মঙ্গলের পানে ভারত

আপডেট : ১০ নভেম্বর ২০১৩, ২০:৪৬
মঙ্গল গ্রহ নিয়ে মানুষের আগ্রহের কমতি নেই। বিশেষ করে পৃথিবীর সাথে মঙ্গলের বেশ মিল খুঁজে পাওয়ায় এক অজানা আবিষ্কারের নেশায় মাতে মানুষ। এতদিন মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার বিজ্ঞানীরাই এগিয়ে নিচ্ছিল মঙ্গল গ্রহ অভিযাত্রা। কিন্তু এবার ঐ গবেষণায় যোগ হলো ভারতের নাম। নতুন নতুন তথ্য জানতে মঙ্গলবার দুপুরে রহস্যপূর্ণ ঐ লালগ্রহের উদ্দেশ্যে রওনা হয় দেশটির প্রথম মহাকাশ যান মঙ্গলায়ান। চেন্নাইয়ের কাছে শ্রীহরিকোটার সতীশ ধাওয়ান মহাকাশ কেন্দ্র থেকে উেক্ষপণ করা হয় ঐ মহাকাশ যান। ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (ইসরো) এই অভিযানকে নাম দিয়েছে মার্স অরবিটার মিশন (এমওএম)। এমওএমের আওতায় আপাতত ছয়টি মহাকাশ যান মঙ্গলে পাঠাবে ভারত। দেশটির বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি এ সব মহাকাশ যান মঙ্গলে খুঁজবে মিথেন গ্যাস ও বিভিন্ন খনিজের অস্তিত্ব। ইসরোর চেয়ারম্যান কে রাধাকৃষ্ণন জানান, মঙ্গল অভিযানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য সেখানে মিথেন আছে কি-না তা নিশ্চিত হওয়া। আর মিথেন থাকলে তা কোনও ভূ-তাত্ত্বিক প্রক্রিয়ায় না-কি জৈব প্রক্রিয়ায় সৃষ্টি হয়েছে, সেটাও জানাতে পারবে মঙ্গলায়ান। এভাবেই মঙ্গলে কখনও প্রাণের অস্তিত্ব ছিল কি-না, তার উত্তর পেতে আরও একধাপ এগিয়ে যাবে বিশ্ব। মঙ্গল গ্রহের ভূ-পৃষ্ঠে রয়েছে পৃথিবীর মতোই আগ্নেয়গিরি, জ্বালামুখ, উপত্যকা, মরুভূমি, পাহাড়-পর্বত। এমনকি দুই মেরুতে বরফের টুপিও (পোলার আইস ক্যাপ) রয়েছে তার। ঋতু বৈচিত্র্যও সেখানে পৃথিবীর মতোই। স্বপ্নবাজ বিজ্ঞানীদের তাই ধারণা, মঙ্গলে হয়তো এমন কোন প্রাণী বাস করে, যারা হতে পারে মঙ্গল গ্রহের মানুষ বা এলিয়েন। এই ধারণা সঠিক না হলেও ঐ গ্রহ প্রাণীর বসবাসের উপযোগী নিশ্চয়ই হবে। সেখানে নিশ্চয়ই মিলবে প্রাণ অথবা পানির অস্তিত্ব। তবে বিজ্ঞানীরা বর্তমানে এ সব ধারণা থেকে অনেকটাই সরে এসেছেন। তাদের এখন গবেষণার বিষয় মঙ্গলের অতীত। অর্থাত্ কোন কালে সেখানে প্রাণের অস্তিত্ব ছিলো কি-না। এছাড়াও বিজ্ঞানীরা মনে করেন, মঙ্গল হলো খনিজ পদার্থের আধার। গত চার বছরে চীন ও জাপানের একাধিক মঙ্গল অভিযান ব্যর্থ হয়েছে। একইভাবে ভারতের মঙ্গলায়ানও যদি ব্যর্থ হয়, তবে বিদেশে যেমন ভারতের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হবে, তেমনি সমালোচনার ঝড় উঠতে পারে দেশের ভেতরেও। কিন্তু ভারতের বিজ্ঞানীরা আপাতত ব্যর্থতার কোন কুচিন্তাই মাথায় আনছেন না। তাদের মতে, উেক্ষপিত মহাকাশ যানটি একদমই সুঠাম আছে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল বা মাধ্যাকর্ষণ পেরিয়ে যেতে এর কোনই বেগ পেতে হয়নি। প্রায় পনেরো মাস আগে ভারতের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে লাল কেল্লায় দেয়া ভাষণে এই মঙ্গল অভিযানের ঘোষণা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী ডক্টর মনমোহন সিং। তিনি তখন বলেছিলেন, মঙ্গলের একেবারে কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক তথ্য জানাবে ভারতীয় মহাকাশ যান। ভারতের বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, আগামী বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর নাগাদ মহাকাশ যানটি মঙ্গলের কক্ষপথ স্পর্শ করবে। আর সেখানে পৌঁছাতে এই তিনশ’ দিন বিরতিহীন যাত্রা করবে মঙ্গলায়ান। বিজ্ঞানীরা আরো জানান, লিম্যান আলফা ফটোমিটার (ল্যাপ), মার্স এক্সোসফেরিক নিউট্রাল কমপোজিশন অ্যানালাইজার (মেনকা), কালার ক্যামেরা এবং থার্মাল স্পেকট্রোমিটারসহ বিভিন্ন অত্যাধুনিক প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি যুক্ত করা হয়েছে মঙ্গলায়ানের সাথে। এগুলো মঙ্গলের তথ্য সংগ্রহের জন্য বেশ উপযোগী ও কার্যকরী ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন ভারতীয় মহাকাশ বিজ্ঞানীরা। তারা জানান, মঙ্গলে হাইড্রোজেন ও ডিউটারিয়ামের পরিমাণ মাপবে ল্যাপ। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা মঙ্গলে পানির অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতে পারবেন। মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলের উপরিভাগের নিরপেক্ষ বা নিষ্ক্রীয় উপাদান সম্পর্কে তথ্য জানাবে মেনকা প্রযুক্তি। আর কালার ক্যামেরা ছবি তুলবে মঙ্গল এবং এর দু’টি উপগ্রহের (ফোবোস ও ডিইমোস)। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করবে থার্মাল ইনফ্রারড ইমেজিং স্পেকট্রোমিটার। এই প্রযুক্তি মঙ্গলের তাপ নিঃসরণের পরিমাণ পরিমাপ করবে এবং এর ভূ-পৃষ্ঠের গঠন ও খনিজ পদার্থের ম্যাপ তৈরিতে বিজ্ঞানীদের সাহায্য করবে। দশ মাসের সফর শেষে মঙ্গলের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি টের পেলে মহাকাশযানটি জ্বলে উঠবে নতুন করে এবং ঐ গ্রহের কক্ষপথে সঠিকভাবে নিজেকে স্থাপন করবে। তবে একথা নিশ্চিত যে, এশিয়ার মহাকাশ শক্তির অগ্রগতিতে এক বিরাট পদক্ষেপ ভারতের মার্স অরবিটার মিশন। বিশ্বের অন্যান্য মহাকাশ বিজ্ঞানীরাও একে ব্যাপকভাবে অভিনন্দিত করছেন। মহাকাশ গবেষণা চর্চার ক্ষেত্রে ভারতের পঞ্চাশ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী প্রকল্প এই এমওএম। এ প্রকল্পের আওতায় চলতি মাসেই আরো চারটি এবং ডিসেম্বরে একটি মহাকাশ যান মঙ্গলে পাঠাচ্ছে ভারত। ভারতের নাগরিকদের কাছে এ বিষয়টির মূল্যায়ন ব্যক্তিভেদে একেক রকম। তারা কেউ বলছেন, মঙ্গলে ভারতের পায়ের ছাপ রাখার বদলে নিজের দেশের উন্নয়নে এই খরচটা করলেই অনেক ভাল হতো। আবার কেউ বলছেন, যে কাজ দেশের জন্য গর্বের, তার জন্য অনেক কিছুই করতে হয়। আর এ সব কিছু টাকার অঙ্কে মাপাও যায় না। তবে আগের যে কোন মঙ্গল অভিযানের চেয়ে এবার এর খরচ সবচেয়ে কম হয়েছে বলে প্রচার করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, এই প্রকল্পে ভারতের খরচ হয়েছে মাত্র সাড়ে চারশো কোটি রুপি, যা নাসা বা চীনের অনুরূপ প্রকল্পের খরচের তুলনায় খুবই কম। তবে এই বিষয়টি মানতে নারাজ অনেকেই। তাদের মতে, খরচের আসল তথ্য গোপন করা হয়েছে। তাছাড়া ভারতে যেখানে এখনো কোটি কোটি মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছে, যেখানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে, সেখানে এই অভিযানের যৌক্তিকতা কী! কিন্তু ভারতের এই অভিযান পুরোপুরি সফল কি-না, তা জানতে আরও অন্তত বছর খানেক অপেক্ষা করা ছাড়া আর উপায় কী?