ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয়

আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০১৩, ১৯:৫৭
সহকারী অধ্যাপিকা ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ চেম্বার: জেনারেল মেডিক্যাল হাসপাতাল (প্রা.) লি., ১০৩, এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা। ১৭৮০ সালে প্রথম এই রোগের বর্ণনা পাওয়া যায়। মশার মাধ্যমে এর সংক্রমণ বিস্তার ১৯০৫ সালে এবং এটি যে একটি ভাইরাসজনিত রোগ তা ১৯০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। অবশ্য, ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত ভাইরাসটি শনাক্ত করা যায়নি। এটি এখন প্রতিষ্ঠিত যে, চারটি পৃথক ধরনের ভাইরাস (টাইপ ১-৪) ডেঙ্গু জ্বরের জন্য দায়ী। এটি একটি ভাইরাসজনিত রোগ যা এডিস মশার কামড়ের মাধ্যমে ছড়ায়। এটি সাধারণত যে সব ঋতুতে মশার প্রকোপ বেশি থাকে অর্থাত্ গরম আবহাওয়ায় বেশি ঘটতে দেখা যায়। এর সুপ্তাবস্থা অর্থাত্ জীবাণুর সংক্রমণ থেকে শুরু করে প্রথম রোগের লক্ষণ দেখা দেয়া পর্যন্ত তিন থেকে ১৫ দিন কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাত থেকে ১০ দিন। ডেঙ্গু মহামারী আকারে ভারত, থাইল্যান্ড, জাপান, ফিলিপাইন, বাংলাদেশসহ পশ্চিম আফ্রিকা এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় এলাকা ইন্দোনেশিয়া, উত্তর-পুব অস্ট্রেলিয়া, ক্যারিবীয় ও দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাংশে দেখা যায়। রোগের সুপ্তাবস্থার সময় বিমানের যাত্রীরা প্রায়ই ভ্রমণ করে থাকে। রোগের উপসর্গ ও লক্ষণ ক্লিনিক্যাল বৈশিষ্ট্যগুলোকে পাঁচটি ভাগে ভাগ করা যায়- ১. প্রাথমিক উপসর্গ: রোগের প্রধান বৈশিষ্ট্য জ্বর শুরু হওয়ার আগের ধাপে দ’দিন শরীরে ম্যাজম্যাজ ভাব ও মাথাব্যথা। ২. রোগের তীব্র আক্রমণ: হঠাত্ তীব্র জ্বর, প্রচণ্ড মাথাব্যথা, পিঠ ও অস্থিসন্ধিতে ব্যথাসহ সারাশরীরে ব্যথা, চোখ মেলতে ব্যথা বোধ, বমিভাব বা বমি হয়ে থাকে। ৩. জ্বর: চতুর্থ বা পঞ্চম দিন বিরতি দিয়ে ৪১ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড জ্বর হয়ে থাকে, সচরাচর এই জ্বর সাত থেকে আট দিন পর্যন্ত থাকতে পারে। জ্বরের দ্ব্বিতীয় থেকে ষষ্ঠ দিনের মধ্যে রোগীর অগ্নিমন্দা, বমিভাব বা বমি, গলায় ব্যথা, নাকের ঝিল্লির প্রদাহ ও কাশি হয়ে থাকে। ৪.চামড়ার নিচে ছোট লাল ফুসকুড়ি: রোগাক্রান্তের এক থেকে দুই দিনের মধ্যে বুক, হাত ও পায়ে লাল ফুসকুড়ি দেখা যায় এবং তা প্রায় এক থেকে পাঁচ দিন স্থায়ী হয়। এই ফুসকুড়ি ওঠার আগ পর্যন্ত এটি ম্যালেরিয়া বা ইনফ্লুয়েঞ্জা হতে আলাদা করা যায় না। এই ফুসকুড়ি দেখে ডেঙ্গুর উপস্থিতি প্রায় নিশ্চিত হওয়া যায়। রোগ মুক্তির পর স্বাস্থ্যের ক্রমোন্নতি খুব ধীরে ধীরে রোগ মুক্তি ঘটে থাকে। তীব্রতার দিক থেকে ডেঙ্গুকে ডব্লিউএইচও চারটি পর্যায়ে বিভক্ত করছে- প্রথম পর্যায়: ব্যথাসহ জ্বর। দ্ব্বিতীয় পর্যায়: প্রথম পর্যায়ের লক্ষণসহ চামড়ার নিচে, মাড়ি ও পাকস্থলী থেকে স্বতঃস্ফূর্ত রক্তক্ষরণ। তৃতীয় পর্যায়: দ্ব্বিতীয় পর্যায়সহ রক্তপ্রবাহে সমস্যা বা সারকুলেটরি ফেইলিওর। চতুর্থ পর্যায়: তৃতীয় পর্যায়সহ রোগী শকে থাকে যখন তার রক্তচাপ ও পালস পরিমাপ করা যায় না। এটি প্রধানত শিশুদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, তবে অনেক সময় বড়দের মধ্যে এটি মহামারীর সময় দেখা যায়। রোগের চিকিত্সা ও প্রতিরোধ এ রোগের কোনো সুনির্দিষ্ট চিকিত্সা নেই। প্যারাসিটামল সেবনে রোগের প্রচণ্ড ব্যথার উপশম ঘটে। এসপিরিন পরিহার করা উচিত। প্রয়োজনে শরীরের তরলের ঘাটতি স্যালাইন দ্ব্বারা পূরণ ও রক্ত সঞ্চালন করা হয়। রোগীদের মশারির নিচে পরিচর্যা করা হয়। এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্রগুলো নির্মূল করতে হবে। বাড়ি ও আঙ্গিনায় এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্র যেমন গাছের নিচে ভাঙা বোতল বা গ্লাসে আবদ্ধ পানি, স্যাঁতস্যাঁতে রান্নাঘর ও চারপাশ, ময়লা ফেলা পাত্রে আবদ্ধ পানি এসব প্রজনন ক্ষেত্র নির্মূল করতে হবে। সমাজের সর্বস্তরের সদস্যকে দায়িত্বশীল করে তোলার ওপর জোর দেয়া উচিত যাতে করে তাদের সরাসরি অংশগ্রহণ ও সহযোগিতার মাধ্যমে এই রোগের বাহকের প্রজনন ক্ষেত্র নির্মূল করা সম্ভব। থাইল্যান্ডে এই রোগের ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হয়েছে এবং বর্তমানে শিশুদের মধ্যে তা প্রয়োগ করা হচ্ছে।