ভূমিকা ও অনুবাদ : আন্দালিব রাশদী
আমার পড়া একটি ‘ডিস্টার্বিং’ উপন্যাস ‘মাই নেইম ইজ রেড’ তুর্কি কথাসাহিত্যিক ওরহান পামুকের লেখা। ফেবার অ্যান্ড ফেবার প্রকাশিত, পেপার ব্যাকে ৫০৮ পৃষ্ঠার উপন্যাসটির দাম ৭.৯৯ পাউন্ড স্টার্লিং।
উপন্যাসটির জন্য ওরহান পামুক ২০০৩ সালে ‘ইমপ্যাক ডাবলিন অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন, নোবেল পুরস্কারের পথে আরও একধাপ এগিয়ে যান। অপেক্ষাকৃত তরুণ ৫৪ বছর বয়সি ওরহান ২০০৬ সালে নোবেল পুরস্কার পান।
‘মাই নেইম ইজ রেড’ পুরস্কৃত হবার পর তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, তাঁর জীবন ও সাহিত্যের ওপর এ পুরস্কার কতটা প্রভাব ফেলেছে?
তিনি বললেন, আমার জীবনের কোনোকিছুই বদলায়নি। আমি আগের মতোই সারাদিন কাজ করি। গল্প লিখে আমি তিরিশ বছর কাটিয়ে দিয়েছি। প্রথম ১০ বছর টাকার জন্য নিজেই উদ্বিগ্ন থাকতাম। কেউ তখন জিজ্ঞেস করেনি লিখে কত টাকা জমিয়েছি। পরের ১০ বছর টাকা খরচ করেছি—তখনও কেউ কিছু জিজ্ঞেস করেনি। গত দশ বছর ধরে আমি মনে করে আসছি অন্যরা আমার কানাকড়ির হিসাব রাখুক—আমি মুখ খুলিনি।
‘মাই নেইম ইজ রেড’-এর প্রথম হার্ডকভার সংস্কার প্রকাশিত হয়েছে ২০০১ সালে আলফ্রেড এ এফ প্রকাশনাসংস্থা থেকে। তুর্কি ভাষায় লিখিত মূল উপন্যাস ‘বেনিম আদিম কিরমিজি’ ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত হয়। উপন্যাসটি উসমানিয়া সাম্রাজ্যে সুলতান তৃতীয় মুরাটের সময় ১৫৯১-র বরফঝরা নয়টি শীতের দিনের ভয়াবহ কিছু ঘটনার ওপর সাজানো। গ্রন্থের অলঙ্করণে মিনিয়েচারিস্ট শিল্পীরা একসময় সমাজে বেশ আদৃত ছিল। তাদের উপার্জনও ছিল ঈর্ষণীয়। মাই নেইম ইজ রেড-এর উদ্বোধনী অধ্যায়টিই পাঠকের ওপর একটি ভয়াবহ চাপ সৃষ্টি করে কিন্তু উপন্যাস থেকে সরতে দেয় না। শুরুতে একটি মৃতদেহ পরিত্যক্ত এক কুয়োর ভেতর থেকে কথা বলতে শুরু করে—কেমন করে তার মাথা গুঁড়ো করে দিয়ে একজন ঘাতক তাকে কুয়োর ভেতর নিক্ষেপ করেছে।
৫৯টি অধ্যায়ের প্রতিটিতেই এই অনুশিল্পী কিংবা তার স্বজনদের কেউ না কেউ তাদের গল্পটা বলে গেছেন। রহস্য রোমাঞ্চ ও দার্শনিক গোলকধাঁধা বই জুড়ে।
ওরহান পামুকের স্বাদ পেতে বইটির প্রথম অধ্যায় ‘আই অ্যাম এ র্কর্পস’—‘আমি একটি লাশ’ অনূদিত হলো।
সচেতন পাঠকরা মনে করেন, ওরহান পামুক এই উপন্যাস রচনার সময় ল্যাটিন আমেরিকান কথাসাহিত্য বিশেষ করে হাই লুই বোর্হেসের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারেননি।
আমি এখন একটি লাশ ছাড়া আর কিছু নই, কুয়োর তলায় পড়ে থাকা একটি মৃতদেহ। যদিও আমি বহু আগে শেষবারের মতো শ্বাস টেনেছি এবং আমার হূদস্পন্দন থেমে গেছে, আমার সেই বীভত্স খুনি ছাড়া আর কেউ জানে না আমার আসলে হয়েছেটা কী। বদমাশটা আমার নাড়ি টিপল, আমার নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে চাইল; সে নিশ্চিত হতে চাচ্ছে আমার দমটা বেরিয়ে গেছে। তারপর আমার তলপেট বরাবর লাথি মারতে মারতে কুয়োর প্রান্তদেশে নিয়ে এল। তারপর আমাকে তুলে নিচে ছুঁড়ে ফেলল। আমার মাথাটা আগেই সে পাথরের আঘাতে চূর্ণ করে ফেলে। নিচে পড়ার সাথে সাথে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। আমার মুখমণ্ডল, আমার কপাল, আমার গাল থেঁতলে ফেলেছে, হাড়গুলো ভেঙে টুকরো হয়ে গেল আর আমার মুখ ভরে গেল রক্তে।
প্রায় চারদিন ধরে আমি নিখোঁজ। আমার স্ত্রী ও ছেলেমেয়েরা হন্যে হয়ে আমাকে খুঁজতে থাকবে; কেঁদে কেঁদে অবসন্ন হয়ে আমার মেয়ে অস্থিরচিত্তে গেটের দিকে তাকিয়ে আছে। আমি জানি সবাই জানালায় মুখ রেখে দাঁড়িয়ে আছে—কখন আমি ফিরব।
কিন্তু তারা সত্যিই কি আমার অপেক্ষায় আছে? আমি তো তা-ও নিশ্চিত হতে পারছি না। হতে পারে আমার অনুপস্থিতি তাদের সয়ে গেছে—কী ভয়াবহ ব্যাপার! এই মৃতপুরীর মানুষেরা অন্যদিকে অনুভব করছে যে তাদের পুরোনো জীবনটাই এখনো চালু আছে। আমার মৃত্যুর আগের সময়টা ছিল অসীম আর মৃত্যুর পরের সময়ও অফুরান। আগে এ ব্যাপারটা কখনো ভাবিনি : আমি দুই অনন্ত অন্ধকারের মধ্যিখানে আলোকোজ্জ্বল অস্তিত্ব হয়ে বেঁচেছিলাম।
আমি সুখী ছিলাম। আমি সেই সুখটা এখন টের পাই। আমাদের সুলতানের কারখানায় আমার কাজই ছিল সবচেয়ে দ্যুতিময়। আমার যে দক্ষতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কেউ আমার সামনে দাঁড়াতে পারেনি। সুলতানের কাজের বাইরে আমি ব্যক্তিগত উদ্যোগে যে কাজ করতাম তাতে মাসে আমি নয়শত রৌপ্যমুদ্রা কামাই করতে পারতাম। স্বাভাবিকভাবেই এটা কেউ শুনতে পেলে তা হজম করাও ছিল একটি কঠিন কাজ।
বইয়ের পাতায় ছবি আঁকা আর অলঙ্করণ করার দায়িত্ব ছিল আমার। আমি বইয়ের প্রতিটি পাতায় প্রান্তদেশ আলোকোজ্জ্বল করে তুলতাম, রংতুলিতে প্রায় জীবন্ত পাতা, শাখা-প্রশাখা, ফুল এবং পাখি আঁকতাম। ঝিনুক নকশার নীল দোলায় শৈলীতে আমি মেঘ আঁকতাম, একটার পর একটা বিছিয়ে রাখা আঙ্গুরলতার গুচ্ছ আঁকতাম, বহুরংয়ের মিশেলে আঁকতাম অরণ্য, যে অরণ্যের আড়ালে লুকোনো দাড়টানা নৌকো, সুলতান, বৃক্ষ, রাজপ্রাসাদ, অশ্ব ও শিকারি। আমার যৌবনে আমি ছবি এঁকে থালা সাজাতাম, কিংবা আয়নার পেছন দিকটা অথবা সোজা সিন্দুক কিংবা অট্টালিকার ছাদ, ছবি আঁকতাম বসফরাসের কাছারি বাড়িতে এবং এমনকি কাঠের চামচেও আমার কারুকাজ। বয়স আরও বেড়ে গেলে আমি কেবল পাণ্ডুলিপির পাতাগুলোতে ছবি আঁকার কাজ করতাম, কারণ আমাদের সুলতান এ কাজের জন্য ভালোই মজুরি দিতেন। আমি এখন বলতে পারি না—টাকার পরিমাণটা খুব তুচ্ছ মনে হচ্ছে। এমনকি মরে গেলেও টাকার মূল্য যে কত তা বেশ বোঝা যায়।
আমার দৈবকণ্ঠ শোনার পর আপনার মনে হতে পারে, ‘বেঁচে থাকতে আমি কত কামিয়েছি তাতে কার কী এসে যায়? বরং কী দেখছ তা আমাদের বলো তো শুনি। মৃত্যুর পর কি কোনো জীবন আছে? তোমার আত্মা এখন কোথায়? স্বর্গ আর নরকের ব্যাপারটা কী? মৃত্যুটা কেমন? তোমার কি যন্ত্রণা হচ্ছে?’
আপনি ঠিকই বলেছেন। যারা বেঁচে আছে তাদের প্রবল কৌতূহল এই জীবনের পরের জীবনটা কেমন। আপনি হয়তো সেই লোকটির গল্প শুনেছেন—কৌতূহল যাকে রণক্ষেত্রে সৈনিকদের মধ্যে ঘুরে বেড়াতে নিয়ে যায়। যুদ্ধে আহত রক্তাক্ত সৈনিকদের মধ্যে সে এমন একজনকে চায়, যে সত্যিই মৃত্যুবরণ করার পর মৃত্যুপুরী থেকে ফিরে এসেছে—যে সৈনিক তাকে জানাতে পারবে সেই অন্য পৃথিবীর গোপন বিষয়। অনুসন্ধানী এই মানুষটিকে শত্রু মনে করে তৈমুর লং-এর যোদ্ধাদের একজন খঞ্জরের আঘাতে তাকে দু-ভাগ করে ফেলে। তখন তাকে এই উপসংহারেই উপনীত হতে হয় যে, ওপারের পরবর্তী জীবনে মানুষ দু-ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়।
কী বাজে গল্প! আসলে তো ঘটে ঠিক উল্টোটা। আমি বরং বলব, এ জীবনে বিভাজিত আত্মা ওপারে গিয়ে আবার মিলিত হয়। শয়তানের প্ররোচনায় যেসব অবিশ্বাসী পাপী পরলোককে অস্বীকার করে, আমি তাদের বলতে চাই, বাস্তবিকই পরকাল আছে; ঈশ্বরকে অনেক ধন্যবাদ। এর প্রমাণ তো এই যে, আমি ওখান থেকেই তোমাদের সাথে কথা বলছি। আমি মৃত্যুবরণ করেছি, কিন্তু তোমরা তো সোজাসাপটা দেখতেই পাচ্ছো—আমার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়নি। তবে হ্যাঁ, এটা অবশ্য আমাকে স্বীকার করতেই হবে, বেহেশতের সোনা ও রুপার প্রকোষ্ঠের গা ঘেঁষে বয়ে যাওয়া নদীর সাক্ষাত্ আমার এখনো মেলেনি; মহিমান্বিত ধর্মগ্রন্থ কোরআনে বর্ণিত বড় পাতাওয়ালা গাছে সরস কুলফল এবং সুন্দরী ও অক্ষতযোনি তরুণীদের স্বাদ আমি এখনো পাইনি। ‘তারপর যা আসছে’ অধ্যায়ে বর্ণিত বৃহত্-চক্ষু হুরিদের সোত্সাহে আমি সেই কবে থেকে স্মরণ করে আসছি। ধর্মগ্রন্থের বর্ণনায় নয়, কল্পকথার স্বাপ্নিক ইবন আরাবির বর্ণনায়, দুগ্ধ, মদ্য, সুমিষ্ট পানি এবং মধুর নহরের যে বিবরণ, আমি তার দেখাও পাইনি। যারা ন্যায়সঙ্গতভাবে ওপার সম্পর্কে তাদের আশা ও কল্পিতরূপ নিয়ে জীবনধারণ করে আসছেন, তাদের বিশ্বাস থেকে সরিয়ে আনার কোনো ইচ্ছে আমার নেই। কাজেই আমি ঘোষণা করে আপনাদের জানাতে চাই, আমি যা দেখেছি তা কেবল অত্যন্ত ব্যক্তিগত পরিস্থিতির সাথে খাপ খায়। পরলোকের কিছু জ্ঞানসম্পন্ন যেকোনো বিশ্বাসী মানুষ জানেন, আমার মতো পরিস্থিতিতে একজন অতৃপ্ত মানুষের পক্ষে বেহেশতের নদী দেখা একটি কঠিন ব্যাপার।
সংক্ষেপে বলতে গেলে আমি, যার পরিচিতি অভিজাত ওস্তাদ এফেন্দি এখন মৃত। কিন্তু যেহেতু আমাকে কবর দেওয়া হয়নি, আমার আত্মাও সম্পূর্ণভাবে আমার শরীরকে ছেড়ে যায়নি। আমার এই যে অসাধারণ এক পরিস্থিতি, যদিও আমারটাই পৃথিবীর প্রথম নজির নয়, আমার সত্তার অমর অংশ আত্মার ওপর ভয়াবহ যন্ত্রণা সৃষ্টি করেছে। আমি যদিও আমার গুঁড়িয়ে যাওয়া মাথার খুলি, ক্ষতস্থানের নিচে পচতে থাকা শরীর, ভাঙা হাড়গোড় কিংবা বরফশীতল পানিতে ডুবে থাকা দেহ অনুভব করতে পারছি না, আমার আত্মা যে পচনশীল দেহবৃত্ত থেকে বের হয়ে যেতে মরিয়া হয়ে সংগ্রাম করে যাচ্ছে তা ঠিকই টের পাচ্ছি। আমার মনে হচ্ছে, আমার শরীরের সাথে গোটা পৃথিবীটাই যন্ত্রণায় একদলা মাংসে পরিণত হচ্ছে।
আমার মৃত্যুর অনুপম মুহূর্তটিতে আমার যেরকম বিস্ময়কর এক অব্যাহতির অনুভূতি জেগেছিল, কেবল তার সাথেই এই সঙ্কোচনের তুলনা চলে। যখন সে অপ্রত্যাশিতভাবে পাথর দিয়ে আমার মাথাটা ফাটিয়ে ফেলল, আমি তাত্ক্ষণিকভাবেই বুঝতে পেরেছিলাম বদমাশটা আমাকে হত্যা করতে চাচ্ছে। কিন্তু তারপর কীভাবে এগোবে আমি বিশ্বাস করতে পারিনি। হঠাত্ আমি অনুধাবন করলাম আমি একজন আশাবাদী মানুষ। আমার কর্মক্ষেত্রে ও বাড়ির ছায়াতলে যখন দিন কাটাচ্ছি, আমি তখন এ ব্যাপারে সচেতন ছিলাম না। আমার নখ, আঙুল ও দাঁত যখন তার ত্বকে বসিয়ে দিই তখন আসলে প্রচণ্ড আবেগে জীবনকে আঁকড়ে ছিলাম। আর এর খেসারত হিসেবে যে যন্ত্রণাদায়ক ক্রমাগত আঘাত এসেছে তার বিস্তর বিবরণ দিয়ে আপনাদের বিরক্ত করতে চাই না। এই যন্ত্রণার পরিণতিতে যখন আমার আসন্ন মৃত্যু নিশ্চিত হয়ে উঠল, স্বস্তির অবিশ্বাস্য এক অনুভূতি আমাকে ভরে তুলল। বিদায়ের মুহূর্তটিতে আমার এই স্বস্তির এই অনুভূতি; আমার এপারে আগমন ছিল বড় প্রশান্তিময়, স্বপ্নে কাউকে যেন ঘুমোতে দেখছি। আমার চোখে শেষ যা পড়েছে, তা হচ্ছে আমার খুনির জুতোজোড়া—বরফ ও কাদায় ঠাসা। আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম যেন আমি ঘুমোতে যাচ্ছি, তারপর অবলীলায় পেরিয়ে এলাম।
এখন আমার অভিযোগ এই নয় যে, আমার দাঁতগুলো বাদামের মতো আমায় রক্তাক্ত মুখের ভেতর খসে পড়েছে; কিংবা আমার মুখ এতটাই ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে যে, চেনাই যাচ্ছে না; কিংবা কুয়োর গভীরে আমাকে পরিত্যাগ করা হয়েছে—আমার অভিযোগ হচ্ছে : অথচ সবাই ভাবছে আমি এখনো বেঁচে আছি। আমার বিচলিত আত্মা যন্ত্রণাবিদ্ধ, কারণ আমার পরিবারের সদস্য ও আপনজনেরা মনে করছে আমি নিশ্চয়ই ইস্তাম্বুলের কোথাও তুচ্ছ বিষয় নিয়ে মেতে আছি কিংবা অন্য কোনো মহিলার পেছনে ছুটছি।
বেশ! এখন তাহলে আমার লাশটা কোথায় খুঁজে বের করো, আমার জন্য প্রার্থনা করো এবং আমাকে কবরে সমাহিত করো। তারচেয়ে বড় কথা আমার খুনিকে খুঁজে বের করো। যত জাঁকজমকপূর্ণ কবরে আমাকে সমাহিত করো না কেন, যতক্ষণ খুনিটা ঘুরে বেড়াবে আমি তো অস্থির হয়ে কবরে কুঁচকাতে থাকব। অপেক্ষা করব আর আপনাদের সকলকে আমার বিশ্বাসহীনতা দিয়ে সংক্রমিত করব। ওই বেশ্যার পোলা, আমার খুনিটাকে খুঁজে বের করো, তাহলে জীবনের পরপারে এসে কী দেখছি, তোমাদের বলব। তাকে ধরার পর তার শরীরের আট থেকে দশটি হাড় ধীরে ধীরে টুকরো করে ফেলা হবে—বিশেষ করে পাঁজরের হাড়গুলো জাঁতায় পেষা হবে, অত্যাচারের জন্য বিশেষভাবে তৈরি লোহার শিক দিয়ে মাথার খুলিতে ছিদ্র করা হবে, গোছা গোছা করে তার তৈলাক্ত চুল টেনে তোলা হবে যেন প্রতিবার সে যন্ত্রণায় চেঁচিয়ে ওঠে।
আমাকে এত উত্যক্ত করছে—এই খুনিটা কে? এরকম হঠাত্ করে আমাকে সে কেন খুন করল? কৌতূহলী হয়ে মন লাগিয়ে এগুলো বের করুন। আপনারা বলবেন, দুনিয়াটাই কুিসত ও বাজে অপরাধীতে ঠাসা। সম্ভবত খুনটা এ করেছে কিংবা ও করেছে। সে ক্ষেত্রে আমি আপনাদের সতর্ক করে দিতে চাই। আমাদের ধর্ম, আমাদের ঐতিহ্য এবং আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে ভয়াবহ এক ষড়যন্ত্র আমার মৃত্যুর মধ্যে লুকিয়ে আছে। আপনারা চোখ খুলুন, জীবনকে আপনারা যেভাবে বিশ্বাস করেন, সেই জীবনের শত্রু, যে জীবন যাপন করেন, তার শত্রু এবং ইসলামের শত্রুরা আমাকে কেন হত্যা করেছে তা বের করুন। বোঝার চেষ্টা করুন, কোনো একদিন তারা এভাবেই আপনাদের হত্যা করবে। এরজুরামের মহান ধর্মপ্রচারক নুসরাত হোজা যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, আমি যা অশ্রুসিক্ত হয়ে শুনেছি, তা একে একে ফলছে। আমরা যে পরিস্থিতিতে পড়েছি তা নিয়ে গ্রন্থরচিত মূল অত্যন্ত দক্ষ ক্ষুদে ছবি আঁকিয়েরাও তার অলঙ্করণ করতে পারবে না। কোরআনের বেলায় যেমন, আল্লাহ মাফ করুন, আমাকে যেন ভুল বোঝা না হয়—এ ধরনের একটি বইয়ের প্রবল শক্তি উঠে আসে তার অলঙ্করণ-সম্ভব বৈশিষ্ট্য থেকে। আপনারা আমার কথা পুরোপুরি বুঝতে পেরেছেন কিনা—এ নিয়ে আমার সন্দেহ রয়েছে।
আমার কথা শুনুন। আমি যখন শিক্ষানবিশ শিল্পী ছিলাম, আমিও ভয় পেতাম এবং অন্তর্নিহিত সত্য ও অব্যক্ত বাণী এড়িয়ে যেতাম। এসব বিষয় নিয়ে আমি হাসি-ঠাট্টা করতাম। আজ আমার পরিণতি এতটাই ভয়াবহ—পড়ে আছি। সতর্ক হয়ে যান। এমনটা আপনাদের বেলাতেও ঘটতে পারে। এখন আমার আর করার কিছু নেই, আমার শরীর পুরোপুরি পচে গলে যাবার অপেক্ষায় আছি—সেই দুর্গন্ধ শুঁকে আমার আত্মীয় ও স্বজনরা আমাকে খুঁজে বের করবে—আশা করা ছাড়া আমার আর কোনো পথই খোলা নেই। কেবল সেই অত্যাচার কল্পনা করতে পরি—একবার সেই নারকীয় খুনি ধরা পড়লে কোনো বদান্য ব্যক্তি যে অত্যাচার চালাবেন তার ওপর।
