ফরিদুর রেজা সাগরের—মানুষের মুখ

আপডেট : ৩১ অক্টোবর ২০১৩, ১৭:৫৬
চেনা অচেনা মুখ ফরিদুর রেজা সাগর প্রচ্ছদ :ধ্রুব এষ প্রকাশক :অনন্যা মূল্য :৩০০ টাকা তিনি হলেন সবচে বড় জাদুকর যিনি পরিপূর্ণরূপে নিজেকে জাদু করে রাখেন, স্বশাসিত উপস্থিতির মতো তার অলীক মূর্তির ধারাবাহিকতা আত্মস্থ করেন। এটা কি আমাদের ব্যাপার নয়? আমরা যা দেখি আমাদের চারপাশে যা ঘটে তার শিল্পিত বয়ান অনেক সময় আমাদের আলোড়িত করে। ফিকশনধর্মী সাহিত্যকর্মের বাইরে রিয়েলিস্টিক সাহিত্যকর্মের গুরুত্ব সাধারণ্যে কম নয়। খুবই সাধারণ ঘটনা কিন্তু তার মধ্যেও লুকিয়ে থাকে গভীর তাত্পর্য। আমরা দেখি আর ভুলে যাই কিন্তু কেউ যদি সেই সাধারণ ঘটনাকে শিল্পিত মাত্রায় উপস্থাপন করতে পারে তাহলে নতুন অর্থ নির্মিত হয়। মানুষ দেখার দক্ষতা সবার থাকে না। সব শিল্পী মানুষের মুখ আঁকতেই সারাটা জীবন ব্যয় করেছেন। সাহিত্যিকগণ মুখের ভেতরেও যে অসংখ্য মুখ থাকে তার ধারণা দেন। শ্রয়ডেঙ্গারের বহুবিশ্বের ধারণার মতো এ এক দুর্দান্ত চিন্তা। ‘মানুষের মুখ-২’ বইটি অনেকদিন হাতের কাছে রেখেছি। মাঝে মাঝে পড়ি। বইটি সম্পর্কে আমার কিছু প্রতিক্রিয়া আছে যা তুলে ধরলে নতুন কোনো বিশ্বের সূর্য দেখা অসম্ভব হবে না। বইটির লেখক ফরিদুর রেজা সাগর। তিনি যখন ‘মানুষের মুখ-১’ লিখেছিলেন—তারও একটা আলোচনা আমি লিখেছিলাম। ফরিদুর রেজা সাগর মানুষ দেখেন। খুব খুঁটিয়ে দেখেন। মানুষের ভেতরের বেদনা আর আকাঙ্ক্ষার মানবিক জায়গা যখন চূড়ান্তরূপ নেয় তার ওপরেই আলো ফেলেন তিনি। উজ্জ্বল হয়ে ওঠে ঘটনাগুলো। তাঁর দেখার ধরন দেখে রফিক আজাদের একটা কবিতা অনিবার্যভাবে মনে পড়ে—‘খুব খুঁটিয়ে মানুষ দেখি/ যেমন করে বরের বাবা/ কনের চলাফেরা এবং/ চুল থেকে তার পা অব্দি/ দেখতে থাকে।/ ঠিক তেমনই মানুষ দেখি। মানুষ দেখি।’ সারাজীবন ধরে মানুষ দেখা শেষ হলো না—গোর্কির এই উক্তি শিরোধার্য মানি। কত বিচিত্র মানুষ কত বিচিত্র তার জীবনধারনের পদ্ধতি। কেউ কি বিশ্বাস করবে শ্রীলঙ্কার পাঁচতারা হোটেলের কাকতাড়ুয়া লোকটির কাহিনি? রাতে ছাদে খাবার দিয়ে রাখলে ভোরে কাকপক্ষী এসে খায় আর কাকতাড়ুয়া লোকটি সকালে সেই কাকপক্ষী তাড়ায়। এটাই তার চাকরি। তিনি খাবার না দিলে কাক আসবে না এবং চাকরি থাকবে না। একবার কাক আসা কমে গেলে তার চাকরি যাওয়ার উপক্রম হয়—তিনি খাবার দিয়ে আবার কাকের উপদ্রব বৃদ্ধি করেন এবং চাকরি রক্ষা হয়। হা হতোস্মি। দুবাইয়ের বিখ্যাত হোটেল আটলান্টিক-এর বার্থা। ডলফিন ট্রেনার। বিনোদন তৈরিতে সিদ্ধহস্ত। ২৮টি ডলফিনের দেখাশোনা করে, পরিচর্যা করে। কিন্তু সে কথা বলে না, বোবা। জানা গেল আসলে সে বোবা নয়। ইস্ট ইউরোপে ওদের বাড়ি। যুদ্ধ চলছিল। ওর বাবা-মাকে গুলি করে ওরই সামনে মেরে ফেলে সন্ত্রাসীরা। তারপর থেকে সে বোবা। কথা বলে না। ফরিদুর রেজা সাগরের ভাষায়—‘কে জানে হয়তো সমস্ত পৃথিবীর ওপর ক্ষোভে-দুঃখে-অভিমানে ইচ্ছে করেই কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে বার্থা। মানুষের মুখ কত উজ্জ্বল আবার বীভত্স নিষ্ঠুরতায় ভরা। সেই মুখ আবিষ্কার করার যে অনুসন্ধিত্সা লেখকের মধ্যে জাগ্রত তাকে সাধুবাদ দিই। সবাই ভ্রমণ করে, বিভিন্ন মানুষ দেখে কিন্তু ভেতরের এই যে অভিনব আরেক মানুষ, ঘটনার দ্বন্দ্ব, সংসারের দোলাচল, মানসিক টানাপোড়েন তা খুঁজে বের করার সাধ্য কজনার? আরেক চিকিত্সক। তার চাওয়া সামান্য। মাত্র তিন বছর বাঁচতে চান। কেননা, তার স্ত্রীর কবরের পাশে তিনি কবরস্থ হতে চান। বনানী গোরস্থানের নিয়মানুযায়ী মৃত ব্যক্তির কবরে তিন বছর হাত দেওয়া যাবে না। দেখা গেল, তার চাওয়া পূর্ণ হয়েছে। তিন বছর পরই তিনি অর্থাত্ ডা. মৃত্যুবরণ করেছেন। স্ত্রীর প্রতি গভীর ভালোবাসায় কেউ মমতাজ মহল গড়েছেন কেউ সমাহিত হতে চেয়েছেন তারই পাশে। মৃত্যুর পরের পৃথিবী সম্পর্কে আমরা কেউ জানি না। ধর্মবিশ্বাস থেকে যতটুকু জানা যায়, তা হলো— শাস্তির কাল হিসাব নিকাশের কাল। দান্তের ডিভাইন কমেডিয়ার প্যারাগোটেরিওতে যে শাস্তি ও নরক যন্ত্রণা—তা পাঠ করে বার্টান্ড রাসেল বলেছিলেন, দান্তের ডিভাইন কমেডিয়ার মতো ঈশ্বর নিষ্ঠুর হলে সেই ঈশ্বর আমার নয়। হয়তো মৃত্যুর পরে শাস্তি আছে কিংবা নেই কিন্তু মানুষ চায় মৃত্যুর পরে এক অমর জীবন। দার্শনিকরা এ প্রশ্নের উত্তর একভাবে দিয়েছেন, বিজ্ঞানী, ধর্মপ্রবর্তকগণ দিয়েছেন অন্যভাবে। কিন্তু মৃত্যুর পরে যে রূপান্তর তা কেউ অস্বীকার করে না। দেহ রূপান্তরিত হবে মাটিতে কিংবা উদ্ভিদে অথবা পোকায়। সেই ছেলেটি যাকে আদর করে শাইখ সিরাজ ও ফরিদুর রেজা সাগর খাওয়াত। তার মধ্যেও ছিলো অসীম কৃতজ্ঞতা। নানারকম চিন্তা আর কথার ফুলঝুরি ছিল ছলেটির মধ্যে—চাঁদের আকারের মতোই A B C D আছে, ব্যাংক রাতে খোলা থাকলেই ভালো কিংবা স্টেডিয়ামে সাপ খেলা দেখানো উচিত লোক বেশি হবে। হ্যাঁ সত্যিই একদিন সাপ ছাড়া হলো খোন্দকার মোশতাকের জনসভায়। বোমা ফাটলো। আর ধরা পড়লো ওই সাপ পাগল ছেলেটি। বিনা বিচারেই হয়তো জেলে আছে। সেখান থেকেই খোঁজ নিয়েছে ফরিদুর রেজা সাগর আর শাইখ সিরাজের। ‘মানুষের মুখ-২’-র পরীর গল্পটিও নির্মম। সুন্দরী স্মার্ট। অনেকের বন্ধু। কিন্তু ভালো লাগে না কাউকে। হঠাত্ যাকে ভালো লাগল তিনি এক বয়স্ক মানুষ। এর আগে তার দুই স্ত্রী মানসিকব্যাধিগ্রস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। পরী বিয়ের পর শান্তিতেই ছিল। হঠাত্ ধরা পড়ে ক্যান্সার। এক বছরেই মৃত্যু। পরীর মতোই এসে আবার চলে যাওয়া। নিয়তি কেউ বিশ্বাস করুক বা না করুক পরীর স্বামীর নিয়তি যেন স্ত্রীর মৃত্যুতেই। রামপুরা টিভির এক চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী যে স্বামীর চাকরি চেয়েছিল—অবশেষে সে পুড়ে মরলো স্টোভের আগুনে আর স্বামীটি মরলো বিষ খেয়ে। এই গল্পটি যখন পড়ছিলাম তখন আমার নিজের লেখা ‘সঠিক উত্তর’ কবিতার কয়েকটি লাইন মনে পড়লো— আমাদের বাড়িওয়ালার এক চাকর ছিলো পাড়ার লোকে তাকে ডাকতো সক্রেডিস বলে — লিখেছে এক ছাত্র বাড়িওয়ালা তাকে সারাদিন খাটাতো আর পেটাতো বেদম খেতে দিতো না কিছুই একদিন মরলো সে মনের দুঃখে বিষ খেয়ে এখন বাড়িওয়ালার প্রতি শিক্ষকের দারুণ রাগ হলো আর শূন্য দিলো ছাত্রটিকে। এইভাবে মানুষের অসহায়ত্ব দেখতে দেখতে, হোমার অন্ধ হয়ে যায়। আবদেরা নগরের ডেমোক্রিটাস উদ্যানে জেমস্ জয়েস নিজেকে অন্ধ করে ফেলে। জন মিল্টন সরকারের প্রচারপত্র লিখতে লিখতে অন্ধ। কিংবা ‘চোখ থাকিতে অন্ধ এ জীবন জ্বইলা পুইড়া শেষতো হইলো না’ আমজাদ হোসেনের ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’র বোবা হয়ে যাওয়া মেয়েটি আর ফরিদুর রেজা সাগরের ডলফিন কন্যা বার্থা। সময় গড়িয়ে যায় কত চেনা মুখ অচেনা হয়ে যায় আবার অনেক অচেনা মুখ মনে থাকে। গ্যেটে মানবজীবনের পরিণাম সম্পর্কে বলেন—ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসে—কাছের সবকিছু হয়ে যায় বহুদূরের গোধূলি। তবু মানুষ থাকে—তার মুখ অম্লান। ফরিদুর রেজা সাগরের মানুষগুলো খুবই সাধারণ, ছুঁয়ে দেখা যায়—কিন্তু স্পর্শমাত্র বিষ্ফোরণ ঘটে—বেরিয়ে আসে ক্যাপ্টেন আহবের তিমি হননের গল্প। আশা করি এই জীবনে লেখক ফরিদুর রেজা সাগর আরও মানুষের মুখ আবিষ্কার করবেন। খনি শ্রমিক যেমন একরাশ কয়লার মধ্যে খুঁজে পান উজ্জ্বল নক্ষত্র।