নিজেকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে মানসম্পন্ন কিছু কাজই যথেষ্ট। নিজের প্রতিভার বিচ্ছুরণ ঘটিয়ে তারই প্রমাণ দিয়েছেন নাট্যপরিচালক এহসানুল হক সেলিম। শুধু পরিচালনা নয়, অভিনয় ও নাটক লেখাতেও তিনি পারদর্শী। এই গুণী নির্মাতাকে নিয়ে লিখেছেন খালেদ আহমেদ
নির্মাণশৈলীতে চমক থাকায় তার প্রতিটি নাটক সমান জনপ্রিয় হয়ে ওঠে দর্শকদের কাছে। বেশ কয়েকটি মানসম্পন্ন নাটক দিয়েই তিনি জয় করেছেন দর্শকের হূদয়। পরিচালনায় আসার নেপথ্যের গল্প জানতে চাইলে এহসানুল হক সেলিম মৃদু হাসলেন। কয়েক সেকেন্ডের বিরতি নিয়ে খুলে বসলেন তার কথার ঝাঁপি। তার ভাষ্যে, ‘নির্মাণে আসব এটা ভাবনায় ছিল না। ছোটবেলায় খুব সিনেমা ও টিভি অনুষ্ঠান দেখতাম। এগুলোর প্রতি দিন দিন আসক্তি বাড়তে থাকে। তখন সিনেমা দেখে মনে হতো, যারা মারামারি করছে তাদের মতো করতে পারলে ভালো হতো। তখন তাদের মতো অভিনয় করতে মন চাইত। পড়াশোনা শেষ করে অভিনয়ের সাথে জড়িয়ে গেলাম। পরে মনে হলো অভিনয়ের চেয়ে নির্মাণ অনেক আনন্দের। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম নির্মাণের কাজে যোগ দেব। নির্মাণের কলাকৌশল শিখে নাটক নির্মাণ শুরু করলাম। আমার পরিবারের নাটক নির্মাণ পছন্দ না হলেও বাধা দেয়নি। বলা যায়, তাদের নিরবতাই আমার অনুপ্রেরণা।’ এহসানুল হক সেলিমের পরিচালনায় বিটিভিতে প্রচারিত নাটকগুলো হলো—বলয় মাল্টিমিডিয়া প্রযোজিত মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে চিত্রায়িত ‘মাতৃভূমির জন্য’ ও ‘শুভযাত্রা’। বর্তমানে নির্মাণ করছেন বেশ কয়েকটি ধারাবাহিক নাটক। এগুলো হলো—‘সবার দুঃখ আছে’, ‘অক্টোপাস’, ‘প্রতিশোধ’, ‘অভিবাসী’ প্রভৃতি। সেইসাথে এটিএন বাংলায় প্রচারের জন্য নির্মাণ করছেন ১ হাজার পর্বের ধারাবাহিক ‘দূরত্ব’। ২৬টি দেশে এই ধারাবাহিকের শুটিং হবে। এরইমধ্যে দুই লটের শুটিং সম্পন্ন হয়েছে। এই নাটক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘নতুন পরিচালক হিসেবে আমাকে এই মেগা ধারাবাহিক নাটকের সুযোগ দেওয়ার জন্য আমি ড. মাহফুজুর রহমানের কাছে কৃতজ্ঞ।’ তিনি বিটিভির তালিকাভুক্ত উচ্চ গ্রেডের নাট্যশিল্পী ও নাট্যকার। অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি বিটিভিতে প্রচারিত জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘ছায়াছন্দ’ ও ‘প্রবাসে প্রিয়জন’-এর গ্রন্থনা, উপস্থাপনা ও পরিচালনা করেছেন দীর্ঘদিন। বর্তমানে তার গ্রন্থনা ও পরিকল্পনায় বিটিভিতে প্রচার হচ্ছে তথ্য ও বিষয়ভিত্তিক অনুষ্ঠান ‘আশ্বাস’। সেলিম অভিনীত অর্ধ শতাধিক সাপ্তাহিক ও ধারাবাহিক নাটক বিটিভিতে প্রচার হয়েছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—‘সুখ নগরের ট্রেন’, ‘বাসন্তিকা’, ‘বাবার জন্মদিন’, ‘রাজবন্দী’, ‘আকাশ বলেছিল বৃষ্টিকে’, ‘পালাবার পথ নেই’, ‘ব্যস্ত আছি’, ‘কাল সন্ধ্যা’, ‘ফেরা হয় না’, ‘যৌতুক গৃহে বসবাস’, ‘নাটকীয়’, ‘ছিন্ন পালক’, ‘সৌরভ’, ‘এই হূদয়’ প্রভৃতি। আর ধারাবাহিকের মধ্যে রয়েছে—‘উজান’, ‘বন্ধন’, ‘আমলকির মৌ’, ‘মফস্বল সংবাদ’, ‘নানা রঙের দিনগুলি’, ‘শহরের শেষ বাড়ি’, ‘গোধূলি লগ্নে’, ‘জীবন মোহনা’ প্রভৃতি। এ ছাড়া এটিএন বাংলা প্রচারিত হয় তার অভিনীত ধারাবাহিক ‘রুপালি মানুষ’ ও ‘ভালোবাসার রঙ’ এবং বৈশাখী টিভিতে বুলবুল আহমেদের পরিচালনায় ‘বাবার বাড়ি’। আমাদের দেশে এত পেশা থাকতে আপনি কেন এই পেশা বেছে নিলেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ইচ্ছা ছিল অভিনয় করার। অভিনয় করতে গিয়ে পরিচালনার স্বপ্ন জাগে। এরপর নাটক পরিচালনাকেই পেশা হিসেবে বেছে নিলাম।’ বিটিভিতে প্রচারিত নাটকের মান সম্পর্কে এহসানুল হক সেলিম বলেন, ‘দেশের একমাত্র সরকারি টিভি চ্যানেল বিটিভির নাটকের মান আরও ভালো হতো, যদি নতুন নির্মাতারা বেশি করে সুযোগ পেত। সেইসাথে এখানকার নাটকগুলোতে অভিনয়শিল্পীদের সম্মানীও বাড়াতে হবে। কেননা সম্মানী কম বলে ভালো অভিনেতারা এখানকার নাটকে অভিনয় করতে চান না।’ আমাদের দেশে এই পেশা কতটা জনপ্রিয় জানতে চাইলে এহসানুল হক সেলিম বলেন, ‘যদিও উত্তরটা জনমত যাচাইয়ের বিষয়। তথাপি আমি বলতে পারি এ পেশাটা অনেক জনপ্রিয়।’ নতুন যারা এই পেশায় এসেছেন তাদের সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই নতুনদের মধ্যে অনেকেই ভালো করছেন। আমি চাই আরও ভালো করুক। তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, প্রথমত কাজটা ভালো করে শিখতে হবে, বুঝতে হবে। তাকে লাইট, ক্যামেরা, এডিটিং, মিউজিক, অভিনয় সব কিছু সম্পর্কে ভালো জ্ঞান থাকতে হবে, একইসাথে নিষ্ঠাবান এবং প্রচুর পরিশ্রমী হতে হবে।’ ভবিষ্যত্ ভাবনার কথা জানতে চাইলে এহসানুল হক সেলিম বলেন, ‘যতদিন বেঁচে থাকব ততদিন এ পেশাতেই থাকতে চাই। সেই সাথে চলচ্চিত্র নির্মাণের ইচ্ছা আছে। দর্শকদের জন্য ভিন্ন কিছু করতে চাই। ভালো স্ক্রিপ্ট পেলেই আগামী বছর চলচ্চিত্র নির্মাণে হাত দেব।’
