জীবনানন্দ দাশ দাঙ্গাজনিত কারণে দেশত্যাগীদের অবস্থা নিরিখে সেই বাস্তবতাকে কাব্যে রূপ দিয়েছেন স্বতন্ত্র বিন্যাসে। পলায়নপ্রবৃত্তির গোপন ব্যস্ততাকে তিনি বলেছেন, অস্পষ্ট ব্যস্ততা। ১৯৪৬-৪৭ কবিতায় দাঙ্গাচিত্র রূপায়ণ করেছেন কয়েকটি অংশে। কবিতার শুরুতেই তিনি পালাতে বাধ্য হওয়া দেশত্যাগী মানুষের কথা বলেছেন, এর পরই তিনি বাংলা ভূখণ্ডের মানুষের সহাবস্থানের যে ঐতিহ্য ছিল সেই বর্ণনা দিয়েছেন, তারপরই আবার দাঙ্গার সময়ে ঢুকে পড়েছেন। সেই সময়ে মানুষ অনেকেই সত্য উপলব্ধি করতে পারেনি। আবার যারা পেরেছে তারা সত্যকে সত্য বলে প্রকাশ করার পরিবেশ পায়নি। কবি সেই অনুভূতিগুলো তুলে ধরেছেন।
যিনি ব্যক্তিজীবন-পরিবারজীবন-সমাজজীবন-ইতিহাস-ঐতিহ্য-দেশ-কাল-মহাকাল-বিশ্বভাবনা সবকিছুকেই প্রকৃতির সূক্ষ ব্যঞ্জনায় সর্বাধিক সাফল্যে বাংলা কবিতাশিল্পে গেঁথে দিয়েছেন; তর্কহীন তিনি জীবনানন্দ দাশ। সুখানুভূতি-দুঃখানুভূতি-বিষ্ময়ানুভূতি সকল বোধ-ই আবহমান বাংলার রূপ-সৌন্দর্যের উপমা-রূপক-প্রতীকে তিনি ন্যস্ত করেছেন। তাঁর কাছে জীবনের ছায়ায় কখনো প্রকৃতি, কখনো প্রকৃতির ছায়ায় জীবন। সকাল-দুপুর-বিকেলের রং তিনি খুঁজেছেন, খুঁজেছেন পাখির ঠোঁট-পেঁচা-লক্ষ্মীপেঁচা-ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। বিভোর থেকেছেন সেসবকিছুকে পঙিক্তবদ্ধ করতে; আবার সেই কবি সময়ের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া অসাম্প্রদায়িক বাঙালির সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প সংক্রমিত দাঙ্গা, ভেদজ্ঞানে জীবনের চেয়ে ধর্মকে বড় করে দেখার প্রবণতায় দূষিত-কলুষিত সময়চিত্রকেও কবিতার পরতে বেঁধে দিয়েছেন। কালসচেতন কবি ইতিহাস-ঐতিহ্য থেকে কবিতার রসদ সংগ্রহ করেছেন, বিশ্বলোক তাঁর কবিতার উপাত্ত হয়েছে আবার সমকালীনতাও দানা বেঁধেছে তাঁর কবিতায়। বাংলার রাজনীতি যখন ঘাত-প্রতিঘাতমুখর—এরকম সময়ে কবি বেড়ে উঠেছেন। পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দুটি ঘটনা—প্রথম মহাসমর এবং দ্বিতীয় মহাসমর তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন। একদিকে ব্রিটিশ শোষণের কড়াল অভিঘাতে বিপর্যস্ত বাঙালি-জীবন, অন্যদিকে বিশ্বরাজনীতির প্রতিহিংসায় দ্বিতীয় মহাসমরে ভেঙে যাওয়া অর্থনীতিতে মানুষের ওপর মানুষ যখন আস্থা হারিয়েছে তখন অযুত যন্ত্রণা-কষ্ট সত্ত্বেও বাঙালিরা মুক্তির স্বপ্ন দেখছিল।
ব্রিটিশরা ভারতবর্ষকে মুক্ত করে দিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে। ভূখণ্ড নির্ধারণের কাজ চলছে। জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভৌগোলিক সীমা নির্ধারণ করা হচ্ছে। জাতিতত্ত্বকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে বাংলার অনেক হিন্দুকে বাংলাদেশ ছাড়ার প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে, আবার অনেক মুসলমানকে ভারত ছাড়ার প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। এই বেদনায় কাতর যখন দু-দেশের জন্মভূমি ত্যাগ করতে যাওয়া হিন্দু-মুসলিম তখন তাদের মধ্যে ধর্মভিত্তিক বিরোধ তুঙ্গে ওঠে। জীবনানন্দ দাশ ধর্মভিত্তিক বিরোধকে উপজীব্য করে ১৯৪৬-৪৭ কবিতাটি রচনা করেছেন। কবিতার শিরোনাম হিসেবে একটি নির্দিষ্ট সময় উল্লেখ করেছেন। এই সময়ে ভারতবর্ষের রাজনীতি ছিল উত্তাল। কবি এ সময়ের স্পর্শকাতর ঘটনা দাঙ্গাকে উপজীব্য করেছেন এ কবিতায়। জাতিগত সহাবস্থানের ইতিহাস, দাঙ্গার কার্যকারণ, জাতিগত ব্যর্থতার মূলসূত্র, দাঙ্গাজনিত সৃষ্ট কালো আখ্যান এ কবিতায় উঠে এসেছে।
১৯৪৬-৪৭ সালে বাংলাদেশের মুসলমানেরা সংখ্যাগুরু হলেও ভারতে হিন্দুরা সংখ্যাপ্রধান। বাংলাদেশের হিন্দুরা সংখ্যালঘুহেতু তারা যেমন এখানকার মুসলমান কর্তৃক নির্যাতিত হয়েছে, তেমনি ভারতের মুসলমানেরা হিন্দু কর্তৃক নির্যাতিত হয়। সহমর্মিতা আর সৌহার্দ্যবোধের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা ভ্রাতৃত্ববোধে চরম আঘাত পড়ে। দেশমাতা-স্বজন সবকিছুকেই তুচ্ছ করে জীবন বাঁচাতে এখানকার হিন্দুরা জীবনের সকল সম্পদ নিলামে বিক্রি করে দিয়েছে, আবার ভারতের মুসলমানেরা একই কাজ করেছে। জন্মদেশের সাথে, জীবনের পরিবেশ-পারিপার্শ্বিকতার সাথে অবিচ্ছেদ্য যে সম্পর্ক, সেই সম্পর্ককে তুচ্ছ করে শুধু বেঁচে থাকার তাগিদে দেশ ছেড়েছে ধর্মীয় উন্মাদনার শিকার ক্ষত-বিক্ষত সাধারণ মানুষ। অকস্মাত্ সৃষ্ট অনাকাঙ্ক্ষিত এ পরিস্থিতিতে সংখ্যালঘুগণ প্রকাশ্যে পালানোর সুযোগও পায়নি। দাঙ্গার সময়ে যারা নিজেদের জন্মদেশ ছেড়েছে, তারা যখন তাদের সম্পদ বিক্রি করেছে, তখন যেহেতু একরকম গোপনে করতে হয়েছে, সে কারণে তারা সেই সম্পদ জলের দামে বিক্রি করেছে। জীবনানন্দ দাশ দাঙ্গাজনিত কারণে দেশত্যাগীদের অবস্থা নিরিখে সেই বাস্তবতাকে কাব্যে রূপ দিয়েছেন স্বতন্ত্র বিন্যাসে। পলায়নপ্রবৃত্তির গোপন ব্যস্ততাকে তিনি বলেছেন, অস্পষ্ট ব্যস্ততা। ১৯৪৬-৪৭ কবিতায় দাঙ্গাচিত্র রূপায়ণ করেছেন কয়েকটি অংশে। কবিতার শুরুতেই তিনি পালাতে বাধ্য হওয়া দেশত্যাগী মানুষের কথা বলেছেন, এর পরই তিনি বাংলা ভূখণ্ডের মানুষের সহাবস্থানের যে ঐতিহ্য ছিল সেই বর্ণনা দিয়েছেন, তারপরই আবার দাঙ্গার সময়ে ঢুকে পড়েছেন। সেই সময়ে মানুষ অনেকেই সত্য উপলব্ধি করতে পারেনি। আবার যারা পেরেছে তারা সত্যকে সত্য বলে প্রকাশ করার পরিবেশ পায়নি। কবি সেই অনুভূতিগুলো তুলে ধরেছেন। এর পরের অংশে মানুষ সৃষ্টির মনের কথাকে পঙিক্তবদ্ধ করেছেন। দাঙ্গায় এক ভাই অন্য ভাইকে ধর্মের নামে কীভাবে নির্বিচারে মেরে ফেলেছে সে কথা উঠে এসেছে। এর পরই কবি কল্পনায় মৃতদের কাছে পৌঁছে যান। মৃতদের ডাকলে যেন তারা এসে তাদের পরিচয় দেবে এখনো। তাদের কেউ মুসলমান কেউ হিন্দু। কিন্তু মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তারা যে রক্তনদীতে মিশেছে সেই প্রবাহ আলাদা নয়।
জীবনানন্দ দাশ ১৯৪৬-৪৭ শীর্ষক কবিতায় দাঙ্গা প্রসঙ্গকে বেঁধেছেন তাঁর স্বতন্ত্র কাব্যপ্রতিভায়। কবিতার শুরুতেই তিনি দাঙ্গায় মানুষ যে ভীতিজনিত এক করুণ পরিণতির শিকার হয়েছিল তাঁর বর্ণনায় সেই সময়চিত্র উঠে এসেছে—
দিনের আলোয় ওই চারিদিকে মানুষের অস্পষ্ট ব্যস্ততা :
পথে-ঘাটে ট্রাক ট্রামলাইনের ফুটপাতে;
কোথাও পরের বাড়ি এখুনি নিলেম হবে— মনে হয়,
জলের মতন দামে।
সকলকে ফাঁকি দিয়ে স্বর্গে পৌঁছুবে
সকলের আগে সকলেই তাই। (১৯৪৬-৪৭ : শ্রেষ্ঠ কবিতা)
দাঙ্গার সময়ে যেসব সম্পত্তি সাথে বহনযোগ্য ছিল না সেগুলো জলের দামে বিক্রি করা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। মানুষ কেউ কেউ মৃত্যুর শিকার হচ্ছে। কেউ কেউ সঙ্গোপনে সটকে পড়ছে নিরাপদে। কেউ কেউ অপরিচিত স্থানে গিয়ে নিজের পরিচয় আড়াল করে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। কবি ‘হেমন্ত’ শব্দের মধ্য দিয়ে জীবন থেকে ঝরে যাওয়ার অনেক উপমা ব্যবহার করেছেন তাঁর বিভিন্ন কবিতায়। হেমন্ত শব্দটি তিনি অনেকবার জীবনের জন্য নেতিবাচক অর্থে ব্যবহার করেছেন। এই কবিতার মধ্যেও তিনি জীবন নিয়ে পালিয়ে বেড়ানো মানুষদের সম্পর্কে বলেছেন—
বাকি সব মানুষেরা অন্ধকারে হেমন্তের অবিরল পাতার মতন
কোথাও নদীর পানে উড়ে যেতে চায় (১৯৪৬-৪৭ : শ্রেষ্ঠ কবিতা)
যারা সঙ্গোপনে নিজেকে আড়াল করে রাখে তাদের সম্পর্কে কবির মূল্যায়ন হচ্ছে, তারা অন্ধকারে লীন হয়ে থাকে। যখন তারা অন্ধকারের সাথে মিশে থাকে, তারাও মৃতসম। মৃতসম হয়ে ওঠার আগে তারা যদি নারী-আকাশ-আলো-অন্ন সুস্থিরভাবে পেত তাহলে ভালো হতো বলে তিনি নিজস্ব মত যুক্ত করেন কবিতায়। কবি সমগ্র বাংলাকে দেখেন অন্ধকারে নিমজ্জিত। সহাবস্থানের ঐতিহ্য ধারণ করে ছিল বাংলা। যে অনন্যগুণে গুণান্বিত বাংলা, তার যেন সবকিছুই নিভে গেছে। বাংলা সভ্যতা-শিক্ষা-সমৃদ্ধিতে অনেক পিছিয়ে থাকলেও অতীতে তারা অনেক ভালো ছিল। কবি এ কবিতার প্রথম চরণে যে অস্পষ্ট ব্যস্ততার কথা বলেছেন, সেই রূপ কোনো অস্পষ্টতা ছিল না তখন। ব্রিটিশ শাসনামলেই যে জমিদারী প্রথা শ্রেণীবৈষম্য সৃষ্টি করেছিল, সেখানে কৃষক যৌথ প্রতিবাদী না-হলেও তাদের মধ্যে ধর্মভিত্তিক সমপ্রদায়গত কোনো অস্পষ্ট সম্পর্ক ছিল না। ছেচল্লিশের দাঙ্গায় সেই স্পষ্ট সম্পর্ক ভেঙে গিয়ে এক অস্পষ্ট সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। দাঙ্গাকালকে কবি বলেছেন অন্ধকার। নিজেদের স্বার্থ বিবেচনাকে তিনি বলছেন অর্ধসত্য। সেই অন্ধকারে অর্ধসত্যকে সকলেই মহান করে তোলার চেষ্টায় লিপ্ত হয়েছিল। কেউ যদি অখণ্ড সত্যকে উপলব্ধি করতে চায়, তাকে একাকী সেই সত্য উপলব্ধি করতে হয়। কবির ভাষায়—
আজকে অস্পষ্ট সব? ভালো করে কথা ভাবা এখন কঠিন;
অন্ধকারে অর্ধসত্য সকলকে জানিয়ে দেবার
নিয়ম এখন আছে; তারপর একা অন্ধকারে
বাকি সত্য আঁচ করে নেওয়ার রেওয়াজ
রয়ে গেছে; সকলেই আড়চোখে সকলকে দেখে। (১৯৪৬-৪৭ : শ্রেষ্ঠ কবিতা)
জীবনানন্দ দাশ নিঃসঙ্গতার কবি। সমাজজীবনে দাঙ্গা প্রসঙ্গ ছাড়াই তিনি নেতিবাচকতাসংক্রমিত। ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রকাশসম্বলিত কবিতার অন্তরঙ্গ সম্পর্ক তার নির্জনতার সাথে। সময়ের প্রতিকূলতা তাঁকে যেন ক্রমাগত দংশন করে। বিরূপসময় তাঁকে ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন করে তোলে সকল সম্পর্ক থেকে। আনুক্রমিক হারে নিঃসঙ্গ হতে থাকা কবির জীবনে দাঙ্গা একটি অনেক বড় ঘটনা। দাঙ্গায় মানুষের বিকৃতচরিত্র পর্যবেক্ষণে তিনি মানুষ সম্পর্কে চূড়ান্ত নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেছেন—‘সৃষ্টির মনের কথা মনে হয় — দ্বেষ।’ (১৯৪৬-৪৭ : শ্রেষ্ঠ কবিতা)
দাঙ্গায় ভিন্ন ধর্মচারীকে মেরে নিজেদের গৌরব বৃদ্ধিবোধের ভ্রান্ত এক ঘৃণ্য খেলায় মেতে উঠেছিল বাঙালি। খুনি এবং খুন হওয়া ব্যক্তির মধ্যে সম্পর্ককে কবি ভাই বলে উল্লেখ করেছেন। এক ভাই আরেক ভাইয়ের জীবননাশ করছে। মারা গেছে হিন্দু-মুসলমান। তাদের রক্ত মিলেছে একসাথে। সেখানে আর তাদের পার্থক্যসূচক কোনো ভিন্ন পরিচয় নেই। তারা যেন অনন্ত ঘুমের পথযাত্রী। কবি কল্পনাশক্তি যুক্ত করে মৃতদের ডাকলে শুনতে পান, তাদের দেখতে পান। উভয় ধর্মের মৃতদের মিলিত রক্তনদী থেকে উঠে এসে তাদের আলাদা আলাদা ধর্মপরিচয়-সমৃদ্ধ নাম বলে যায়। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে অখণ্ড মানুষ পরিচয় লাভ করা যাচ্ছে, অথচ বেঁচে থাকালীন খণ্ডিত পরিচয়ে নিজেদের জীবনকে মৃত্যুর মধ্যে ঠেলে দেওয়া। কবি তাই সমাজে জ্ঞান নেই বলে আহাজারি করেছেন। জ্ঞানহীন সমাজ বলে সেখানে প্রেমও নেই। প্রেম নেই বলে নির্বিচার মানুষ হত্যা।
জীবনের চেয়ে ধর্ম বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলে পরিণতি কত ভয়াবহতায় পৌঁছুতে পারে তার প্রামাণ্য রূপ প্রত্যক্ষ করা গেছে ১৯৪৬-৪৭ সালের দাঙ্গায়। জীবনানন্দ দাশ সেই ভয়াবহতাকে আশ্রয় করে লিখেছেন ১৯৪৬-৪৭ কবিতাটি। কবি অনেক অনুষঙ্গ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে নৈরাশ্যবাদীতায় নীত ছিলেন। সেই অনুষঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইতিহাসের কলঙ্কিত অধ্যায় দাঙ্গাকাল। দাঙ্গাপরিস্থিতি জীবন সম্পর্কিত নেতিবোধে কবিকে অনড় অবস্থায় স্থিত করতে সহায়ক উপকরণ হয়েছে। সময়-সমাজ-রাজনীতি-ধর্ম সকল কিছুর রসায়নে আলোচ্য কবিতার আবক্ষ গড়ে তুলেছেন।
