সম্প্রতি জার্মান চ্যান্সেলরের ফোন ট্যাপ করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সারাবিশ্বে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। শুধু বিদেশেই নয়, নিজ দেশের নাগরিকদের ওপর গোয়েন্দাগিরি চালানোর অভিযোগও রয়েছে মার্কিন সরকারের বিরুদ্ধে। তবে কেবল যুক্তরাষ্ট্র নয়, একই অভিযোগ রয়েছে পৃথিবীর আরও বেশ কয়েকজন সরকার প্রধানের বিরুদ্ধেও।
জার্মানী: যুক্তরাষ্ট্র ফোনে আড়ি পেতেছিল বলে অসন্তুষ্ট জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল। জার্মানির মানুষও খুশি নন তাদের উপর আমেরিকার এই নজরদারিতে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, তাদের নেত্রী অ্যাঞ্জেলা মার্কেলের সরকার নিজেই যে মার্কিন নিরাপত্তা সংস্থা এনএসএ-এর অন্যতম পার্টনার হিসেবে কাজ করে আসছে। জার্মানির শীর্ষস্থানীয় সাপ্তাহিকী ডার স্পিগেল-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশটির গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জনগণের হাঁড়ির খবর জানতে এনএসএ’র সঙ্গে একযোগে কাজ করেছে, তাদের কাছ থেকে নেয়া সফটওয়্যার ‘এক্সকীস্কোর’-এর সাহায্যে দেশের মানুষের যাবতীয় পার্সোনাল মেসেজ পর্যন্ত পড়ে ফেলছে। মানুষের গোপনীয়তা বলতে আর কিছু থাকছে না। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জার্মান সরকারের সেই ‘গোপন আঁতাত’ আর না থাকলেও এক্সকীস্কোর সফটওয়্যার তো রয়েই গেছে। আর সেটি যে এখনও জনগণের ফোনে, কম্পিউটারে উঁকিঝুঁকি মারছে না, তারই বা গ্যারান্টি কী?
ফ্রান্স: ফ্রান্সের লা মন্ডে পত্রিকার খবর অনুযায়ী, জনগণের গোপন খবরাখবর সংগ্রহের ক্ষেত্রে সেদেশের সরকার যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে খুব একটা পিছিয়ে নেই। দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা ‘ডাইরেকশন জেনারেল ডা লা সিকিউরিট এক্সটেরিউর’ লোকজনের ফোনালাপ, ইমেইল, এসএমএস ও ফেসবুক অ্যাকাউন্টের ডাটা নিয়মিতই সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে আসছে। যদিও সরকার এ গোয়েন্দাগিরির অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে এসেছে।
চীন: কমিউনিস্ট চীনের জনগণ যে প্রায় সব সময়ই সরকারের কড়া নজরদারির মধ্যে রয়েছে, সে তো মোটামুটি সকলেরই জানা। দেশবাসীর উপর গোয়েন্দাগিরি চালাতে সরকারের রয়েছে অত্যন্ত উন্নত ডিজিটাল প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা। তবে এ গোয়েন্দাগিরির মাত্রা এমনই সীমা ছাড়িয়ে গেছে যে সরকারি কর্মকর্তারা পর্যন্ত একে অপরের উপর ‘স্পাইং’ করতে শুরু করেছেন। অনেক কর্মকর্তার অফিস ও গাড়িতে, এমনকি বাথরুমের শাওয়ারে পর্যন্ত লুকানো মাইক্রোফোন পাওয়া গেছে। কমিউনিস্ট পার্টি মেম্বার বো জিলাই তো স্বয়ং প্রেসিডেন্টের উপরও গোয়েন্দাগিরি করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। মজা করে বলা হয়, চীনা কর্মকর্তারা এখন কোন মিটিং-এর আগে ঘন ঘন কোলাকুলি করেন, যদি অন্যের শরীর হাতিয়ে গোপন মাইক্রোফোনের সন্ধান পাওয়া যায়!
রাশিয়া: অলিম্পিকে যদি ‘নজরদারির’ ওপর কোন ইভেন্ট চালু করা হতো তাহলে গোল্ড মেডেলটা নির্ঘাত রাশিয়াই জিতে নিত। রাশিয়ার সোচিতে আগামী বছর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে অলিম্পিক গেমস। এই আসরকে ঘিরে রুশ সরকার এমন এক নজরদারি ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছে যার মাধ্যমে প্রতিটি ক্রীড়াবিদ ও দর্শনার্থীর কথাবার্তা শোনা যাবে, চলাফেরা পর্যবেক্ষণ করা যাবে।
জিম্বাবুয়ে: নির্বাচনে জেতা যেন রবার্ট মুগাবে সরকারের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। অনেকের সন্দেহ, নির্বাচনে জয়লাভের ক্ষেত্রে বাড়তি কোন সুবিধা ভোগ করে থাকেন মুগাবে। সম্প্রতি সরকার সকল ব্রডব্যান্ড প্রোভাইডার ও ফোন কোম্পানিগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে তারা যেন আগামী ৫টি বছর তাদের ব্যবহারকারীদের যাবতীয় তথ্যাদি সযত্নে সংরক্ষণ করে। আর এসব তথ্য রাখা হবে ন্যাশনাল ডাটাবেসে। সরকারের যুক্তি- অপরাধ দমনই এই তথ্য সংরক্ষণের উদ্দেশ্য। কিন্তু নিন্দুকেরা বলেন অন্য কথা। তাদের মতে, আসলে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের উপর গোয়েন্দাগিরি চালাতেই সরকারের এমন পদক্ষেপ।
সিরিয়া: সিরিয়ায় ইন্টারনেট জগত্ নিয়ন্ত্রণ করে মূলত দুটি কর্পোরেশন। আর দুটি কোম্পানিরই প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ। কোম্পানিগুলো অনলাইন ও অফলাইনের সকল তথ্য রেকর্ড করে থাকে। টেক্সট মেসেজ ব্লক করতে বা বিরুদ্ধ মতের লোকদের ইন্টারনেটে প্রবেশ রুখতে এরা অত্যন্ত পটু।
ইরান: ইরান সরকার কেবল নাগরিকদের ওয়েবসাইট সেন্সরে পটু নয়, জনগণের গোপন তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রেও যথেষ্ট পারদর্শী। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের খবর অনুযায়ী, এই তথ্য সংগ্রহের কাজে ইরান সরকারকে সহায়তা করছে নামকরা কিছু মোবাইল ফোন কোম্পানি। সরকার ইরানিদের ব্যক্তিগত ইমেইল, ফেসবুক ও টুইটার অ্যাকাউন্টে অবাধে ঢুকে পড়ছে।
নিউজিল্যান্ড: নিজ দেশের নাগরিকদের উপর গোয়েন্দাগিরি থেকে দীর্ঘদিন বিরত থাকলেও শেষ পর্যন্ত নিউজিল্যান্ডও এই অপ্রিয় কাজটি করতে যাচ্ছে। এজন্য রীতিমতো নতুন আইন তৈরি করে আটঘাট বেঁধে নামছে দেশটির সরকার। ‘রাষ্ট্রীয় স্পাইং’কে বৈধতার আবরণ দেয়া নতুন এই আইনের বিরুদ্ধে জনমতও দানা বেঁধে উঠছে। সরকার নিজের পক্ষে সাফাই গাইছে এই বলে- জনগণের নিরাপত্তার জন্যই তাদের উপর এই বাড়তি নজরদারি। আর সেটি নির্বিঘ্ন করতেই তৈরি হয়েছে নতুন আইন।
বাহরাইন: বাহরাইন সরকার দেশের বিরোধী দলের উপর গোয়েন্দা নজরদারি চালাতে যুক্তরাজ্যের গামা গ্রুপের কাছ থেকে চড়া দাম দিয়ে কিনেছে ফিনফিশার নামক এক স্পাইওয়্যার সফটওয়্যার। প্রথমে রাজনৈতিক বন্দী সম্পর্কিত তথ্যাদি অথবা সরকারি সংস্থার নির্যাতনের বর্ণনাসহ বিভিন্ন ইমেইলের টোপ দিয়ে বিরোধী দলকে আকৃষ্ট করা হয় ইমেইলটি ওপেন করার জন্য। ইমেইলে লুকানো থাকে বিচ্ছিরি সেই স্পাইওয়্যারটি। ইমেইল খোলামাত্র স্পাইওয়্যার ফিনফিশার বিরোধী কর্মীর কম্পিউটারের যাবতীয় ফাইল কপি করতে এবং স্কাইপি কলে বিঘ্ন সৃষ্টি করার কাজে সরকারকে সহায়তা করে থাকে।
কানাডা: কারও সাতে পাঁচে নেই- কানাডা সম্পর্কে এমনটাই মনে করে থাকেন অধিকাংশ মানুষ। কিন্তু সেই ধারণাতেও ফাটল ধরতে শুরু করেছে। দ্য ব্রিটিশ কলম্বিয়া সিভিল লিবার্টিজ এসোসিয়েশন সমপ্রতি কানাডা সরকারের বিরুদ্ধে দেশবাসীর অন্দরে আড়ি পাতার মতো গুরুতর অভিযোগ এনেছে। গ্রুপটির মতে, কানাডার গোয়েন্দা সংস্থা সিএসইসি দেশের জনগণের ব্যক্তিগত তথ্যাদি সংগ্রহের কাজ করে যাচ্ছে। তবে সিএসইসি’র প্রধান এই অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
ভিয়েতনাম: এ দেশটির যোগাযোগ নেটওয়ার্ক অন্যান্য দেশের মতো ততোটা শক্তিশালী না হলেও এটি রয়েছে সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণে। ব্লগ, ফেসবুক বা টুইটারের মাধ্যমে সরকারের সমালোচনা করা সেখানে নিষিদ্ধ। এসবের মাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে কেউ বিষোদগার করলে তার সমূহ বিপদ। ভিয়েতনামও বাহরাইনের মতো ব্রিটেনের কাছ থেকে সফটওয়্যার কিনেছে আর তা ব্যবহার করছে বিরোধী পক্ষের উপর গোয়েন্দাগিরির কাজে।
যুক্তরাজ্য: দেশের নাগরিকদের উপর কিংবা বিদেশে গোয়েন্দাগিরির ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র বহুকাল থেকেই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে। তারা সবকিছুই নিজেদের মধ্যে শেয়ার করে থাকে। এক দেশের নাগরিকদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে দেয় অপর দেশের গোয়েন্দা সংস্থা- এতটাই গভীর তাদের সম্পর্ক।
সূত্র: গ্লোবাল পোস্ট ডট কম
