মানুষটা আর নেই। সত্যিই নেই। তুমি কি কেবলই ছবি শুধু পটে লিখা? তিনি নেই বটে, তবে আছে তাঁর কাজ, বহুমাত্রিক মনোলোভা সৃষ্টিসম্ভার। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় আমরা বলতে পারি—রাতের সব তারাই আছে দিনের আলোর গভীরে। তাঁর প্রস্থানের এক বছর পূর্তি হলো গত ১৯ জুলাই। জন্মদিনও এসে গেল। আমাদের দুর্ভাগ্য, বাংলাদেশের মানুষের যে গড় আয়ু, সেই প্রান্ত স্পর্শ করা সম্ভব হয়নি তাঁর পক্ষে। এটাকে অকালমৃত্যুই বলব। আর পাঁচ কী দশটি বছর বেঁচে থাকলে প্রকৃতির বা পৃথিবীর কী এমন ক্ষতিবৃদ্ধি হতো? জীবনবাদী এই মানুষটির দীর্ঘজীবন লাভের বড়ো বেশি আকাঙ্ক্ষা ছিল। সেই আকাঙ্ক্ষার ছিটেফোঁটাও যদি পূরণ হতো, আমরা আরও লাভবান হতে পারতাম। আরও বেশি ঋদ্ধ হতো সমকালের বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতির নানান শাখা। গভীর জীবনতৃষ্ণায় তিনি মন্থন করে গেছেন তাঁর ভুবন—সোনালি শস্যের সম্ভার উপহার দিয়ে ঋণী করে গেছেন আমাদের। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির বহু শাখায় তাঁর ছিল অনায়াস ও সাবলীল বিচরণ—যা সাফল্যের দ্যুতিতে উদ্ভাসিত মহিমান্বিত। অনন্য মৃত্যুর অল্পকাল আগে নিজেকে ব্যাপৃত করেছিলেন চারুকলা চর্চায়। আমরা জানি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও চারুশিল্পকে অনন্য এক উচ্চতায় স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। চারুকলা চর্চাকে রবীন্দ্রনাথ অভিহিত করেছেন, ‘খেলাচ্ছলে বেলা কাটাবার সঙ্গিনী’ হিসেবে। হুমায়ূন আহমেদ দীর্ঘ সময় পাননি—কালান্তক কর্কট ব্যাধি তাঁকে সেই সুযোগ দেয়নি।
বাংলাদেশের শুধু নয়; সমগ্র বাংলা সাহিত্যেই হুমায়ূন আহমেদ এক অনন্য নাম, স্বতন্ত্র এক প্রতিষ্ঠান। তাঁর অকাল প্রস্থানের শোক বিহ্বলতার রেশ এখনো অন্তর্হিত হয়নি। শোকের বাতাবরণ যখন দূরীভূত হবে—তখন থেকেই তাঁর প্রকৃত মূল্যায়ন পর্ব শুরু হবে। আমার বিবেচনায় সেই পর্ব এখনো পর্যন্ত আসেনি। আরও সময় প্রয়োজন। কথাশিল্প, নাটক, চলচ্চিত্র, বৃক্ষপ্রেম, জাদুশিল্প, সংগীত, ভ্রমণপিপাসা, বিজ্ঞানমনস্কতা, কথকতা, টিভিনাটক-চলচ্চিত্র পরিচালনা, বন্ধুবাত্সল্য, ক্রীড়াপ্রেম, সংগঠন, স্কুলপ্রতিষ্ঠা, অধ্যাপনা—কত জগতেই না ছিল তাঁর অবাধ গতায়াত ও ঈর্ষণীয় সিদ্ধি। এসব জগতে তাঁর স্বজন-সুহূদ, শুভানুধ্যায়ী, ভক্ত-অনুরাগীর সংখ্যা সুপ্রচুর। দেশে বিদেশে সর্বত্র। নিকট ও দূর ভবিষ্যতের সন্ধানী, একনিষ্ঠ গবেষকবৃন্দ হুমায়ূন আহমেদকে আবিষ্কার, পুনরাবিষ্কার, মূল্যায়ন, পুনর্মূল্যায়ন করবেন। নিরাসক্ত দৃষ্টিকোণ থেকে এই বিচার-বিশ্লেষণ সম্পন্ন ও পূর্ণাঙ্গ হবে। এই কাজটি একইসঙ্গে বিশাল ও সুকঠিন। সময় সাপেক্ষও বটে। আমরা গভীর আগ্রহ নিয়ে সেজন্যে অপেক্ষা করতে থাকব।
হুমায়ূন আহমেদের অনন্যতা ও স্বাতন্ত্র্য কী? দু-চার কথায় এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যাবে না। বইবিমুখ বাঙালি পাঠককে তিনি প্রচণ্ড পরিমাণে গ্রন্থপ্রেমিক করে তুলতে পেরেছিলেন। বহু প্রতিষ্ঠান যা করতে পারেনি, তিনি সেটা খুব সহজেই করে ফেলেছিলেন। তাঁর লেখা বই কেনার জন্যে যে সুদীর্ঘ লাইন হতো, সেটা নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজন হতো রীতিমতো পুলিশি হস্তক্ষেপ—ভাবা যায়? জনপ্রিয়তার তুঙ্গে ছিলেন দীর্ঘকাল, আমৃত্যু। এও এমন এক রেকর্ড, যা ভাঙা হয়তো এদেশের বা বাংলা সাহিত্যের কারও পক্ষে সহসাই সম্ভবপর হবে না। অবস্থা এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছিল যখন একুশের বইমেলা ও হুমায়ূন আহমেদ অভিন্ন এক সত্তা হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়। এই দুটি নাম সমার্থক হয়ে পড়ে। হুমায়ূনবিহীন বইমেলা এক নিষ্ঠুর বাস্তব। হূদয়বিদারকও বটে! বহুবছর ধরে নিয়মিত যেতেন একুশের বইমেলায়। পরম ধৈর্য ও আগ্রহ নিয়ে ভক্ত-অনুরাগীদের অটোগ্রাফ দিতেন—ঘণ্টার পর ঘণ্টা, অক্লেশে অম্লানবদনে। ফাঁকে ফাঁকে চলতো বন্ধু সুহূদ স্বজনদের সঙ্গে খোশগল্প, আড্ডাবাজি। জীবনের সায়াহ্ন যত ঘনিয়ে আসছিল, একুশের বইমেলায় তেমন একটা যাওয়া হতো না তাঁর। ভক্তকুলের প্রতীক্ষা আর সফল হতো না।
২.
রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, সহজ কথায় লিখতে আমায় কহ যে/সহজ কথা যায় না লেখা সহজে। হুমায়ূন আহমেদ সহজ কথায় লিখতে পারতেন। আশ্চর্য সেই ক্ষমতা ছিল তাঁর। কে জানে, হয়তো ঐশী কোনো প্রতিভাই ছিল তাঁর মধ্যে। মানব মনের গভীর গোপনে সন্ধানী আলো ফেলতে পারতেন শৈল্পিক নৈপুণ্যে। দক্ষ হাতে ফুটিয়ে তুলতেন মানবিকতা, মনস্তত্ত্ব, সাধারণ আটপৌরে জীবনের হাসি কান্না আনন্দ বিষাদের সরল শিল্পিত আন্তরিক ছবি। স্বভাবসুলভ ব্যঙ্গ রসিকতার কুশলী রসায়নে জারিত করে নিপুণ মুন্সিয়ানায় তা পরিবেশনে তিনি ছিলেন অতুলনীয়। নিজে ছিলেন রসায়নশাস্ত্রের কৃতী ছাত্র, অধ্যাপক। সেই কৃতিত্বের আলো ছড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন দূরের দেশ আমেরিকায়ও। হুমায়ূনের তুলনা হুমায়ূনই। ছিলেন স্বল্পভাষী মানুষ। স্বল্পাহারীও। অসম্ভব আড্ডাপ্রিয়। ভ্রমণপিপাসু। জাদুশিল্পের অনুরাগী। অনেক সময় দলবেষ্টিত থাকলেও ছিলেন ভেতরে ভেতরে প্রচণ্ড নিঃসঙ্গ। তাঁর রসবোধ ছিল খুবই সূক্ষ্ম ও হূদয়স্পর্শী। সত্য উচ্চারণে ছিলেন নির্ভীক। পাছে লোকে কিছু বলে কমপ্লেক্সে আক্রান্ত হননি কোনো সময়ে। এ এক বিরল ব্যতিক্রম নিঃসন্দেহে। এই অকৃত্রিমতা তাঁকে মহিমান্বিত করেছে, ব্যাপক মানুষের হূদয়ের কাছাকাছি পৌঁছে দিয়েছে। যারা তাঁর সঙ্গে পরিচিত, ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তারা জানেন তিনি যেভাবে মজা করে কথা বলতেন, লিখতেনও সেভাবে। এমন অদ্ভুত সাযুজ্য সচরাচর দেখা যায় না।
বাংলাদেশের কথাসাহিত্য যখন প্রায় অফলা এক দুঃসময় পার করছিল—সেই প্রেক্ষাপটে হুমায়ূন আহমেদের আবির্ভাব ও ভুবনজয়। মহান মুক্তিযুদ্ধকে তিনি শিল্পিত কুশলতায় উপস্থাপন করেছেন। চলচ্চিত্রে, নাটকে, কথাশিল্পে সর্বত্র। গীতিকার হিসেবেও তিনি ছিলেন স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত, চমত্কার সফল। স্বাধীন বাংলাদেশে কলকাতানির্ভর পাঠকশ্রেণীকে তিনি ফিরিয়ে আনলেন নিজস্ব শেকড়ে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বই বাণিজ্যে যে পাহাড়প্রমাণ অসমতা ও বৈষম্য—তার দাঁতভাঙা জবাব দিলেন তিনি একা। সাফল্য পেতে বিশেষ সময় লাগেনি। এতটাই প্রবল ছিল তাঁর আত্মবিশ্বাস ও প্রতিভা। কাজটা কোনোক্রমেই সহজ ছিল না—হারকিউলিসের মতো অসাধারণ বীরত্বে তিনি এদেশের প্রকাশনাশিল্পকে মজবুত একটি ভিতের ওপর দাঁড় করিয়ে দিলেন। নিন্দা, হুল, বিদ্রূপবাণ কম সইতে হয়নি তাঁকে। হাসিমুখে, প্রচণ্ড প্রত্যয়ে সেসব অগ্রাহ্য করেছেন। সৃষ্টিমুখর ছিলেন জীবনের শেষ অধ্যায় অব্দি। লেখালেখির এভারেস্ট জয়ের পথযাত্রা ছিল অতীব দুর্গম, কাঁটা বিছানো। সেই পথচলা ছিল নির্মম, রক্তঝরানো। সেই মর্মন্তুদ অভিজ্ঞতার কথা তিনি লিখেছেন ‘সকল কাঁটা ধন্য করে’ নামের আত্মজৈবনিক একটি গ্রন্থে। এই বইয়ের কলামগুলো তিনি লিখেছিলেন তাঁর প্রিয় পত্রিকা দৈনিক বাংলায়। সেই প্রকাশনা পর্বে বর্তমান লেখকের সংযোগ সংশ্লেষ ছিল। ‘আমার বন্ধুরা’ নামে একটি লেখা রয়েছে ওই বইয়ে। লেখকের সেই মহার্ঘ উপলব্ধির পরিচয় আমরা পাই। তিনি লিখছেন,
‘... প্রকাশকদের কথা বলা হচ্ছে—হ্যাঁ আমাকে দিয়ে তাঁদের কিছু স্বার্থ সিদ্ধি তো হবেই। কিন্তু একটা ব্যাপার ভুললে চলবে না। এঁরা আমার উপর যতটা নির্ভরশীল—আমি তাঁদের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। আমার লেখা এদেশের আনাচে কানাচে পৌঁছে দিচ্ছেন এঁরাই। পাঁচ বছর আগের বইমেলায় সর্বাধিক বিক্রীত একটি গ্রন্থের বিক্রয়সংখ্যা ছিল সাত শ’। আজ একজন নবীন লেখকের লেখাও মেলার প্রথম দশ দিনে এক হাজার কপি বিক্রি হয়।
মানুষকে গ্রন্থের প্রতি আগ্রহী করার প্রধান ভূমিকা এই প্রকাশকদের। এঁরা ব্যবসায়ী। একজন ব্যবসায়ী লাভ-লোকসান দেখবেন। কিন্তু আমরা ভুলে যাই যে, এঁরা লাভ-লোকসান বিবেচনা করে চিনি বা পেঁয়াজের ব্যবসায় যাননি। এসেছেন বই-এর ব্যবসায়, যার কোনো স্থিরতা নেই। এঁদের যুদ্ধ করতে হচ্ছে পাশের দেশের শক্তিমান প্রকাশকদের সঙ্গে। যাদের আছে দীর্ঘদিনের প্রকাশনার অভিজ্ঞতা।
আমার বই-এর যাঁরা প্রকাশক, তাঁরা সবাই অল্পবয়স্ক। কারো বয়সই আমার চেয়ে বেশি নয়। প্রতিষ্ঠিত পুরোনো প্রকাশকরা আমার প্রতি আগ্রহী হননি। আগ্রহী হয়েছেন তরুণ প্রকাশকরা—আজ আমাদের প্রকাশনা শিল্পের যে জয় জয়জয়কার, তা তাঁদের উদ্যম এবং কর্মপ্রচেষ্টার সোনালী ফসল।
কলকাতার প্রকশকরা সেখানে আমার নয়টি বই প্রকাশ করেছেন। মনিলিথো কাগজ ব্যবহার করেছেন। তারপরও সেসব বই এবং এদেশে প্রকাশিত আমার বইগুলি যখন পাশাপাশি রাখি, তখন কোনো রকম দ্বিধা ছাড়াই বলতে বাধ্য হই—আমাদের দেশে প্রকাশিত বইগুলির প্রকাশনা মান অনেক অনেক উপরে।
আমরা যাত্রা শুরু করেছি—এই যাত্রা দীর্ঘ যাত্রা। পথ তৈরি নেই। বন কেটে পথ বানাতে হচ্ছে। বানাচ্ছেন এই সময়ের তরুণ প্রকাশকরা। তাঁদের মূর্খ বলে আত্মপ্রসাদ লাভ করতে চাইলে করা যেতে পারে। কিন্তু এই মূর্খ(!)রাই চেষ্টা করে যাচ্ছেন যেন দেশ থেকে ‘মূর্খ’ শব্দটি উঠে যায়।...’
[সকল কাঁটা ধন্য করে/হুমায়ূন আহমেদ/কাকলী প্রকাশনী, প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ১৯৯৫]
হুমায়ূন আহমেদের পূর্ণাঙ্গ জীবনীগ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ এখনই নিতে হবে। তাঁর সম্পর্কে যে যতটুকু জানেন, তা খুঁটিনাটিসমেত লিপিবদ্ধ হওয়া দরকার। অনেক মূল্যবান তথ্য বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাবে নাহলে। তাঁর স্বপ্নের নুহাশ পল্লীকে ঘিরে পরিকল্পিত একটি নগরী গড়ে তুলতে হবে। তাঁর অপূর্ণ একটি বড় স্বপ্ন—ক্যান্সার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার কাজও অবিলম্বে শুরু করা প্রয়োজন। এজন্যে সরকারের মুখাপেক্ষী হয়ে নিষ্ক্রিয় থাকলে বোকামি করা হবে। কাজ শুরু করতে হবে তাঁর সুহূদ স্বজন অনুরাগীদেরই। তখনই প্রমাণ হবে, আমরা এই মহান শিল্পস্রষ্টাকে কতটা ভালোবাসি। এই কাজগুলো করা দুঃসাধ্য কিছু নয়। তাঁর রচনাবলি সংরক্ষণ করতে হবে, শুদ্ধতা বজায় রাখতে হবে। এ কাজ একটি স্থায়ী কমিটি বা ট্রাস্ট-এর ওপরে ন্যস্ত থাকতে পারে। হুমায়ূন স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা, তাঁর নামে রাজধানী ঢাকার বড় একটি সড়কের নামকরণেরও দাবি জানাই। এগুলো তাঁর জীবদ্দশায়ই সূচিত হতে পারত। মৃত্যুর এক বছর পরও এসব দাবি পূরণের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না, সেটি অনভিপ্রেত ও দুঃখজনক। এই মৃত্তিকার মহান সন্তান হুমায়ূন আহমেদের আত্মার চিরশান্তি কামনা করি।
