ভূত!

আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০১৩, ২১:২৩
কেউ একজন চেঁচিয়ে উঠল ভূত বলে! আর যায় কোথায়। চারিদিকে কেবল একটাই শব্দ- পালাও পালাও। ভূত ভূত। পরের দৃশ্য হলিউডের কোনো হরর মুভির দৃশ্যের মতো। এরপর একের পর এক জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যাওয়া। ছুটে এলো ডজনখানেক অ্যাম্বুলেন্স। তাতে তুলে নেয়া হয় জ্ঞান হারানোদের। কেউবা আধা জ্ঞান হারায়। নেয়া হলো হাসপাতালে। হাসপাতালের বেডে জ্ঞান ফেরার পরেই আবার ‘বাঁচাও’ বলে চিত্কার। আবার জ্ঞান হারানো। ঘটনাটি পাকিস্তানের লানধির একটি গার্মেন্টস কারখানার গত ২৭ অক্টোবরের। ঘটনার পর জ্ঞান হারিয়ে ফেলা মেয়েদের জিন্নাহ পোস্ট গ্র্যাজুয়েট মেডিক্যাল সেন্টারে ভর্তি করানো হয়। কিন্তু সেখানে তাদের চিত্কারে অন্য রোগীদের ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা। যার জ্ঞান ফেরে সেই-ই চিত্কার করে ওঠে ভূত বলে। সাথে সাথে আবার জ্ঞান হারায়। চিকিত্সকরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে একের পর এক ঘুম পাড়ানি ইনজেকশন দিতে থাকেন। আসলে কি ঘটেছিল গার্মেন্টস কারখানাটিতে। চেকিং ডিপার্টমেন্টে হেল্পার পদে চাকরি করা সাগুফতা নাজ নামে এক তরুণী বলেন, আমি বাথরুমে গিয়েছিলাম। সেখানে বিশাল কালো একটি ভূত দেখি। এত বড় ভূত আমি জীবনে দেখিনি! গত কয়েকদিন ধরে আমরা শুনতে পেতাম বাথরুমের ভেতর একটা পুরুষ মানুষ কাঁদছে। কিন্তু বুঝতে পারতাম না। কিন্তু আজ যা দেখলাম তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। সেটা এই জগতের কোনো প্রাণী নয়। স্ট্রেচারে শুয়ে আরেক নারী কর্মী বলেন, আমি ছিলাম আমার ডিপার্টমেন্টে। হঠাত্ করে দেখি একটা ভূত! আমি কোনো রকমে দিলাম দৌড়। ওই গার্মেন্টসে চাকরি করতে আর কোনোদিন যাব না। জেপিএমসি হাসপাতালের প্রধান সেবিকা ডেইজি নাসরিন বলেন, এই মেয়েগুলোকে ঠাণ্ডা করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। একজন ভূত বলে চিত্কার করে উঠছে, অন্য সবাই তার সাথে তাল দিয়ে চিত্কার করে মুহূর্তেই জ্ঞান হারাচ্ছে। ভূত এমনভাবে ঘাড়ে চেপে বসেছে যে কয়েকটি মেয়েকে তাদের নাম জিজ্ঞাসা করলে কেউই নাম পর্যন্ত মনে করতে পারেনি। নাম জিজ্ঞাসা করলে একজন উত্তর দেয়, আমার নাম রুহি। কিন্তু তার মা ধমক দিয়ে বলেন, তোমার নাম তো শাহীনা, রুহি বলছ কেন? তখন মেয়েটি বলে, ও তাইতো, আমার নাম শাহীনা! শাহীনার কাছে চিকিত্সক জানতে চান তার কি ঘটেছিল। সে বলে, ‘আমি কিছু দেখিনি। দুটি মেয়ে বাথরুমে গিয়েছিল। তারা ভূত দেখে ভেতর থেকে বাঁচাও বাঁচাও বলে চিত্কার করছিল। ইতিমধ্যে একজন দরজা খুলে বাইরে দৌড়ে এলো। এরপর সে তার চাঁদর দিয়ে নিজের গলায় ফাঁস দেয়ার চেষ্টা করল। তখন হঠাত্ আমি বুঝতে পারলাম কেউ একজন আমার গলা টিপে ধরেছে। এরপর আমাদের ফ্লোরের শতাধিক মেয়ের একই অবস্থা হলো। কে যেন সবার গলা চেপে ধরছিল। কেউ দম নিতে পারছিলাম না। একের পর এক মেয়েরা মেঝেতে পড়ে যাচ্ছিল। তারা বলছিল দম ছাড়তে পারছে না। শাহীনা আরো বলে, কয়েকদিন আগে আমাদের ফ্লোরের একজন মেয়ে প্রথমে ভূত দেখেছিল। সে সাথে সাথে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। তাকে স্যারেরা বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। সুস্থ হয়ে যখন সে কাজে ফিরল তখন তাকে আর চেনার মতো ছিল না। সে বাথরুমে গেলেই ভূতটাকে দেখতে পেত। একদিন সে আবার ভূত দেখে জ্ঞান হারায়। এই কোরবানী ঈদের আগের দিন সে মারা যায়। ঈদের পর গার্মেন্টস খুললে তার এক বান্ধবী বাথরুমে গিয়ে ভূতটাকে দেখে। সেও আর ফিরে আসেনি। ডাক্তাররা শাহীনার কাছে জানতে চান, ওই গার্মেন্টসে কি একটাই বাথরুম। জবাবে সে বলে, না আরো আছে। কিন্তু ভূতটা সব বাথরুমেই ঘুরে বেড়ায়। এমন কি সিঁড়ি দিয়ে নিচে ওঠা-নামার সময়ও অনেকে তাকে দেখেছে। সে মেয়েদের গায়ে হাত দেয়! কর্তৃপক্ষ কি এই আতঙ্ক দূর করার জন্য কোনো ব্যবস্থা নেয়নি? শাহীনা বলে, ‘চেষ্টা করেছিল কিন্তু পারেনি। ভূত তাড়াতে গার্মেন্টস মালিকপক্ষ একজন মৌলভীকে নিয়ে এসেছিল। তিনি ভূত তাড়াতে তেলাওয়াত করা শুরু করেন। কিন্তু হঠাত্ করে বিশাল এক চিত্কার দিয়ে মৌলভী সাহেব ছুটে বের হয়ে এলেন। তিনি রুদ্ধশ্বাসে দৌড়ে গার্মেন্টস থেকে পালিয়ে গেলেন। মৌলভী সাহেব আর কোনোদিন গার্মেন্টসে আসতে রাজি হননি।’ ওই গার্মেন্টসের মোহাম্মদ ইয়াসিন নামে এক পুরুষ কর্মী বলে, ভূতটি এই কোম্পানির কোনো পুরুষ কর্মীকে কিছু বলে না। কেবল মেয়েরাই তাকে দেখতে পায়। ঘটনার দিন সকাল ১১টার দিকে কাজে এসে ভূতের তাণ্ডবে প্রথমে সাতজন মেয়ে জ্ঞান হারায়। এরপর ১২টার পর একের পর একজন মেয়ে ভূত দেখতে থাকে। এভাবে সবাই আক্রান্ত হয়। কেউ একেবারে জ্ঞান হারায়, কেউবা আংশিক। আমরা সাথে সাথে সবাইকে স্ট্রেচারে, অ্যাম্বুলেন্সে কিংবা কোলে করে তাদের সবাইকে হাসপাতালে নিয়ে আসি। হাসপাতালের ইমার্জেন্সি বিভাগের চিকিত্সক ডা. শিমিন জামিল বলেন, ‘মেয়েগুলো অদ্ভুত আচরণ করছে। জ্ঞান ফেরার পর তারা দুই হাত পাখির ডানার মতো করে ঝাপটাচ্ছে এবং ঘন ঘন চোখ খুলছে এবং বন্ধ করছে। তাদের কিভাবে যে এমন হচ্ছে তার ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছি না। প্রথমে ধারণা করেছিলাম, গার্মেন্টসের গ্যাস পাইপ লিক হয়ে তারা হয়তো অসুস্থ হয়ে পড়েছে। কিন্তু সব ধরনের টেস্ট করে দেখা গেছে, রিপোর্ট নরমাল। এখন মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা তাদের চিকিত্সা করবেন।’ হাসপাতালের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আফ্রিদি বলেন, তিনি ভূতে বিশ্বাস করেন না। মেয়েগুলো একটি রোগে আক্রান্ত হয়েছে যার নাম ‘ম্যাস হিস্টেরিয়া’। পাকিস্তানের মতো উন্নয়নশীল এবং গরীব দেশগুলোতে জিন, ভূত একটি ছেলেভুলানো আতঙ্কের নাম। একজন যদি বলে সে ভূত দেখেছে তো অন্য দশজন একপ্রকার সিনড্রোমে আক্রান্ত হয়। এই মেয়েগুলো ভূতের গল্প শুনতে শুনতে সেই সিনড্রোমে আক্রান্ত হয়েছিল। এমনকি হাসপাতালে খোঁজ নিতে আসা অনেকের স্বজনও ভূতের ভয়ে জ্ঞান হারিয়েছে! একসময় একজন মেয়ে চেঁচিয়ে ওঠে, ‘‘মৌলভী সাহেবও ভূত বিশ্বাস করতেন না। সাহস থাকে তো আমাদের গার্মেন্টসের বাথরুমে একবার ঢুকে বলুন -আমি ভূতে বিশ্বাস করি না। তাহলে বুঝব আপনি বাপের বেটা’’!