ব্রাদারহুডের নতুন কৌশল

আপডেট : ১৭ নভেম্বর ২০১৩, ২০:৩৮
স্বৈরশাসন থেকে মুক্ত হয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন নিয়ে মিসরের বিক্ষোভকারীরা হোসনি মোবারককে গদিচ্যুত করেছিলেন, তা এখনও বাস্তবে রূপ নেয়নি। আদৌ সেদেশে গণতন্ত্র আসবে কি-না, তা কেউ জানে না। দেশটির প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করে আবারো প্রতিষ্ঠিত হয় সেনাশাসন। এর প্রতিবাদে মুরসির সমর্থক ও মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতা-কর্মীরা মাঠে নামলে তাদের কঠোর হাতে দমন করা হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে নিহত হয় প্রায় হাজারখানেক মানুষ। কারাগারে বন্দি করা হয়েছে মুরসিসহ মুসলিম ব্রাদারহুডের সব নেতাকে। তবুও থেমে নেই সরকার বিরোধী আন্দোলন। মুসলিম ব্রাদারহুড নিষিদ্ধ হওয়ার পর আন্দোলনের কৌশল বদলেছে এর নেতা-কর্মী-সমর্থকরা। ক্ষমতায় টিকে থাকতে বসে নেই কায়রোর সেনাসমর্থিত সরকারও। তারাও ঝেড়ে ফেলছে পুরোনো কৌশল। নিচ্ছে নতুন পররাষ্ট্রনীতি। ১৯৭১ সালের পর মিসরের রাজনীতি ও উন্নয়নের একমাত্র নক্ষত্র হয়ে ওঠে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু বিগত তিন বছর ধরে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে দেশটির প্রায় প্রত্যেক ক্ষমতাধারী ও প্রভাবশালীকে ক্ষেপিয়ে তুলেছে ওয়াশিংটন। দীর্ঘদিনের বন্ধু হোসনি মোবারকের বিরুদ্ধে ২০১১ সালের গণঅভ্যুত্থান ও তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়ার প্রতি সমর্থন জানায় যুক্তরাষ্ট্র। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হলেও মুসলিম ব্রাদারহুড নেতৃত্বাধীন সরকারকে স্বীকৃতি দেয় ওয়াশিংটন। সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট মুরসিকে অপসারণ করা হলেও সে কাজে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন জোটেনি দীর্ঘদিনের মিত্র মিসরীয় সেনাবাহিনীর। বরং ওবামা প্রশাসনের কড়া সমালোচনার শিকার হতে হয়েছে তাদের। তাতেও ক্ষান্ত হয়নি যুক্তরাষ্ট্র। বরং মিসরীয় সামরিক বাহিনীর জন্য নিয়মিত সাহায্য বরাদ্দ হঠাত্ করেই কমানোর ঘোষণা দিলো ওয়াশিংটন। সাহায্যের এই অর্থ মোটেই মামুলি নয়, বার্ষিক প্রায় দেড়শ’ কোটি মার্কিন ডলার। এসব কারণে পরিবর্তিত পররাষ্ট্রনীতিতে রাশিয়ার দিকে ঝুঁকছে মিসর। গত বৃহস্পতিবার কায়রো সফর করেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সার্গেই লাভরভ ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী সার্গেই শোইগুসহ মস্কোর উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম জানিয়েছে, তাদের এই সফর ছিলো মিসরের অতি আকাঙ্ক্ষিত একটা বিষয়। বিশেষ করে রুশ সরকারের সাথে কয়েক বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি অস্ত্র চুক্তি করার কথাও শোনা যাচ্ছে। আসলে যুক্তরাষ্ট্রের বদলে রাশিয়াকে এখন বেশি নির্ভরযোগ্য মিত্র বলে ভাবতে শুরু করেছে মিসর। এমনকি সরকার এবং তার বিরোধী মুসলিম ব্রাদারহুড উভয়েই এমনটা মনে করছে। সেনাসমর্থিত সরকারের উপলব্ধি হলো, যুক্তরাষ্ট্র মুসলিম ব্রাদারহুডকে সমর্থন দিচ্ছে। আর মুসলিম ব্রাদারহুড মনে করছে, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুরসিকে ক্ষমতা থেকে উত্খাত করা হলেও ওয়াশিংটন এর বিরুদ্ধে খুব কমই নিন্দা জানিয়েছে। তারা বলছেন, মিসরে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ওবামা প্রশাসনের অনেক কিছুই করার ছিলো। দেশের বিভিন্ন স্থানে তাই ঝুলতে দেখা গেছে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ছবিসম্বলিত রঙিন পোস্টার। এ ব্যাপারে মিসরীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য খুবই স্পষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বদর আবদেল আত্তি গণমাধ্যমকে জানান, রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীর কায়রো সফর বিশ্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। যদিও কারও বুঝতে বাকি নেই যে, বিশ্ব বলতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকেই বোঝাতে চাইছেন। মিসরের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় বলা হচ্ছিল, মস্কো ওয়াশিংটনের বিকল্প হতে পারে বা হতে যাচ্ছে। তবে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প নয় বলে উড়িয়ে দেন রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লাভরভ। তিনি জানান, রুশ-মিসর সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদী ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে। মিসরীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী নাবিল ফাহমিও বলেন, একজনের জায়গায় অন্যজনকে বসানো নয়, বরং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কায়রো তার পররাষ্ট্রনীতির পরিধি বিস্তৃত করছে। তিনি জানান, পর্যটন থেকে শুরু করে পররাষ্ট্রনীতির সব বিষয় নিয়েই খোলামেলা আলোচনা হয়েছে দু’দেশের নেতাদের মধ্যে। তবে কায়রোতে লাভরভের সফর নিয়মিত হলেও রুশ প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দু’দিনের ঐ সফর ছিলো ১৯৭১ সালের পর প্রথম। কিন্তু কয়েক বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র চুক্তিসহ তেমন সুনির্দিষ্ট কোন বিষয়ে অগ্রগতি হয়নি তাদের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে। বহুল আকাঙ্ক্ষিত ঐ চুক্তি নিয়ে সপ্তাহজুড়ে মিসরের সবক’টি পত্রপত্রিকা ও গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। গামাল আবদুল নাসের মিসরের প্রেসিডেন্ট থাকাকালে মস্কো ছিলো কায়রোর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র। সোভিয়েত ইউনিয়নে তিনি ছিলেন জনপ্রিয় নায়ক। কারণ নাসেরের বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মসূচি ও তার পররাষ্ট্রনীতি পশ্চিমাদের প্রায়ই ঝামেলায় ফেলে দিতো। প্রেসিডেন্ট নাসের মারা যান ১৯৭০ সালে। ক্ষমতা গ্রহণ করেন আনোয়ার সাদাত। তিনিই সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে যান। তবে এখানে একটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির খেলাও অন্তর্নিহিত রয়েছে। সেটা হলো সিরিয়া ইস্যু। রুশ-সিরিয়া দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় এ ইস্যুতে কায়রো মস্কোর সাথে প্রায় একমত। সোজা কথায়, সিরীয় প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের বিরুদ্ধে নয় মিসর। সম্ভবত এখানেই মস্কোর যত আগ্রহ। ক্ষমতাচ্যুত হবার আগে সিরিয়ার বিদ্রোহীদের পক্ষে পরিষ্কার সমর্থন জানিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট মুরসি। তাও আবার ধর্মভিত্তিক গোষ্ঠীগুলোর আয়োজনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই সমর্থন জানিয়েছিলেন। যা অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছিলো মিসরের অনেক সেনা কর্মকর্তাকে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মুরসির ঐ বক্তব্য তার বিরুদ্ধে সেনা অভ্যুত্থান ঘটার অন্যতম কারণ। তারা বলছেন, আরব বসন্তের পর মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমেই বাড়ছে ক্ষমতার শূন্যতা। এরই মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন একটি সরকারের সাথে রাশিয়ার দহরম-মহরমকে যুক্তরাষ্ট্র কিভাবে নেবে, সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সরকার বিরোধী আন্দোলন কৌশল পরিবর্তন করছে মুসলিম ব্রাদারহুডও। একই সাথে কয়েক হাজার মানুষের সমাবেশ না করে এখন তারা জড়ো হচ্ছেন ছোট ছোট বিক্ষোভ সমাবেশে। গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে সমাবেশ করছেন সপ্তাহে একবার, শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর। তারা এই সমাবেশকে বলছেন শান্তিপূর্ণ। সমাবেশকারীরা এ সময় আকাশে চার আঙ্গুল উঁচিয়ে একটি ইঙ্গিত করছেন। দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠা এই ইঙ্গিতকে তারা বলছেন রাবায়া। মূলত রাবায়া আল আদাবিয়া স্কোয়ারে সেনা অভিযানে কয়েকশ’ মুরসি সমর্থকের প্রাণহানিকে আন্দোলনকারীরা স্মরণ করছেন এভাবে। তারা এখনও আশা করছেন, এত শত মানুষের প্রাণের বিনিময়ে মুরসি আবারো ফিরবেন তাদের মাঝে। তবে পরিবর্তিত কৌশল অনুযায়ী সেনাসমর্থিত সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীরা আর কখনই এক স্থানে সর্বশক্তি নিয়ে নামবেন না। নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে গণগ্রেফতার হবার ভয়েই তারা এই কৌশল নিয়েছেন। তারা বলছেন, এত গ্রেফতার ও হতাহতের পর আন্দোলনে তারা ক্লান্ত। কিন্তু তারা পরাভূত নয়। মুরসির বিচারকেও একত্রিত হবার একটি উপলক্ষ বলে মনে করছেন আন্দোলনকারীরা। তবে যে কোন সময় গ্রেফতার হবার ভয় সবসময়ই তাড়া করছে তাদের। কারণ মুসলিম ব্রাদারহুড এখন একটি নিষিদ্ধ সংগঠন। ধর্মভিত্তিক এই সংগঠনের রাজনৈতিক কার্যক্রম চালানো মিসরে আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।