কবিতা কি জ্যোত্স্না? ভাঙে চাঁদ? যেমন স্রোত ভাঙে ঢেউ, নদী ভাঙে ঘাট, পাখি ভাঙে ঠোঁট, আঁধার ভাঙে রাত, দুপুর ভাঙে রোদ, স্বপ্ন ভাঙে ঘুম, কুমারী ভাঙে শরীর, জানালা ভাঙে ভোর, মন ভাঙে নাভি। ঘুম ভাঙে চিলেকোঠা। নিদ্রা ভাঙে অবয়ব। কিশোর ভাঙে রিনিঝিনি। ভাঙনের শব্দ নেই। সুর আছে, স্বর আছে, সুর ও স্বরের ব্যবধান আছে।
কবি কি সুর ও স্বরের সন্ধান করেন? না, পূর্ণিমার আলোর সন্ধান করেন? না, দূরের পথ চলেন? পথে কি কখনো থাকে রৌদ্রের উন্মাতাল ছড়াছড়ি কিংবা কখনো মাতাল মেঘের ছড়াছড়ি? কবি কি কখনো কবিতায় তোলেন ঢেউ-নদী, বুক-পাথর, পাখি-ডানা, চোখ-শেকড়, ঠোঁট-রং, জল-জমিন, বাঁশি-আঁচল, রুটি-রাত্রি, মাটি-ঘৃণা, জানালা-ঘুম, উত্তাপ-অন্ধকার, প্রেম-বর্ণমালা, হেমন্ত-লবণাক্ত প্রণয়ের ঘ্রাণ, নক্ষত্র-দ্বান্দ্বিক জোয়ার, বৃষ্টি কুড়ানো-কানামাছি বু বু, টিপ-টিয়াপাখি, প্রথম বাসর-হারানো চিঠিগুচ্ছ, হলুদ ঘাস-দ্রাঘিমা, গোগল ও নেট-টাওয়ার।
নক্ষত্রের ভাঙন থেকে কবি কখনো কখনো বেরিয়ে যান। পৌঁছে যান যোজন যোজন দূরের দ্বীপে। দ্বীপ শিকারিদের প্রপিতামহদের মতো কেউ কেউ খোঁজেন হেমন্তের কুয়াশা, কেউ কেউ পৃথিবীর ভূ-স্বর্গে ভূগোল তৈরি করেন। তখন কবির নির্লিপ্ত চোখে ঘুরে বেড়ায় চরায় জমে থাকা জলের মতো কীর্তিনাশা, ধলেশ্বরী আর ধানসিঁড়ি। নদীগুলো মায়াবতী, ছায়াবতী মায়ের আঁচল। শেওড়া-অশ্বত্থের পাতার মতো মচমচ করে কোনো কোনো দুপুর।
স্বাভাবিক সূত্রের সুতো
আমাদের ঘুমগুলো নির্ঘুম হলে
প্রাতঃভ্রমণ থেকে আমরা চোখ ফিরাই
নদীর পিঠে জন্মদাগ দেখা দিলে
স্বাভাবিক সূত্রের সুতো ক্রমশ বদলাই
অবশেষে নদীতীরে গাবগাছ হয়ে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকি
অবশেষে মাঠভরা চোখগুলো চুম্বকের চোখ করে ফেলি
প্রৌঢ় রাত
নিদ্রার ভেতর পড়ে থাকে কয়েকটি প্রৌঢ় রাত
স্টেশনের পেছনে পড়ে থাকে কয়েকটি বছর
আমি মেঘের মন্দিরে ঢুকে যাই তোমাকে নিয়ে
আমি গদ্যের ঘ্রাণ খুঁজি তোমার সিন্দুকের ভেতর
আমি তোমার অনুভবের পাথরে গুচ্ছগ্রাম বানাই
আর একটি প্রবেশপথের জন্য বুকের পাঁজর ভাঙি
কফিভরা মগ না মগভরা বারান্দা এই তর্কেই থাকি
তবে বুকের দুপুর বাড়িয়ে দাও, ব্যথার দুপুর নয়।
খাঁ খাঁ
কেউ যদি নাড়িয়ে দেয় রোদ
আমি রাঙিয়ে দেবো তোমার দুপুর
কেউ যদি তুলসী পাতায় হাত রাখে
আমি কৃষ্ণচূড়ার সব রং কেড়ে নেবো
কেউ যদি সমগ্র সময় ঢেলে দেয়
আমি অশ্বারোহীর পিঠ মসৃণ করে দেবো
সুর ও স্বরের ব্যবধান
খেয়া খেয়া খেয়া বলে আমার চিত্কারে কারোর কোনো যায় আসে না। যারা বেদনার জল ঢেলে আমাকে ঘাটের সন্ধান দিয়েছো, তারাই এখন অচেনা স্টেশন। পাতাগুলো পড়ে থাকে, ইটগুলো প্রাচীন হয়। আমি ধুতুরার আঠা মেখে ক্লান্ত করি জনপদের ধুলোমাখা সড়ক। এক্কা-দুক্কা’র দিন শেষ হয়ে এলে আমরা ভুলে যাই মাসিমা’র মুখ। স্মৃতিরা সব ঢুকে গেছে অন্তর্জালের জালে। জেলেপাড়া থেকে ঘুড়ি উড়ে গেলে মন খারাপ করার কেউ থাকে না। না থাকুক, আমরা কেবল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কাগজের ফুল বানাবো।
