বরফের ফুল

আপডেট : ২১ নভেম্বর ২০১৩, ১৯:৪০
চেকার ভদ্রলোকটি অন্য বগিতে ঢোকার আগেই তিনশ কিলোমিটার বেগের বিদ্যুত্বাহিত ট্রেনটা পাহাড়ের টানেলে ঢুকে পড়ল। অনেকটা ইঁদুরের মতো। বিশালাকার পাহাড় ফুটো করে রেল বসিয়েছে সরকার। পাহাড় ছেড়ে নদী। তারপর সমতলের বিরতির পরেই আবার সেই হরদম পাহাড়-নদী। মনমাতানো দৃশ্যের ভেরিয়েশনে জামিলের জমে থাকা মনটা হালকা হয়ে গেল। সারাদিনের জার্নি শেষে যখন সে মেসে পৌঁছুল তখন চারদিকে অন্ধকার। পাহাড়ি মেস। পাহাড়ের ওপরে বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে দোকানপাট সব আছে। ঘনঠান্ডা ছাড়া তেমন অপছন্দের কিছু নেই এখানে। তারপরও পরদেশ বলে কথা। প্রথম প্রথম ভীষণ মন খারাপ লাগত। তারপর দিনকে দিন কেমন করে সবকিছু যেন রুটিন হয়ে গেল। নিয়ম করে পড়াশোনা আর নিজের কাজ নিজে করা। পাহাড়ের কোলে কোমরে বলতে গেলে ভালোই চলছিল। কিন্তু নভেম্বরের প্রথম রোববারে হঠাত্ করেই বরফ পড়তে লাগল। প্রথম দিকে জামিল বুঝতেই পারেনি। দুদিন যেতে না যেতেই বদলে গেল সবকিছু। সেদিন কী কারণে যেন সন্ধ্যা পার হয়ে গিয়েছিল। কলেজ থেকে বেরোতেই তাজ্জব হয়ে গেল জামিল। চারদিকে শ্মশানের নীরবতা। শুধুই ধু-ধু। মিটসুবিশি টয়োটার সারিগুলো সাদা বেড়ালের মতো দলা দলা হয়ে এক-একটা মমি বনে গেছে। আগে পিছে কেউ নেই। বরফের সাদা রাজ্যে জামিল অগত্যা একটা কাঁকতারুয়া হয়ে হাঁটতে লাগল। একটানা বরফ পাড়ি দিয়ে সদর রাস্তায় উঠতেই দৃশ্যগুলো অন্যরকম হয়ে গেল। এত সাদা ফুল কোথায় ছিল! যেসব চেরি এতদিন সবুজপাতা নিয়ে এখানে ওখানে ইতস্তত দাঁড়িয়েছিল, তাদের মাথা-শরীরে কোনো পাতা নেই আজ। শুধু থাবা থাবা ফুল আর ফুল। অলিগলি, বাগান, ময়দান—সবখানে সাদা আর গোলাপি চেরির ঝাঁকড়া। শহরে আর কী কোনো গাছ নেই নাকি! চেরির দঙ্গল ফেলে জামিল ট্রাফিক মোড়ের দিকে এগোতে শুরু করল। বরফের দিনে অন্তত ওখান দিয়ে পার হওয়াই ভালো। ক্যাফেগুলোতে হলুদ আলো জ্বলছে। সেখান থেকেই বোধহয় কলশব্দ উড়ছে। বেশিদূর যেতে পারল না জামিল। তার আগেই একঝাঁক তরুণী হেসে উঠল। জামিল ঘুরে দাঁড়াল। তারপর কী মনে করে সেও হেসে ফেলল। এ শহরে আজ যেন কোনো দুঃখ নেই, নেই কোনো আলোর অভাব। কানাজাওয়া এমনিতেই রূপনগরী। তার ওপর পাহাড় আর বুনো সৌন্দর্যে ভরে আছে চারপাশটা। সায়েকাওয়া ও আসানোকাওয়া নামে দুটো নদী নেমে গেছে দু-পাশ দিয়ে। রূপবান নদীযুগলকে নিয়ে অনেক গল্পই প্রচলিত আছে এখানে। মানুষজনের বিশ্বাস—এরা ঠিক নদী নয়; মানব-মানবী। আসানোকাওয়াকে পাশ কাটিয়ে হাঁটতে গিয়ে জামিল এবার একটা মজমার মুখে পড়ল। দুই বালিকা ইয়া লম্বা এক চাকাওয়ালা সাইকেলে চড়ে সার্কাস দেখাচ্ছে। ভর সন্ধ্যায় সারা শহরে এমন আনন্দ কেন আজ? জামিল বুঝতে পারে না। জিজ্ঞাসা করতেই এক বৃদ্ধ সামান্য হাসলেন—‘বরফ পড়ার প্রথম দিন আমরা খুব আনন্দ করি। দেখেন না সবাই কেমন পান করছে’। জামিল চারদিকে তাকিয়ে ব্যাপারটা পরিষ্কার করে নিল। সত্যিই তো! কারও হাত খালি নেই। নিদেন পক্ষে একটা বিয়ারের ক্যান হলেও হাতে ধরা আছে। বিনি পয়সার সার্কাস ফেলে অনেকটা আনমনেই জামিল মোড়ের দোকানে ঢুকে পড়ল। কী মনে করে আটশ ইয়েন দিয়ে দুটো আসাহি বিয়ার কিনে ফেলল। দাম মিটিয়ে বের হতে গিয়ে কিমাতুর সামনাসামনি হয়ে গেল সে। কিমাতুকে ঠিক এখনকার মেয়েদের সাথে মেলানো যায় না। চোখজোড়া বেশ প্রশস্ত আর গভীর। সোনালি চুলে সুন্দর বেণি করেছে ও। কাছে যেতেই একটা ফুলের গন্ধ পেল জামিল। মেরুন টি-শার্টের ওপরে শীতের জন্য কফি কালারের একটা জ্যাকেট ঘাঁড়ের ওপর দিয়ে দুই দিকে ঝোলানো। নীল জিনস্ আর কালো কেডস্। কিমাতু সুন্দর করে হাসল। তারপর ভাসা ভাসা চোখ তুলে বলল— গেনকি দেস্কা, জামিল সান? (তুমি কেমন আছ, জামিল?)। (জাপানিরা নামের আগে জনাব বা মিস্টার না বলে নামের শেষে ‘সান’ বলে) উত্তর না দিয়ে জামিল উল্টো প্রশ্ন করল, তুমি ভালো? —তুমি কি একটু মোটা হয়েছ? সুন্দর করে হাসল কিমাতু। কোনো কোনো মেয়ের হাসি বড় স্বচ্ছ হয়। ঠোঁট থেকে হাসিটা উঠে আসে চোখে। চোখের জানালা দিয়ে তখন ভেতরের মনটা দেখা যায়। খামোখাই আবার একুশ বছর বয়সে ফিরে যেতে ইচ্ছা করে । —তুমি নাকি ন্যাচার আর কবিতা খুল ভালোবাস? কবিতা লেখ, তাও শুনেছি। —হ্যাঁ, ও দুটোই আমার খুব প্রিয়। কিন্তু তেমন লেখা হয় না আজকাল । —আমিও নেচার ও ভ্রমণ খুব ভালোবাসি। গতমাসে থাইল্যান্ডে গিয়েছিলাম। ওখানে বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছি নদী ও পাহাড় দেখে। ভিন্ন ভিন্ন সমাজ ও সংস্কৃতিও আমার ভালো লাগে। ভালো ইংরেজি জানিনা বলে মানুষের সাথে যোগাযোগ রাখতে পারি না। তুমি কি এ ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করতে পারবে? —কী সাহায্য চাও বলো। —তুমি আর কত বছর জাপানে থাকবে? —তিন বছরের কম না! কথা বলতে বলতে ওরা লনের কাছে চলে এল। কিমাতু হ্যান্ডব্যাগ খুলে চকচকে একটা গ্যাসলাইট বের করে জামিলের হাতে দিয়ে বলল—রাখো, এটা তোমার। জামিল কিছু বলবার আগেই কিমাতু গাড়ি স্টার্ট দিলো। সুন্দর করে হেসে বলল, সায়োনারা (শুভ বিদায়)। বরফ মাড়িয়ে টয়েটোটা বড় রাস্তায় উঠে গেলে জামিল উল্টোদিকের ফুটপাত ধরে হাঁটা দিলো। আকাশে উজ্জ্বল চাঁদ। থোকা থোকা তুষাররেণু সমানে ঝরে চলেছে। ওপর নিচে সবখানে সাদা। জোছনায় সাদাগুলো ঠিক আগের মতো আর নেই বরং সোনালি হয়ে অপার্থিব এক সৌন্দর্য এনে দিয়েছে। জামিল জ্যাকেটের ঝোলা পকেট হাতড়ে বিয়ারের ক্যান তুলে প্রথমটা ঢক ঢক করে খেয়ে নিল। তারপর দ্বিতীয় ক্যানের মুখ খুলে ওয়াকম্যানটা অন করল—আমাকে অন্ধ করে দিয়েছিলো চাঁদ/ আমাকে নিঃস্ব করে দিয়েছিলো চাঁদ... দুটো ক্যানের পর দৃশ্যগুলো আরও পরিষ্কার হয়ে এল। প্রতিদিনের পথকে আজ যেন দূরবর্তী আর অচেনা লাগছে খুব! চেরিতলায় বসা যুগল! চাঁদের আলোতে হঠাত্ করেই ওদের এত শুভ্র আর নিষ্কলুষ মনে হচ্ছে কেন! গোটা শহরটাই কী আজ ঝলমলে সরাইখানা! জামিল আনমনেই হেসে ফেলল। তারপর অনেক পথ হেঁটে দুলে দুলে একসময় মেসে ফিরে এল সে। ওপরতলার একটা রুমে বাতি জ্বলছে কেবল। পাহাড়ের চূড়ায় দোতলা মেসটার ওপরে একদল চীনা ছেলে আর নিচে ওরা পাঁচ বাঙালি। কাজের চাপে মেসমেটদের কারোর সাথেই দেখা হয় না তেমন। বলতে গেলে শুধু ছুটিরদিন রাতেই একমাত্র সাইফুলের সাথে ঠিকমতো কথা বলতে পারে জামিল। সপ্তাহে এই একদিন আরাম করে মদ খায় সাইফুল। আগে শনিবার করে বিয়ার খেতে এক চীনা বান্ধবীর বাসায় যেত। মেয়েটা নাকি অন্যরকম ছিল। মাতাল হলে বেপরোয়া হয়ে যেত। সাইফুল তাই গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ওজর দেখিয়ে মেয়েটিকে এড়িয়ে যাচ্ছে। পরিষ্কার মনের সাইফুলকে ভালোই লাগে জামিলের। দরজা খুলে নিজেকে আর আটকাতে পারল না জামিল। শরীরটা সারহীন হয়ে গেছে। সটান বিছানায় ঢলে পড়ল সে। কিন্তু বন্ধচোখে পনের মিনিটের বেশি থাকতে পারল না। জামিল কম্পিউটার অন করল। ইদানীং বড় বেশি বাজে ও হিজিবিজি মেইল আসে। সেগুলো ডিলিট করতে গিয়ে জাপানি-ইংরেজি মেশানো একটা মেইল পেল সে। মেইলটার মোদ্দা বাংলা মানে হলো— ডিয়ার রহমান সান, শুভেচ্ছা নেবেন। আমি হিরোহিকো। আপনার নিশ্চয়ই আমাকে মনে আছে। আমি কোমাটসু জুনিয়র স্কুলের প্রধান শিক্ষক। এর আগে কাজের চাপে আপনি দু-বার আসতে পারেননি। কাল সকাল দশটায় সার্গেই সান আপনার মেসে যাবে। ড্রাইভ করে আপনাকে স্কুলে নিয়ে আসবে। আশা করি এবার আসবেন... জাপানি শব্দে ভরা মেইলটার বাকিটুকু না পড়েই অস্বস্তিমনে ঘুমুতে গেল জামিল। সকালে রাশিয়ান যুবক সার্গেইয়ের সাথে দূরের শহর কাগা-তে চলে গেল জামিল। ফরেন স্টুডেন্টদেরকে বছরে অন্তত একবার স্কুলে গিয়ে বাচ্চাদের সাথে খেলতে হয় এবং নিজের দেশ সম্পর্কে বলতে হয়। আগেই যাবার কথা ছিল। কিন্তু জামিল জাপানি ভালো বলতে পারে না বলে তালবাহানা করেছে। ওদিকে এলিমেন্টারির বাচ্চারা এত ছোট যে ওরা জাপানি ছাড়া তেমন কিছুই বোঝে না। কয়েকবার তারিখ পাল্টে অগত্যা স্কুল কর্তৃপক্ষ জামিলের ব্যাপারে সিন্ধান্ত নিয়েছে যে, বাচ্চাদের সাথে সে শুধুই খেলবে। জামিল এবারও যেতে চায়নি। কারণ কিমাতুর আসার কথা ছিল। ওকে আলাদা করে ভাবার কিছু নেই। মেয়েটা ওর ক্লাসমেট। তবুও তার মুখটা কেন বারবার মনে পড়ছে! জামিল বুঝতে পারে না। কোমাটসু স্কুলের বাচ্চাগুলোর গায়ের রং ডিমের মতো। মেয়ে বাচ্চাগুলো এক একটা ফুটফুটে পরি। আগ থেকেই ওরা বাংলাদেশের ছবি জোগাড় করে রেখেছিল। ওরা প্রজেক্টরে সেসব ছবি দেখাল। এবার জামিলকে কিছু একটা করে দেখাতেই হবে। অগত্যা বাচ্চাদের মোরগ লড়াই খেলা শেখাল সে। তারপর বাচ্চাগুলোর সাথে এমনভাবে মিশে গেল যে, খেলতে খেলতে বিকেল পার। মায়াবি মুখগুলো ছেড়ে আসতে কষ্ট হচ্ছিল ওর। ভারী মন নিয়েই কানাজাওয়া ফিরে আসলো সে। বুকের ভেতর টুকটুকে জাপানি পুতুলগুলো ডাকছে—জামিল সান কোনবাওয়া (শুভরাত্রি)। পরদিন পিওনের ডাকে জামিলের ঘুম ভাঙল। খামে ভরা চিঠিটা খুলতে গিয়ে খানিক থামল সে। ইংরেজিতে লেখা কিমাতুর চিঠি— ডিয়ার জামিল সান কিছু মনে করো না। ফোন করতে পারতাম কিন্তু ফোনে সবকথা আমি বলতে পারতাম না। কিছু কথা এমন যে, সরাসরি বলা যায় না। নারা প্রিফেকচারে একটা মোটর কোম্পানির মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টে চাকরি পেয়েছি। কাল সেখানে যেতে হবে। বাকি পড়াশোনাটা ওখানেই করে নিতে হবে মনে হচ্ছে। দেখা হবে না ভেবে মনটা কালো হয়ে আসছে। চলে যাবার মুহূর্তে ভাবলাম, এতদিন যেকথা তোমাকে বলতে পারিনি আজ তা জানানো দরকার। মেসে তোমাকে পেলাম না। একসাথে ক্লাস করতে করতে কখন যে তোমাকে ভালোবাসতে শুরু করেছিলাম, ঠিক বলতে পারব না। কী করে কথাগুলো তোমাকে বলব, ভেবে ভেবে কোনো কূলকিনারা পাইনি। আজ ভেবেছিলাম বলতে পারব। কিন্তু মেস পর্যন্ত এসে সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে। পরশু বান্ধবাীদের সাথে একটা প্রার্থনালয়ে গিয়েছিলাম। পাহাড়ি প্রার্থনালয়টি দেখার মতো। মাঝখানটা ছবির মতো ঢালু হয়ে পরস্পর নেমে গেছে। নিচে গোল উপত্যকা। মার্জিত একটা নদী পুবপাহাড়ের পা থেকে নেমে উপত্যকার ঘাষ ছুঁয়ে খেলেছে অনেকক্ষণ। তারপর পশ্চিম পাহাড়ের সুড়ঙ্গপথে হারিয়ে গেছে কোথাও। নদীর জল এত স্বচ্ছ যে তলায় ছড়ানো সাদা নূঁড়িগুলো পর্যন্ত জ্বল জ্বল করছিল। পাহাড় ভরে থোকা থোকা লাল আর মেরুন চেরি ফুটেছিল। মনে হলো, অসম্ভব সাদা আলোর মধ্যে আমি যেন বহুকাল আত্মীয়হীন জোনাকির মতো ডুবে আছি। পরে উত্তরের পাহাড়ে উঠে গিয়েছিলাম। একেবারে চূড়ায় বসানো বৌদ্ধমূর্তির সামনে দাড়িয়ে মনটা ফাঁকা হয়ে গেল। পুরো আকাশ জুড়ে শুধু তোমার মুখ। কেন এমন হলো জানি না। তুমি কতদিন থাকবে জাপানে!... হাতেলেখা চিঠিটার কোথাও কাটাকুটি হয়নি। চিঠিটাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে কিমাতু নিজের নাম লিখেছে। জামিলের মন খারাপ হয়ে গেল। চিঠি পড়ার আগ পর্যন্ত কিমাতু তো অন্যসব বান্ধবীদের মতোই ছিল! কিমাতুর সাথে কবে দেখা হবে? নাকি আর দেখা হবে না! জামিল মেস থেকে বের হয়ে অগোছালো পা ফেলতে লাগল। থামল না। হেঁটে হেঁটেই পাহাড়ি মেস থেকে নিচের দিকে নামতে থাকল সে।