‘কাকতালীয়’ সেই মৃত্যুগুলো

আপডেট : ১৭ নভেম্বর ২০১৩, ২০:৩৯
হ্যালির কমেট ও মার্ক টোয়েন ‘অ্যাডভেঞ্জার অব টম সয়্যার’, ‘অ্যাডভেঞ্চার অব হাক্লবেরি ফিন’ খ্যাত মার্কিন ঔপন্যাসিক মার্ক টোয়েন জন্মগ্রহণ করেন ১৮৩৫ সালের ৩০ নভেম্বর। ঠিক ঐ তারিখেই আকাশে হ্যালির ধূমকেতুর আবির্ভাব ঘটে। বড় হওয়ার পর ঐ ঘটনা শুনে অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় টোয়েন মজা করে বলেছিলেন, ‘আমি এসেছিলাম হ্যালির সাথে, যাবও তারই সঙ্গে।’ অবিশ্বাস্য শোনালেও সত্যি, টোয়েনের সেই আশা পূরণ হয়েছিল। ৭৫ বছর পর ১৯১০ সালের ২১ এপ্রিল সূর্যের ওপাশ থেকে ঊঁকি দেয় হ্যালির ধূমকেতু, তার সাথে মারা যান মার্ক টোয়েন। কার্টুন সমাপ্তির ঘোষণা দিয়েই কার্টুনিস্টের মৃত্যু বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপা হয় মজার কার্টুন পিনাটস। এর স্রষ্টা বিশ্ববিখ্যাত কার্টুনিস্ট চার্লস শুলজ টানা ৫০ বছর পিনাটস আঁকা শেষে ১৯৯৯ সালের ১৪ ডিসেম্বর অবসর গ্রহণের ঘোষণা দেন। আর পিনাটস-এর শেষ স্ট্রিপটি প্রকাশের ঠিক আগের দিন ২০০০ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অন্ত্রের ক্যান্সারে মারা যান শুলজ। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষণা দিবসে দুই ঘোষকের মৃত্যু ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেন এর রচয়িতা টমাস জেফারসন, জন অ্যাডামস ও বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন। দেশটির দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রেসিডেন্ট ছিলেন যথাক্রমে জন অ্যাডামস ও টমাস জেফারসন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১৫তম স্বাধীনতা দিবসে টমাস জেফারসন ছিলেন গুরুতর অসুস্থ। বিছানা ছেড়ে ওঠার মতো অবস্থা ছিল না তার। ঘরের বাইরে বাজছিল বিউগলের সুর। শয্যাশায়ী টমাস আকুল কণ্ঠে আশেপাশের লোকদের প্রশ্ন করলেন- ‘এটা কী ৪ জুলাই?’ তাকে সেটা বলামাত্রই তিনি পরম শান্তিতে চোখ বুঁজলেন। চলে গেলেন ওপারে। আর যুক্তরাষ্ট্রের ৫০তম স্বাধীনতা দিবসে ১৮২৬ সালের ৪ জুলাই মারা যান দেশটির আরেক সাবেক প্রেসিডেন্ট জন অ্যাডামস। লাইফ ম্যাগাজিনের হাত ধরেই জন্ম-মৃত্যু বিশ্ববিখ্যাত লাইফ ম্যাগাজিনের প্রথম সংখ্যাটি বের হয় ১৯৩৬ সালে। ঐদিনে জন্মগ্রহণকারী এক শিশুর ছবি ছাপা হয় প্রথম সংখ্যার প্রচ্ছদে এবং জর্জ স্টোরি নাম দেয়া সেই শিশুটিকে ঘিরেই মূল প্রতিবেদন রচিত হয়। শিরোনাম ছিল- ‘একটি প্রাণের সূচনা’। ২০০০ সালের মার্চে লাইফ ম্যাগাজিনের শেষ সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়। শিরোনাম ছিল-‘একটি প্রাণের শেষ’। এর পরই হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান জর্জ স্টোরি। ১৩-তে ভয়, ১৩-তেই ক্ষয় ১৮৭৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন অস্ট্রিয়ান সুরস্রষ্টা আর্নল্ড শোনবার্গ। বড় হওয়ার পর নিজ জন্ম-তারিখ শোনার পর থেকেই আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়েন তিনি। ‘অশুভ ১৩’ সংখ্যাটি সারাজীবন তাড়া করে ফেরে তাকে। তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে এই ১৩ই হবে তার কাল। ১৩ সংখ্যাটিকে তিনি এতই ভয় করতেন যে তিনি তার সৃষ্ট বিখ্যাত একটি কম্পোজিশনের নামের বানান থেকে একটি অক্ষর বাদই দিয়ে দেন। কারণ ঐ নামে মোট অক্ষর ছিল ১৩টি। গোদের ওপর বিষফোঁড়া হয়ে দেখা দেয় এক জ্যোতিষীর গণনা। শোনবার্গের যখন ৭৬ বছরে পা দেন, সে সময় ঐ জ্যোতিষী তাকে বলে বসেন তার বয়সের দুটি সংখ্যার যোগফল ১৩ (৭+৬), যা তার জন্য অত্যন্ত অশুভ। এ কথা শুনে ভয়ে শোনবার্গের সারা শরীর অবশ হয়ে যায় এবং তিনি বিছানা নেন। আর ১৯৫১ সালের ১৩ জুলাই মারা যান তিনি। মৃত্যুর গান গাইতে গাইতে মঞ্চে গায়কের মৃত্যু যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের মেট্রোপলিটন অপেরা হাউসে একবার ঘটে এক অভাবনীয় ঘটনা। মঞ্চে মৃত্যুর গান গাইতে গাইতে মারা যান লিওনার্ড ওয়ারেন নামে এক বিখ্যাত অপেরা গায়ক। প্রায় একইভাবে মারা যান আমাদের দেশের বিখ্যাত গায়ক ফিরোজ সাঁই। ‘এক সেকেন্ডের নাই ভরসা, বন্ধ হইব রঙ তামাশা, চক্ষু বুঁজিলে, হায়রে দম ফুরাইলে’- এ গান গেয়ে মঞ্চ থেকে ফিরেই হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান জনপ্রিয় এই সঙ্গীত শিল্পী। জেনারেলের মুখে এসে লাগলো গুলি তখন যুক্তরাষ্ট্রে গৃহযুদ্ধ চলছিল। স্পটসিলভানিয়া কোর্ট হাউস যুদ্ধক্ষেত্রে ইউনিয়ন আর্মির জেনারেল জন সেডউইক তার বাহিনীকে নিয়ে প্রতিপক্ষের ওপর চড়াও হওয়ার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু কনফেডারেট বাহিনীর স্নাইপারদের গুলির তোড়ে সামনে আগাতে পারছিল না ইউনিয়ন আর্মি। সৈন্যরা যখন গুলি থেকে গা বাঁচাতে ব্যস্ত, জেনারেল সেডউইক তখন তাদের ভর্ত্সনা করে বলে ওঠেন, ‘তোমাদের মতো ভীরুদের জন্য আমি লজ্জাবোধ করছি। এভাবে অহেতুক গা বাঁচাতে চাইছ কেন? এত দূর থেকে ছোঁড়া গুলি হাতির গায়েও লাগবে না।’ একথা বলতেই সেডউইকের মুখে এসে লাগলো একটা গুলি। সাথে সাথেই মারা যান সাহসী এই জেনারেল। একই তারিখে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেলেন স্বামী-স্ত্রী এ বছরেরই ২৯ জুলাইয়ের ঘটনা। স্বামীর মৃত্যুবার্ষিকীর দিন ৮৮ বছরের বৃদ্ধা মার্গারেট সোডার মেয়ে রেনাট বার্লকে নিয়ে যাচ্ছিলেন কবরস্থানে, স্বামীর কবরে ফুল দিতে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে পথে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান মার্গারেট। সামান্য আহত হন রেনাট। ৫৬ বছর আগে ১৯৫৭ সালের ২৯ জুলাই কর্মস্থলে এক দুর্ঘটনায় মারা যান মার্গারেটের স্বামী এমিল সোডার। মেয়ে রেনাট মনে করেন, সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছাতেই তার বাবার মতো মাও একই দিনে দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। যমজ দু’ভাইয়ের একইদিনে একইভাবে মৃত্যু ২০০২ সালের একটি দিনে ফিনল্যান্ডের রাহি অঞ্চলে বইছিল তুমুল তুষার ঝড়। এসময়ে রাস্তায় সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছিলেন ৭০ বছর বয়সী যমজ দুই ভাই। একজন জোরে চালিয়ে প্রায় মাইল দেড়েক এগিয়ে যান। হঠাত্ বরফের পর্দা ভেদ করে সামনে এসে পড়লো এক দানব ট্রাক। তার চাকায় পিষ্ট হয়ে মারা গেলেন এক ভাই। পেছনে পড়ে থাকা অপর ভাই জানেন না এসবের কিছুই। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস। কিছুক্ষণের মধ্যে ভাইয়ের মতোই ট্রাক চাপা পড়ে মারা গেলেন তিনিও।