[বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের প্রথম কবি বড়ু চণ্ডীদাস। রাধা-কৃষ্ণের আধ্যাত্মিকতা নিয়ে নয়, বরং তাদের প্রণয়লীলা নিয়েই তিনি রচনা করেছেন তাঁর অমর কাব্য ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’। জন্মখণ্ড, তাম্বুলখণ্ড, দানখণ্ড, নৌকাখণ্ড, ভারখণ্ড, ছত্রখণ্ড, বৃন্দাবনখণ্ড, কালীয়দমনখণ্ড, বস্ত্রহরণখণ্ড, বাণখণ্ড এবং রাধাবিরহ—এই ১১টি খণ্ডের মধ্যে বংশীখণ্ড প্রেমের অর্ন্তগত ব্যঞ্জনায় চিত্তহরণকারী। এই খণ্ডের মোট ৬৪টি পদের মধ্যে রাধা-কৃষ্ণমিলনের যে হূদয় মথিত করা পদসমূহ আছে, তা বাঙালি পাঠকের কাছে পরিচিত হলেও আদি ভাষার দুর্বোধ্যতার কারণে তা সহজপাঠ্য নয়। সেদিক বিবেচনায় রেখে সবধরনের বাঙালি পাঠকের কাছে ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’-এর রসাত্মক পঙিক্তসমূহ সহজ বাংলা ভাষায় এবং মৌলিক ছন্দ ও মাত্রা হুবহু ঠিক রেখে অনুবাদ করে এখানে তুলে ধরা হলো। এটি অত্যন্ত দুরূহ একটি কাজ এবং একে অনুবাদ করা আরো বেশি দুঃসাহসের কাজ। উল্লেখ্য, আমি কবিতায় অর্ধমিলের ঘোরতর বিরোধী। কিন্তু এই কাব্যের পদসমূহের মৌলিক ব্যঞ্জনা রক্ষা করতে গিয়ে আমাকে কোনো কোনো পদের ক্ষেত্রে কখনো কখনো কিছুটা আপস করতে হয়েছে। তাতে মূল কবিতার সুর ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি বলেই আমার ধারণা। এখন এটি যদি বাঙালি পাঠকের কাছে সামান্যতম ভালো লাগে, তাহলেই আমার শ্রম সার্থক হয়েছে বলে মনে করব। অনুবাদক]
সখিরা বললো, ‘বঁধু চলো যাই স্নানে’।
বড়াইকে নিয়ে রাধা যায় সেই স্থানে \
ষোলোশত গোপী গেলো যমুনার ঘাটে।
তাই দেখে কৃষ্ণও চলে গেলো নাটে \
কখনো মাদল বাজে, বাজে করতাল।
তাই দেখে রাধিকার সখিরা মাতাল \
আর যতো যন্ত্রীরা ছিলো রে কানুর
প্রতিদিন নানা তালে তোলে শুধু সুর \
তা দেখেও ভোলে না আইহনের দাসী
কৃষ্ণ বাজায় তবু মোহনীয় বাঁশি \
সাত ছিদ্র রেখে তাতে কী অনুপম!
স্বর্ণ-হীরক দিয়ে বাঁধিলো পরম \
আনন্দে কৃষ্ণের উঠিলো ওঁকার
বাঁশির সুরেতে দিলো মোহনীয় ধার \
যমুনার ঘাটে রাধা শুনে বাঁশিধ্বনি।
জল নিয়ে ঘরে এলো, আয়ান-ঘরণী \
বাঁশিতে সুর তোলে নন্দ-নন্দন।
গাইল যে বড়ু চণ্ডী বাসলীগণ \
২.
কে বাঁশি বাজায় সখি কালিন্দী-কূলে।
কে বাঁশি বাজায় সখি গোষ্ঠ-গোকুলে? \
আকুল শরীর সখি, ব্যাকুল হূদয়।
বাঁশির সুরেতে সব ছিন্নভিন্ন হয় \
কে বাঁশি বাজায় সখি, কোথায় সে ধন?
দাসী হয়ে তাঁর পায়ে সঁপিবো জীবন \
মনের সুখেতে কানু বাজায় যে বাঁশি।
কী দোষ করেছি বলো, এ-সর্বনাশী? \
আমার চোখের জল ঝরোঝরো ঝরে।
সখি গো, বাঁশির সুরে মন কেঁদে মরে \
তবে কি নন্দ-ছেলে কেড়ে নিতে প্রাণ।
এমন আকুল সুরে বাঁশিটি বাজান? \
পাখি নই, তাঁর কাছে উড়ে চলে যাবো।
কী করে যে আমি তাঁকে কাছাকাছি পাবো! \
বুঝি না—তাই তো বলি ‘ভেদ করো মাটি;
সে-মাটি দীর্ণ করে আমি হই খাঁটি \
সেখানে লুকিয়ে মুখ লাজ ঢাকি আমি।
আগুনেতে বন পোড়ে, জানে অন্তঃযামী \
কুমোরের অগ্নিসম জ্বলে এ-মন।
কানু-অভিলাষে তা-ও শুকোয় এখন \
বাসলী দেবীর পায়ে নত করে মাথা।
বড়ু চণ্ডী রচেছে রাধা-কানু-গাথা \
