তালায় চিংড়ির ঘেরের প্রভাবে ধ্বংসের মুখে প্রকৃতি

আপডেট : ২৩ নভেম্বর ২০১৩, ২১:৩১
পরিবেশ ধ্বংস করে সাদা সোনার সন্ধানে ছুটছে হাজারো মানুষ। জনবসতির প্রয়োজনে সবুজ প্রকৃতি থাকুক বা না থাকুক চাই প্রচুর অর্থ। চেনা-জানা ছায়াঘেরা গ্রাম, গাছপালা, তরুলতা, গবাদিপশু, কৃষি আবাদ কিছুই থাকছে না। মাঠের পর মাঠ শুধু পানি আর পানি। যে জমিতে এক সময় নানা জাতের ধান হতো, সেখানে এখন চাষ হচ্ছে চিংড়ি। উপজেলার কয়েকটি গ্রাম ঘুরে দেখা যায় চিংড়ি চাষের প্রভাবে বহুমুখী এ ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র। এলাকাবাসী জানান, চিংড়ি চাষ তাদের অবস্থা কিছুটা বদলাতে পেরেছে ঠিকই কিন্তু ছায়াঘেরা সবুজ পরিবেশ এখন আর এলাকায় নেই। ফলে এতে ধ্বংসের মুখে পড়েছে প্রকৃতি ও পরিবেশ। সরকারি হিসেব মতে, উপজেলায় ৭ হাজার ৭৪৫টি মত্স্য ঘের রয়েছে। এর মধ্যে খলিশখালী, খেশরা, ধানদিয়া, নগরঘাটা ও খলিলনগর ইউনিয়নে চিংড়ি চাষের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। এ ছাড়া ইসলামকাটী, মাগুরা, জালালপুর, তালা, তেঁতুলিয়া, কুমিরা ও সরুলিয়া ইউনিয়নেও বেশ কিছু এলাকায় চিংড়ি চাষ সমপ্রসারিত হয়েছে। তবে অনেক এলাকার চেহারা একেবারেই ভিন্ন। বারুইহাটী, আটারই, নলতাসহ কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সবুজ ধানক্ষেত যেন সেখানে নবান্নেরই আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ১০/১২ বছর আগে এ উপজেলায় প্রায় ২৮ হাজার হেক্টর জমিতে ধান আবাদ হতো। জলাবদ্ধতার কারণে এবং চিংড়ি চাষ সমপ্রসারিত হওয়ায় আবাদি জমির পরিমাণ কমে বর্তমানে বোরো মৌসুমে ১৬ হাজার ৪শ’ এবং আমন মৌসুম ৯ হাজার ৪শ’ হেক্টর মিলে সর্বমোট ২৫ হাজার ৮০০ হেক্টরে নেমে এসেছে। অন্তত ১০ হাজার কৃষক এ পেশা থেকে অন্য পেশায় ফিরেছে। তালার খলিশখালী ও খলিলনগর ইউনিয়নের কয়েকটি চিংড়ি ঘের এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অনেক এলাকায় লবণাক্ততা বেড়ে গিয়ে সুপেয় পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। কয়েক কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে কিংবা ভ্যানে পানি সংগ্রহ করতে হয় অনেকের। গবাদিপশু, হাঁসমুরগি, ভেড়া, ছাগল নেই। বাড়ির আঙিনায় আগে সবজি হতো, সবজি বাজার থেকে কিনতে হতো না। এখন বাজার থেকে উচ্চমূল্যে সবজি কিনতে হচ্ছে। সরেজমিন দেখা যায়, চিংড়ি চাষ এলাকার ভেতরে ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন বাড়ি-ঘর। বাড়ির আঙিনা, স্কুলের বারান্দা অবধি সব সময় পানি থাকছে। বাড়ির উঠান নেই, স্কুলে নেই খেলার মাঠ। গাছপালার সংখ্যা খুবই কম। এ যেন ভিন্ন পরিবেশ। এসব এলাকার মানুষ জানান, শুধু লবণ পানির কারণে নয়, জলাবদ্ধতার কারণে সারা বছর জমি পানিতে ডুবে থাকায় মাটি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। শালিক, কাক, বক, ঘুঘু, সাপ, ব্যাঙ, শামুক এগুলো এখন আর এলাকায় দেখা যায় না। এলাকার ছেলে-মেয়েরা এ সব প্রাণীদের চিনে না। উপজেলা সিনিয়র মত্স্য কর্মকর্তা অমল কান্তি রায় বলেন, ধানের চেয়ে মাছ চাষ বেশি লাভবান হওয়ায় কৃষকরা মত্স্য চাষে ঝুঁকে পড়েছে। তালা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শেখ সামসুল আলম বলেন, চিংড়ি চাষের জমিতে অধিকাংশ সময় লবণ থাকায় মাটির উর্বরতা শক্তি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থা থেকে ফিরতে চিংড়ি ও ধানের সমন্বিত চাষের উদ্যোগ নিতে হবে।