জনশীলতা ও সৃষ্টিধর্মিতা বিচারে আবদুল মান্নান সৈয়দ (১৯৪৩-২০১০) একজন নিরীক্ষাধর্মী ও আবিষ্কারপ্রবণ কথাশিল্পী হিসেবে পরিগণিত। তাঁকে অনেকেই বলে থাকেন—বিপ্লবী কথাসাহিত্যিক, ফলে অনিবার্যভাবেই চিহ্নিত হয়েছেন একজন বিতর্কিত কথাকোবিদ হিসেবে। ষাটের দশকের এক অস্থির আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্যে মান্নান সৈয়দের আবির্ভাব ঘটলেও তিনি সচেতনভাবেই রাজনীতিকে পাশ কাটিয়ে গল্পের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছেন। ব্যক্তির আত্মিক সংকট এবং অন্তর্গত মানস প্রবণতার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ তাঁর গল্পের মৌলপ্রবণতা। মূলধারাতে সমপ্রসারিত দৃষ্টিতে সৃজনশীলতা আরোপ করেছেন কখনো ফ্রয়েডীয় তত্ত্বের আলোকে চরিত্রায়ণ করে, কখনো পরাবাস্তব ঘূর্ণি প্রকট হয়ে উঠেছে, কখনো বা গল্পের মানুষগুলো অস্তিত্বের সংকটে হয়েছে জর্জরিত। পাঠক সাধারণত যে ধরনের গল্প পড়ে অভ্যস্ত, মান্নান সৈয়দের গল্প তা থেকে অনেকটাই ব্যতিক্রম। তাঁর গল্পের আয়োজন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমাদের অন্তরমহলকে ঘিরে। আর্থ-সামাজিক পারিপার্শ্বিকতায় সমসাময়িক বাংলাদেশের মানুষের অনুভূতির রূপায়ণ ঘটালেন গল্পগুলোকে অবলম্বন করে। মনোজগত্ বিশ্লেষণে মান্নান সৈয়দের মৌলিকতা অনস্বীকার্য। মানুষের মনোজগতের অদেখা কোণগুলোর ওপর আলো ফেললেন লেখক। বিচিত্র বিষয় ভঙ্গিমা ও গল্পের একটি সার্থক কাঠামো আত্মীকরণের ফলে গল্পগুলোর সৌষ্ঠব ও সৌকর্য আরও বেড়েছে।
‘সত্যের মতো বদমাশ’ (১৯৬৮) প্রকাশের পরপরই গ্রন্থটি পাকিস্তান সরকার কর্তৃক অশ্লীলতার দায়ে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এছাড়া ‘বান্দা’ গল্পের যৌনপ্রত্যঙ্গ-সংক্রান্ত গালিগালাজ ছাড়াও খোলামেলা অনেক কথা রয়েছে, ‘দণ্ডিত খেলোয়াড়’-এর বিষয়বস্তুও তাদের চোখে অশ্লীল লাগতে পারে। বাংলাদেশে আজ পর্যন্ত সত্যের মতো বদমাশ-ই একমাত্র নিষিদ্ধ হওয়া গল্পগ্রন্থ। বইটির পুনর্মুক্তিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন লেখকের বন্ধু অধ্যাপক আতাউর রহমান খান। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের প্রথম দিকে তিনি এক সাংসদকে রাজি করান বইটির ওপর নিষিদ্ধাদেশ তুলে নেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার জন্য। ঢাকা স্টেডিয়ামের নিচতলায় ‘প্যাপিরাস’-এর সামনে বিভিন্ন লেখকের উপস্থিতিতে সেই সাংসদ স্বয়ং নিষিদ্ধাদেশ তুলে নেওয়ার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন।
গল্পটি পাঠ করে গ্রন্থের অন্যান্য গল্পের সঙ্গে মিলিয়ে পড়ার চেষ্টা করলে দেখা যায়, ‘সত্যাসত্য’ গল্পটি একেবারেই আলাদা, কেননা লেখক যখন গল্পটিকে গ্রন্থভুক্ত করেছেন, তারও অনেক আগেই মান্নান সৈয়দের গল্পলোক চলে গিয়েছে আরেক বলয়ে। চারটি চরিত্র মাহমুদ, তার স্ত্রী জমিলা, পুত্র যদু এবং জনৈক পথচারীকে উপজীব্য করে গল্পটির ঘটনাংশ এগিয়েছে। গল্পাংশে একাধিক জায়গায় পরিণতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কাহিনির একটি বড় অংশ জুড়েই পাঠক মানব চরিত্রের চেতন-অবচেতনের ক্রিয়াকলাপ পর্যবেক্ষণ করে। মাহমুদ এবং জনৈক পথচারীর আলাপচারিতায় একটি রাতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে গল্পটি লেখা। মাহমুদের মানসক্রিয়ায় মানসিক দ্বন্দ্ব তথা পথচারীকে বিভিন্ন নেতিবাচক চরিত্র সাব্যস্ত করে সন্দিহান মনের টানাপোড়েন এই গল্পের মূল বিষয়। গল্পাংশের পরিণতির ইঙ্গিত বিভিন্ন জায়গায় দেওয়া হলেও পাঠক সে ইঙ্গিত সম্পর্কে সজাগ দৃষ্টি দিতে অনেকাংশেই ব্যর্থ হয় লেখকের গল্পাংশ বর্ণনায় দক্ষ বিশ্লেষণভঙ্গি তথা কাহিনির অংশ বর্ণনার অভিনবত্বের কারণে। মাহমুদ এবং পথচারীর কথোপকথনে মাহমুদের মানসিক অস্থিরতা তথা পথচারীর প্রতি সন্দিহান দৃষ্টি পাঠককেও তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় আর এখানেই লেখক সর্বতভাবে সফল। শুরু থেকে শেষাবধি ঠাস বুনোটে রচিত গল্পটিতে চরিত্রগুলোর মানসিক পীড়নের সঙ্গে পীড়িত হয় পাঠকও আর এখানেই লেখকের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব। ‘মাতৃহননের নান্দীপাঠ’ গল্পটি বর্ণিত হয়েছে প্রধানত আতিকুল্লাহ, তার মা এবং প্রেমিকা রিনা চরিত্রটিকে ঘিরে। কখনো মূল চরিত্র হিসেবে কখনো বা স্বগতভাষণে কথোপকথনের মধ্য দিয়ে আখ্যানটির এগিয়ে চলা। গল্পটি আবর্তিত হয়েছে ২৮ বছর বয়সে বিধবা হওয়া আতিকুল্লাহর মাকে কেন্দ্র করে। যে মায়ের মাত্রাতিরিক্ত স্নেহে অতিষ্ঠ আতিকুল্লাহ একসময় মাতৃহননের চিন্তা পর্যন্ত করতে বাধ্য হয়। সব সময় অনুসরণকারী মায়ের চোখ দুটো তাকে প্রতিনিয়ত মানসিক নির্যাতন করে চলেছে। সে-সময় আতিকুল্লাহর একমাত্র কাম্য ছিল, ‘মা’ নামক এই ব্যক্তির ‘মাতৃস্নেহ’ নামক অসহ্য নির্যাতন থেকে মুক্তি। এমনই মা-ছেলের তুঙ্গস্পর্শী মানসিক দ্বন্দ্ব যখন বিরাজমান, ঠিক তখন আতিকুল্লাহ অনুধাবন করতে পারে তাদের মাঝে তৃতীয় এক ব্যক্তির উপস্থিতি। অথচ এই তৃতীয় ব্যক্তির উপস্থিতি দুজনের জন্যই কাঙ্ক্ষিত হবার কথা। কিন্তু মানব-হূদয় এমনই এক অধরা বিষয় যাকে জয় করার ক্ষমতা স্বয়ং হূত্মালিকেরও নেই। মানব-জীবনের এক অদেখা দুঃখবোধ, চাওয়া-পাওয়া সামঞ্জস্যহীনতা তথা যা কিছু আকাঙ্ক্ষিত তা আদৌ কাঙ্ক্ষিত কি-না—এ বিষয়গুলোর প্রতি এক সূক্ষ্ম দৃষ্টি গাঁথলেন মান্নান সৈয়দ গল্পটিতে। লেখকের প্রতিটি গল্পের মতো বিষয়বৈচিত্র্যের অভিনবত্ব প্রকাশক গল্পগুলোর একটি—মাতৃহননের নান্দীপাঠ। আতিকুল্লাহ ও তার মায়ের ভেতরে যে মানসিক দ্বন্দ্ব তা অনেক ক্ষেত্রেই ফ্রয়েডের Psycho-analysis-এর কথা মনে করিয়ে দেয়। প্রবৃত্তিচালিত Id এবং যুক্তিশাসিত Ego-র মধ্যে দ্বন্দ্ব সবসময়েই চলতে থাকে, আমাদের মনের ভেতরে। যুক্তি ও প্রবৃত্তির দ্বন্দ্বমুখর চেতনার এমন বহুমাত্রিক বিন্যাস বাংলা ছোটগল্পে বিরল। ফ্রয়েডের সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে যায় Oedipus Complex-এর কথা। এই Complex-ই ভিন্ন রূপ হয়ে ধরা দেয় যখন আতিকুল্লাহ এবং তার মাকে নিয়ে ভাবনায় এক অশুচিতা বিরাজ করে।
জন্ম-বিবাহ-মৃত্যুর যে চিরন্তন বলয়ে মানবজীবন প্রবহমান, সেই সত্য প্রকাশক গল্প ‘ভয়’। মান্নান সৈয়দ এ গল্পে প্রতীকী চরিত্র ও ঘটনার মধ্য দিয়ে জীবনের জটিলতম বিষয়গুলোর ওপর আলো ফেলেছেন। প্রথম পুরুষে বর্ণিত এ গল্পের মূল চরিত্র এক রাতে তার কামনা চরিতার্থ করার সুযোগ পেয়ে যায়, তারই বাসার সবাই যখন একটি আপাত অসুস্থ মেয়েকে রেখে আমন্ত্রিত হয় কোনো এক ভোজসভায়। ফলে মেয়েটি হয়ে পড়ে সন্তানসম্ভবা। শ্রেণীগত বা ধর্মীয় যে দিক থেকেই হোক না কেন, যেহেতু ঘটনাটির দায় নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর ক্ষমতা অপরাধীর নেই, সে দায়ভার এড়ানোর জন্য বিভিন্ন যুক্তি দাঁড় করাতে চেষ্টা করে। একজন মানুষকে ভালো না বেসেও কেবল শরীরী আকর্ষণে পরাজিত হয়ে যে সুযোগ কথক গ্রহণ করল, তাতে পরবর্তী সময়ে তার অনুতাপও গল্পে প্রকাশিত।
অধ্যাপক শাহেদ আলী আকস্মিক তার ডাক্তারের কাছ থেকে জানতে পারে, এই পৃথিবীতে তার বিচরণ হবে বড়জোড় এক বছর। অধ্যাপক সাহেবের এই অবস্থায় তার মানসিক পরিবর্তনের পটভূমিতে রচিত গল্প ‘অধঃপতন’। আর দশটা স্বাভাবিক মানুষের মতো যে জীবন সে কাটাচ্ছিল, এক মুহূর্তেই যেন তাতে ধস নামল। অধ্যাপক হিসেবে তার যে আদর্শবোধ, তিল তিল করে গড়ে তোলা আজকের যে অবস্থান তথা সামাজিক দায়বদ্ধতা—সবকিছুই যেন বিচূর্ণ হয়ে গেল। সমাজ-প্রতিবেশ-পরিবেশ-পরিপ্রেক্ষিত ক্রমশ মূল্যহীন হয়ে উঠল অধ্যাপক শাহেদ আলীর কাছে। মৃত্যুই তার কাছে চরম সত্য হয়ে উঠল এবং মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত সে জীবনকে চূড়ান্তভাবে ভোগ করার সিদ্ধান্ত নেয়। ‘সমস্ত সুখের চেয়ে জীবন বড়ো, সমস্ত দুঃখের চেয়ে জীবন বড়ো’—এই দর্শনকে আঁকড়ে ধরে সে জীবনের বাকিটা অংশ কাটিয়ে দিতে চায়। ফলে তার পক্ষে বাড়ির বয়স্ক কাজের মেয়েকে চোখ মারা, সমাজের নিচুতলার মানুষের সঙ্গে বসে সিনেমা হলে অশ্লীল সিনেমা দেখা এবং তাদের মতোই শিস দেওয়ার চেষ্টা করতেও বাঁধল না। তার অধঃপতন চূড়ান্ত রূপ পেল যখন সে পথের একটি বেশ্যা মেয়েকে সঙ্গে করে তার ঘরে গিয়ে উঠল এবং রাত্রিযাপন শেষে মাতাল হয়ে নিজের বমিতে শুয়ে প্রতিজ্ঞা করেছিল।
সত্যের মতো বদমাশ গল্পগ্রন্থের শেষ গল্প, প্রথমে ছাপা হয়েছিল অশোক সৈয়দ ছদ্মনামে। ‘ভয়’ গল্পটিও এই নামেই ছাপা হয়। শুরু থেকে শেষাবধি প্রতীকময়তার পাশাপাশি পরাবাস্তববাদী ভাবনার বিকাশ দেখা যায় গল্পটিতে। মানবিক অনুভূতি ও বিশ্বাসের এক অপূর্ব সম্মিলন ঘটিয়েছেন লেখক এ গল্পে। সত্যের মতো বদমাশ গ্রন্থের বারোটি গল্পে—বুদ্ধিদীপ্ত অস্তিত্বকামী-মানুষ, ব্যক্তির মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব, অন্তর্কলহ, কামনা-বাসনা, শূন্যতাবোধ, অপ্রাপ্তি, আত্মমর্যাদা বিসর্জন, প্রবৃত্তির উল্লাস প্রভৃতি বহুমুখী কোণ স্পর্শ করে গিয়েছেন লেখক। লক্ষ করার বিষয় যে, গল্পগ্রন্থটিতে যৌনতা, কামনা, বাসনার কথা থাকলেও সমাজবাস্তবতা যেমন অনুপস্থিত তেমনি প্রেমের গল্পও অনুপস্থিত। অথচ তারপরও জীবনের অজস্রতায় যেন কোনো ঘাটতি পড়ে না।
‘মৃত্যুর অধিক লাল ক্ষুধা’—গ্রন্থে এসে আবদুল মান্নান সৈয়দ নবরূপে উদ্ভাসিত হলেন। এবার তিনি মনোজগতের পাশাপাশি সমানভাবে গল্পের আখ্যান বর্ণনাতেও মনোযোগী হলেন। ফলে গল্পগুলোকে বাস্তবতার ভিতের ওপর দাঁড় করিয়ে চরিত্রগুলোর মনোজগতের ওপর ফেললেন আনুবীক্ষণিক দৃষ্টি। গল্পগ্রন্থটিকে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশাজীবী মানুষের আত্মিক দুঃখবোধের চিত্রায়ণ বলা যায়। নিম্নশ্রেণীর মানুষের সঙ্গে নিম্নমধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত শ্রেণীর মানুষের অন্তর্গত ক্ষোভ, হতাশাবোধ, গ্লানি বা নিয়তিতাড়িত মনোবৃত্তিই গল্পগুলোর বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। ‘রুপোলি খুন’, ‘দর্পণে অগ্নি দেখে’, ‘বাঘ’, ‘শুকতারা সন্ধাতারা’, ‘মৃত্যুর অধিক লাল ক্ষুধা’—গল্পগুলোতে নিম্নবর্গের মানুষের জীবনযন্ত্রণার নানামুখী প্রকাশ দেখা যায়। ‘শিকার’, ‘সর্বশক্তিমান’, ‘ঋষি ও রাণী’, ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’, ‘মৃত্যুর অধিক লাল ক্ষুধা’—গল্পগুলোতে মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষকে উপজীব্য করা হলেও বিষয় ও মানবানুভূতি নির্মাণে লেখক যথেষ্ট বৈচিত্র্যের স্বাক্ষর রেখেছেন। প্রতিটি গল্পই জীবনের সংকট চিত্রায়ণে অনন্য।
‘রুপোলি খুন’ নামের মতোই সমগ্র গল্পটি জুড়ে রয়েছে প্রতীকময়তার ছড়াছড়ি। মানবিক অনুভূতির সঙ্গে জড়পদার্থগুলোও যেন তাদের জড়তা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে লেখকের এক অপূর্ব লেখনীস্পর্শে। গল্পের কাহিনি বিধৃত হয়েছে মূলত সমাজের নীচু শ্রেণীর মানুষের দুঃখ-বেদনা, চাওয়া-পাওয়াকে উপলক্ষ করে। সমাজের উঁচুতলার মানুষের কাছে মূল্যহীন বা গুরুত্বহীন বিষয়গুলোই খেটে খাওয়া নিম্নবিত্ত মানুষগুলোর কাছে যেন অমূল্য হয়ে দেখা দেয়। গোমতী নদী থেকে বালি তুলে জীবিকা নির্বাহ করে যে কলিম সেই কলিমের বউয়ের ওপর চোখ পড়ে তার কোম্পানির মালিকের। এক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ছিল কোম্পানির ম্যানেজার। স্বাভাবিকভাবেই যে মানুষটির ‘দিন আনি দিন খাই’ অবস্থা, তার জন্য একটি মোটা অংকের টাকার মোহ কাটানো সহজ বিষয় নয়। ম্যানেজার কলিমকে নানাভাবে বড় অঙ্কের টাকার লোভ দেখিয়ে রাজি করানোর চেষ্টা চালিয়ে যায়। হয়তো সমাজের ওপরতলার মানুষগুলোর জন্য মানবিক আবেগ-অনুভূতির মানদণ্ড—এমনই। সেক্ষেত্রে নিজের বউ বা সন্তান—এ বিষয়গুলো খুব বেশি গুরুত্ব বহন করে না। মনে পড়ছে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর ‘শাস্তি’ গল্পে চন্দরার কথা। যেখানে ছিদাম তার ভাইয়ের জন্য নিজের বউকেও ফাঁসির আসামি করতে দ্বিধাবোধ করেনি। সেই ছিদামেরই প্রতিরূপ হিসেবে যেন ‘রুপোলি খুন’ গল্পটিতে পাওয়া যায় কলিমকে।
নিম্নশ্রেণীর মানুষের চাওয়া-পাওয়া, আনন্দ-বেদনা, দুঃখ-কষ্টের এক সুন্দর চিত্র ‘বাঘ’। সমাজের নীচুতলার মানুষের প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তির মধ্যকার দূরত্ব হয়তো খুবই নগণ্য, কিন্তু সেই ব্যবধানটুকু অতিক্রম করাও দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। এই গরিব মানুষগুলোর কাছে পোলাও তো যোজন যোজন দূরের বিষয়, সে চালের গন্ধও যে কতটা কাঙ্ক্ষিত তা বোঝা যায় নববিবাহিত গরিব রিকশা চালক রহিম ও আসিয়ার কথপোকথনে। আসিয়া ও রহিমের নতুন জীবনে ছোট ছোট সুখানুভূতির মধ্যদিয়ে গল্পটি এগিয়ে গিয়েছে। নিজের বউয়ের ব্যাপারে রহিম যথেষ্ট রক্ষণশীল। ফলে একটি একচ্ছত্র আধিপত্যের আদিম অধিকারবোধ থেকেই সে বউকে বাইরে বের হতে দেয় না। মালিকের বিরাট বাড়ি ও জমির এক প্রান্তে একটি ছোট কুটিরে সে তার বউকে নিয়ে থাকে। ঘরের টুকিটাকি কাজ সারার জন্য আসিয়া যখন বের হয়, মালিকের ছেলে তাকে অনুসরণ করে। মালিকের ছেলের আসিয়ার ওপর এই কুদৃষ্টি রহিমের চোখ এড়িয়ে যায়নি, কিন্তু যেহেতু নিজের বউয়ের কোনো অসদাচরণ সে লক্ষ করেনি তারপরও মালিকের ছেলের রাগের রোষ সে নিজের বউয়ের ওপর দিয়েই ঝাড়ে।
এমনই টোনা-টুনির ছোট্ট সংসারে সুখে-দুঃখে যখন রহিম-আসিয়ার দিন কেটে যাচ্ছিল, তখনই বজ্রাঘাতের মতো এক সড়ক দুর্ঘটনায় পা হারায় রহিম। রহিমের এই মেঘাচ্ছন্ন দিনগুলোতে তার মালিক যথেষ্ট সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠে আর মালিকের ছেলে সহানুভূতির পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে আসিয়াকে গ্রাস করে।
জীবনের জটিলতার একটি বড় অংশ জুড়েই রয়েছে সম্পর্কের জটিলতা। মানবমন এমনই এক কুয়াশাচ্ছন্ন বিষয় যেখানে যতই তাকে সাবধানে সঠিক পথে রাখার চেষ্টা করা হোক না কেন—কখন যে দিকভ্রষ্ট হয়ে পড়ে, তার চাবিকাঠি যেন মালিকের হাতেও থাকে না। মানব সম্পর্কের এই টানাপোড়েন নিয়েই ‘শিকার’ গল্পটি লেখা।
গল্পগ্রন্থটিতে মূলত মানব-সম্পর্কের জটিলতা তথা সম্পর্কগুলোর অন্তর্নিহিত ক্ষত চিহ্নিত করে বহুমুখী সম্পর্কের অন্তর্গত জটিলতা তুলে ধরতে চেয়েছেন লেখক। গল্পগুলোতে যেমন উঠে এসেছে একদিকে সম্পর্কের বহুমুখিনতা তেমনি একমুখিনতাও।
‘ঋষি ও রাণী’ গল্পটির নামকরণে রূপকথার ছোঁয়া পাওয়া যায়। বয়োঃসন্ধি অতিক্রম করছে—এমন এক কিশোর যোগেন ঋষি এ গল্পের নায়ক। তিন ভাই নগেন, খগেন ও যোগেন—এদের মধ্যে বড় দু-ভাই নিজের সংসার, বাবার বিষয়-সম্পত্তি নিয়ে নিজেদেরকে গুছিয়ে নিলেও ছোট ভাই যোগেন সহায়-সম্পত্তি বঞ্চিত বেকার তারুণ্যের দিকে ধাবমান এক মানুষ। পরিবারে মা, বড় দু-ভাই, দু-ভাবি এবং বড় ভাইয়ের সন্তানদের নিয়ে যোগেনের জগত্। এত সম্প্রসারণশীল এক পরিবারের মধ্যে থেকেও যোগেন যেন সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন। সবাই মনে করে, তাকে দিয়ে কিছু হবে না, কেননা পরিবার তার কাছ থেকে কিছু পায় না, সে বেকার। একমাত্র ব্যতিক্রম তার মেজো বৌদি, যার কয়েক বছরের বিবাহিত জীবনে সে সন্তানহীন অথচ সদাহাস্যময়ী এ রমণী যেন যোগেনকে কিশোর থেকে যুবকে পরিণত করল। অসম বয়সী এক সমাজ গর্হিত সম্পর্কের সূত্রপাতের মধ্যদিয়ে লেখক এ গল্পের ইতি টেনেছেন।
লেখক জীবনের সংকট চিত্রায়িত হয়েছে ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ গল্পে। লেখক আবেদের আর্থিক সংকট, সামাজিক সংকট তথা অর্থনৈতিক সংকটের এক যুগপত্ প্রকাশ ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ গল্পটি।
যৌবন অতিক্রান্ত অবিবাহিতা এক নারীর অন্তর্গত দুঃখবোধ ‘মৃত্যুর অধিক লাল ক্ষুধা’ গল্পের মূল বিষয়। ‘কল্যাণপুর ফ্রি প্রাইমারি স্কুল’-এর ম্যাট্রিক পাশ হেডমিস্ট্রেস রাজিয়া। এই চাকরিটা শুধু রাজিয়া নয়, তার সমগ্র পরিবারটাকে আসন্ন পতন থেকে রক্ষা করেছিল। ফলে বাবা-মাকে নিয়ে অন্ন-বস্ত্রের সংস্থান করে ভাইদের লেখাপড়া শিখিয়ে সে তার নিজের জীবন গোছানোর সময়টাকে যে হারিয়ে ফেলেছে, তা অসময়ে এসে বুঝতে পারল। যে পদে সে আসীন তার থেকে অনেক কম যোগ্য হওয়ার কারণে প্রতিনিয়ত চাকরি হারানোর ভয় দেখাত স্কুলটির সেক্রেটারি। জনাব আমির উদ্দিন সাহেব খুব ভালো করেই রাজিয়ার দুর্বলতার সুযোগটা গ্রহণ করে এবং তাকে বিভিন্ন সমস্যায় ফেলে নিজের কামজ বাসনা চরিতার্থ করতে থাকে। কখনো অনিচ্ছায় কখনো ইচ্ছায় রাজিয়া সেক্রেটারি সাহেবের বাসনার পরিপুষ্টি সাধন করে চলছিল এবং তা অবশ্যই তার জীবিকার তাগিদেই। সর্বোপরি, যেহেতু বাবার সংসারের অন্নসংস্থান করতে গিয়ে নিজের সংসার- জীবনের (যা প্রতিটি নারী জীবনেরই একান্ত কাম্য) সূর্যাস্ত ঘটে গিয়েছিল। ফলে রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে যৌনক্ষুধার এক অতৃপ্তি নিয়েই তার পথচলা।
‘উত্সব’ (১৯৮৮) গল্পগ্রন্থটি তাঁর নিরীক্ষাধর্মী গল্পগ্রন্থগুলোর একটি। গ্রন্থটিতে স্থান পেয়েছে ‘উত্সব’, ‘চোখ’, ‘রাজা’, ‘কালো গোলাপ’, ‘আম্রকাননে’ গল্পগুলো।
ভাষা ও প্রকাশভঙ্গির ক্ষেত্রে মান্নান সৈয়দ যে ব্যতিক্রমধর্মিতার পরিচয় দিয়েছিলেন তাতে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল উত্সব। গতানুগতিক ধারার মধ্যে এক পরিবর্তিত মেজাজের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন লেখক। গ্রন্থ থেকে গ্রন্থান্তরে মান্নান সৈয়দের যে ক্লান্তিহীন ছুটে চলা, এ যেন অতৃপ্তিরই বহিঃপ্রকাশ। এই অতৃপ্ত লেখনিশক্তি একেকবার একেক পথে তাঁকে নিয়ে চলেছে। গল্পগ্রন্থটিতে আবদুল মান্নান সৈয়দ আবির্ভূত হলেন পূর্ণাঙ্গ নতুনত্ব নিয়ে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, ইতিহাসনির্ভর কল্পনাশ্রয়ী রাজা-বাদশাদের গল্পসংকলন। প্রকৃতপক্ষে কেবল রাজা-বাদশাদের রূপকথাশ্রয়ী কাহিনির বয়ান উত্সব নয়। সংস্কৃত-তত্সম শব্দ বহুলতার জন্য সমগ্র আখ্যানভাগ জুড়েই রয়েছে প্রাচীনতার ছাপ। কিন্তু গল্পগুলোর মর্ম অনুধাবন করলেই বোঝা যায়, মূলভাব সর্বজনীন চিরকালীনতাকেই ধারণ করে। রাজ-বাদশা কাহিনির চরিত্র মাত্র। যাদের পেছনে রয়েছে এক-একটি আবেগানুভূতিপ্রবণ রক্ত-মাংসের সাধারণ মানুষ।
‘উত্সব’ ও ‘চোখ’ গল্পদুটি পড়লে মনে হয় যেন একই গল্প। কিন্তু কাহিনির অগ্রসরমাণতায় একটি পথের থেকে দুটি সম্প্রসারিত দিকের উন্মোচন ঘটে। গল্পের শুরু একই রকম হলেও দুটি সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী বিষয়ের সূত্রপাত ও পরিসমাপ্তি পরিলক্ষিত হয়।
রাজনীতিবিমুখতা মান্নান সৈয়দের স্বভাবজাত। তিনি সচেতনভাবেই বিষয়টিকে এড়িয়ে চলেছেন। কিন্তু এ গল্পগ্রন্থের ‘রাজা’ গল্পটি রাজনৈতিকই। এরকম গল্প তাঁকে আগে পরে লিখতে দেখা যায় না। গল্পটি যেন আমাদের রাজনৈতিক আর্থ-সামাজিক অবস্থাকেই কটাক্ষ করে। গল্পে এক রাজার মৃত্যুতে রাজার আসন অলঙ্কৃত করেছে নতুন রাজা। প্রজারা জানে না এই নতুন রাজাই পূর্ববর্তী মৃত্যুর জন্য দায়ী। এটি নিছক এক মৃত্যু নয়, একটি হত্যাকাণ্ড। মৃত রাজার স্বেচ্ছাচারিতার বদনাম ছিল, কিন্তু ক্ষমতার যেহেতু এক নিজস্ব ধর্ম আছে, তাই সিংহাসনে আসীন হবার পরেই নতুন রাজাও ক্রমশ স্বেচ্ছাচার করতে শুরু করল। সরে আসল নীতি-নৈতিকতার মানদণ্ড থেকে । গল্পশেষে দেখা যায়, রাজার জীবনাবসনে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি।
‘নেকড়ে হায়না আর তিন পরী’ (১৯৯৭) গল্পগ্রন্থের নামকরণের সঙ্গে গল্পগুলোর বিষয়বস্তুর সমগ্রতার একটি আভাস পাওয়া যায়। নাম ভূমিকার গল্পটির বিষয়ের সঙ্গে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সামঞ্জস্য বিধান করে অন্যান্য গল্পগুলোর ঘটনা বিধৃত হয়েছে। বিষয়বৈচিত্র্য হিসেবে নানামুখী সামাজিক সম্পর্কগুলো ছাপিয়ে মানব-জীবনের ভেতরে যে অনৈতিক সম্পর্কগুলোর হাতছানি দেখা যায়, তা-ই তুলে ধরেছেন আবদুল মান্নান সৈয়দ। মানব সম্পর্কের অন্তর্নিহিত নানামুখী জটিলতাকে লেখক এ গ্রন্থে গুরুত্ব দিয়েছেন। রয়েছে কিছু বৈচিত্র্যধর্মী গল্পও, যেখানে লেখকের রচনাভঙ্গির নতুনত্ব দৃশ্যমান।
মান্নান সৈয়দের গল্পগুলো পড়ে মনে হয়, যে সময়কালেই আমরা অবস্থান করি না কেন এক জটিল যুগ-যন্ত্রণার মধ্যে আমরা বিরাজ করি। আসলে নিজ নিজ যাপিত জীবনের সম্পর্কগুলো নিয়ে তৃপ্ত নই, ফলে প্রতিনিয়ত সম্পর্কগুলোর ভাঙন অনস্বীকার্য হয়ে পড়ে। বউ ও দুই সন্তান নিয়ে বেকার জামাল সাহেব অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়ে যে চাকরিটি পেয়েছিল তাতে মাইনে বাদ দিয়েও উপরি আয়ের কোনো অভাব ছিল না। ফলে একসময় অর্থই যে সকল অনর্থের মূল আরেকবার প্রমাণিত হলো। জামাল সাহেবের মেয়ে রিমির বয়সী মেয়েদের নিয়ে যত্রতত্র সময় ব্যয় করার ফলে ভাঙন ধরে জামাল দম্পতির দাম্পত্যজীবনে। আবদুল মান্নান সৈয়দের বেশিরভাগ গল্পই সমাজবিচ্ছিন্ন নিঃসঙ্গ মানুষের জীবনছবি—যার ব্যতিক্রম নয় এ গল্পটিও।
নেকড়ে হায়না আর তিন পরী গল্পগ্রন্থের প্রথম গল্পটির মতো অন্যান্য গল্পেও যুগ-যন্ত্রণাক্লিষ্ট মানুষের ছবি পাওয়া যায়। গল্পগুলোর বিষয় হিসেবে যেমন এসেছে মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়-বিশ্বাসহীনতা-অসমবয়সী প্রেম তথা অপরিণামদর্শিতা তেমনি কোনো কোনো গল্পকে নারীবাদী দৃষ্টিকোণ থেকেও পর্যালোচনা করা সম্ভব। মানব-সম্পর্ক নিয়ে কাটাছেঁড়া করার মাধ্যম হিসেবে মান্নান সৈয়দ অনুভূতির যে নব-নব রূপায়ণ ঘটিয়েছেন, তা তাঁর জীবনাভিজ্ঞতারই পরিচায়ক। ‘নেকড়ে হায়েনা আর তিন পরী’ গল্পটির মতোই ‘স্বর্গোদ্যান’, ‘চৈত্রের ঘূর্ণি’, ‘পয়লা ফাল্গুন ১৪০১’, ‘দরোজা’, ‘সমুদ্র ও সাধারণ মানুষ’, ‘আট বছর আগের একদিন’ গল্পগুলোর কাহিনি ও চরিত্ররা নানামুখী সম্পর্কের জটিলতায় সংকটাপন্ন এক সময়ে বিরাজমান। প্রধান চরিত্রগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মধ্যবয়সী অধ্যাপক, কখনো লেখক—খুব কম সময়েই তারা সরকারি চাকরিজীবী অথবা ভিন্ন পেশাবৃত্তির মানুষ।
আপাতদৃষ্টিতে গল্পগুলোর প্রধান চরিত্রগুলোকে দেখে মনে হয়, সংসার-সন্তান নিয়ে সুখী এক-একজন মানুষ, কিন্তু কাহিনির এগিয়ে চলা সাপেক্ষে সম্পর্কগুলোর নানামুখী টানাপোড়েন প্রকট হতে থাকে। অন্যান্য গল্পগুলোর তুলনায় ‘স্বর্গোদ্যান’ ও ‘দরোজা’ গল্পদুটি লেখকের প্রতীকী দৃষ্টিভঙ্গি বিচারের শ্রেষ্ঠ পরিচয়বাহী। মিনু ও গল্পের নায়ক বিয়ের কয়েক বছর পর যৌথপরিবারের নানামুখী সমস্যার সম্মুখীন হয়ে চারতলার ওপর ছোট দু-রুমের বাড়িতে যে স্বর্গোদ্যান রচনা করল, তা প্রতীকী অর্থে বিরাজমান। কেননা তাদের সে স্বর্গসুখের ভেতর যখন সন্দেহ দু-জনের মনেই দানা বাঁধল, তখন সবকিছু ছাপিয়ে একে অপরের প্রতি বিশ্বাসহীনতাই মূর্তমান হয়ে উঠল। ফলে গল্পের শেষাংশে একরাতে তাদের শোবার ঘরে যে উপর্যুপরি পোকার আক্রমণ শুরু হলো তা যেন রূপকল্পে তাদের সম্পর্কের ভাঙনেরই প্রতিরূপ।
লেখকের নেকড়ে হায়না আর তিন পরী গল্পগ্রন্থের ভিন্নধর্মী গল্পগুলোর একটি ‘কে বিদেশী বন-উদাসী’। কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে লেখা গল্পটির চরিত্র হিসেবে এসেছে গীতিকার-সুরকার কাজী নজরুল ইসলাম, তাঁর পত্নী প্রমীলা, নজরুল এবং সমসাময়িক ব্যক্তিত্বগণ যেমন—সুভাষ বোস, দিলীপ রায়, পরবর্তী সময়ে বিভা চট্টোপাধ্যায় ওরফে রিনা। মান্নান সৈয়দ নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে নজরুলের জীবনের একাংশকে ধরতে চেয়েছেন। চরিত্র ও ঘটনায় কিছু পরিবর্তন করেছেন গল্প লেখার প্রয়োজনেই।
গল্পটিতেও একাধিক জায়গায় দিলীপ রায়, সুভাষ বোস প্রভৃতি চরিত্রগুলো এসেছে। মান্নান সৈয়দের বিভিন্ন লেখা পড়লে অনুধাবন করা যায়, তাঁর দুর্বলতা ছিল নজরুল ইসলামের প্রতি।
‘আট বছর পরে একদিন’ গল্পে সত্যের কাছাকাছি গিয়ে সত্যকে স্পর্শ না করে মানবিক সম্পর্কের জটিলতাগুলোকে কখনো পরাবাস্তব দৃষ্টিভঙ্গিতে, কখনো প্রতীকময় করে লেখক পাঠকের সামনে হাজির করলেন। গল্পটির নানামুখী পাঠ সম্ভব, চাইলে নারীবাদীদৃষ্টিকোণ থেকেও বিচার করা যায়। লেখকের গল্পগুলোর আয়োজন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমাদের মনের অন্দরমহলকে ঘিরে। গল্পে অধ্যাপকের অন্তর্বিশ্বের সমস্ত অস্থিরতা শঙ্কা-অন্তর্দ্বন্দ্ব-অপ্রাপ্তিকে ঘিরেই গল্পটির এগিয়ে চলা। মাইক্রোস্কোপীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে যেন পুরো গল্প জুড়ে লেখক মানব মনের অলিগলিতে ঘুরে বেড়িয়েছেন।
‘মাছ মাংস মাত্সর্যের রূপকথা’ (২০০১) গল্পগ্রন্থটিতে আবদুল মান্নান সৈয়দ আধুনিকতার দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেলেন। গ্রন্থটি জীবিত অবস্থায় লেখকের শেষ মৌলিক গল্পগ্রন্থ। আগের গ্রন্থগুলোতে কোনো একটি বিষয়কে মূল থিম করে গল্পগুলো রচিত হয়েছিল। ফলে গ্রন্থগুলোতে কখনো প্রাধান্য পেয়েছে সম্পর্কের নানামুখী টানাপোড়েন, কখনো জনপ্রিয় লেখকদের নিয়ে এসেছেন চরিত্র হিসেবে, কখনো ইতিহাস আশ্রিত চরিত্রগুলোর ওপর আরোপ করেছেন নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি। সবকিছু ছাপিয়ে মূল বিষয় হিসেবে মানব সম্পর্কের স্বরূপ তথা অনুভূতির নানামুখী বিস্তার মুখ্য হয়ে উঠেছে।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৮-১৯৫৬)-এর ‘পদ্মানদীর মাঝি’ (১৯৩৬) উপন্যাসের চরিত্রগুলোকে ‘হোসেন মিয়ার সঙ্গে’ গল্পে লেখক নতুন রূপকল্পে তুলে আনলেন। লেখকের মনোবিশ্লেষক গল্পগুলোতে যেমন দ্বন্দ্বমুখর অন্তর্লোকের পরিচয় পাওয়া যায়, তেমনি মানুষকে তাঁর অনেক গল্পে চিত্রিত করেছেন বিপরীত ও বহুমুখী সম্ভাবনাসহ। গল্পটিতে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ভাই সুবোধকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়—প্রভৃতি চরিত্রগুলোর সঙ্গে উঠে এসেছে পদ্মানদীর মাঝি উপন্যাসের কুবের, কপিলা, হোসেন মিয়ার মতো কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলো। ফলে এ যেন উপন্যাসটির একটি ভিন্ন পাঠ।
‘কে তুমি’ গল্পটির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এক ধরনের কাব্যময়তা বিরাজমান, যেন বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়—কবির লেখা গদ্য। সত্তরের দশকের গোড়ার দিকে স্বাধীনতার পরপরই ‘কিংশুক’ নামে একটি ছোটকাগজ বের হতো, তারই কোনো একটি সংখ্যায় মান্নান সৈয়দের গদ্যভঙ্গির বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল। তত্সম শব্দের বাহুল্য কিন্তু বিশেষ এক ঢং বিদ্যমান। ‘মান্নানীয় গদ্য’ বাকবন্ধটিও ব্যবহূত হয়েছিল এই সময়েই। মান্নান সৈয়দের গদ্যরীতির এ নিজস্বতা গ্রন্থ থেকে গ্রন্থান্তরে, গল্প থেকে গল্পান্তরে এক সর্বত্রবিরাজি সমগ্রতা অর্জন করেছে।
মান্নান সৈয়দের পরাবাস্তব ভাবনা আক্রান্ত গল্পগুলোর একটি ‘কে তুমি’। রমজান গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র যার ‘বাঁজা’ বউ ফুলবাসরী। ‘জোন’ হিসেবে খেটে খাওয়া রমজানের মালিক ঢালি। গল্পকার রমজানের অনুভূতিতে Surrealist ভাবনার প্রতিফলন ঘটান যখন ঢালির ছোট মেয়ে ফিরোজাকে সাপে কাটার ফলে তার মৃত্যু হয়। শুরু হয় রজমানের সাপের পেছনে ছুটে চলা। ছুটতে ছুটতেই পথে তার সঙ্গে দেখা হয় এক বাঘের, মাটি ফুঁড়ে জেগে ওঠে দুজন লোক—যারা তাকে নতুন এক জীবনের হাতছানি দেয়।
মান্নান সৈয়দের নিরীক্ষাধর্মী গল্পগুলোর একটি ‘ব্ল্যাক আউট’। প্রায়ই মনে হয়, মান্নানীয় গদ্যের রয়েছে একধরনের দুর্জ্ঞেয়-দুর্বোধ্যতা। কথাটি আক্ষরিক অর্থে ঠিক হলেও ভাবার্থে নয়। ব্ল্যাক আউট গল্পটির শুরু থেকেই ছড়িয়ে রয়েছে এক দুর্বোধ্যতা। এ যেন গল্প নয়, ছোট ছোট কবিতার সম্মিলন। প্রতীকময়তার সঙ্গে সঙ্গে দেখা পাওয়া যায় অসাধারণ সব চিত্রকল্পের।
‘নারীর হূদয় প্রেমগৃহ অর্থ কীর্তি সচ্ছলতা’ গল্পটির প্রকাশকাল ১৯৯৭ সাল। জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪)-এর শেষ জীবনের কয়েকদিনের গদ্যরূপ দিলেন মান্নান সৈয়দ এই গল্পে। জীবনানন্দের খুব কাছের মানুষগুলো—স্ত্রী লাবন্য দাশ, পুত্র রঞ্জু, কন্যা মঞ্জু, ছোটবোন সুচরিতা, ভাই অশোকানন্দ এবং খুব কাছের কিছু বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ী গল্পটির চরিত্র হিসেবে উঠে এসেছে। ১৯৫৪ সালে যখন কবির ট্রাম দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়, তখন তিনি হাওড়া গার্লস কলেজে কর্মরত ছিলেন। মূলত জীবনের এ বিষয়গুলোই গল্পে উঠে এসেছে। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জীবনানন্দীয় এক কাব্যিক সুষমা।
অদ্যাবধি আলোচিত সবচেয়ে নিরীক্ষাধর্মী গল্প ‘মাছ মাংস মাত্সর্যের রূপকথা’। গল্প থেকে গল্পান্তরে লেখক বিষয় বৈচিত্র্যের যেমন স্বাক্ষর রেখেছেন তেমনি শৈল্পিক বিন্যাস তথা গাঠনিক দিক বিচারেও যথেষ্ট পরিশ্রমের সাক্ষ্য বহন করে গল্পগুলো। গল্পটি পারিবারিক কাঠামোয় আবর্তিত—যেখানে গোলাম রহমান, তার স্ত্রী লায়লা, তিন সন্তান জ্যাকি-লিজা-বনি এবং গোলাম রহমানের আশি বছর বয়সী এক বৃদ্ধ বাবার দেখা পাওয়া যায়। শুরুতেই গোলাম রহমানের কাছ থেকেই পাঠক জানতে পারে গল্পটির পরিণাম। এক অর্থে শেষ থেকে শুরু হয়েছে গল্পটি।
মানুষ, তার অন্তর্জগত্ এবং মানুষের কার্যকলাপের প্রভাব পারপার্শ্বিকতাকে আন্দোলিত করে। তার অন্তর্জগত্ ও বহির্জগতের সম্মিলনে যে জীবন তাকেই কাটাছেঁড়া করা মান্নান সৈয়দের মূল লক্ষ্য, কিন্তু বিষয়-বৈচিত্র্যে তাঁর সমকক্ষ লেখক খুব কমই পাওয়া যায়। এ গল্পে লেখকের জীবনবোধ দর্শনে রূপ পেয়েছে। মান্নান সৈয়দের জীবনদৃষ্টি প্রতীকময়তার মাধ্যমে প্রকাশিত, কখনো বা তা দার্শনিকতার পরিচয়বাহী।
সৃজনশীলতা ও মননশীলতায় সমসাময়িক খুব কম লেখকদের এক কাতারে দাঁড় করানো যায়, মান্নান সৈয়দ তাঁদের অন্যতম। নিরীক্ষাপ্রবণতা মান্নানীয় গদ্যের মৌল বৈশিষ্ট্য। প্রতিনিয়ত তিনি বিষয় ও আঙ্গিক নিয়ে চিন্তাশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। ফলে তাঁর গল্পে উঠে এসেছে পরাবাস্তব ভাবনার আলোকে মানবচৈতন্যের অবলোকন, বিষয় বর্ণনায় প্রতীকময়তার উপস্থাপন, ইতিহাস বা কল্পোতিহাস নির্ভর চরিত্রগুলোতে আরোপ করেছেন সাধারণ মানুষের আত্মিক সংকট, বিবাহ বহির্ভূত তথা অসমবয়সী অসামাজিক সম্পর্ক চিত্রায়ণের মতো বহুধা বিস্তৃত নানামুখী বিষয়। সম্পর্কের জটিলতা প্রকাশকমান লেখাগুলো মান্নান সৈয়দের সৃষ্টিশীলতাকে উচ্চ মর্যাদা দান করেছে। গল্পে অনেক চরিত্র বা বিষয়বর্ণনায় লেখক প্রতীক বা চিত্রকল্পের আশ্রয় নিয়েছেন। ফলে আখ্যান বর্ণনায় তাঁর যথেষ্ট শিল্পকুশলতার পরিচয় পাওয়া যায়।
