মুস্তাফিজ শফির নস্টালজিক কবিতাগুচ্ছ

আপডেট : ২১ নভেম্বর ২০১৩, ১৯:৩৯
দহনের রাত মুস্তাফিজ শফি প্রকাশক :ভাষাচিত্র প্রচ্ছদ :আনিসুজ্জামান সোহেল প্রকাশকাল :বইমেলা ২০১৩ মূল্য :১০০ টাকা টিএস এলিয়ট একবার বলেছিলেন, কবিতা বোঝার আগেই তা অনুভূত হতে হয়। ‘অনুভূতি’ কিংবা ‘অনুভূত’ শব্দের গূঢ় রহস্য বা মর্মকথা এই যে, প্রকৃতিগতভাবে শুধু একটি ‘আলোড়ন’ এটি। অন্যকিছু নয়। আলোড়ন মৃদু হতে পারে, তীব্রও হতে পারে। কবিতার উপমা, দৃশ্যকল্প, প্রতীক কিংবা অন্তনির্হিত ভাব ও ব্যঞ্জনা যখন পাঠককে আন্দোলিত করে, উদ্বেলিত করে, ঠিক তখনই সংবেদনশীল ইন্দ্রিয়ে একটা সংকেত তৈরি হয়। দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে যেতে যেতে ওই সংকেত আলোড়িত হয়, বস্ফািরিত হয়। কবিতায় পাঠক সাড়া দেন তখনই। টিএস ইলিয়ট হয়তো বোঝাতে চেয়েছেন এটাই। কবি মুস্তাফিজ শফির কাব্যগ্রন্থ ‘দহনের রাত’ পড়তে পড়তে মনে হয়, মূলত কবিতায় ইন্দ্রিয়জাত এক অনুভূতির বিস্তার ঘটান তিনি। তাতে যেমন স্মৃতি আছে, আছে বিস্মৃতিও। স্মৃতি-বিস্মৃতির মধ্য দিয়ে একটা অন্তরাল বা আড়াল রেখে কবিতা করেন তিনি। পাঠক তা পড়তে পড়তে জড়িয়ে যান অন্য এক মায়ায়, ভিন্ন এক নস্টালজিক অনুভূতিতে। সাংবাদিকতা পেশার প্রায় সর্বোচ্চ শিখর স্পর্শ করেও কবিতার মধ্যে মুস্তাফিজ শফির নিত্যবসত। ফলে প্রতিদিনের বেরসিক, কাঠখোট্টা খবরাখবরের বাইরেও আমরা পেয়ে যাচ্ছি তাঁর কবিমনের সংবাদ। কবির এই মন বড় অনুভূতিময়, যেন টলমল করা স্মৃতিপুঞ্জ। যেন ভাসমান মেঘমালা। ফেলে আসা শৈশব, দুরন্ত কৈশোর, কিংবা প্রেম অথবা অপ্রেম; যৌবনের টানাপোড়েন, যান্ত্রিকতার যন্ত্রণা—এসব নিয়েই তাঁর কবিতা। উচ্চস্বর নয়, অনেকটা কবির নিজের মতোই নিচুস্বরে, প্রায় চুপচাপ নিভৃত, বিনীত ভঙ্গিমায় কবিতার সুর তৈরি করেছেন, নিজস্ব ভাষা তৈরি করেছেন তিনি। আলোচ্য কাব্যগ্রন্থ ‘দহনের রাত’ পড়ে মনে হয়, কবিতাগুলো যেন একই সূত্রে গাঁথা। আপাত বিচ্ছিন্ন, ভিন্ন। তবে সামগ্রিক অর্থে এক ও অভিন্ন। প্রতিটি কবিতা আলাদা, বৈচিত্র্যময়। তবে মেজাজ ও স্বাদ একই। গোটাটা মিলিয়ে একটিই কবিতা—দীর্ঘ কবিতা। কাব্যগ্রন্থে স্থান পাওয়া ৩৮টি কবিতাই এ জন্য মিলেমিশে তৈরি করেছে একটি স্নিগ্ধ ফুলের মালা। ‘দহনের রাত’ কাব্যগ্রন্থটি যেন কোনো বিশেষ রাতে ফিরে দেখা জীবনের গল্প। সেখানে প্রেম আছে, আছে বেদনাও। আছে চাপাত্রস্ত দহনও। হয়তো এ কারণে কাব্যের এমন নামকরণ। ‘আজ তবে দহনের রাত—’ এই বাক্য দিয়েই শুরু হয় কবিতার যাত্রা। তারপর সেই রাতের নানামাত্রিক ব্যবচ্ছেদ : ‘বহুদিন পর ফেলে যাওয়া নিজস্ব ধুলোর ভেতর তবে কেনো আজ আঁকতে এলে আল্পনা, তবে কেনো আজ এই নক্ষত্রের রাতে বিষণ্ন ঝাউবনে দোলা দিয়ে গাইতে এলে গান?’ (প্রেম) ‘আত্মার গান আর বিষণ্নতার মৌন সঙ্গীত ছাড়া তবে কি আর কোনো প্রার্থনা আছে? বর্ণময় সন্ধ্যা শেষে ঝরাপাতার হাহাকার বুকে নিয়ে এই যে নেমে আসে রাত, তাকে আমি ব্যবচ্ছেদ করব কোন পরাবাস্তব ছুরি দিয়ে?’ (বহুমাত্রিক নির্জনতা) ‘আজও মনে পড়ে সেই শ্যামল কিশোরী মুখ। স্মৃতির ধুলো হাতড়ে আজও আমি তুলে আনি সেইসব উজ্জল পাতাবাহার দিন। তার আলতামাখা পায়ে নূপুরের ধ্বনিতে আজও আমি পথ খুঁজি, নতুন পথ।’ (শিউলী রায় বাড়ি আছো) ‘বছরের প্রথম বৃষ্টিতে যেমন পবিত্র হয়ে ওঠে শহরের পিচঢালা কালো পথ—আজ এই জ্যোত্স্নাবৃষ্টিতে তুমিও কি আমার কাছে দৃশ্যের ভেতর থেকে সেরকম কোনো দৃশ্যমান হয়ে উঠেছো?’ (ভাঙনের শব্দ) কাব্যগ্রন্থটিতে ঘুরে ফিরে প্রেমের কাছেই আশ্রয় চান শফি। যেন কোনো অনুশোচনায় দগ্ধ হয়ে, না পাওয়ার বেদনায় অঙ্গার হয়ে পুড়তে পুড়তে খাঁটি হতে চান। অধিকাংশ সময় দেখা যায়, প্রেমের কবিতা গভীর কোনো দ্যোতনা তৈরি করে না, গভীর কোনো চিন্তার উদ্রেক করে না। কবিতা হয়ে পড়ে তরল, ‘আমি’ ও ‘তুমি’ ঘেরা। কিন্তু আলোচ্য কাব্যগ্রন্থে শফি সেই প্রেমকে মুক্ত করে দিয়েছেন, আপন করে নিয়েছেন ব্যক্তির মধ্য দিয়ে সামষ্টিক ভাব। এখানেই তাঁর বড় মুনশিয়ানা। যখন তিনি গোপন কোনো প্রেমিকার কথা বলেন, যাকে বানাতে চান তাঁর কবিতা, ওই প্রেমিকা কবিতায় ধরা দেয় নানা প্রতীক, নানা উপমা-উেপ্রক্ষা হয়ে। তখন প্রতীক ছড়িয়ে যায় নানাজনের প্রেমভাবনায়। ‘পূর্বজন্মে তুমি নদী ছিলে, আর আমি তরঙ্গে ভাসা কচুরিপানা। হাজার বেদেনীর দাঁতে ঝিলিক দেওয়া হাসিতে রাতের নির্জনতা ভেঙে এখনও তুমি দুলে দুলে ওঠো, আর আমি হাবুডুবু খেতে খেতে ভালোবাসার নামে পাঠ করি কোনো এক আশ্চর্য আখ্যান।’ (জুয়াড়ি) কবি যখন বলেন, ‘পৃথিবীর সব প্রেমিক প্রেমিকা হারিয়ে গেলেও মরে না প্রেম’ তখন তো ব্যক্তিক অনুভূতি নয়, সামগ্রিক ও সামষ্টিক ভাব ফুটে ওঠে কবিতায়, পঙিক্ততে। শুধু প্রেম নয়, প্রেমহীনতা, সম্পর্কহীনতা, যোগাযোগহীনতার কথাও উঠে আসে পঙিক্ততে। প্রেম তো মানুষের জীবনের শ্রেষ্ঠ অনুভূতির নাম, কিন্তু আধুনিক সময়ই যেখানে বিছিন্ন, মানুষে মানুষে বিভেদ, সম্পর্ক ঘুরপাক খাচ্ছে অনিশ্চয়তায়, তখন কবি ওই বিচ্ছিন্নতাবোধেও কাতর হন। মানুষের এক গভীর গভীরতর অসুখের কথা বলেন, নিরাময়ের কথা বলেন। প্রেমের আকুতি, না পাওয়ার দহনই যেন তাঁর কবিতার মূল সুর। যা কি না বেদনার সুর হয়ে, বেহালার করুণ ও পরম আশ্রয় হয়ে বেজে ওঠে প্রেমিক বা প্রেমিকার মানসপটে। ‘আজও আমার বুকের ভেতর সেই জলের ক্রন্দনধ্বনি বাজে। আজও আমার ঠোঁটের কোণে সেই কম্পনের দাগ হাহাকার করে ওঠে। বিষণ্ন এই রাতে চেয়ে চেয়ে দেখি, দূরের আকাশে উড়ছে একটি পাখি একাকী একাকী! এখন আর নেই সেই ভৈরবী সুর—জানি, রাত শেষে কাক হয়ে আসবে কর্কশ ভোর।’ (কর্কশ ভোরকে সামনে রেখে)। ‘জেনে রেখো বেদনারও আছে বন্ধনের কিছু ইতিহাস। সেই দীর্ঘশ্বাস আজ জমা রাখলাম এই নক্ষত্রপুঞ্জের হাতে। বেদেপাড়ার সেই কৃষ্ণ তরুণীর কাছে একদিন যেমন গচ্ছিত রেখেছিলাম স্বর্গের ঘরের চাবি।’ (তাম্রফলক) শুধুমাত্র মিলনই প্রেমের সার্থকতা নয়, ব্যর্থতাও প্রেমের এক নির্মম সাফল্য। কে না জানে, মহত্ বেদনাবোধ না থাকলে, মনের ভেতর হাহাকার না থাকলে সৃষ্টি হয় না কবিতা, সৃষ্টি হয় না কোনো সুর। মন যদি কেমন না করে, তবে কীসের প্রেম? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটা গান আছে না, ওই যে, যেখানে তিনি বলেন, ‘বড়ো বেদনার মতো বেজেছো তুমি হে আমার প্রাণে/ মন যে কেমন করে মনে মনে তাহা মনই জানে!’ প্রাণের মধ্যে কেমন করা এই হাহাকার বেজে উঠতে হয়। তখনই তো মন পাগলপারা হয়ে ছুটে যায় আপনবেগে। প্রাপ্তি বা উচ্ছ্বাসে প্রেম নেই, আনন্দেও নেই। প্রেম আছে অপ্রাপ্তি আর অপূর্ণতাতেই। কবি মুস্তাফিজ শফি ওই অপ্রাপ্তির কথাই বলেছেন তাঁর দহনের রাতের বেশিরভাগ কবিতায়। ‘নিঃসঙ্গ বেহালার তারে বেজে ওঠে হাহাকার/ কে রাখে দমিয়ে তারে, এমন সাধ্য কার? / যারে উড়ে যা, উড়ে যা বেদনাপাখি/ এই ভালো, তবু একলা থাকি।’ (বেদনাপাখি)। কবিতা পড়তে পড়তে যে বেদনার ভার মনের আকাশে ঘনিয়ে আসে, পাঠকমনও তাতে সাড়া দেয় নিজের অজান্তেই। এখানেই কবির বড় সাফল্য, মহত্ কারিগরি দক্ষতা। কবির এ বেদনাবোধ সঞ্চারিত হয়, ছড়িয়ে পড়ে এক হূদয় থেকে অন্য হূদয়ে। কখনো কবির মনে পড়ে শিউলির কথা, কখনো বা মুক্তি, নয়নতারা—ইত্যাদি সব নাম কিংবা প্রতীকের মধ্য দিয়ে স্মৃতিকাতর হন তিনি। তখনই ভর করেন শৈশবের ডানায়, কৈশোরের দুর্নিবার দুরন্তপনায়। কবি এখানে কৈশোর-যৌবনের দিনকে ‘ওড়াওড়ির দিন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ‘চন্দ্রগ্রস্থ’ শিরোনামের কবিতায় এ সম্পর্কে তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন। কবি বলেন, ‘সেইসব ওড়াওড়ির দিন, শালিকনগর, চরজাগা নদী, ধূ-ধূ মাঠ, বালুচর—ওরাও কি মনে রাখবে কেউ এসেছিল একদিন এইখানে, ধূসর ছায়ার সঙ্গে অদ্ভুত আলিঙ্গনে রচেছিল আশ্চর্য আখ্যান?’ ঠিক তখনই বোঝা যায়, গোটা কবিতা কিংবা কাব্যগ্রন্থ মিলিয়েই একটি আখ্যান, একটি গল্প। আধুনিক কাব্যসমালোচকেরা দেখিয়েছেন যে, জীবনানন্দ দাশের প্রতিটি বিখ্যাত কবিতার ভেতরেই রয়েছে একটি বা একাধিক গল্প। কবিতায় গল্প বলার এই রীতি, আখ্যান তৈরি করার এই পদ্ধতি আমাদের কাব্য ইতিহাসে নতুন নয়। মধ্যযুগের অধিকাংশ কবিতাই তো আখ্যানধর্মী। এ ছাড়াও বাংলাসাহিত্যে যত মহাকাব্য রচিত হয়েছে, তাতেও আছে মহাবিস্তারী গল্প। ফলে মুস্তাফিজ শফির কাব্যে যখন আমরা আখ্যানের নির্দেশনা পাচ্ছি, তখন বোঝা যায়, এই কবির যাত্রা পটভূমি মহাকাব্যের দিকেই ধাবিত। বলা যায়, প্রতিটি মহত্ কবির মধ্যেই কবিতায় আখ্যান নির্মাণের এ প্রবণতা রয়েছে। কবিতায় শফির প্রিয় অনুষঙ্গ জ্যোত্স্না, নক্ষত্র, চাঁদ। প্রিয় কোনো মুহূর্ত ভাবতে গিয়ে, প্রিয় কোনো স্মৃতি প্রকাশ করতে গিয়ে এসব অনুষঙ্গ তিনি ব্যবহার করেন। কবির সেই প্রিয় মুখগুলো হয়তো অনেক দূরে, দূর কোনো প্রবাসে। কিংবা নক্ষত্রসমান দূরত্ব থেকেই তাদের স্মরণ করেন তিনি। সম্ভবত, মুস্তাফিজ শফির প্রিয় কবিদের মধ্যে অন্যতম জীবনানন্দ দাশ। কবিতায় তাঁর নমিত সুর ও বিষয়, অনুষঙ্গের ব্যবহার দেখে তা চকিতে মনে হয়। জীবনানন্দ দাশের ওই আকাশ, ওই নক্ষত্রকে তিনিও ভালোবাসেন। তিনি যখন বলেন, ‘অনেক, অনেক দিন পর আজও যখন নক্ষত্রের রাতে জ্যোত্স্না নামে, টের পাই—সেই কমলা রঙের রোদগুলো মরে যায়নি, ডানা ভেঙে যায়নি সেই অবিসংবাদিত হাঁসগুলোর।’, ঠিক তখনই মনে আসে জীবনানন্দ দাশের আবহ ও ঘোরলাগা প্রকৃতি। কিন্তু শফি সেই চেতনাকে জারিত করেন নিজস্ব ভঙিমায়, নিজস্ব লয়ে। ফলে পৃথকভাবেই উচ্চারণ করেন তিনি। মুস্তাফিজ শফি টানা গদ্যেই লিখেছেন অধিকাংশ কবিতা। স্পষ্ট ও নমিত ভাষায় কথা বলেন তিনি, বাকচাতুর্যে নয়, কবিতায় যা অনিবার্য হয়ে ধরা দেয়, তাঁর পঙিক্ততে তা-ই উঠে আসে। তাঁর কবিতায় অলঙ্কারের বাহুল্য আছে, আছে বুদ্ধিপ্রবণ উপস্থিতিও। কবিতাগুলো যেন চর্চিত কবিতার খোলস ভেঙে বেরিরে আসার বাসনায় কাতর। কবির মন ও মানসের সুপ্ত কথাকলি তিনি যেভাবে ব্যক্ত করেন, নির্বিকারভাবে খোলাসা করেন, তাতে জড়তা নেই। কবিতায় সোজাসাপ্টা বলা দরকার, বলেছেন। যেখানে বাঁকা কিংবা কিছুটা-বা আড়াল করে বলা দরকার, কবিতায় বাঁকা কথাতেই যেন ব্যঞ্জনা গভীর হয়, শফি তা-ও করেছেন। টানা গদ্যে লিখলেও কবি শফির একটা প্রবণতা হলো অন্ত্যমিল। কিছু কবিতার শেষাংশে এসে তিনি অন্ত্যমিল রাখতে চেয়েছেন। কিন্তু কোথাও কোথাও সেই প্রবণতা মনে হয়েছে কিছুটা আরোপিত। অবাক করার বিষয় এই যে, মেইনস্ট্রিমের সাংবাদিকতা করেও কবিতাকে লালন করছেন মুস্তাফিজ শফি। চুপচাপ লিখছেন, পড়ছেন। কবিতার জন্য তাঁর এ এক বড় আরাধনা। প্রকৃত কবিরাই জানেন যে, কবিতা এমন এক অধরা শিল্প যার জন্য ছিপ ফেলে বসে থাকতে হয় প্রতিটা মূহূর্ত। আমি সুনিশ্চিত যে, কবি মুস্তাফিজ শফি যদি ওই সাধনার জন্য পর্যাপ্ত অবসর পান, তবে বাংলা সাহিত্য তথা বিশ্বসাহিত্যে শক্তিমান কবি হিসেবে আবির্ভূত হবেন তিনি।