চমকে দিল এলটিটিই’র ‘প্রতিচ্ছায়া’

আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০১৩, ২১:২৫
প্রভাকরণ নিহত; পরাভূত এলটিটিই (লিবারেশন টাইগার্স অব তামিল ইলম)। বিলীন হয়ে গেছে তাদের অস্তিত্ব— এসব খবর পুরনো। তাই বলে শ্রীলংকার সংখ্যালঘু তামিল সম্প্রদায়ের বিষয়ে বিশ্ববাসীর আগ্রহের কমতি ঘটেনি। সচেতন লোকজন জানতে চায়, এখন কেমন কাটছে তাদের দিনকাল। সেজন্যেই ওয়ার্ল্ড মিডিয়া মওকা পেলেই শ্রীলংকার তামিলদের সম্পর্কিত খবরা খবর প্রচার করে ফলাও করে। সর্বশেষ যে সংবাদটি নজর কেড়েছে, তা হল— শ্রীলংকার সর্বউত্তরের নর্দার্ন প্রভিন্সে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে এলটিটিই’র এক সময়কার পলিটিক্যাল প্রক্সি টিএনএ (তামিল ন্যাশনাল এ্যালায়েন্স) বিস্ময়কর সাফল্য দেখিয়েছে। যা দেখে প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসে রীতিমত হতবাক। তবে অন্যান্য প্রদেশে ক্ষমতাসীন জোট আশানুরূপ সাফল্যই পেয়েছে। তার মানে, তামিলদের ভাগ্যোন্নয়নে বর্তমান সরকারের নেয়া নানা পদক্ষেপ তেমন কাজেই দিচ্ছে না; তাদের মনোভাব রয়ে গেছে আগের মতোই। সিনহলিদের প্রাধান্যযুক্ত সরকারের বিরুদ্ধে তামিলদের বিস্তর অভিযোগ। আর তারই জবাব দিয়েছে ভোটের মাধ্যমে। গত ২১ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত নর্দার্ন প্রভিন্সের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে মোট ৩৮টি আসনের মধ্যে ৩০টিই জিতে নেয় টিএনএ। মাহিন্দা রাজাপাকসে’র নেতৃত্বাধীন দ্য ইউনাইটেড পিপল’স ফ্রিডম এ্যালায়েন্সের ঝুলিতে বহুকষ্টে জমা পড়ে মাত্র সাতটি আসন। প্রদত্ত মোট ভোটের মাত্র ১৮ শতাংশ পেয়েছে তাদের এ জোট। বাকি আসনটি যায় শ্রীলংকা মুসলিম কংগ্রেস পার্টির দখলে। ২০০৯ সালে রক্তক্ষয়ী ও ধ্বংসাত্মক গৃহযুদ্ধ অবসানের পর নর্দার্ন প্রভিন্সে এটিই প্রথম কোনো নির্বাচন। এ নির্বাচনে টিএনএ অংশ নেয়াতে একটি বিষয় অবশ্য পরিষ্কার হয়েছে, শ্রীলংকার তামিলরা দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ধীরে ধীরে পুনঃসংযুক্ত হতে চাচ্ছে। দেশের স্থিতিশীলতার জন্য এটি একটি ইতিবাচক দিক। প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে জেতার কারণে যদিও খুুুুুব সামান্য ক্ষমতারই হকদার বনছে টিএনএ; কিন্তু এতে আশান্বিত হওয়ার যথেষ্ট খোরাক রয়েছে। বিশেষত, তামিলরা যে সংখ্যালঘু হিসেবে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে সেটি প্রাদেশিক সংসদে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার পাশাপাশি নিজেদের দাবি-দাওয়াগুলো উত্থাপনের সুযোগ পাবে। চাথাম হাউজেস এশিয়া প্রোগ্রাম-এর সহযোগী ফেলো চারুলতা হগ গত ২১ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশের নির্বাচনকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেছেন, ‘টিএনএ’র জয় নিঃসন্দেহে শ্রীলংকার গণতন্ত্রের জন্য বিশাল অনুপ্রেরণা। কিন্তু এ জয় প্রতীকী। সুফল পেতে আরো অনেক দিন লেগে যেতে পারে। কারণ কেন্দ্রীয় সরকার ইদানীং মুখে তামিলদের প্রতি উদারতা দেখালেও ভেতরে ভেতরে বেশ কঠোর। শ্রীলংকার সরকারি বাহিনীর কাছে এলটিটিই যোদ্ধারা পরাজিত হওয়ার পর চার বছর কেটে গেছে; কিন্তু এখনো নর্দার্ন প্রভিন্সে উর্দি পরিহিতরা গিজগিজ করে। টিএনএ’র সিনিয়র নেতা সুরেশ প্রেমাচন্দ্রন জানিয়েছেন, তাদের অঞ্চলে স্বাভাবিকতা ফিরে আসেনি এবং আদৌ ফিরে আসবে কি-না এ নিয়ে তারা শঙ্কিত। কারণ, দেশের মোট ২ লাখ সেনা সদস্যের প্রায় দেড় লাখেরই উপস্থিতি নর্দার্ন প্রভিন্সে। অথচ প্রদেশের লোকসংখ্যা মাত্র ১০ লাখ। সুরেশ প্রেমচন্দ্রনের মতে, এখন টিএনএ’র উচিত সেনা প্রত্যাহারের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কামনা করা। নর্দার্ন প্রভিন্সে সেনা সদস্যরা জোর করে দখল করে রেখেছে বহু ব্যক্তিগত জমি এবং ব্যবহূত হচ্ছে সামরিক উদ্দেশ্যে। সেখানে মানবাধিকারও লঙ্ঘিত হচ্ছে চরমভাবে। হাজার হাজার লোক এখন পর্যন্ত বাস্তুচ্যুত। জীবন কাটাচ্ছে শরণার্থী শিবিরগুলোতে এবং বঞ্চিত হচ্ছে মৌলিক অধিকারগুলো থেকে। এদের পুনর্বাসনের জন্য রাজাপাকসে সরকার কার্যকরি কোনও উদ্যোগই গ্রহণ করছে না। যুদ্ধের কারণে নিখোঁজ রয়েছে কয়েক হাজার লোক। এদের কোনো সন্ধান মিলছে না। এ বিষয়ে তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছে টিএনএ। কিন্তু সরকার তা কানেই তুলছে না। জাতিসংঘের তথ্যানুসারে, বিচ্ছিন্নতাবাদী যুদ্ধের কেবল শেষ মাসেই নিহত হয়েছিল অন্তত চল্লিশ হাজার লোক। তদন্তের প্রশ্নে চাপ রয়েছে জাতিসংঘেরও। তবুও ভ্রূক্ষেপ নেই সরকারের। শ্রীলংকার মোট লোকসংখ্যা ২ কোটি। এর মাত্র ১৫ শতাংশ হচ্ছে তামিল। উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশের প্রাদেশিক নির্বাচনে বৈধ ভোটারের সংখ্যা ছিল ৭ লাখেরও বেশি। বলার অপেক্ষা রাখে না, এদের বেশিরভাগই তামিল। টিএনএ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যেসব ইস্যুকে সামনে নিয়ে এসেছিল, সেগুলো হল— সামরিকীকরণ, জমি অধিগ্রহণ, লোকজনের নিখোঁজ হয়ে যাওয়া এবং তামিল অঞ্চলের চূড়ান্ত রাজনৈতিক মর্যাদা। এতেই বাজিমাত করেছে তারা। যুদ্ধ কাভার করা বিশিষ্ট সাংবাদিক দুশিয়ান্থিনি কাংগাসাবাপাথিপিল্লাই জানিয়েছেন, এখনো সেনা সদস্যদের উপস্থিতিকে কিছুতেই মানতে পারছে না সেখানকার তামিলরা। দখল করে নেয়া সমস্ত জমি তারা ফেরত চায়। পাঁচটি দলের দুর্বল কোয়ালিশন টিএনএ কানাডার মডেলে প্রাদেশিক সরকার পরিচালনা করতে চায়। তাদের ওপর জনগণের অনেক আশা; কিন্তু সে আশাগুলো পূরণ করতে পারবে কি-না সে বিষয়ে তারা নিজেরাই সন্দিহান। রাজাপাকসে সরকার শুধুমাত্র কৃষি ও মাছ ধরার অধিকার তাদের হাতে ছাড়তে রাজি। প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক সম্পর্কের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরিভাবেই থাকবে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে। এ দুটিতে বিন্দুমাত্র ছাড় দেয়া হবে না। এ ছাড়া কর ও পুলিশী ব্যবস্থার দেকভাল কারা করবে, তা নিশ্চিত নয়। চারুলতা হগের মতে টিএনএ কার্যত ঠুঁটো জগন্নাথে রূপ নিতে পারে। সিনহলিদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় মাহিন্দা রাজাপাকসে সম্প্রতি আল জাজিরাকে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে বলেছিলেন, ‘ উত্তরের সকল অবকাঠামোর উন্নয়নে বিশেষ মনযোগ দিয়েছি আমরা। এখন পর্যন্ত এ বাবদ ব্যয় করা হয়েছে প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। কারণ আমরা অবিভক্ত শ্রীলংকা দেখতে চাই।’ তার কথা অবশ্য কিছুটা হলেও ঠিক। উত্তরাঞ্চলের অধিকাংশ রাস্তাই এখন ঝকঝকে। রাজধানী কলম্বো থেকে দুই ঘন্টায় পৌঁছে যাওয়া যায় জাফনায়। কিন্তু এসব মন ভরাতে পারছে না তামিলদের। তারা সকল প্রকার বৈষম্যের অবসান চায়। সেজন্যেই দ্য ইউনাইটেড পিপল’স ফ্রিডম এ্যালায়েন্স-এর পক্ষে তামিলদের ভোট খুব একটা পড়েনি। জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের প্রধান নাভি পিল্লাই অতিসম্প্রতি শ্রীলংকা সফরে এসেছিলেন। সফর শেষ করে তিনি জানান, দেশটিতে ব্যাপকভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। এর জবাবে রাজাপাকশে বলেন, ‘তিনি যেখানে যেতে চেয়েছেন, সেখানেই যেতে দেয়া হয়েছে। এরপরও কোথায় কী দেখলেন তা আমার বোধগম্য নয়। তাকে আমি অনুরোধ জানাচ্ছি, অনুগ্রহপূর্বক ক্ষুদ্র দেশটিকে খণ্ড-বিখণ্ড করতে উত্সাহ যোগাবেন না। অনুপ্রাণিত করুন আমাদের গণতন্ত্রকে।’ উল্লেখ্য, সাংবাদিক ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু গ্রুপগুলোর (বিশেষত মুসলমান) ওপর আক্রমণের ঘটনা অহরহই ঘটছে। গত পাঁচ বছরে অন্তত ২৫ জন সাংবাদিক শ্রীলংকা থেকে পালিয়ে ভিন্ন দেশে আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। চারুলতা হগ মন্তব্য করেন, ‘শ্রীলংকার বর্তমান সরকার ক্রমান্বয়েই স্বৈরাচারী হয়ে উঠছে। তারা বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে। মিডিয়া ও মানবাধিকার গ্রুপগুলো তাদের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করলে তারা সেটিকে ভালভাবে নিচ্ছে না। অনেককে হুমকি পর্যন্ত দেয়া হচ্ছে।’ রাজাপাকসে সরকার মনে করে, সবই শ্রীলংকা-বিরোধী প্রচারণা। দেশটির উন্নতিতে অনেকের চোখ টাটায়। তারাই খুঁজে খুঁজে বের করে দুর্বলতাগুলো। তিল থেকে তাল খসলেই সেটিকে ছড়িয়ে দেয়া হয় বিশ্বব্যাপী। অথচ ভাল খবরগুলো তেমন একটা প্রচার পায় না, যেমন— দেশের উত্তরাঞ্চলের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে খুব কম লোকই অবগত।