ক্ষণিক বসন্ত

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০১৩, ১৮:১৮
‘চুনিবেটা, তুমি কি জান তুমি কী জিনিস’? অসুস্থ চিত্রকর অকৃতদার জাহিদুর ওসমানের মাথায় পরম মমতায় হাত বুলাতে বুলাতে ভাইঝি তিতির বলছিল। তিতির এসেছে ইউএসএ থেকে গত সপ্তাহে। আর কেউ খুব একটা আসে না এখন দেশে। তিতিরের দুই চাচা, এক ফুপু। সবাই একসঙ্গে ছিল একসময়। আহ্্ কী দিন গেছে! এলিফ্যান্ট রোড়ের এই বাাড়িতেই কী জমজমাট দিনগুলো কাটিয়েছে ওরা। তখনো তিতিরের দাদিমা বেঁচে। দাদিমাই বড়ছেলেকে ডাকত বড়বেটা বলে, মেজছেলেকে মেজবেটা, ছোটছেলেকে চুনিবেটা আর ফুপুকে রুনিবেটা। তিতির দাদিমার ডাক পুরোটাই মেরে দিয়েছিল। দাদিমার কাছে শোয়া নিয়ে চাচাত ভাইবোনদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলত। তিতির বরাবরই চুনিবেটার ন্যাওটা। কারণও ছিল। রংয়ের গন্ধ। চুনি তখন আর্ট কলেজের আধুনিক শিল্পীগোষ্ঠীর উদীয়মান প্রতিভূ। বড়বড় চুল, অবিন্যস্ত দাড়ি, ছুঁচালো নখ, চার পকেটঅলা ফতুয়া, দুইফিতার চপ্পল। ক্লাসমেট ইরার সাথে চুটিয়ে প্রেম। ইরা লম্বায় চুনির চাইতে তিন ইঞ্চি বড়। চুনি নামটাও আসলে ও ছোটখাটো বলেই কবে কবে যেন দাঁড়িয়ে গিয়েছিল ছোটবেলায়। চুনিবেটার রংতুলিতে সর্বাধিকার তিতিরের। ‘আমার জানায় কী যায়-আসে?’—তিতিরের মসৃণ হাতের পাতার ওপর আঙুলের বৃত্ত আঁকতে আঁকতে চুনির জবাব। ‘এই তোমার মতো মানুষগুলো আমার দু-চোখের বিষ। যেখানে ফ্রান্সে তোমার তিনটে সোলো ছিল, পাঁচটা বেস্ট অ্যাওয়ার্ড ছিল, ছবি বিক্রির টাকায় দুনিয়া ঘুরে বেড়িয়েছ, সেই তুমি কিনা একটা ইন্টারভিউ দিতে চাও না? একটা এক্সিবিশনের অ্যারেঞ্জ করো না? বেশ, কেউ নেইতো আমি বছর বছর আসি না? আমি কিন্তু আর আসব না বলে রাখলাম’—চুনিবেটার হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে অভিমানে গাল ফুলালো তিতির। সেই ছোটবেলার মতো। ‘শুধু তোর জন্যেই তো এখনো আঁকছি তিতু। এই লোভে—তুই আসবি, দেখবি। এরচে আনন্দ আমার আর কী আছে’? ‘এই এই শোন, তোমার মতো মানুষরা যদি সেকেলে ধাঁচের হয়, তাহলে কিন্তু খুব দুঃখজনক। আমার কথা শুনবে? এই নিয়ে চার নম্বর বয়ফ্রেন্ডের সাথে আমি আছি। কিচিরকে কাউকে দিইনি। চার নম্বরটা মনে হচ্ছে টিকে যাবে। আর্ট বোঝে। টিকে গেলে সামনেবার নিয়ে আসব। কিচিরও ওকে পছন্দ করে’ ‘এবার আনলেই পারতিস। সামনেবার কি আর...’ চুনিবেটার মুখ চেপে ধরে তিতির। ‘তোমার অবস্থাটা হলো গিয়ে সেকালের হিন্দু নারীদের মতো। ন-বছর বয়েসে বিয়ের দিন স্বামীহারা। সারাজীবন মাথা মুড়িয়ে শাদা শাড়ি পরা আর হবিষ্যি গেলা’। কড়া কথা বলে আবার মায়ের মতো করে বুড়ো সন্তানের মাথায় নিজের গাল ঘষে দেয় তিতির। গলার মধ্যেকার বেদনার দলা চোখে এসে গলে। চুনিবেটাটা যে কী? মানুষ এমন অভিমানী হয়? মেজবেটা তখন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতায় প্রথম শ্রেণী পেয়ে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে জয়েন করল। বড়বেটা মানে তিতিরের বাবা উচ্চপদস্থ সরকারি চাকুরে। একটু উন্নাসিক ও রক্ষণশীল। সবচে সুন্দর মেজবেটা। যেন গ্রেগরি পেক। আমেরিকায় স্কলারশিপের জন্য চেষ্টা চলছে। পেয়ে গেলেই ফুট। প্রেমট্রেম নেই। চুনির সাথে ইরা আসে বড়বেটা যখন অপিসে থাকে। দুপুরে খায়-টায়। দাদিমার পানের বাটা থেকে পান-সুপারি নিয়ে মুখ ভরে পান চিবোয়। তিতিরের অন্য দুই ভাইবোন আর রুনিবেটার মেয়ের সাথেও তার ভারি ভাব। একদিন তিতিরের বড়ভাইকে রুনিবেটার মেয়ে আড়ালে ডেকে নিয়ে যা বলছিল তা শুনে তিতিরের রক্ত জল। ‘মেজমামুর সাথে ইরাকে রমনা পার্কে দেখলাম’ ‘ধেত্। কী বলছিস?’ ‘মেজমামুর ঘাড়ে মাথা দিয়ে বসে ছিল সে’ ‘তুই ওখানে কী করছিলি?’ ‘বন্ধুরা মিলে চটপটি খেতে গিয়েছিলাম’। একেবারেই মিথ্যে নয়। সবার অসম্মতিতে মেজবেটা বিয়ে করে ইরাকে নিয়ে আমেরিকায় চলে গেল। চুনিবেটা উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়াতে লাগল। তিতিরের বাবা মেজবেটার ওপর রাগ করেই চুনিকে ফ্রান্সে পাঠিয়ে দিল। চুনিবেটার জন্যে কাঁদতে কাঁদতে তিতিরও বড় হলো। কাঁদতে কাঁদতে দাদিমা গত হলো। ওদের বাড়ির পেছনের খোলা বারান্দায় শুকনো কাঠালপাতার নিচে মোজাইকের সমতল পাথর বৃদ্ধের চোখের মতো ঘোলাটে হলো। উঠানের মাটিদাবা ইট সরাতে গেলে বৃশ্চিক ধীরে সরে গেল অনিচ্ছায়। চুনিবেটার রেখে যাওয়া রং নিয়ে বোনের বিয়ের আলপনা আঁকল তিতির। আলপনার কিছুই মুছল না। পায়ের চলাচলে রং ফিকে হয়। পায়েরা সব পথ খুঁজে পেল বিদেশের পথে। অবসরপ্রাপ্তির পাঁচমাসের মাথায় তিতিরের বড়বেটা ব্রেনস্ট্রোকে স্তব্ধ হয়ে গেল। তিতিরের চোখ থেকে সব রং মুছে গেলে চুনিবেটা ফিরে এলো পাণ্ডুলিপির আয়োজনে। তিতির আবার ঝেড়েমুছে দিল তার ঘর। ঝালিয়ে নিল নিজের খামতিটুকু চুনিবেটার মমতাময় পাঠদানে। কোটরে ঢোকা ম্লান চোখের দিকে তাকিয়ে তিতিরের বুক ফেটে গেলেও চুনিকে কেউ সংসারী হবার অনুরোধ করার সাহস করেনি। এখানে এই বাড়ি ছেড়ে আর কোথাও যাবে না সে সাফ জানিয়ে দিল। বড় ছেলেমেয়ের কাছে তিতিরের মা আমেরিকায় চলে গেলে তিতির তার পড়াশোনার শেষ বছরটা চুনিবেটার সাথে কাটিয়ে গেল। চুনিবেটা তার আসল গুরু। কিন্তু কোনোদিনও একবারও ইরার কথা জিজ্ঞসা করেনি তিতির। ‘কতবার বললাম তুমি আমার কাছে চল। তোমার আর আমার প্রফেশন তো এক। না, সেই এক গোঁ। তোমার তো এখন চিকিত্সার দরকার। টাকা-পয়সা দরকার। সঙ্গী দরকার। এভাবে একা থাকলে তো স্বাভাবিক মানুষও পাগল হয়ে যায়। কারোর কাছ থেকে কিছু নেবে না, কোথাও যাবে না...’ ‘লাগলে তো নেবই। তোর কাছ থেকেই নেব’ ‘কত যে নেবে সে তো এ দশ বছরে দেখলাম’ ‘ওসব বাদ দে। দেখ তো এই ছবিটা’। তিতির ছবিটা দেখে কিছুক্ষণ হতবাক হয়ে থাকল। একবার চুনিবেটার দিকে একবার ছবিটার দিকে তাকিয়ে মাথায় হাত দিয়ে মেঝের ওপর বসে পড়ল। কী অসাধারণ ভাবনা আর তার রং-রেখা। এ ছবি যেকোনো শিল্পবোদ্ধা বা শিল্প প্রতিষ্ঠান কয়েক লক্ষ টাকা দিয়ে কিনে নেবে। ‘এ তুমি কী করেছ চুনিবেটা!’ ছবির টাইটেল ‘দি শর্ট স্প্রিং’। গোধূলির রং আলো ফেলছে ঝরে যাওয়া নিষ্প্রভ ফুলগুলোর ওপর। পাতাগুলো সব নীল। একাকিত্বের বিমূর্ত বেদনার এক অনন্য শোকগাথা। ‘তুমি কি জান তুমি কী জিনিস?’ চুনির শীর্ণ দুর্বল হাতদুটো দুহাতে জড়িয়ে রেখে তিতিরের কান্না চাপল। মানুষটার জন্যে মায়ায় ভেতরটা আর্দ্র হলো। মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখে নিজের ঘরে গেল। বিছনায় পড়ে একদম হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। তিতির সিদ্ধান্ত নিল এবারেই চুনিবেটার ছবিরগুলোর একটা সোলো এক্সিবিশন করে সে ফিরবে। ছবি বেচতে চায় না চুনি, কিন্তু তিতিরের জেদ-এর কাছে এই প্রথম হার মানল। তিতির শহরের সবচে নামকরা গ্যালারি দা ভিঞ্চি কালেকশনে যোগাযোগ শুরু করল। প্রদর্শনীর জন্য চারদিনের বুকিং দিল। দোকান থেকে সুন্দর ফ্রেমে ভরে ছবিগুলোতে অসাধারণ মাত্রা যোগ করল। সব মিলিয়ে সাতাশটা ছবি। চুনি দেখল সবগুলো। অনেকদিন পর আবার বাঁচার প্রেরণা জোগাচ্ছে মেয়েটা। কে কিনবে ওগুলো? যারা শিল্প বোঝে তাদের অত পয়সা নেই, যাদের পয়সা আছে তারা কোটি টাকা দিয়ে দামি সোফা কেনে, হাজার টাকা দিয়েও ছবি নয়। ‘শুধুই পণ্ডশ্রম। কে কিনবে?’—চুনিবেটার কণ্ঠে হতাশা। বলে— ‘তারচে ভালো, রটিয়ে দে বুড়ো মরেছে, দেখবি কেমন তরতর করে বিক্রি হয় ওগুলো। তখন সেমিনার, খবরের কাগজ, শোকসভা, বিনে খরচে প্রদর্শনী, এমনকি বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতারও আয়োজন হবে দেখিস। এদেশে মরে না গেলে কেউ দাম দেয় নারে মা। কেবল প্রতারণা আর প্রতারণা’। তিতির জানে চুনিবেটার শেষ খেদটির সাথে পুরো বক্তব্যের মিল কমই। প্রতারণার আঘাতেই মানুষটা শেষ হতে চলেছে। ‘ধুরো চুনিবেটা, এই তোমরা না বড্ড পিউরিটান। এভাবে কেউ নিজের জীবনটাকে শূন্য করে রাখে?’ ‘কিন্তু তোর ভাষায় যদি আমার শিল্পকর্মগুলো অসামান্য হয়ে থাকে, তাহলে পিউরিটান হওয়াতে খুব ক্ষতি হয়নি বল?’ ‘কিন্তু শরীরটার তো মুড়ো মেরে রেখেছ’ ‘শরীরের আর কী দোষ বল? একদিন তো যেতেই হবে, আজ আর কাল’ ‘দাদিমা যে বলত তার ছেলেমেয়েদের মধ্যে তুমি একটা আস্ত গোঁয়ার গোবিন্দ, সেটা এখনো বহাল তবিয়তে আছে’ ‘এ গোবিন্দগিরির দিনও শেষ হয়ে আসছে’ ‘ম্যালা বকো না। কে তোমাকে যেতে দিচ্ছে?’ দা ভিঞ্চি কালেকশন। তিতিরের হাত ধরে চুনি আস্তে আস্তে গ্যালারিতে গিয়ে বসে। তিতিরের বিজ্ঞাপনের বদৌলতে নামি-অনামি অনেক শিল্পী-দর্শকের আগমন লক্ষ করে চুনি। তিতির মহাব্যস্ত। ছবিগুলোর পরিচিতি তুলে ধরছে। এককোণে চায়ের ব্যবস্থাও করে রেখেছে। প্রিন্ট-ইলেকট্রনিক মিডিয়ার লোকজন ক্যামেরা হাতে নানা কোণ থেকে চুনির ছবি তুলছে। একই সাথে তিতিরের ছবি তুলতেও কেউ পিছপা হচ্ছে না। কারণ তিতির সুন্দরী, সুবেশা, প্রিয়ংবদা, আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বে অধরা। ‘দি শর্ট স্প্রিং’-এর সামনে এসে থেমে যাচ্ছে দর্শক। সমালোচনা ছাপিয়ে প্রশংসা তার জায়গা করে নিচ্ছে। তিতিরের আকর্ষণে না কি ছবির সৌন্দর্যে বোদ্ধাজন বেশ কয়েকটা ছবি কিনেওছে, তা বোধগম্য হলো না চুনির। যে ছবিগুলো বিক্রি হয়েছে তিতির বলল— ‘চুনিবেটা, ওগুলোর নিচে সোল্ড না লিখে বিক্রিত লিখতে চাই’ ‘বেশতো তুই লেখ দেখি, কুড়ি বছর বাংলার সাথে সম্পর্ক নেই, তার আবার বাংলা লেখার শখ’ ‘কী ভাবছ? সব ভুলে গেছি? এই দেখ...’—বলে দেখালো সে লিখেছে ‘ছবিটা বিকৃত’। অনেকদিন পর চুনি প্রাণভরে হাসল। প্রদর্শনীর শেষদিন চুনি বেশ অসুস্থ বোধ করায় তিতির বিকেলে তাকে হসপিটালে নিয়ে গেল। ডাক্তার ভর্তি হয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন। তিতিরকে বললেন— ‘অনেক আগেই বলেছি অপারেশনটা জরুরি। উনি বলেছেন ওষুধ খেয়ে দেখবেন কিছুদিন। এখন তো অপারেশন মাস্ট মনে হচ্ছে’ ‘আপনি ব্যবস্থা করুন ডক্টর। কোনো অসুবিধা হবে না’—বলে তিতির চুনিবেটাকে কেবিনে দিয়ে আবার প্রদর্শনীতে ফিরল। শেষ সন্ধ্যা। গ্যালারিতে ঢুকেই ‘দি শর্ট স্প্রিং’ টাঙানো জায়গাটির দিকে তিতিরের চোখ যায়। সবসময় দর্শকের ভিড় জায়গাটি ঘিরে। শেষ সন্ধ্যায় ও জায়গাটায় কেউ নেই। তিতির অনুসন্ধিত্সু চোখে ধীর পায়ে এগোয় ওদিকে। ছবিটিই ওখানে নেই। যেগুলো বিক্রি হয়েছিল সেগুলোও নেই। ক্রেতারা নিয়ে গেছে। গ্যালারির ম্যানেজার ছুটে এল— ‘ম্যাম, একটু রুমে আসুন, জরুরি কথা আছে’। ‘কিন্তু শর্ট স্প্রিং কই?’—তিতির রীতিমতো তোতলাতে থাকে। ‘বলছি, আসুন ভেতরে’। তিতিরের সামনে পাঁচ লাখ টাকার বান্ডিল রাখল ম্যানেজার। ‘দি শর্ট স্প্রিং’-এর যা দাম লেখা ছিল তার পুরোটাই দিয়ে ছবি নিয়ে চলে গেছে ক্রেতা। শুধু নিজের নাম-ঠিকানা গোপন করে গেছে। ক্রেতা একজন অভিজাত বয়স্ক নারী। তিতির খানিক স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। অন্যমনস্কতার সাথে টাকাপয়সা ব্যাগে ভরল। বাদবাকি ছবিগুলো নামিয়ে ফেলার অনুরোধ জানিয়ে ম্যানেজারের বিল পরিশোধ করে তিতির দ্রুত হসপিটালেরর দিকে পা বাড়াল। ‘চুনিবেটাগো, এই নাও, এবার নিশ্চিতমনে নিজের টাকায় অপারেশন করাও, শর্ট স্প্রিং তোমার জীবনের লং স্প্রিং-এর ব্যবস্থা করে গেছে’—বলে পাঁচ লাখ টাকার বান্ডিল চুনির সামনে রেখে দিল তিতির। চুনি টাকাগুলোর দিকে বেশ খানিকক্ষণ চেয়ে রইল। তারপর সেই একই চাউনি গিয়ে পড়ল তিতিরের মুখে। তারও কিছুক্ষণ পর তিতিরের মুখটা বুকে চেপে ধরে অস্ফূটে বলল চুনি— ‘আমি সবই বুঝিরে মা’