শৈশব থেকেই আমার প্রবল আগ্রহ ছিল বই পড়া আর গান শোনায়। বাল্যকালের এই দুই নেশা পরবর্তী জীবনেও পিছু ছাড়েনি। আমার চিত্রকর জীবনের ওপরও রয়েছে তার বিশেষ প্রভাব। বাড়িতে ছিল বইপত্রের বিশাল ভাণ্ডার। তাছাড়া ডাকযোগে নিয়মিত পাওয়া বাংলা সাময়িকীর সংগ্রহটাও নেহাত কম ছিল না। ‘প্রবাসী’, ‘ভারতবর্ষ’, ‘মানসী’ ও ‘মর্ম্মবাণী’, ‘বঙ্গশ্রী’ তো ছিলই, এমনকি বঙ্কিমচন্দ্র সম্পাদিত ‘বঙ্গদর্শন’-এর পুরনো অনেক সংখ্যাও ছিল পারিবারিক সংগ্রহে।
সেকালের রুচিশীল প্রায় প্রতি পরিবারে থাকত কলেরগান। আমাদের পরিবারেও এর ব্যতিক্রম ছিল না। তবে আমাদের ছিল গ্রামোফোন রেকর্ডের এক বিশাল সংগ্রহ। বাঙালি মধ্যবিত্ত ঘরে তখন বড় আসন দখল করেছিল সাহিত্য সাময়িকী ও ৭৮ আরপিএম (মিনিটে ৭৮ ঘূর্ণন) রেকর্ড। মাসিক সাহিত্যপত্রগুলো মুদ্রণ কৌশলের অগ্রগতির সুযোগ নিয়ে ফটোগ্রাফ এবং চিত্রকলার প্রতিলিপি নিয়মিতভাবে ছাপত। গ্রামোফোন রেকর্ডে গানকে বন্দী করার কৌশলের অভিনবত্ব বাংলা সঙ্গীতজগতে এক প্রবল জাগরণ সৃষ্টি করে। যান্ত্রিক পুনরুতপাদনের এই দুই পদ্ধতি চিত্রকলা ও সঙ্গীতের রস পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছিল প্রত্যক্ষ দর্শক কিংবা শ্রোতামণ্ডলীর বাইরে অপ্রত্যক্ষ স্তরে বৃহত্তর জনসমাজে। এমনি পারিবারিক প্রভাবে স্নাত হয়ে বাল্যকালে, চিত্তবিকাশের সুযোগ আমার হয়েছিল।
স্কুল জীবন থেকে আমার আঁকাআঁকির প্রতি ঝোঁক ছিল। তখনকার দিনে আঁকাআঁকি শেখার জন্য যেতে হত কলকাতায়, কিন্তু সে তো পরিবারের সামর্থ্যের বাইরে। শুনতে পেলাম ঢাকায় নাকি শিল্পশিক্ষালয় খোলা হয়েছে এবং এই কাজের প্রধান কুশীলব ময়মনসিংহের কৃতী সন্তান জয়নুল আবেদিন। একদিন জয়নুল আবেদিনকে আমি দেখেও ফেললাম। সেটাই প্রথম দেখা। ছুটি কাটাতে দেশে আসা জয়নুল আকুয়ার পুকুর ঘাটে স্নান করছিলেন। আমার আগ্রহ থাকায় বাবা জয়নুল আবেদিনের সঙ্গে আলোচনা করলেন, ঢাকার আর্টস ইনস্টিটিউটে ভর্তির ব্যাপারে। ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের আগেই ১৯৪৯ সালের শেষ দিকে আমি ঢাকায় এসে অপরিসর দুই কক্ষের সেই প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হই।
প্রথম ক্লাসে জয়নুল আবেদিন যখন চাইনিজ ইঙ্ক নিয়ে ক্লাসে আসতে বললেন তখন বিস্মিতভাবে আমি জানতে চাইলাম চাইনিজ ইঙ্ক কি? ডাঙ্কি কাকে বলে সেটিও ক্লাসে ঢুকে প্রথম চিনতে হল। ঢাকায় এসে উঠলাম বোনের বাসায়। বাবা দিতেন মাসোহারা চার টাকা। সতীর্থ অন্যরাও মধ্যবিত্ত বলয়ের মানুষ। জেলা শহর ঢাকা হঠাত্? করে প্রাদেশিক রাজধানী হয়েছে বটে কিন্তু নাগরিক আচার তখনও কিছু আয়ত্ত হয়নি। দ্রুত বাড়ছিল শহর, তবে শহরের মানুষের সঙ্গে গ্রামবাংলার যোগ ছিল বেশ নিবিড়। বস্তুত গোটা পূর্ববঙ্গেই শহুরে এলিট শ্রেণী বিশেষ বলবান ছিল না। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ৬ মাসের মধ্যেই যে বাংলা ভাষার অধিকার ঘিরে উত্তেজনা ও আন্দোলনের স্ফূরণ দেখা দেয় সেটি পূর্ববঙ্গবাসীর এই সমাজসম্পৃক্ত সাংস্কৃতিক চেতনারই অভিব্যক্তি।
সে আমলে ঢাকার নবীন শিক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্যপথিক ছাত্র, চলচ্চিত্রপ্রেমী, সঙ্গীতগুণী— সবার সঙ্গে সবার অবাধ যোগাযোগ ছিল। আর্টস ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সমগ্র শিল্পজগতের এমনি মিল রচনায় জয়নুল আবেদিনও ছিলেন বিশেষ যত্নশীল। তিনি জসীমউদদীন, শামসুদ্দিন আবুল কালাম, কানাইলাল শীল, মমতাজ আলী খান বা আব্বাসউদ্দিনের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। ঢাকা আর্ট গ্রুপ গঠনের পর এতে যুক্ত হয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বিদগ্ধজন। আর ছাত্ররা সেতুবন্ধ গড়েছিল হাসান হাফিজুর রহমান, শামসুর রাহমান, ফজলে লোহানী, জহির রায়হান, আলাউদ্দিন আল-আজাদ, আলতাফ মাহমুদ, আনিসুজ্জামান, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর প্রমুখ নবীনদের সঙ্গে। উদার সংস্কৃতির মিলনের আবহে নবীন-প্রবীণের সম্মিলনে সবকিছু হয়ে উঠেছিল অন্যরকম। (অনুলিখিত)
