হুমায়ূন আহমেদের গল্প এবং আমরা

আপডেট : ১৪ নভেম্বর ২০১৩, ১৯:৩২
যখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম পড়তে এলাম তখন ক্যাম্পাসের বাতাসে হুমায়ূনবিরোধী একটা গন্ধ ছিল। বিশেষ করে এখানে যারা শিল্প-সাহিত্য চর্চার সঙ্গে জড়িত ছিলেন তাঁদের অনেকেরই ছিল হুমায়ূন বিষয়ে উদাস ভাব। তবে দ্বিতীয় আরেকটি দল ছিল, যারা পুরোপরি তাঁকে নাকচ না করে একটু সংস্কারপন্থি হলেন। তারা একটা পর্যায়ে এই সাহিত্যিকের অবদানকে স্বীকৃতি দিতে রাজি, তা এরকম—হুমায়ূনের প্রথমদিককার সহ কিছু উপন্যাস আছে যা ভালো, আর যা ভালো এবং বড় মাপের লেখক তালিকায় রেখে পড়ার মতো তা হলো তাঁর ছোটগল্প। তাই একেবারে বাতিলপন্থিদের সঙ্গে না গিয়ে আমি দ্বিতীয় ভাবের অনুসারী হলাম। একদিন কবি নওশাদ জামিল হুমায়ূন আহমেদের গল্প সংকলন ‘গল্পপঞ্চাশত্’ পড়তে দিয়ে বললেন, ‘পড়ে দেখো, ভালো লাগবে। তুমি তো গল্প লিখতে চাও, প্রস্তুতিতে কাজে দেবে।’ আগ্রহ নিয়ে পড়া শুরু করলাম। চিন্তা করে দেখলাম, কী কারণে গল্পগুলো ভালো, কী কারণে গল্পগুলো পড়ব? উত্তর খুঁজতে গিয়ে প্রথমেই মনে এল, হুমায়ূনের গদ্যের কমিউনিকেটিভ পাওয়ারের দিকটি। পাঠকের সঙ্গে সহজবোধ্য ভাষায় তিনি যোগাযোগ গড়ে তোলেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কমলকুমার মজুমদার বা আখতারুজ্জামান ইলিয়াস আর হাসান আজিজুল হকের ভাষা কি তাহলে হুমায়ূনের ভাষা থেকে কঠিন? আমার কাছে তো তা সহজ ও মধুর মনে হয়। এর উত্তর একটাই, হুমায়ূনের ভাষা সব পাঠকের জন্য সহজবোধ্য। তার চেয়ে বড় কথা হলো, সম্ভবত, তিনি এমন একটা শ্রেণীর পাঠকের কথা মাথায় রেখে লিখতেন, যারা তার মূল পাঠক। তারা কারা? একুশে বইমেলার সময় অন্যপ্রকাশের স্টলের সামনে যারা হুমায়ূনের বইয়ের জন্য ভিড় করে থাকেন, তারাই। এই শ্রেণীর পাঠকের অধিকাংশই শুধু হুমায়ূনের নতুন বইটি কেনার জন্য মেলায় আসতেন। অন্য কোনো লেখকের বই মেলায় আছে কি নেই তা নিয়ে এই পাঠকদের বড় একটা মাথা ব্যাথা নেই। তিনি গল্প বলার সময় একটা টেকনিক অনুসরণ করেন। গল্পের চমকপ্রদ অংশ তিনি অনুচ্ছেদের শেষে বলেন। আর একগুচ্ছ চমক রহস্যের মতো করে জমাতে থাকেন, গল্পের শেষ দিকে বলবেন বলে। এতে পাঠকের পুরো গল্পটি পড়ার আগ্রহ তৈরি হয়। এই টেকনিক গল্পের আঙ্গিকগত ডিসকোর্সের বিষয়। আদতে, আঙ্গিকের দিক থেকে হুমায়ূনের গল্পের সঙ্গে রবি ঠাকুরের ছোটগল্পের তেমন পার্থক্য খুঁজে পাওয়া মুশকিল। তবে গল্পকারের নতুনত্ব ভাষায়। গল্পের চরিত্ররা এমন করে কথা বলে, যেন তারা প্রতিটি কথার মধ্য দিয়ে পার্শ্বচরিত্র তো বটেই পাঠককেও চমকে দিতে চায়। গল্পের রন্ধ্রে রন্ধ্রে চমকের প্রবণতা হুমায়ূনের গল্পের অন্যতম অন্বিষ্ট । আরেকটি প্রবণতা তাঁর গল্পে আছে, যা গল্পের বিষয়গত আলোচনার মধ্যে পড়ে। তিনি কিছু কিছু ক্ষেত্রে এমন ঘটনা পাঠককে শোনাতে চান, যা এর আগে পাঠক শোনেনি বা এমন ঘটনার সঙ্গে পাঠকের পরিচয় নেই। আবার কিছু গল্পে তিনি টেনে আনেন বৈজ্ঞানিক চিন্তা-ভাবনা। যাকে বলে মেটা-ফিজিকস। সায়েন্স ফিকশনাল প্রবণতা থেকে জাত এই গল্পগুলো। হুমায়ূন আহমেদের গল্পের সামগ্রিক প্রবণতা আমার কাছে এমনই মনে হয়। আরও মনে হয়, হুমায়ূন আহমেদের গল্পসত্তা তাঁর উপন্যাসসত্তার আড়ালে ঢাকা পড়ে প্রায়শ। আবার উপন্যাস তথা সমগ্র লেখকসত্তাটিকে প্রতিনিয়ত চোখ রাঙাচ্ছেন ব্যক্তি হুমায়ূন। বিষয়টা একটু ব্যাখ্যা করা দরকার— আমাদের এখানে সত্তুরের দশকের অনেক কথাসাহিত্যিক জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। এখনো অনেকের বই সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় মেলায়। কিন্তু তাঁদের লেখা নিয়ে তেমন রেফারেন্স জমা হয়নি, যাকে কোনো গবেষণায় কাজে লাগানো যায়। বরং লেখার চেয়ে লেখককে নিয়েই বেশি কথা হয়েছে। যেমন, হুমায়ূন আহমেদ। তাঁর লেখা নিয়ে খুব কমই কাজ হয়েছে। অথচ পত্রিকা ও টিভি খুললে দেখা যায়, ব্যক্তি হুমায়ূনকে নিয়েই কথা হচ্ছে, তার লেখা আড়ালে থেকে যাচ্ছে। হুমায়ূন তমুকের অমুক হতেন, তিনি বাগান করেছেন, পল্লী বানিয়েছেন, প্রকাশনাশিল্পকে বাঁচিয়েছেন, তিনি দিলখোলা মানুষ ছিলেন, তিনি গল্প করতে পছন্দ করতেন... এন্তার বিষয়। অথচ তাঁর ‘নন্দিত নরকে’ কিংবা ‘শঙ্খনীল কারাগার’ নিয়ে ক-টা লেখা হয়েছে? লেখার চেয়ে লেখক বড় কিংবদন্তি হলে লেখার সারসত্তা ক্রমেই হারিয়ে যায়। যেমন, বাল্মিকী-ব্যাসদেবের নাম অনেকে না শুনলেও রামায়ণ-মহাভারত দ্বারা ভারতবর্ষের বৃহত্ একটা জাতি প্রভাবিত। একজন পাঠক হিসেবে কষ্ট পাই, যখন হুমায়ূনের গল্প পড়ে, গল্পটাকে ভিন্ন ভিন্ন ডিসকোর্সের আলোকে বুঝতে চেয়ে গল্প নিয়ে আলোচনার দেখা পাই না। এখন, যদি দশকের দিক থেকে বিষয়টি চিন্তা করি, তবে দেখা যায়, একজন নতুন পাঠক বাংলাদেশের ছোটগল্প পড়তে এসে ষাটের গল্প পড়তে পড়তে যে রুচি ও অভ্যস্ততা নিজের মধ্যে দাঁড় করাবে, সত্তরের গল্প হাতে নিলে তাকে হোঁচট খেতেই হবে। পাঠকের এমন হোঁচটক্ষেত্র যাঁরা প্রস্তুত করেছেন তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য হুমায়ূন আহমেদ। তিনি বাংলা গদ্যের যে সরস-স্রোত প্রবাহিত করেছেন তা এর আগে কখনোই কোনো দশকে অন্য কোনো লেখকের লেখায় পাওয়া যায় না। অসুখী-বিষণ্ন মধ্যবিত্তের মুখে আক্ষরিক অর্থেই যেন হাসি ফোটালেন হুমায়ূন আহমেদ। সত্তরের দশকে জাতীয় জীবনে নেমে আসা রাজনৈতিক দুর্যোগে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে মানুষ। এমনই এক হতবিহ্বল সময়ে রসাত্মক গদ্য পরিবেশন করে, গদ্যের নতুন বিন্যাসে গল্প রচনায় মনোনিবেশ করে গল্পকার সত্যিই মধ্যবিত্তের মুখে হাসি ফোটালেন। মনে ফূর্তির ভাব উদয় করতে সচেষ্ট হলেন। তাঁর গল্পেই আমরা প্রথমবারের মতো মধ্যবিত্তকে পেলাম তাদের নিত্যদিনের সমস্যা-সংকট-আনন্দ-বেদনা-হাসি-কান্নাসহ। অল্প কথায়, সাবলীল ঢংয়ে জীবনের ছোটখাটো সুখ-দুঃখগুলো তাঁর গল্পে চমত্কার কুশলতায় ধরা পড়েছে। বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের স্পর্শকাতর বিন্দুগুলোর সঙ্গে সাক্ষাত্ হয় তাঁর ছোটগল্পে। মূলত, নাগরিক মধ্যবিত্ত জীবন, তার বিচিত্র আকাঙ্ক্ষা ও অনুভূতি, প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির নিভৃত উন্মোচন ঘটেছে হুমায়ূন আহমেদের গল্পে। বাংলাদেশের ছোটগল্পকারদের মধ্যে নিঃসন্দেহে তাঁর হিউমার সেন্স অদ্বিতীয়; তিনি জাতীয় জীবনের নানা ঘটনাকে বরাবরই ব্যঙ্গাত্মক রূপে প্রকাশ করার সক্ষমতা দেখিয়েছেন, যেখানে প্রাধান্য লাভ করেছে হাস্যরসময় বর্ণনাভঙ্গি। এই অন্যতম প্রবণতার কারণে বাংলাদেশের ছোটগল্পের ভুবনে তিনি সফলমাত্রার গল্প যোগ করেছেন। জীবনকে তিনি দেখেছেন সহজ ও প্রত্যক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে। জীবনের নানা ঘটনাকে, অভিজ্ঞতাকে তিনি এমন নিপুণতার সঙ্গে তাঁর গল্পে বর্ণনা করেছেন যে, পাঠকের কাছে তা অতি পরিচিত প্রাত্যহিক জীবনের ঘটনা বলে মনে হয়। মধ্যবিত্তের পরিবার কাঠামোর মধ্যে ঘটতে থাকা পিতার শাসন, মায়ের আদর, বোনের স্নেহ, মামার পাগলামি, ফুপীর মৃত্যু, বাবার অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার জন্য নতুন পোশাক পরতে না পারার দুঃখ, ছোটবোনের মৃত্যু, বিয়ের দিন বাড়ি থেকে উচ্ছেদ এবং শৈশব-কৈশোর-যৌবনের দিনগুলোকে হুমায়ূন আহমেদ তাঁর গল্পে সহজভাবে চিত্রিত করতে পেরেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থগুলো হলো—নিশিকাব্য (১৯৭৯), শীত ও অন্যান্য গল্প (১৯৮৬), আনন্দ বেদনার কাব্য (১৯৮৮), শ্রেষ্ঠগল্প (১৯৮৮), ছায়াসঙ্গী (১৯৯০), ভয় (১৯৯১), গল্পসমগ্র (১৯৯১), শ্রেষ্ঠগল্প (সময় সংস্করণ ১৯৯২), এই আমি (১৯৯৩), আমার আপন আঁধার (১৯৯৩), নির্বাচিত গল্প (২০০০) প্রভৃতি। হুমায়ূন আহমেদের গল্প জীবনের ক্ষুদ্র-সূক্ষ্ম আনন্দ-বেদনা, স্বপ্ন ও ব্যর্থতার বয়ান। ব্যক্তি জীবনের অম্ল-মধুর অভিজ্ঞতা থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধোত্তর সময়ের জীবনযন্ত্রণার অন্তরঙ্গ রূপটিকে সরল বর্ণনার মাধ্যমে তুলে ধরেছেন গল্পকার। খণ্ড-ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা এক বিপুল জীবনসত্যের ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করেছে তাঁর গল্পে। মানুষের ক্ষুদ্র চাওয়া-পাওয়া, সুখ-দুঃখ, মিলন ও বিষাদই এসব গল্পের উপজীব্য। এ পর্যায়ে আমরা তাঁর কয়েকটি আলোচিত ও সফল গল্প থেকে জীবনকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব। ‘জলিল সাহেবের পিটিশন’ গল্পে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার যুদ্ধাপরাধীদের কথা উঠে এসেছে। জলিল সাহেব দু্ই শহীদ মুক্তিযোদ্ধার বাবা। বর্তমানে রিটায়ার্ড। তিনি বাংলাদেশের ত্রিশ লক্ষ লোককে যারা হত্যা করেছে সেই সব পাষণ্ডদের বিচারের জন্যে সরকারের সমীপে পিটিশন করে তাতে জনসাধারণের স্বাক্ষর সংগ্রহ করেছেন। পিটিশনের বিষয়বস্তু হচ্ছে—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে দশ লাখ ইহুদি মারা গিয়েছিল। সেই অপরাধে অপরাধীদের প্রত্যেকের বিচার করা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। কিন্তু এদেশের ত্রিশ লাখ মানুষ মেরে অপরাধীরা কী করে পার পেয়ে গেল? কেন এ নিয়ে আজ কেউ কোনো কথা বলছে না? জলিল সাহেব তাঁর দীর্ঘ পিটিশনে সরকারের কাছে আবেদন করেছেন যেন এদের বিচার করা হয়। অবশেষে, বর্তমানে সেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে অনেকের রায় ঘোষণা করা হয়েছে। এই গল্প প্রমাণ করে, হুমায়ূন আহমেদ মনে-প্রাণে চাইতেন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হোক, তিনি বিচারের পক্ষে ছিলেন। ‘ফেরা’ গল্পে বাড়ির গৃহকর্তা বেশ রাত্রিতে একটি বড় রুই মাছ নিয়ে গৃহে ফেরেন। দারিদ্র্যজর্জর নিম্নবিত্ত এ পরিবারের প্রতিটি সদস্যের কাছে রাতটি আনন্দময় হয়ে ওঠে—‘বাসন-কোসন কলতলায় রাখতে গিয়ে হাসিনা অবাক হয়ে দেখে মেঘ কেটে অপরূপ জ্যোত্স্না উঠেছে। বৃষ্টি ভেজা গাছতলায় ফুটফুটে জ্যোত্স্না। সে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে সেদিকে। অকারণেই তার চোখে জল এসে যায়।’ গল্পে দেখানো হয়েছে, এ ধরনের মানুষগুলো অল্পতেই তুষ্ট। খুব বেশি ভালো থাকার ইচ্ছে নেই ওদের। জনগণের কাছে রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা কী, রাষ্ট্র জনগণের জীবনের নিরাপত্তা বিধানে কোন কোন অধিকার পূর্ণ করবে, তাঁদের নিয়ে মার্কস-এঙ্গেলস কী বলেছেন, কী বলেছেন লেনিন—তার কিছুই জানতে চায় না এরা। এরা ‘সাবলটার্ন তত্ত্ব’ বোঝে না, ‘সাম্যবাদ’ বোঝে না, এরা শুধু দুমুঠো অন্ন পেলেই ভাবে, জীবন সার্থক। এভাবেই তাদের জীবনের আয়ু বাড়ছে। রাষ্ট্র নামক যন্ত্রটির সঙ্গে তাদের সম্পর্কের দ্বন্দ্ব অধিকারের নয়, যদি বা কিছু থেকে থাকে তবে রাজনৈতিক স্বার্থের। ‘মন্ত্রীর হেলিকপ্টার’ গল্পে দেখা যায়, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে একজন মন্ত্রীর আত্মম্ভরিতা এবং নিজ গ্রামের মানুষের সামনে তার ঐশ্বর্য ও ক্ষমতা প্রদর্শনের অভিলাষ ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে উপস্থাপিত হয়েছে। শুধু জনপ্রিয়তার লোভে মন্ত্রীর হেলিকপ্টারে একজন অসুস্থ রোগীকে নিয়ে যায় চিকিত্সার জন্য, পথিমধ্যে তার অবস্থার আরও অবনতি, পুনরায় তাকে নিয়ে গ্রামে প্রত্যাবর্তন। কিছু সময় পর রোগীটির মৃত্যু এবং জানাজায় অংশ নিয়ে মন্ত্রীর রাজধানী যাত্রার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র নেতার ভণ্ডামি, শঠতা ও অমানবিকতাকে তীব্রভবে বিদ্রূপ করা হয়েছে। বস্তুত, এভাবেই প্রতিনিয়ত রাষ্ট্রের জনগণ প্রতারিত হচ্ছে তাদেরই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা। রাষ্ট্রের বাস্তব চেহারার মুখোশ উন্মোচন করে দিয়েছেন গল্পকার এ গল্পে। জনগণকে নিয়ে তাদেরই জনপ্রতিনিধিদের এমন ভেল্কিভাজি ও ‘ইন্দুর-বিলাই’ খেলা নিরন্তর। এই জনসাধারণ ‘গণতন্ত্র’ বোঝে না, বোঝে শুধু তাদের নেতা নির্বাচিত হলে তাদের ভাগ্য ফিরবে। অথচ ভাগ্য আর ফেরে না। ভাগ্যের চাকা অচল থেকে পাঁচ বছর না ঘুরতেই আবার আসে নির্বাচন। আবারও তারা আশায় বুক বাঁধে, অথচ বিফল। শুধু তাদের ব্যবহার করে জনপ্রতিনিধির ভাগ্যের পরিবর্তন হয়, তাদের নয়। ‘এইসব দিনরাত্রি’ গল্পে উপস্থাপিত হয়েছে সংকট বিক্ষত মধ্যবিত্ত পরিবারের কর্তার কাহিনি। গল্পের প্রণব বাবু বকেয়া বেতনের স্কুল শিক্ষক। তিনি পুত্র-কন্যাদের সাধ পূরণে অক্ষম। আর্থিক সংকটে বিপন্ন মধ্যবিত্ত পিতা। গল্পে স্কুল শিক্ষক প্রণব বাবুর নিয়মিত বেতন হয় না, জ্যাঠার বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া, সেখানে টাকা দেন অনিয়মিত। চা খাওয়ার অভ্যেস আছে, চা জুটলেও চিনি জোটে না, দুধের প্রশ্নই আসে না। বিপন্ন ছেলে সুবলকে প্রয়োজনে টাকা দিতে পারেন না, টাকা দিতে পারেন না শ্বশুরবাড়িতে অসহায় মেয়ে অজুকে। ‘তাঁর যে মেয়ে কোলকাতায় শিবপুরে ছিল, সেও কি একটা ঝামেলায় পড়েছিল। এক হাজার টাকা চেয়ে চিঠি লিখেছিলো। ছোট্ট চিঠি, কিন্তু সেই চিঠি পড়ে তিনি সারারাত ঘুমাতে পারেননি।’ প্রণব বাবুর গণিতের হিসাব মিলে গেলেও জীবনের হিসাব মেলে না। গণিতের চেয়েও জীবন দুর্বোধ্য-কঠিন। মূলত, এই গল্পে বাংলাদেশের শিক্ষকদের দুর্বিষহ জীবনের আলোকপাত করেছেন গল্পকার। একজন শিক্ষক কত টাকা মাইনে পান? রাষ্ট্র তাকে নিয়োজিত রেখেছে মহান একটি পেশায়। অথচ নানা সংকটে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে তাদের জীবন দুর্বিষহ। গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, যিনি শিক্ষা দিচ্ছেন, অথচ তাঁর জীবনের নানা সংকট ও বিপন্নতা থেকে কী-ই শিক্ষা দেওয়ার আছে! তাই প্রণব বাবু শিক্ষার্থীদের অংক করাতে গিয়ে হয়তো হিসাব মেলাতে পারেন, কিন্তু, তাঁর জীবনের গণিতের যে হিসাব মিলে না, তা থেকে কী শিখবে শিক্ষার্থীরা? এই বয়ানের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই মূলত অবস্থান নেন, হুমায়ূন আহমেদ। আর একটা সহানুভূতির চেয়ার এগিয়ে দেন শিক্ষকদের উদ্দেশে। হুমায়ূন আহমেদ ব্যতিক্রমী গল্পপ্রয়াসের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত আর সাধারণ মানুষের জীবনকে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন। রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নানা অনুদ্ঘাটিত বিষয়-চরিত্রসমূহকে গল্পে লিপিবদ্ধ করেছেন। হুমায়ূন আহমেদের রাজনৈতিক সচেতনতা ছিল বলেই আর জনগণের মনোজগত্ তাঁর নখদর্পণে ছিল বলেই তিনি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভেতর দিয়ে মানুষদের দুঃখ ও বেদনাকে রাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বান্দ্বিক সম্পর্কে উপনীত করে শিল্পিতরূপ দিতে সক্ষম হয়েছিলেন।