আচ্ছা মন্টু ভাই, ছাদের এত কানায় দাঁড়িয়ে আছেন কেন? যদি পা পিছলে পড়ে যান?
টেরির বুক ধড়ফড় করছে। শুধু বুক ধড়ফড় না হাতের আঙুলও কাঁপছে।
টেরি আঙুলের দিকে তাকাতে তাকাতে বলল—আজ চমত্কার বাতাস, তাই না মন্টু ভাই?
টেরি হঠাত্ বাতাস নিয়ে কথা বলল কেন, কে জানে। মন্টু ভাই যেকোনো সময় ছাদ থেকে পড়ে যেতে পারেন—এই শঙ্কাটা কি তার চিন্তাজগতকে অসংলগ্ন করে তুলছে?
বছরের এই সময়টায় দক্ষিণ থেকে একটা হাওয়া আসে। ‘কোজি।’ কী বলেন?
টেরি মনে মনে অস্বস্তিতে পড়ে গেল। কোজি আবার কী? টিনেজাররা এই জাতীয় কথা বলে। সে টিনেজার নয়। সামনে তার তৃতীয় বর্ষ সমাপনী।
আপনি কি চা খাবেন?
টেরির অস্বস্তি আরও বেড়ে গেল। কথার প্রসঙ্গ হাওয়া থেকে কীভাবে চায়ের দিকে চলে গেল?
বড় দুলাভাই একটা বিশেষ চা নিয়ে এসেছেন। স্ট্রবেরি অ্যান্ড ম্যাঙ্গো ফ্লেভারের। হাতে দিয়ে বললেন—একটা চা করে খাওয়াও। তোমার আপার মতো কায়দার চা।
মন্টু কিছু বলল না। কায়দার চা বিষয়টা নিয়ে তার প্রশ্ন করা উচিত ছিল। কিন্তু করল না।
বড় দুলাভাইয়ের ধারণা, আপা হচ্ছেন কায়দার মানুষ। তার সবকাজেই একটা কায়দা আছে।
ও। কায়দার চা কি দিয়েছ তাকে?
হুম। চায়ে চুমুক দিয়ে বড় দুলাভাই বললেন—তুমি খুব অদ্ভুত মেয়ে টেরি।
মন্টু কিছু বলল না।
বড় দুলাভাই বললেন—তোমার আর তোমার বড় আপার মধ্যে পার্থক্য কি জানো টেরি? তোমার আপা আমাকে চা দেওয়ার সময় আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকত। আর তুমি অন্য দিকে তাকিয়ে থাকো।
মন্টু পকেট থেকে সিগারেট বের করল। এক ঘষাতেই দেশলাইয়ের কাঠিতে আঙুন লেগে গেল। সিগারেটে টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে মাথার ওপর ঝুলে পড়া ইউক্যালিপটাসের একটা ডালের দিকে তাকাল সে। পাতাগুলো এত তিরতিরে—ইচ্ছে করছে ছুঁয়ে দেখে।
বড় দুলাভাইয়ের কথা শুনে আমি ইশুর দিকে তাকালাম। ও দেখতে একদম বড় আপার মতো হয়েছে। পাতলা নাক। কাটা কাটা চেহারা।
আর সঙ্গে সঙ্গে তোমার চোখে পানি চলে এল, তাই না টেরি?
টেরি কিছু বলতে পারল না। মন্টু ভাই কীভাবে বুঝতে পারলেন ইশুর দিকে তাকানোর সঙ্গে সঙ্গে তার চোখে পানি এল?
টেরির চোখ আবারও ভারী হয়ে উঠছে। আপার কথা মনে পড়লে প্রায়ই তার এমন হয়। আপা এমন একটি কাজ করতে পারল? ইশুর বয়স তখন কত, দুই? দুই বছরের একটা বাচ্চাকে রেখে আপা এমন কাজটি করতে পারল?
আচ্ছা, আপা কোন জায়গায়টায় দাঁড়িয়েছিল? মন্টু ভাই যেখানটায় দাঁড়িয়েছেন—ওখানটাতে?
টেরির বুকে আবারও ধড়ফড় ফিরে এল। তার নিশ্বাস এখন দ্রুত ওঠানামা করছে। মন্টু ভাই কেন ওখানে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন? যদি একটা কিছু সত্যি সত্যি হয়ে যায়? কী ভয়ংকর, মন্টু ভাই পায়ের বুড়ো আঙুলের ওপর দাঁড়িয়ে ইউক্যালিপটাসের একটা ডাল ধরারও চেষ্টা করছেন!
টেরি নিজের অজান্তেই চিত্কার করে উঠল। ভয়ংকর চিত্কার।
ঘুম ভাঙার পর টেরি দেখতে পেল তার সারা গায়ে ঘাম। ইশু বসে আছে বিছানার পাশে। তার মুখে মন্দ একটা হাসি। চোখে মোটা পাওয়ারের চশমা। ছেলেটা এত মোটা চশমা পরেছে কেন? নোটবুক টিপে টিপে চোখের বারোটা বাজিয়ে ফেলেছে?
এই, তুই কবে এসেছিস? অনেক্ষণ?
ইশুর মুখে হাসি।
তুমি কি অনেক ক্লান্ত ছিলে?
তুই কি অনেক্ষণ ধরে বসে আছিস?
হুম।
সঙ্গে বাবা এসেছে?
ইশু এ কথার উত্তর দিলো না। সে বলল অন্য কথা।
বাবা তিন কেজি ইলিশের ডিম নিয়ে এসেছে। বাবা বলছে পদ্মার ইলিশ। আমি বলছি মিয়ানমারের। এটা নিয়ে আমাদের ফাইট।
ইলিশের ডিম কেন?
মা নাকি বলত, তুমি ছোটবেলায় খুব ইলিশের ডিম পছন্দ করতে।
ও।
ইশরারটা দেখতে দেখতে বড় হয়ে যাচ্ছে। সেদিনও হামাগুড়ি দিত। আজ পরিষ্কার উচ্চারণে কথা বলছে। হলুদ রংয়ের হাফপ্যান্টের সঙ্গে স্ট্রাপের একটা পোলো শার্ট পরেছে। ইংরেজের বাচ্চার মতো লাগছে। ইংরেজের বাচ্চাটা এখন একটা মোড়ার ওপর বসে আছে। মুখ চমশা গম্ভীর।
তোর বাবার জন্য চা করছি। তুই খাবি?
হুঁ।
টেরি কাপে ব্রাউন সুগারের একটা চামচ গোলাতে গোলাতে বলল—সরি, নো সুগার ফর ইউ মাস্টার।
ইশু কোনো কথা বলল না।
টেরি আবারও বলল—নো সল্ট ফর ইউ অ্যাস ওয়েল।
ইশু দ্বিতীয়বারও কোনো কথা বলল না। বড় আপাও এরকম ছিল। কেউ কিছু না করলে, কেন না করেছে, প্রশ্ন করত না। কেন করত না, কে জানে।
তুই কি দিন দিন তোর মায়ের ট্রু কপি হয়ে যাচ্ছিস?
হুঁ।
টেরি ইশুর দিকে তাকাল। ইশুটা খুব গম্ভীরভাবে হুঁ বলছে। অথচ বড় আপা যখন মারা যায় তখন তার স্মৃতি পর্যন্ত তৈরি হয়নি।
তুই না কলা পছন্দ করিস, খাবি?
খাব।
টেরি অবাক হয়ে ইশুর দিকে তাকিয়ে আছে। মুহূর্তের ভেতর ছেলেটা চায়ের কথা ভুলে গেল? এই ছেলে কীভাবে এ জগত সংসারে চলবে?
টেরি ইশুর কোলের কাছে গিয়ে বসল। ছেলেটাকে তার কিছু কঠিন কঠিন কথা বলতে ইচ্ছে করছে। যেমন—এই! তুই কি একটা গাধা ছেলে? আমাকে না ডেকে অনেক্ষণ ধরে বিছনার পাশে বসে ছিলি কেন?
টেরি কোনো কঠিন কথা বলতে পারল না। কোনো এক বিচিত্র কারণে তার হূদয় কোমল হয়ে উঠল। সে বলল—তুমি কি জানো, আজকের এ দিনটাতে তোমার মায়ের বিয়ে হয়েছিল?
জানি। আমি মায়ের জন্য একটা স্পেশাল কার্ড বানিয়েছি। কাউকে দেখাইনি।
বাবাকেও না?
না।
আমাকে দেখাবে?
হ্যাঁ।
টেরির ইচ্ছে করল ছেলেটিকে শক্ত করে কিছুক্ষণ বুকে জড়িয়ে ধরতে। কিন্তু ধরল না। কেন ধরল না, কে জানে।
শাহেদ কিছুটা বাঁকা হয়ে বসে আছে। টেরিকে দেখার পরও তার সে বসার ভঙ্গির কোনো পরিবর্তন হলো না।
কেমন আছেন দুলাভাই?
ভালো।
বড় দুলাভাইয়ের কণ্ঠ কি আরও ভারী হয়ে গেছে? পুরুষ মানুষের কণ্ঠ যখন ভারী হয়, শুনতে ভালো লাগে।
হুট করে চলে এলাম। হঠাত্ ইশুরও কয়েকটা দিন ছুটি মিলে গেল।
টেরি মনে মনে হাসে। এই বাড়িতে এলে প্রায় প্রতিবার বড় দুলাভাই একটা কৈফিয়তের মতো দেবেন। এই বাড়ি তো তার নিজের শ্বশুরবাড়ি। এই বাড়িতেই তো আপাকে নিয়ে তাদের যুগল জীবনের প্রথম রাতটি কেটেছে। ওই দক্ষিণ দিকের ঘরটায়। সময়টা শীতকাল ছিল। খাট টেনে ঘরের মাঝখানে আনা হলো। যাতে সিলিং থেকে খাটের চারপাশে বেলিফুলের একটা একটা ধারা ফেলা যায়। টেরির এখনো মনে আছে, বড় দুলাভাই ফুল সহ্য করতে পারেন না। হেই ফিভারের মতো হয়। একটু পরই তার হাঁছি শুরু হয়ে যাবে—এই আশংকায় আপার চোখ বারবার অস্থির হয়ে উঠছিল।
আজকে একটা স্বপ্ন দেখেছি, দুলাভাই।
শাহেদ চায়ে চুমুক দিল।
দেখেছি আপনি একটা বিশেষ চা নিয়ে এসেছেন।
শাহেদ কোনো উত্তর করল না। তাকে দেখে মনে হচ্ছে, চা খাওয়া একটা বড় রকম দায়িত্বের কাজ—দায়িত্বটা সে পালন করছে।
ইশুকে নিয়ে শেষ পর্যন্ত কী ভেবেছেন, দুলাভাই?
মুহিদ আছে, ওর বউ-বাচ্চারা আছে, সে ওখানেই বরং ভালো থাকবে। তুমি কী বলো?
আপনি সত্যি ওকে চিটাগাং ওর চাচার বাসায় রেখে আসবেন?
শাহেদ কিছু বলল না।
আপনারা কবে চিটাগাং যাচ্ছেন? আজই?
হুম।
এজন্যে দেখা করতে এসেছেন?
শাহেদ আবারও কিছু বলল না।
ট্রেন কি এগারোটায়?
হ্যাঁ।
টেরি কোনো কথা বলতে পারল না। ক্রমশ তার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। ইশু সত্যি সত্যি চিটাগাং চলে যাবে?
চা খেতে ভালো হয়েছে, টেরি।
টেরি কিছু বলল না।
তোমাদের পাশের ভিলাটার নাম যেন কী?
মমতা ভিলা।
একটা বিশ্রী কাণ্ড সেখানে। দেশটাইতো বিশ্রী হয়ে গেছে! আসার সময় মমতা ভিলার সামনে একটা জটলার মতো দেখলাম। মাথার অর্ধেকটা ভেঙে পড়ে রাস্তায় গেছে!
কী বলছেন?
ছাদ থেকে পড়ে গিয়েছে। কেউ কি আর শুধু শুধু পড়ে যায়? আমি বলি, লাফ দিয়েছে। এই মুহূর্তে ছেলেটার নাম ঠিক মনে করতে পারছি না। তবে ম দিয়ে। মন্টু ফন্টু হয়তো হবে।
মুহূর্তের ভেতর টেরির সমস্ত শরীর নিবিড় হয়ে উঠল। স্তব্দ হয়ে গেল কান। মনে হলো চারপাশটা ক্রমশ গম্ভীর হয়ে আসছে।
শুতে শুতে অনেক রাত হয়ে গেল টেরির। সাধারণত খুব সহজে তার চোখে ঘুম আসতে চায় না। অনেক্ষণ ধরে মোবাইল টেপাটেপি করতে হয়। দু-এক পাতা গল্পের বই পড়তে হয়। কিন্তু আজ শোয়ামাত্রই সে ঘুমিয়ে পড়ল। শুধু ঘুম না, ঘুমের ভেতর সে অদ্ভুত একটা স্বপ্নও দেখল। দেখল, মন্টু বসে আছে ছাদে। তার হাতে রিচমন্ড সিগারেট।
টেরি চমকে উঠল।
মন্টু ভাই?
অবাক হয়েছ? তোমার কি ধারণা মমতাভিলায় একজনই শুধু মন্টু থাকে? গুনে গুনে তিনজন।
টেরি স্থির দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে থাকল।
তুমি বোধহয় আমার কথা বিশ্বাস করতে পারছ না। ঠিক আছে তাহলে তোমাকে একটু চমকে দিই। কী বলো? ইশু কি তোমাকে একটা কার্ড দেখিয়েছে?
টেরি সত্যি সত্যি চমকে উঠল।
ইশু আমাকে কার্ড দেখিয়েছে সেটা আপনি কীভাবে জানেন?
আমি জানি না। তবে ধারণা করেছি। এই বয়সের ছেলেমেয়েরা মাকে কল্পনা করে অনেক কিছু করে। বিশেষ করে স্পেশাল দিনগুলোতে। যেমন রাইম ধরনের কবিতা, কার্ড। কবিতা হবার সম্ভাবনা কম। ইংলিশ মিডিয়ামের ছেলেমেয়েদের মাঝে কার্ড তৈরির একটা বিশেষ ঝোঁক আছে। আমি শুধু কাণ্ডজ্ঞান প্রয়োগ করছি।
টেরি কিছু বলার আগেই মন্টু বলল—আমার ধারণা কার্ডটার কোনো একটা অংশে একটা ছবিও আঁকা ছিল। ইশুর মায়ের ছবি। সঠিক?
হুম। ছবিতে আপা একটা গাছের নিচে বসে আছে।
আপার হাতে নিশ্চয় একটা আইসক্রিম ছিল?
টেরি আবারও চমকে গেল।
কাণ্ডজ্ঞান প্রয়োগ করছি। কারণ, মহিলারা সাধারণত খুব গরম না হলে গাছের নিচে গিয়ে বসেন না। আমার ধারণা, ছবিটাতে আপার হাতে আইসক্রিমও ছিল। ক্রোন। এটা একটা সাধারণ দৃশ্য। মায়েরা যখন তাদের সন্তানদের স্কুল থেকে আনতে যায়, তারা মধ্যাহ্নের কোনো কোনো সময় গাছের ছায়ায় বসে আইসক্রিম খেয়ে কাটায়। ইশু স্কুলের আশপাশে প্রায় এই দৃশ্যগুলো দেখে। দেখে না?
টেরি চুপ করে থাকল। অনেক্ষণ কিছু বলল না মন্টুও। তাদের এই নীরবতার মাঝখানে একটা অ্যাম্বুলেন্স বিকট শব্দ করে ছুটে গেল হাসপাতালের দিকে।
মন্টু বলল—কানের পাশে ফুলটা তুমি আজ নতুন পরেছ টেরি। ছবিতে আপার কানের পাশে নিশ্চয় এইরকম একটা ফুল গোঁজা ছিল। ছিল না?
টেরি অবাক হয়ে মন্টুর দিকে তাকিয়ে আছে। মন্টুর চোখ দুটি এখন অস্থির। ছবিতে আপার কানের পাশে নিশ্চয় এইরকম একটা ফুল গোঁজা ছিল—এই কথার অর্থ কী? মন্টু ভাইয়ের কী হয়েছে?
অনেক্ষণ ধরে মন্টু সিগারেটে টান দিচ্ছে না। সিগারেটের আগুনের মুখে লম্বা একটা ছাইয়ের অংশ জমা হয়ে আছে।
আমার কাণ্ডজ্ঞান-মাত্রা সাংঘাতিক। ঘর থেকে বের হবার সময় বড় দুলাভাই তোমাকে কী বলেছেন সেটাও আমি বলে দিতে পারি। বলব?
টেরি কিছু বলল না।
বলেছেন—তোমার আর তোমার বড় আপার মধ্যে পার্থক্য কি জানো, সে বিদায় দেবার সময় চোখের দিকে তাকাত, আর তুমি অন্য দিকে তাকিয়ে থাকো। আমি কি ঠিক বললাম?
টেরি আর কোনো কথা বলতে পারল না। তার চোখে এখন জল। তার এখন খুব কাঁদতে ইচ্ছে করছে। মন্টু ভাইকে একটু ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করছে।
মন্টু মাথা গুঁজে বসে সিগারেট টানছে। নিচের দিকে একটা একটা করে সিড়ি ভাঙছে টেরি।
