কাঠগড়ায় মুরসি

আপডেট : ১০ নভেম্বর ২০১৩, ২০:৪৬
তিনি এখনো বৈধ প্রেসিডেন্ট। এমন দাবি করা অবশ্য অপ্রাসঙ্গিক নয়। কারণ জনগণই তো তাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছিলো। গণতন্ত্রের নিয়ম অনুযায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ জনতার ভোটে তিনি সরকার গঠন করছিলেন। মিসরের প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে মোহাম্মদ মুরসি নাম লিখিয়েছিলেন ইতিহাসে। কিন্তু এক বছরের মাথায় বিরোধীদের বিক্ষোভের মুখে সেনারা তাকে জোর করে ক্ষমতা থেকে নামিয়ে দিয়েছে। তিন মাস অজ্ঞাত স্থানে তাকে আটকে রাখা হয়েছিলো। এর পর গত সোমবার কায়রোর একটি বিশেষ আদালতে তার বিচার শুরু হয়। গত জুন-জুলাইতে সরকার বিরোধী সহিংসতায় উসকানি দেয়া এবং হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। কিন্তু আদালতের কার্যক্রম চলাকালে মুরসি বিচার প্রত্যাখ্যান করে নিজেকে দেশের বৈধ প্রেসিডেন্ট হিসেবে দাবি করেন। একই আদালতে মুরসির ১৪ সহযোগীরও বিচার হচ্ছে। আদালতে মুরসি প্রথমে কারাগারের প্রথাগত সাদা পোশাক পরতে অস্বীকৃতি জানান। পরে তিনি পোশাক পরলে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। কিছুক্ষণ পর মুরসি বিচার প্রত্যাখ্যান করে আদালতে বলেন, আমি ডক্টর মুরসি, এই প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট। এই আদালত অবৈধ। এ সময় তিনি সেনাবাহিনীর সমালোচনা করে অভ্যুত্থানের জন্য সেনা কর্মকর্তাদের বিচারেরও আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এটা ছিল একটা সামরিক অভ্যুত্থান। এই অভ্যুত্থানের নায়কদের বিচার করতে হবে। ২০১১ সালে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সাবেক স্বৈরশাসক হোসনি মোবারকের পতনের পর মিসরের প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রেসিডেন্ট হন মুরসি। তবে এক বছর না যেতেই তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষোভের মুখে সেনাবাহিনী মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করে। মুরসি ও তার ১৪ সহযোগীর বিরুদ্ধে গত বছরের ডিসেম্বর মাসের একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে অভিযোগ আনা হয়েছে। ঐ সময় তার পদত্যাগের দাবিতে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের বাইরে বিক্ষোভ চলছিল। এ সময় সংঘর্ষে অন্তত ১০ বিক্ষোভকারী নিহত হয়। দোষীসাব্যস্ত হলে মুরসির মৃত্যুদণ্ড হতে পারে। এ কথা সত্য যে মুরসি ৫২ শতাংশ ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। তবে বলা হচ্ছে তার সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। মোবারককে উত্খাতে গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী সব পক্ষের সঙ্গে মিলিতভাবে দেশ পরিচালনায় উদ্যোগী না হয়ে প্রেসিডেন্ট মুরসি শুধু তার নিজ সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুডের রাজনৈতিক স্বার্থ ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সচেষ্ট থেকেছেন। মিসরে মুসলিম ব্রাদারহুডের তথাকথিত ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠার সর্বাত্মক প্রয়াস দেশটির যুব ও নারী সমাজের শিক্ষিত, আধুনিক, উদারপন্থী অংশের সমর্থন পায়নি। রাষ্ট্রের পরিচালক হিসেবে প্রেসিডেন্ট মুরসির অদক্ষতা ও স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা বেশ সমালোচিত হয়েছে। মিসরের দুর্বল অর্থনৈতিক অবস্থা মুরসির এক বছরের শাসনকালে আরও দুর্বল হয়েছে। ২০১১ সালে বেকারত্বের হার যেখানে ৮ দশমিক ৯ শতাংশ ছিল সেখানে ২০১২ সালের শেষ প্রান্তিকে তা বেড়ে ১৩ শতাংশে দাঁড়ায়। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি মুরসি সরকার থামাতে পারেনি। সেই সঙ্গে ক্রমাগত বেড়ে চলেছে বিদ্যুতের সংকট। কিন্তু এসব ব্যর্থতা সত্ত্বেও মুরসি ছিলেন জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট, সামরিক হস্তক্ষেপে তাকে ও তার সরকারকে অপসারণের ঘটনা মিসরের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় এক বিরাট ছন্দপতন। তার বিরুদ্ধে যেমন বিক্ষোভ হয়েছে তেমনি পক্ষে হয়েছে। তার মুক্তির দাবিতে রাজপথে আন্দোলনে শত শত মিসরীয় প্রাণ দিয়েছে। এখনো অগ্নিগর্ভ হয়ে রয়েছে মিসর। হয়তো মুরসির বিচারের মধ্যে তা স্ফুলিঙ্গ হয়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে। কারণ তিনি এখনো অনেক মিসরীয়দের রাষ্ট্রনেতা। তার প্রমাণ মেলে বিচারের শুরুর দিনেও। কায়রোতে কড়া নিরাপত্তাবেষ্টিত পুলিশ একাডেমির বাইরে তার সমর্থকেরা বিক্ষোভ করেন। তারা সেনাবাহিনী ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়র বিরুদ্ধে স্লোগান দেন। বিচার প্রক্রিয়া শুরুর আগে মুরসির পোস্টার ও সেনাবাহিনী বিরোধী বিভিন্ন বার্তা-সংবলিত ব্যানার-ফেস্টুন হাতে জড়ো হয় অসংখ্য সমর্থক। হাজার হাজার সমর্থক কায়রোতে সাংবিধানিক আদালতের সামনে বিক্ষোভ করে। কায়রোর কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত উচ্চ আদালতের সামনেও চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বিচার কারণে নিরাপত্তা জোরদারে কায়রোতে ২০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়। বিচার চলার সময় পুলিশ একাডেমির বাইরে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল। সেখানে শত শত দাঙ্গা পুলিশ সদস্য ও সাঁজোয়া যান মোতায়ন করা হয়। সেনাদের প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তবে ইতিহাস বলে, মিসরে সেনাবাহিনী একটি শক্তি। ৬১ বছর ধরেই তারা ক্ষমতায়। মাঝখানে সীমিত পরিসরে ২০১১ সালের বিপ্লবের পর কিছুদিন পর্যন্ত তারা পর্দার অন্তরালে থেকে ক্ষমতা পরিচালনা করেছে। এখন আবার তারা প্রকাশ্যে। ১৯৫২ সালে রাজতন্ত্র উত্খাতের মধ্য দিয়ে মিসরের সেনাবাহিনী সেখানে একটি রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছিল। কর্নেল জামাল আবদুল নাসের ওই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে শুধু মিসরেই নয় বরং সমগ্র আরব বিশ্বে আরব জাতীয়তাবাদী রাজনীতির জন্ম দিয়েছিলেন। পুরো আরব বিশ্ব এবং সেই সঙ্গে তৃতীয় বিশ্বে এক অবিসংবাদিত নেতায় তিনি পরিণত হয়েছিলেন। তার সেই আদর্শকে সামনে রেখেই আনোয়ার সাদাত আর হোসনি মুবারক রাষ্ট্র পরিচালনা করে গেছেন। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বেও চাওয়ায় মুবারকের পতন হয়। মাঝখানে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের জন্য মুরসি এসেছিলেন। মুরসি সেনাবাহিনীর এই শক্তিকে বেশি গুরুত্ব দেননি। তার পতনের পর শিগগিরই প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সম্ভাবনা ক্ষীণ। মিসরে গণতন্ত্রের যে সম্ভাবনার জন্ম হয়েছিল, তা অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে গেল।