বাউলকোষ
সুমনকুমার দাশ সম্পাদিত
প্রচ্ছদ :সব্যসাচী হাজরা
প্রকাশক :অন্বেষা প্রকাশন
মূল্য ২০০ টাকা
এপার-ওপার দুই বাংলায় একটি বাউল অভিধানের প্রয়োজনীয়তা ছিল দীর্ঘদিনের। অবশেষে বহুল আকাঙ্ক্ষিত সেই কাজটি অসাধারণ দক্ষতায় সম্পন্ন করলেন বিশিষ্ট বাউল-গবেষক সুমনকুমার দাশ। তাঁর সম্পাদনায় এবারের অমর একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে বাউলকোষ শীর্ষক গ্রন্থটি। এতে এক হাজার ১৪৫টি ভুক্তি স্থান পেয়েছে।
বইটির প্রথম ফ্ল্যাপে উল্লেখ রয়েছে, ‘বাউলতত্ত্বের গূঢ় ও গুহ্য বিষয়গুলো চটজলদি বুঝে নেওয়ার জন্য বইটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, বাউল গবেষক এবং বাউল অনুরাগীদের জন্য বাউল কোষ-এর গুরুত্ব অপরিসীম।’ ফ্ল্যাপের কথাগুলো যে বিন্দুমাত্রও মিথ্যে নয়, সেটি বইটি একটু নাড়াচড়া করলেই অনুধাবন সম্ভব। যতই দিন যাচ্ছে বাউলতত্ত্ব নিয়ে বিভ্রান্তির বেড়াজাল ততই বেড়ে চলছে। সেসব বিভ্রান্তি থেকে সাধারণ পাঠকদের সঠিক দিকনির্দেশনা হয়ে রইবে বাউলকোষ।
বাউলদের গোপন বিষয় এবং গুহ্য তত্ত্ব সম্পর্কে অনেকেই অজ্ঞ। কথায় আছে, বাউলেরা ইশারা-ভাষায় নিজেদের মনোভাব প্রকাশ করেন। সেই ইশারা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভের জন্য বাউলদের সঙ্গ করতে হয়। সঙ্গ ছাড়া কোনোভাবেই বাউলদের গোপন ও সাংকেতিক দুর্বোধ্য শব্দগুলো বোঝা সম্ভব নয়। এ কারণেই গুরু কিংবা মুর্শিদ ভজনা করে একজন শিষ্য তাঁর গুরুর কাছে নিজেকে সমর্পণ করে ভাবজগতের নিগূঢ় তত্ত্বগুলো জানার চেষ্টা করে থাকেন।
সুমনকুমার দাশ তাঁর অনুধাবন ও অনুসন্ধানী মননে সেইসব গোপন এবং গুহ্য বিষয়গুলো তুলে এনেছেন। এতদিন ধরে যেসব শব্দ ছিল একান্তই বাউলদের মুখের ভাষা, বাউলকোষ প্রকাশের পরে সেসব শব্দই আমাদের চেনা-জানাকে আরও সহজসাধ্য করেছে। জনসমক্ষে বাউলদের মৌখিক বাক্যকে উপস্থাপন করার কৃতিত্বটুকু বাউলকোষ সম্পাদকের যথার্থই প্রাপ্য। বাউলদের গোপন ভাষা এবং তাঁদের রচিত পদাবলিতে সেসব সাংকেতিক শব্দের ব্যবহারে পাঠকমাত্রই বিভ্রান্তিতে পড়েন, জানা-অজানার দোলাচালে ভোগেন। আলোচ্য গ্রন্থের সম্পাদক সেসব অনুদঘাটিত শব্দগুলোকে আয়ত্তে এনে সঠিক ও যথার্থ অর্থবাচক বাক্যে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করেছেন।
বাউলকোষ সংকলনটির গভীরতা ও আবেদন অনন্য। এটি পাঠে সংকলকের দীর্ঘ পরিশ্রম ও ইচ্ছাশক্তির বিষয়টিই পাঠক হিসেবে আমার কাছে প্রথমে ধরা পড়ে। বাউলদের গানে ব্যবহূত শব্দ, যেগুলো সাধারণ নাগরিক সমাজে না-জানা এবং অপ্রচলিত, সেসব শব্দকে দক্ষতার সাথে বইয়ের পরতে পরতে স্তূপীকৃত করেছেন। বইটি পাঠে এতদিনকার অচেনা বাউল জগতের নানা রীতিনীতি এবং বিচিত্রতা আমাদের নতুন আলোর সন্ধান দেবে। অনেকটা সমাজের অপাঙেক্তয় হিসেবে গণ্য বাউল-ফকিরদের বস্তুবাদী চেতনার পরিচয় মিলবে বাউলকোষ বইয়ে।
লোকসংস্কৃতি গবেষক ও প্রাবন্ধিক সুমনকুমার দাশ বাউলকোষ সম্পাদনা করে বাউল বিষয়ক গবেষণায় এক গুরুত্বপূর্ণ নজির স্থাপন করলেন। স্বভাবতই তাঁর বইটির ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা কামনা করছি।
