কারবালার ঐতিহাসিক হূদয়বিদারক ঘটনা

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০১৩, ১৮:২৭
উম্মাহর মধ্যে শান্তি-শৃংখলা স্থাপনের জন্য একটি লিখিত চুক্তি হয়। সেখানে বলা হয়, হযরত মুয়াবিয়ার পর হযরত হুসাইন (রা.) খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। কিন্তু মুয়াবিয়া তাঁর খেলাফত পরিচালনার শেষ সময়ে স্বীয় পুত্র এজিদকে খেলাফতের দায়িত্ব অর্পণের প্রস্তাব দেন। তখন সমস্যা সৃষ্টি হন। এজিদ জনমতের কোন তোয়াক্কা না করে নিজেই খেলাফতের দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হয়। তখন সর্বত্র বিশৃংখলা দেখা দেয়। ইসলামী খেলাফতের মর্যাদাকে ধ্বংস করে রাজতন্ত্রের সূত্রপাতকে বেশিরভাগ মুসলমানেরা সে সময় মানতে পারেননি। যার কারণে বিদ্রোহ দানা বাঁধতে শুরু করে এজিদের বিরুদ্ধে। কারবালার ঐতিহাসিক হূদয়বিদারক মর্মন্তুদ ঘটনা বিজড়িত আশুরা দিবস আমাদের মাঝে ‘ত্যাগ চাই মর্সিয়া ক্রন্দন চাই না’ এর বারতা নিয়ে যথারীতি সমাগত। এই দিনে হযরত ইমাম হুসাইন (রা.) এবং হযরত আলী (রা.) এর পরিবারের সতের জন শিশু-কিশোর যুবকসহ মোট ৭৭ জন মর্দে মুজাহিদ কারবালার প্রান্তরে ফোয়াতের দু’কূল ছাপা নদীর কিনারায় এক বিন্দু পানি হতে বঞ্চিত হয়ে শাহাদাতের পেয়ালা পান করেছিলেন। রসূল (স.) -এর দৌহিত্র হুসাইন (রা.) -এর পবিত্র মস্তক নিষ্ঠুর নরাধম শিমার ছিন্ন করে কুফার দুরাচার ওবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদের দরবারে প্রেরণ করেছিল। কেন এ মহান ত্যাগ ও শাহাদাত? এটা কি ছিল এজিদের হাত থেকে খেলাফত কেড়ে নেয়ার জন্য? তা নয়। হযরত হুসাইন (রা.) এর শিবিরে মাত্র ৪০জন লোক ছিল তরবারী চালানোর মত। পক্ষান্তরে এজিদের নির্দেশে কুফার গভর্নর চার হাজার রণ নিপুণ সৈন্য পাঠিয়েছিল। এ অসম যুদ্ধে পরাজয় ও মৃত্যু ছিল নিশ্চিত। তারপরও কেন স্বেচ্ছায় এ আত্মত্যাগ? কারণ, শর্ত ছিল, ‘হয় এজিদের আনুগত্য স্বীকার কর, না হয় যুদ্ধ কর’। রসূল (স.) -এর কলিজার টুকরাসম হুসাইন (রা.) একটি মুহূর্তের জন্যও এজিদের আনুগত্য স্বীকার করে ইসলামী খেলাফতের মর্যাদাকে ভূলুণ্ঠিত করতে চাননি। পূর্বে উম্মাহর মধ্যে শান্তি-শৃংখলা স্থাপনের জন্য একটি লিখিত চুক্তি হয়। সেখানে বলা হয়, হযরত মুয়াবিয়ার পর হযরত হুসাইন (রা.) খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। কিন্তু মুয়াবিয়া তাঁর খেলাফত পরিচালনার শেষ সময়ে স্বীয় পুত্র এজিদকে খেলাফতের দায়িত্ব অর্পণের প্রস্তাব দেন। তখন সমস্যা সৃষ্টি হন। এজিদ জনমতের কোন তোয়াক্কা না করে নিজেই খেলাফতের দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হয়। তখন সর্বত্র বিশৃংখলা দেখা দেয়। ইসলামী খেলাফতের মর্যাদাকে ধ্বংস করে রাজতন্ত্রের সূত্রপাতকে বেশিরভাগ মুসলমানেরা সে সময় মানতে পারেননি। যার কারণে বিদ্রোহ দানা বাঁধতে শুরু করে এজিদের বিরুদ্ধে। এজিদ তখন তার বিষদাঁত প্রক্ষালন করল। সে ভাবল, চারদিকে বিদ্রোহ দমন করার চেয়ে বরং হুসাইনকে (রা.) যদি দুনিয়া হতে সরিয়ে দেয়া যায় তাহলে সব মামলা চুকে যায়। সাথে সাথে নিজের নেতৃত্ব কর্তৃত্ব অনায়াসে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। ইসলামী খেলাফতে কলঙ্ক সৃষ্টিকারী এজিদ সেই হুসাইনকে (রা.) হত্যা করার পরিকল্পনা করল যিনি বেহেশতের সব যুবকদের সরদার হবেন। এই কথা রসূল (স.) বলেছিলেন, ‘হাসান-হুসাইন হবে বেহেশতের সব যুবকদের সরদার’ তখন থেকে রসূলের সাহাবীরা তাদেরকে আরো বেশি বেশি মহব্বত করার, খুশি করার চেষ্টা করতেন। তাঁরা কষ্ট পান এমন কোন কাজ কেউ করতেন না। একটি দৃষ্টান্ত দিলে সহজেই বিষয়টি আঁঁচ করতে পারবেন। হযরত রসূল (স.)-এর একজন সাহাবী ছিলেন তার নাম দাহিয়া কলবী (রা.) । তিনি হযরত হাসান হোসাইনকে (রা.) খুব ভালবাসতেন। তাদেরকে খুশি করার জন্য অনেক দূর-দুরান্ত থেকে ফলফলারী নিয়ে আসতেন পকেট ভর্তি করে। যখন হযরত হাসান-হুসাইন (রা.) দেখতেন যে, দাহিয়া কালবী (রা.) আসছেন তখন তারা দৌড় দিতেন। এক দৌড়ে দাহিয়া কালবী (রা.) কাছে পৌঁছাতেন। তাকে জড়িয়ে ধরতেন। পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিতেন। আর ফল বের করে খেতেন। একদিন এই দৃশ্য আসমান থেকে হযরত জিব্রাইল (আ.) দেখে বিস্ময়ে বিমূঢ় হলেন। তিনি ভাবলেন, যদি জিব্রাইল না হয়ে তিনি দাহিয়া হতেন। আর হযরত হাসান-হুসাইন (রা.) -এর কাছে আসতেন। তাঁরা তাঁকে জড়িয়ে ধরে আদর করতেন তাহলে তাঁর জীবনটা ধন্য হয়ে যেত। সত্যিই একদিন চলে এলেন দুনিয়ায় হাসান-হুসাইনের কাছে দাহিয়া কলবী সাহাবীর রূপ ধারণ করে। যখন হাসান হুসাইন (রা.) দেখলো যে দূর হতে দাহিয়া কালবী(রা.) সাহাবী আসছেন। তখন তাঁরা এক দৌঁড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে অন্যান্য দিনের মত পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিয়ে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোমাকে তো দাহিয়া কলবীর মত দেখা যায়? কিন্তু তুমি বোধ হয় দাহিয়া কালবী নও, কারণ তুমি যদি সত্যিই দাহিয়া কালবী হতে তাহলে তোমার পকেট কোনদিনও ফলশূণ্য হতো না। জিব্রাইল (আ.) লজ্জায় পড়লেন। বললেন, ওগো হাসান-হুসাইন! সত্যিই আমি দাহিয়া কালবী নই। আমি জিব্রাইল (আ.), তোমাদের নিকট থেকে একটু আদর নেয়ার জন্য আমি দাহিয়া কালবীর রূপ ধারণ করে এসেছি। কিন্তু দাহিয়া কলবীর রূপ ধারণ করে আসতে হলে যে ফল নিয়ে আসতে হয় এটা আমি বেমালুম ভুলে গিয়েছিলাম। সুতরাং সবাই চাইতো হাসান-হুসাইনকে খুশি করতে। তাঁরা দুঃখ, কষ্ট পাবেন এমন কোন কাজ কেউ করতেন না। আমরা জানি হযরত বেলাল (রা.) যে জীবনের শেষ আজান দিতে গিয়ে শহীদ হয়েছিলেন সেটাও ছিল হযরত হাসান হুসাইনের অনুরোধের কারণে। ঘটনাটি ছিল এমন, রসূল (স.) এর ইন্তেকালের পর হযরত বেলাল (রা.) মদীনার পথে-প্রান্তরে হাঁটতেন আর হা-হুতশ ও আক্ষেপ করতেন। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যে মদীনায় রসূল নেই সেখানে আমি বেলাল থাকতে পারব না। চলে গিয়েছিলেন সিরিয়ার দামেস্কে। দ্বিতীয় খলিফা আমিরুল মোমেনীন হযরত ওমর (রা.) এর খেলাফতকালে সমসাময়িক সাহাবীরা ও মুসলমানেরা হযরত ওমরকে অনুরোধ করেন বেলাল (রা.) কে মদীনায় নিয়ে আসার জন্য। হযরত ওমর(রা.) তখন বেলালের (রা.) কাছে একটি চিঠি লিখেছিলেন, বেলাল! তোমাকে একনজর দেখার জন্য মদীনার আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষার প্রহর গুনছে। একটিবারের জন্য হলেও তুমি মদীনায় এসে দেখা দিয়ে যাও। হযরত বেলাল (রা.) আমীরুল মোমেনীনের চিঠির অবমাননা হবে ভেবে মদীনায় এসেছিলেন। তখন মদীনার সকল মানুষেরা তাঁকে একনজর দেখার জন্য পঙ্গপালের মত দূর-দূরান্ত হতে ছুটে এসেছিলেন। আর দাবি করেছিলেন, একটিবার বেলালের সেই সমুধুর আযান শোনার জন্য। কিন্তু হযরত বেলাল (রা.) তখন বলেছিলেন, ওগো সাহাবীরা যেখানে রসূল (স.) নাই সেখানে আমি কিভাবে আজান দিব? রসূলবিহীন বেলাল কোনদিনও আজান দিতে পারে না। সব সাহাবীর অনুরোধ রেখে দিয়েছিলেন। কিন্তু সবশেষে যখন হযরত হাসান ও হযরত হুসাইন (রা.) অনুরোধ করেছিলেন, তখন বেলাল (রা.) ভাবলেন, তাদের অনুরোধ না রাখলে তাঁরা কষ্ট পাবেন। এটা বেলালের কাছে আরো বেদনাদায়ক। তাই তিনি মিনারে উঠে যখন আজান দিচ্ছিলেন। যখন আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রসূলুল্লাহ (স.) বললেন, তখন পূর্বের মত শাহাদাত আঙ্গুল দিয়ে রসূলের রিসালাতের সাক্ষ্য দেয়ার সময় দেখেন রসূল (স.) মিম্বরে নাই। শূন্য মিম্বর নিরব নিস্তব্ধ পড়ে আছে। এই শূণ্যতা হযরত বেলাল (রা.) কে তোলপাড় করে ফেললো। (চলবে) ই-মেইল :[email protected]