আগুন জ্বেলে ইস্পাতের পাইপ দিয়ে সোনার বল খাঁটি করার কাজ করছে ওরা। ওদের একজনের নাম তৌহিদ, অন্যজন জসিম আর একজন তাহের। বাইরের তাপমাত্রা তেমন প্রচণ্ড না হলেও ভেতরে আগুনের গরমে ওরা সকলেই উদম গায়ে। একটি স্বর্ণের কারখানায় কর্মরত এদের বয়স দশ থেকে তের বছরের মধ্যে।
ওদের কারো বাড়ি ফরিদপুর, কেউ রাজবাড়ীর, কারো মানিকগঞ্জ, কারো আবার অন্য কোন জেলায়। কেউ পদ্মার চরে উন্মুক্ত আকাশের নিচে দুরন্তপনায় মেতেছে। কেউ মায়ের আচল ধরে এপাড়া ওপাড়া ঘুরেছে। স্কুলে যায়নি বলে বাবার উত্তম মধ্যম খেয়ে কেউ অভুক্ত পাশের বাড়িতে পালিয়েছে। সেই দিগন্ত বিস্তৃত জীবন আজ তাদের থিতু হয়েছে আট ফুট/নয় ফুটের ছোট্ট ঘরে। কখনো বা এর চেয়ে একটু বড় আবার একটু ছোট চারদেয়ালে কাজ, খাওয়া, ঘুমানোর মধ্যদিয়ে শুরু করেছে তারা স্বর্ণশিল্পী হওয়ার আটপৌঁড়ে জীবন। একাজে সাথী হয়েছে কারো আগুনের চুল্লি আর ফুঁ দেয়ার জন্য একটি ইস্পাতের নল; কারো হাতুড়ি আর মহিষের শিংহ দিয়ে তৈরি ছাঁচ। আবার কারো, সোনার পাতে খাঁচ কাটার জন্য কাঁচা পাত মেশিন। আর সোনাকে পাকা করার কাজে ব্যবহার করা নাইট্রিক ও সালফিউরিক এসিডে পোড়ার ঝুঁকিতো আছেই। ঢাকার তাঁতি বাজারে নগরীর সবচেয়ে বড় স্বর্ণ কারখানা এলাকার শিশু কারিগরদের সম্পর্কে এলাকার মালিক সমিতির পক্ষ থেকে জানা যায়, এখানে প্রায় পনের হাজার কারিগরের মধ্যে এক হাজারেরও বেশি শ্রমিকের বয়স নয় বছর থেকে চৌদ্দ বছর। আর বয়সের কোঠা আঠার বছর ধরলে কারিগরদের এক-তৃতীয়াংশই এই বয়সের। অভাবের তাড়নায় বাড়ি ছেড়ে এরা নিকট আত্মীয় অথবা পাড়া-প্রতিবেশির হাত ধরে তাঁতীবাজার আসে। প্রথমে পেটে-ভাতে কাজ শেখার পালা শুরু হয়। কাজ শেখা হলে এক হাজার থেকে তিন হাজার টাকা পারিশ্রমিক পায় এই শিশুরা। আর যখন পুরোদস্তুর কারিগর হতে পারে তখন গহনা তৈরির উপর ভরি প্রতি এক আনা ওজনের সোনা তাদের পারিশ্রমিক নির্ধারণ হয়। নেই কোন বেতন বোনাস। তবে কাজ থাকলে এতে মন্দ নয় বলে জানান তাঁতীবাজার মিত্র ভবনের ১৬ বছরের কারিগর মো. জহির। আট বছরের আল-আমিন এসেছে ফরিদপুর থেকে। হাতে গোনা দশ বারোদিন তার কেবলই বাড়ির কথা মনে হতো। কিন্তু যখন তারই বয়সের মো. সেলিম মানিকগঞ্জ থেকে পাশের দোকানে আসে, তখন থেকে একে অন্যের কাজের ফাঁকে সঙ্গী হয়ে জীবন সংগ্রামে মাথানত করে। আল-আমিনকে প্রশ্ন করি, পড়াশুনা করেছ? সে জানায়, টুতে কয়েক দিন ক্লাস করেছে। তিনভাই এক বোনের সংসারের দায়িত্ব নিতে অপারগ তার বাবা। তাই বড় সন্তান নিজের আর পরিবারের বড় দায় নিয়ে দোকানের মালিকের সাথে স্বর্ণ শিল্পী হতে বাড়ি ছাড়ে। যদিও সে শিল্পীর অর্থ বোঝে না, তবে এটা বোঝে তাকে এই কাজই করতে হবে। বাপ্পি ঘোষ বলেন আমাদের দেশের দরিদ্র বাবা-মা সন্তানদের জীবন গোছাতে পারে না। এদের জন্য পড়াশুনা নেই। যদি থাকতো তাহলে এই বয়সে তার কাজ করতে হতো না। আর নামেই শুধু তারা স্বর্ণের কারিগর স্বর্ণ ব্যবসার এই দুর্দিনে এই শিশুদের কোন ভবিষ্যত্ নেই সত্যি কথা।
স্বর্ণ শিল্পীদের জন্য সমিতি থাকলেও এই শিশুদের নেই সদস্যপদ। এই সত্যি কথাকে আগুনে পোঁড়া সোনার মতো খাঁটি বলে উপলব্ধি করে আর এক শিশু কারিগর কৃষ্ণ গোস্বামী। কৃষ্ণের বয়স তের বছর। তবে দেখলে দশ বছরের বেশি মনে হয় না। শুধু কৃষ্ণের নয়, এই এলাকায় যে সকল কারিগর দুই তিন বছর কাজ করছে তাদের বেশির ভাগ শিশুকে দেখলে বয়সের তুলনায় ছোট মনে হয়। এসিড পোঁড়া ধোঁয়া, ধুলাবালি আর বদ্ধ ঘরের জীবন তাদের বৃদ্ধিকে মনে হয় বাধাগ্রস্ত করছে।
বাপ্পি ঘোষ জানান, শুধু বৃদ্ধিকে নয় যে কোন মুর্হূতে তাদের এসিডে ঝলসে গিয়ে থমকে যাওয়া জীবনের আশঙ্কাও থাকে।
বিশেষ করে যারা পালিশের কাজ করে তাদের এসিডে পোড়ার নজির আছে। বাপ্পি নিজেও বেশ কয়েকবার দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। দুই একজনের এসিড ঝিটকে চোখ হারানোর ঘটনাও ঘটেছে। কোতোয়ালী রোডের কুদ্দুস জানান, ১৫ বছর বয়সে সে যখন কাজ শুরু করেন, তখন একটি দুর্ঘটনা ঘটে। ছোট্ট এই কারিগররা সপ্তাহে ছয় দিন স্বর্ণের গহনা গড়ার নানা কাজ যেমন ছিলার কাজ অর্থাত্ আলপনা করা, কয়েক জোড়া গিয়ার চাকা দিয়ে তৈরি কাঁচাপাত মেশিন ঘোরানো, (যা শিশুর শক্তির তুলনায় বেশ কষ্টকর), হার তৈরির কাজ, বল তৈরির কাজ করে বলে জানান আর এক কারখানার মালিক মনির হোসেন। তবে শুক্রবারটা তাদের কেবলই ছুটি। এই দিন ছোটরা কুয়ার পানিতে স্নান সেরে শার্ট পরে বড় কারিগরের সাথে এখানে সেখানে বেড়াতে যায়।
আবার মাঝেমধ্যে রাস্তায় বা মন্দিরের উঠোনে বন্ধুরা মিলে খেলা করে। খেলা করতে গিয়ে যদি কোন অন্যায় নিজের অজান্তে হয়ে যায় তখন মালিকের কাছে নালিশ চলে আসে। আর মালিক সেই অনুযায়ী বকাঝকা কিংবা চড়-থাপ্পরের মতো শাস্তি দিয়ে তাদের শুধরে নেন বলে জানান ছোট্ট কারিগররা। কারণ শাসন না করলে তারা তো বখে যাবে। নেশা আসক্ত হবে। নিজের মঙ্গলের কথা ভেবেই চোখের জল মুছে শনিবারের কর্মময় সপ্তাহ শুরু করার প্রস্তুতি নেয় তারা।
