচ্ছা, আপনার তো সংগ্রামের জীবন।
সংগ্রাম তো আপনিও করেন। ব্যাংকে চাকরি করেন। আবার এমবিএ ভর্তি হতে চাইছেন। তবু তো আপনি রাগ করেন। কারণ বিষয়টা আপনার সঙ্গে যায়। আমাকে মানায় না।
ওমরের লম্বা সংলাপ মন দিয়ে শোনে। কথাগুলোর মধ্যে কোনো ধরনের হতাশা আছে কিনা বোঝার চেষ্টা করে। লোকটা কথা বলে ভালোই। কিন্তু এতে করে মানুষ বোঝা যায় না।
হ্যালো, কথা বলছেন না কেন? লাইনে আছেন তো? ওমর প্রশ্ন করে।
হু। অপর পাশ থেকে নিজের উপস্থিতির জানান দেয় ফারিয়া।
আমি ভাবলাম লাইন কেটে দিয়েছেন।
আপনি তো তা ভাববেনই। কিন্তু মিস্টার অক্টোপাস পল, আপনার সব ভাবনাই মিলবে না। ফারিয়া বলে।
তাহলে তো এখন উল্টাপাল্টা কিছু বলতে হবে। যাতে করে বিপরীতটা ঘটে।
শুনুন, আপনি তো বলেছিলেন আমার কোনোদিন কাশবন দেখতে যাওয়া হবে না। আমি কিন্তু আপনার ভবিষ্যদ্বাণীকে মিথ্যা করে যাচ্ছি কাশবন দেখতে।
খুব ভালো কথা। দেখলেন, আমার দেওয়া ভবিষ্যদ্বাণী খণ্ডন করতে আপনি কী রকম বিপ্লবী হয়ে গেলেন। ওমর হেসে বলে।
আমি কার সঙ্গে যাচ্ছি কাশবনে জানেন?
কার সঙ্গে?
হু... আরেকদিন বলব। এবার ফারিয়া বেশ জমিয়ে বলে।
আরেকদিন কেন? কার সঙ্গে যাবেন এখনো ঠিক করে উঠতে পারেননি। কথা শেষ করে ওমর হো হো করে হাসে।
অন্য সময় হলে ওমরের এভাবে মজা নেয়াতে ক্ষেপে যেত। আজ গেল না।
আচ্ছা আপনার কাছে ফ্রেন্ডশিপের ডেফিনেশন কী? হঠাত্ করে প্রসঙ্গ পাল্টায় ফারিয়া।
কারো সঙ্গে সবকিছু শেয়ার করা। নিজের আশা, স্বপ্ন, কষ্ট, সম্ভাবনা সবকিছু। ওমর উত্তর দেয়।
ফ্রেন্ডশিপ আর অ্যাফেয়ারের মধ্যে পার্থক্য কী?
তা জানি না।
কেন জানেন না, পল?
আরেকদিন বলব।
আপনি আমাকে নকল করছেন, ব্যাপারটা কী?
এই আর কি। ঠিক আছে। আজান দিচ্ছে। পরে কথা হবে।
ঘরের দরজায় মা দাঁড়িয়ে আছেন। আজানের সময় নামাজ পড়তে না গিয়ে ছেলের ঘরে এভাবে পাহারা দেবার কী মানে আছে?
কার সঙ্গে কথা বলছিলি? মায়ের কণ্ঠে কৌতূহল উপচে পড়ছে।
এই তো এক ফ্রেন্ডের সঙ্গে। ওমর বিছানা ছেড়ে উঠে বাথরুমে যাবার প্রস্তুতি নেয়। মায়ের প্রশ্ন নয়তো চলতেই থাকবে।
কোনো মেয়ের সঙ্গে কথা বলছিলি?
মেয়েদের তো খেয়েবসে কাজ নেই যে আমার সঙ্গে কথা বলবে!
বাসা থেকে বের হবার সময় আবার মায়ের প্রশ্নবাণ।
মেয়েটা কী করে? বাসা কোথায়?
মা, মেয়েটা মানে ভদ্রমহিলা ব্যাংকে চাকরি করেন। আমার ওনার ব্রাঞ্চে অ্যাকাউন্ট আছে। ইমপোর্টাররা টাকা পাঠায়। তাই প্রায়ই যেতে হয়।
মেয়েটার ফ্যামিলি কেমন, জানিস?
না, মা। জানার কিছু নাই। মেয়েটা ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াশোনা করেছে। আমাদের মতো ছেলেদের আড়ালে বলে গাইয়া।
চার
সন্ধ্যার পরে দোকানে যায় ওমর। পার্টনার মিজানের মুখ খুব গম্ভীর। মিজান ধুরন্ধর লোক। ওর এই গাম্ভীর্যের মধ্যেই নিশ্চয়ই কোনো ব্যাপার আছে।
ওমর কিছু বলে না। অপেক্ষা করে আছে মিজানের মুখ খোলার জন্য।
আমান ভাই এসেছিলেন। ওমরের দিকে না তাকিয়েই বলে মিজান।
কেন?
কেন আবার চাঁদা চাইতে।
ওনার মতো টপ মাস্তানের কি চাঁদা চাইতে নিজের আসতে হয়? ফোন করলেই তো চলে।
তা চলে। কিন্তু চাঁদার অঙ্কটা একটু বেশি তো তাই।
কত টাকা?
দশ লাখ!
দশ লাখ! কী বলিস! এমনি সারা মাস হরতাল। বেচাকেনা নাই।
কোনো উপায় নেই। আমান ভাই যখন নিজের মুখে এসে বলে গেছে তখন না দিয়ে উপায় নেই। হাতে পায়ে ধরে যদি টাকার অঙ্কটা কিছুটা কমানো যায়, তাতেই লাভ।
আমি চাঁদা দেব না। আমাদের ব্যবসায় কোনো দুই নম্বরি নাই। চল, রমনা থানায় জিডি করে আসি।
আমার তো তোর মতো মাথায় সমস্যা দেখা যায়নি। থানায় জিডি করা মানে সেধে নিজের মৃত্যু ডেকে আনা। মাত্র দুই মাস হলো বিয়ে করেছি। এত তাড়াতাড়ি বউকে বিধবা করার শখ নাই।
আমার একটাই কথা, চাঁদা দেব না। দরকার হলে ব্যবসাই বন্ধ করে দেব।
ওমরের উত্তেজিত চেহারা দেখে আর কথা বাড়ায় না মিজান। ব্যবসা বন্ধ করে দিলে চলবে কীভাবে? নতুন ব্যবসা শুরু করতে হবে। সেখানেও কি চাঁদাবাজরা হামলা করবে না?
পাঁচ
রনবীর-দীপিকার ইয়ে জওয়ানি হ্যায় দিওয়ানি দেখেছিস? কোনো নতুনত্ব নেই। টিভির দিকে তাকিয়ে বলে তিন্নি। মাধুরি দীক্ষিতের নাচটাই যা দেখার মতো। ওয়াও!
তিন্নির কথায় ফারিয়া মাথা নাড়ে। চা-বিস্কিট খেতে খেতে কথা হচ্ছিল ফারিয়ার বাসায়। আড্ডা শুরু হলে তিন বন্ধুর সাবজেক্টের অভাব হয় না।
তোদের বাসার কী অবস্থা? আমরা যে এত জোরে জোরে কথা বলছি, তাতে কোনো সমস্যা হবে না তো? চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে নুপুর জানতে চায়।
ওই সমস্যা নাই। আমার ভাবিরা এমনিতে খুব অতিথিপ্রিয়। সারাদিন এক সঙ্গে থাকলে খিটিমিটি তো লাগবেই।
ফারিয়ার কথা শেষ হবার আগেই ওর বড় ভাবির কাজের মেয়েটা ট্রেতে করে তিনজনের জন্য নুডলস দিয়ে যায়।
ফারিয়া রহস্যময় ভঙ্গিতে হাসে। কাজের মেয়েটা চলে গেলে বলে, এখন অপেক্ষা কর, দেখ ছোট ভাবি কী পাঠায়।
তিন্নি আর নুপুর হাসিতে যোগ দেয়।
এই, তোর না ওমর ভাইয়ের সঙ্গে কাশবন দেখতে যাওয়ার কথা, তার কী হলো? হঠাত্ মনে পড়ে গেছে এমন ভঙ্গিতে বলল তিন্নি।
ফারিয়া অনুভব করল উত্তর দিতে গাল লাল হয়ে যাচ্ছে ওর। নিজের ওপর বিরক্ত হলো। এভাবে কারো নাম শুনেই লজ্জায় লাল হয়ে যাওয়ার কোনো মানে হয় না।
এখনো বলিনি ওমর ভাইকে। ফারিয়া বলে।
ওনাকে টেনশনে রাখ সমস্যা নাই। নুপুর যোগ করে। কবে যাবি ঠিক করেছিস?
শুক্রবার যেতে পারি। নয়তো শনিবার। ফারিয়া খুব চেষ্টা করে কণ্ঠ নিরুত্তাপ রাখতে।
আজকে দুপুরের পরে ওর অফিসে এসেছিল ওমর। বেশিরভাগ সময় ওমর ফারিয়ার অফিসে আসে ফরমাল পোশাক পরে। ফুলহাতা শার্ট। গলা পর্যন্ত বোতাম লাগানো থাকে। শার্টটা আবার প্যান্টে ইন করা। আজ একটু এলোমেলো মনে হলো। কেমন যেন উস্কোখুস্কো ভাব। শার্ট ইন করেনি। জিন্সের প্যান্ট পরা। ফরসা গালে খোঁচা দাড়ি। ফারিয়ার চোখ বার বার চলে যাচ্ছিল ওমরের দিকে। কেমন যেন মায়া লাগছিল।
অন্যদিন ওমর ব্যাংকে ঢুকেই ফারিয়াকে সালাম দেয় হাসিমুখে। আজ এল সবার শেষে। হাসিটাও কেমন যেন প্রাণহীন। তবে তাতেই খুব মুগ্ধ হলো ফারিয়া।
ফারিয়ার মুগ্ধ চেহারা বান্ধবীদের চোখ এড়ায় না।
শোন... ওনাকে কাশবনে গিয়ে কিটসের ওডে টু অটাম কবিতাটা আবৃত্তি করে শোনাবি। হাউ বিউটিফুল দ্যা সিজন ইজ নাউ... হাউ ফাইন দ্যা এয়ার। নুপুর বলে মজা করে।
শেলির কবিতাও শোনাতে পারিস। তিন্নি যোগ করে।
উনি তো গ্রামের স্কুলে পড়াশোনা করা মানুষ। এসব কবিতার অর্থ কি বুঝবেন তিনি? ফারিয়া বলে।
তাহলে বাংলা কোনো কবিতা পড়ে শোনাবি। অটাম নিয়ে রবীন্দ্রনাথের কোনো কবিতা নাই? তিন্নি জানতে চায়?
আছে নিশ্চয়ই। তবে জীবনানন্দ দাশের কবিতাই বেশি। ফারিয়া জানায়। ইংরেজি সাহিত্যের পাশাপাশি বাংলা সাহিত্যেরও খোঁজ-খবর রাখে ও।
ওদের আলোচনার মধ্যে ট্রে নিয়ে ভেতরে ঢোকে ফারিয়ার ছোট ভাবির কাজের মেয়ে। পায়েস রান্না করে পাঠিয়েছেন তিনি। মেয়েটা চলে যাবার পর ফারিয়া, নুপুর, তিন্নির হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যাবার মতো অবস্থা হয়।
ছয়
কী হয়েছে আপনার? সারাদিন এতবার ফোন করলাম... ধরলেন না? ফারিয়া বলে উদ্বিগ্ন স্বরে।
আমি মেসেজ পাঠিয়েছিলাম। পাননি?
পেয়েছি। রাত আটটার পরে ফোন করবেন বলেছিলেন?
এখন তো মাত্র আটটা বেজে তিন মিনিট। একটু পরেই ফোন করতাম।
আপনি যেন কেমন হয়ে গেছেন?
কীরকম?
বুঝতে পারছি না... আপনাকে একটা জরুরি কথা বলার ছিল।
কী, বলেন?
আপনি কোনদিন ফ্রি থাকেন? শুক্রবার না শনিবার?
কেন, বলেন?
আপনি না খুব বিরক্তিকর লোক। শুধু প্রশ্ন করেন। আগামী শুক্রবার আপনার কোনো কাজ আছে?
হ্যাঁ আছে।
কী কাজ?
গ্রামের বাড়িতে যাব।
মানে ময়মনসিংহে, ব্রহ্মপুত্র নদীর কাছে?
হ্যাঁ।
কবে আসবেন?
তিন-চারদিন লাগবে। কেন?
ফারিয়া কোনো উত্তর খুঁজে পায় না। কাশবনে যাবার পরিকল্পনা পিছিয়ে দেবে?
গ্রামের বাড়িতে কেন যাবেন?
আম্মা ও ভাইকে ওখানে রেখে আসব।
মানে?
আপনাকে বলা হয়নি, আমি আবার দুবাই চলে যাচ্ছি। এদেশে ব্যবসা করা আমার পোষাচ্ছে না।
দুবাই চলে যাবেন! ওমরের কথার প্রতিধ্বনি ফারিয়ার কণ্ঠে। আপনার মা কোথায় থাকবেন?
আমি দেশে থাকছি না শুনে আম্মা গ্রামে চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এত লোক এদেশে ব্যবসা করছে না? ফারিয়ার বিস্ময়ভাব কাটছে না।
যারা করছে, তাদের মতো হবার যোগ্যতা আমার নেই।
মোহাম্মদপুরে আপনার যে বাড়িটা আছে, সেটা কী করবেন?
ডেভলপারকে দিয়ে দেব।
তারা তো আপনার করা বাড়ি ভেঙে ফেলবে।
কিছু করার নেই। বাড়ির উঠানে আম্মা নানারকম সবজির গাছ লাগিয়েছিলেন। সব সাফ করে ফেলবে ওরা।
আপনি কি তাহলে পালিয়ে যাচ্ছেন?
ফারিয়া, এদেশে ক্ষমতায় যাবার সাপলুডু খেলা চলে। মই বেয়ে যারা ওপরে ওঠে, তাদের চাওয়ার সীমা নাই। কেউ কিছু করতে গেলে তাদের সন্তুষ্ট করে চলতে হয়। আর সাপে খাওয়ার দল নিজেদের বিষ ঢালে দেশ অচল করে দিয়ে।
এভাবে বিদেশে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়াটা ওমরের জন্য সহজ ছিল না। বুঝতে পারে ফারিয়া। কেন যে সবকিছু এভাবে ওলটপালট হয়ে গেল।
শুনুন, আপনার বাড়ির কাছে কাশবন আছে না? কাশবনের ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করবেন। ঠিক আছে? ওমরের মনে হয় অনেক দূর থেকে কথাগুলো বলছে ফারিয়া।
আরে, আপনার না কার সঙ্গে কাশবন দেখতে যাওয়ার কথা! পরে তো আর বললেন না? ওমর প্রশ্ন করে।
আরে না, আমি জাস্ট মজা করেছিলাম। আপনি ঠিকই বলেছেন মি. পল অক্টোপাস... আমার কোনোদিনই কাশবন দেখতে যাওয়া হবে না।
