জলদস্যুদের নিয়ে হলিউডের যেন রয়েছে বাড়তি আগ্রহ। ‘পাইরেটস অব দ্য ক্যারিবিয়ান’-এর জনপ্রিয়তাই তার সাক্ষ্য দেয়। প্রতি বছর মুক্তি পাওয়া জলদস্যুদের নিয়ে অসংখ্য সিনেমার ভিড়ে মুক্তি পেয়েছে ‘ক্যাপ্টেন ফিলিপস’ সিনেমাটি। শুধুমাত্র টম হ্যাঙ্কস নামটাই যথেষ্ট এই মুভিটিকে অন্য সব পাইরেটস মুভি থেকে আলাদা করার জন্য। ‘ফরেস্ট গাম্প’ খ্যাত অভিনেতা টম হ্যাঙ্কস ও তার সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত মুভিটি নিয়ে লিখেছেন প্রাঞ্জল সেলিম
সনি পিকচার্সের নতুন সিনেমা ‘ক্যাপ্টেন ফিলিপস’-এ অভিনয়ের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন হলিউডি অভিনেতা টম হ্যাঙ্কস। ২০০৯ সালে সোমালি জলদস্যুদের হাইজ্যাক করা জাহাজের ক্যাপ্টেন রিচার্ড ফিলিপসের ওই সময়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে নির্মিত হয়েছে সিনেমাটি। জানা গেছে, সিনেমাটির কেন্দ্রীয় চরিত্র, অর্থাত্, ক্যাপ্টেন ফিলিপসের ভূমিকায় অভিনয় করবেন টম হ্যাঙ্কস। সনি পিকচারসের ব্যানারে অ্যাডভেঞ্চারধর্মী সিনেমাটি এরমধ্যেই আলোচনায় উঠে এসেছে। ধারণা করা হচ্ছে এর বাস্তবনির্ভর গল্প টমকে আরও একটি অস্কার জয়ের রাস্তা খুলে দিতে পারে। এ সিনেমাটি সম্পর্কে টম বলেন, ‘বাস্তব কাহিনী নিয়ে নির্মিত সিনেমা আমাকে বরাবরই মুগ্ধ করে। আমি নিয়মিত খবরের কাগজ পড়ি। তাই আশপাশে কী ঘটছে সে সম্পর্কে আমার ভালো ধারণা থাকে সব সময়। আমি মনে করি, এ ধরনের কাহিনী যেকোনো কাল্পনিক কাহিনীর চেয়ে ভালো।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্লেন এবং জাহাজে দস্যুর আক্রমণ নিয়ে বেশ কিছু সিনেমা ইতোমধ্যেই নির্মিত হয়েছে। তবে যেহেতু এটি বাস্তব কাহিনী নিয়ে নির্মিত সিনেমা, তাই এর মধ্যে ভিন্ন স্বাদ পাওয়া যাবে। তবে এক্ষেত্রে নির্মাতাকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখিও হতে হবে।’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের বিনিময়ে বিপুল অঙ্কের পারিশ্রমিক পেলেও সম্প্রতি টম হ্যাঙ্কস দাবি করেছেন, কখনোই পয়সার পেছনে ছোটেননি তিনি। অর্থ তার কাছে মোটেও গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় নয় বলেও জানিয়েছেন অস্কারজয়ী এ তারকা অভিনেতা।
এ প্রসঙ্গে টমের ভাষ্য, ‘কাড়ি কাড়ি অর্থ উপার্জন কখনোই আমার লক্ষ্য ছিল না, এখনও নেই। এটা আমার কাছে মোটেও গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় নয়। ক্যারিয়ারের শুরুতে কাজের জন্য যে সামান্য পারিশ্রমিক পেতাম, এখনও সেই অঙ্কের পারিশ্রমিক পেলেই আমি খুশি। ১৯৮০ সালে ‘বোসম বাডিস’ টিভি সিরিজে অভিনয়ের পারিশ্রমিক হিসেবে প্রতি সপ্তাহে পাঁচ হাজার ডলার পেতাম। সত্যি বলছি, সারা জীবনই এমন কম পারিশ্রমিক পেয়েও আমি খুশি থাকতে পারতাম।’ টম আরও বলেন, ‘কিন্তু অনেক দিন থেকেই অবিশ্বাস্য অঙ্কের পারিশ্রমিক দেওয়া হচ্ছে আমাকে। আবারও বলছি, কখনোই অর্থের পেছনে ছুটিনি আমি। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও সুন্দর বাড়িতে বাস করেও কোনো লাভ নেই, যদি মনের শান্তি না থাকে।’ নিজের অভিনয় জীবনের উত্থান-পতন নিয়েও বলেন এ মার্কিন অভিনেতা। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘অভিনয় জীবনে ভুল কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়ার খেসারত দিতে হয়েছে আমাকে। ১৯৮৪ সালে আমার অভিনীত ‘স্প্ল্যাশ’ ছবিটি সাফল্যের মুখ দেখলেও এরপর আমার কয়েকটি ছবি ফ্লপের খাতায় নাম লেখায়। তখন আমাকে নিয়ে কেউ কাজের আগ্রহ দেখাননি।’
সম্প্রতি অনলাইন রেডিও ‘আই হার্ট’ কর্তৃক আয়োজিত জরিপে হলিউডে সবচেয়ে পছন্দের মানুষের তালিকায় প্রথম হয়েছেন টম হ্যাঙ্কস। শুধু তাই নয়, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এই জরিপে ২৮ দশমিক ৩ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রথম হয়েছেন টম। তাকে অল্পের জন্য হারাতে পারেননি উইল স্মিথ এবং ড্যানজেল ওয়াশিংটন। হলিউডের গুণী এই দুই অভিনেতার প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১৭ দশমিক ২ শতাংশ এবং ১৩ দশমিক ৯ শতাংশ।
টম হ্যাঙ্কস সম্পর্কে কিছু কথা
টম হ্যাঙ্কস দুইবার একাডেমি অ্যাওয়ার্ড জয়ী একজন আমেরিকান অভিনেতা। ড্রামাটিক অভিনেতা হিসেবে অভাবনীয় সাফল্য অর্জনের আগে তিনি কমেডি ছবিতে কাজ করতেন। তিনি সর্বকালের সর্বোচ্চ আয়কৃত অভিনেতাদের অন্যতম। তার মোট আয় ৩.১ বিলিয়ন ইউএস ডলারের চেয়ে বেশি এবং মোট আন্তর্জাতিক আয় ৫.৭ বিলিয়ন ইউএস ডলার।
হ্যাঙ্কস ক্যালিফোর্নিয়ার কনকর্ডে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা অ্যামস ম্যাফফর্ড হ্যাঙ্কস ছিলেন ইংরেজ ও ওয়েলসিওদের রক্তের উত্তরাধিকারী দক্ষিণাঞ্চলের একজন বাবুর্চি। মা জ্যানেট মেরিলিন ফ্র্যাগার ছিলেন হাসপাতাল কর্মী এবং তিনিও ছিলেন আধা ইংরেজ বংশোদ্ভুত। হ্যাঙ্কসের শৈশব ছিল একঘেয়ে মধ্যবিত্ত জীবন যেখানে তার খুব উচ্চাকাঙ্ক্ষী বা প্রতিভাশালী হওয়ার প্রমাণ মেলে না। তার বয়স যখন পাঁচ তখন তার বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর হ্যাঙ্কস, তার বড় ভাই ল্যারি ও বোন চলে যান বাবার সাথে, যিনি তখন বিভিন্ন শহরে ঘুরে ঘুরে বাবুর্চির কাজ করছেন। যখন তারা ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডে স্থায়ী হলো তখন হ্যাঙ্কসের বয়স আট। হ্যাঙ্কসের ছোট ভাই তার মায়ের সাথে থেকে যায়। স্কুলেও হ্যাঙ্কস কারও নজরে পড়তেন না।
ছোটবেলা থেকেই তিনি খুব ঠাণ্ডা মেজাজের মানুষ। চুপচাপ থাকতে পছন্দ করতেন। তবে থিয়েটারের প্রতি তার আগ্রহ ছিল সব সময়ই। এ ব্যাপারে বলেন, ‘আমি শুধু থিয়েটারে গাড়ি নিয়ে যেতাম, নিজের জন্য একটা টিকেট কিনতাম, সিটে গিয়ে বসতাম এবং অনুষ্ঠানসূচি দেখতাম, এবং তারপর নাটকের ভেতর পুরোপুরি ঢুকে যেতাম। এভাবে বার্টল্ট ব্রেচট, টেনেসি উইলিয়ামস, হেনরিক ইবসেন এবং আরও অন্যান্যের নাটক দেখে অনেক সময় ব্যয় করেছি।’ এই অভিনয় ক্লাস চলাকালেই হ্যাঙ্কসের সাক্ষাত্ হয় ভিনসেন্ট ডোওলিংয়ের সাথে, যিনি ছিলেন ক্লিভল্যান্ডের গ্রেট লেকস নাট্যোত্সবের প্রধান। ডোওলিংয়ের উপদেশ মতো হ্যাঙ্কস উত্সবে শিক্ষানবিশ হিসেবে যোগ দেন। এটি প্রলম্বিত হয়েছিল তিন বছরের অভিজ্ঞতায়, যেখানে আলোকসজ্জা হতে মঞ্চ সজ্জা হয়ে মঞ্চ ব্যবস্থাপনা সকল বিষয়ই অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। এখানে এতটাই মনোযোগ ও দায়িত্ব নিয়েছিলেন যে কলেজ থেকে তিনি ঝরে পড়েন। কিন্তু তিন বছর পরে, তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছিলেন যে তিনি একজন অভিনেতা হবেন। অভিনেতা হওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে অন্যতম কারণ ছিল ক্লিভল্যান্ড ক্রিটিক্স সার্কেল অ্যাওয়ার্ড পাওয়া, যা শেক্সপিয়ারের টু জেন্টলম্যান অব ভেরোনায় প্রটিয়াস চরিত্রে শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে পেয়েছিলেন। দু-একবার তিনি খল চরিত্রেও অভিনয় করেছিলেন।
