লালন সাঁইজির মরমী বাক্য ‘যখন নিঃশব্দ শব্দকে খাবে’ শিরোনাম রেখে সমীর মজুমদার এবং মোজাই জীবন সফরী, তাঁদের যৌথ প্রদর্শনীর শিল্পকর্মগুলো সাজিয়েছেন। তাঁদের কাজগুলোর যথার্থতা রয়েছে বাক্যটির গূঢ়ার্থের ভেতর। কৃষ্ণ গহ্বরের অভিকর্ষকে অতিক্রম করে বের হতে পেরেছিল কেবল বিন্দুময় আলো। সেই আলো বিভিন্ন ফ্রিকোয়েন্সিতে এক্সপান্ড করে এই জগতের সৃষ্টি। আবার কৃষ্ণগহ্বর যা আবার এই শব্দময় জগেক নিজের ভেতর টেনে নিয়ে যায়। শিল্পীর ক্ষেত্রেও বিষয়টিতে ততটা তারতম্য ঘটে না। দৃশ্যশিল্প আলো নির্ভর। বর্ণের মাধ্যমে এই আলোর ব্যাবহার ঘটে থাকে শিল্পীর ক্যানভাসে। বস্তু জগতের ওপর আলোর উপস্থিতি, সেই দৃশ্যকে শিল্পী আত্তীকরণ করে নিজের ভেতর ব্লেন্ড করে থাকেন। এই ভেতরের রূপ অনেকটা নৈঃশব্দ্যের জগত্। সেখান থেকেই আবার অনেকটা বহির্মুখী হয়ে নতুন দৃশ্যের জন্ম। এককথায় নিঃশব্দ যেমন শব্দের আকারকে নিরাকার করে ঠিক তেমনি নিঃশব্দের প্রতিনিধিত্ব করে শব্দের আকার-প্রকরণে। লোকায়ত এবং মরমী এই দুই চিন্তনপ্রবাহের সাথে সমীর এবং সফরী যুক্ত করেছেন বিলেতি ধারার নৈসর্গিক উপস্থাপনা; অথচ ড্রইংয়ের স্টাইলে মেনেছেন প্রাচ্যের প্রথাগত ঐতিহ্য। রবীন্দ্র-অবনীন্দ্রনাথের পর্যায় পার করে গনেশ পাইনের মধ্যে দিয়ে যা এই পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। উভয় শিল্পীর কাজের কম্পোজিশন এবং ফর্মের ব্যবহারে যেমন এম এফ হুসেনের ছায়া পাওয়া যাবে তেমনি কোথাও কোথাও রয়েছে অমৃতা শেরগিলের প্রভাব। বিশষত মানুষের পারস্পরিক নৈকট্যে। ভারতের একজন অধিমনোবিজ্ঞানী বলেছিলেন, ‘বাংলার রূপ একসময় জীবনানন্দের কবিতা ছাড়া অন্য কোথাও খুঁজে পাওয়া মুশকিল হবে’। এই আহাজারি সুলতানের বক্তব্যেও ছিল। সমীর এবং সফরী শিল্পীদ্বয় মূলত যশোর অঞ্চলের। যেখানে সুলতান ঘরানার একটা চর্চা দীর্ঘকাল ধরেই প্রবহমান। সুলতান বলেছিলেন, ইংল্যান্ডের বিশেষত ইউরোপের আকাশে সূর্যকে তেমন প্রত্যক্ষ করা যায় না। সেখানকার ল্যান্ডস্কেপের ভেতর ততটা কালারও নেই। অথচ কী আশ্চর্য সেখানে বড় বড় ল্যান্ডস্কেপ পেইন্টারের জন্ম, বৃদ্ধি এবং বিকাশ। আমাদের এখানকার এতসব ঋতুবৈচিত্র্য, বিস্তৃত নিসর্গ, সবুজের ভেতরই কতগুলো গ্রেড। কিন্তু এখানকার শিল্পীদের ভেতর ল্যান্ডস্কেপ পেইন্টার তেমন দেখা যায় না। ঐতিহ্য থেকে বর্তমানের ঘরে-বাইরের রূপ ততটা পরিলক্ষিত নয়। উভয় শিল্পী কিছুটা হলেও সে দায় মোচন করেছেন। সমীর মজুমদারের কতিপয় কাজ যেমন ‘দ্য রাইডার’, ‘দ্য ফিস হান্টার’ এই কাজগুলো অ্যাক্রেলিক এবং কালিকলমের। ফ্লাট ফিগারেটিভ। কাজগুলোকে দেখে কোলাজ মনে হতে পারে। কিন্তু ভ্রম কেটে যায়—যখন আমরা ঠিক একই ট্রিটমেন্টে কতগুলো কোলাজ পেইন্টিং দেখি। যেমন—‘দ্য বার্ড’, ‘নেচার’। ক্যানভাসে কালিকলমে ‘অটম’, ‘মিল্কমেইড’, ‘পেসান্ট ফ্যামেলি’, ‘দ্য মাদার অ্যান্ড কাউবয়’ এইসব কাজে গৃহস্থজীবনের গল্প। কৃষক, কৃষাণি, গাভী, গরু এবং বাছুর মিলে যেন এক যৌথ খামারের চিত্রায়ণ। ফিগারগুলো অ্যানাটমিক্যাল স্ট্রাকচার ফলো করেছে। মাসলের গড়ন বাস্তবমুখী, অপরাপর অবজেক্টগুলোতে লতানো রেখায় প্রস্ফুটিত। বার্ডস আই ভিউ থেকে সমতল ভূমি যেন মানচিত্রের অবয়বে শায়িত, স্থির। পদচ্ছাপ এইখানে ‘হাজার বছরের’ পদচারণায় গতিশীল, অভিমুখী। মোজাই জীবন সফরী-র ল্যান্ডস্কেপগুলো অনেকটাই আর্কিওটাইপ। ল্যান্ড, বাস্তু, গাছপালা এবং মানুষকে কেন্দ্র করে আলোর আবর্তন ঘটেনি। আলোর ভেতরে ন্যাচারাল অ্যাটমোসফেয়ার যেমন হারিয়ে যাচ্ছে, তেমনি হারিয়ে যাচ্ছে বর্ণের আধিক্য। অবশ্য রোদে পোড়া কালো ফিগারগুলো যেন কয়লার আভাস। তার ভেতরে লাল রংয়ের পরিধেয় সারফেসকে করে তুলেছে বর্ণিল। এতকিছুর ভেতর প্রত্যেকটা বস্তুই চিহ্নিত হয়ে যায় দর্শকের সামনে। কোনো বস্তুই আবার যেন হারিয়ে বসে না নিজেদের স্বাতন্ত্রিকতা। বাইনারী উপস্থাপনায় সফরীকে এইখানে আলাদাভাবে সনাক্ত করা যায়। বাঙালির আচার-ব্যবহার, দৈনন্দিন গৃহস্থকর্ম, উত্সব এবং আধিপত্য এমনকি সাম্প্রদায়িকতার নানান মাত্রিকতাও চিত্রায়িত হয়েছে দ্বিমাত্রিক ব্যাঙ্গাত্মক রেখায়। নগর কীভাবে আধিপত্যবাদী হয়ে ওঠে প্রান্তিক সীমারেখায় ‘হেজিমনি’ শিরোনামের কোলাজেই তার বিবরণ দেখা যায়। গুলশানের বেঙ্গল আর্ট লাউঞ্জে ৩০ অক্টোবর শুরু হওয়া এই প্রদর্শনী চলবে আগামী ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত।
