ধারালো হুল থাকলে শত্রুর গায়ে ফুটিয়ে তো দিবেই! আর সাংবাদিকের হুল হলো দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে প্রকাশ করা তথ্য-প্রমাণ। যে তথ্য-প্রমাণে ভিত কেঁপে ওঠে দুর্নীতিবাজদের। উপযুক্ত সাজা হয় তাদের। একের পর এক সেই হুল ফুটিয়ে ভারতের দুর্নীতিবাজদের নিকট চরম আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছিল সাপ্তাহিক পত্রিকা তেহেলকা। আর অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার নতুন মাত্রা দিয়েছিলেন তেহেলকা পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা এবং সম্পাদক তরুণ তেজপাল। তিনি সমাজ ও দেশের শত্রুদের বিরুদ্ধে রীতিমতো ‘জিহাদ’ ঘোষণা করেছিলেন। একের পর এক তথ্যভিত্তিক সংবাদ প্রকাশ করে বাঘা বাঘা দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে ধনকুবের, ঘুষখোর খেলোয়াড়, ব্যবসায়ীদের ঘুম হারাম করে দিয়েছিলেন। তার প্রকাশ করা খবরের উপর ভিত্তি করে প্রশাসন মামলা দায়ের করেছে। সেই সংবাদের ভিত্তি এতই মজবুত ছিল যে সেগুলো আদালতে সাক্ষ্য হিসেবে ব্যবহূত হয়েছে। এবং অপরাধীদের সাজা হয়েছে।
তরুণ তেজপাল তার পত্রিকার এই অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার নাম দিয়েছিলেন, ‘অপারেশন স্টিং’ অর্থাত্ ‘হুল ফুটানোর অভিযান’। সেই হুলের যন্ত্রণা যে কতজনকে সহ্য করতে হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। কত রাঘব বোয়ালদের যৌন ও নারী কেলেঙ্কারির খবর ফাঁস করে তাদের মুখে চুনকালি লেপে দিয়েছেন তিনি তার লেখাজোখা নেই। সম্পাদক তরুণ তেজপাল হয়ে উঠেছিলেন রীতিমতো সংবাদ তারকা। কিন্তু কথায় বলে, সামান্য ভুলে সবকিছু যায় পানিতে গুলে! সমাজ ও রাষ্ট্রের দুষ্টদের কাছে আতঙ্ক তরুণ তেজপাল এখন সেই সামান্য ভুলে নিজেই চলে গেছেন দুষ্টদের কাতারে! দিচ্ছেন চরম খেসারত। তার অর্জন করা হিমালয়সম সম্মান এখন লুটোপুটি খাচ্ছে বালুর ঢিবিতে। সমপ্রতি পত্রিকাটির পক্ষ থেকে গোয়ায় আয়োজন করা একটি অনুষ্ঠানে তরুণ তেজপাল লিফটের মধ্যে টেনে নিয়ে যৌন নিগ্রহ করেন তার পত্রিকার একজন নারী সাংবাদিককে। তেজপাল চেষ্টা করেছিলেন ওই নারী সাংবাদিকের কাছে ক্ষমা-টমা চেয়ে পার পেতে। কিন্তু এককান দুইকান করে ঘটনা চলে যায় মিডিয়ার কানে। খবরটি চলে আসে বিভিন্ন পত্রিকা ও টিভিতে। প্রচন্ড চাপের মুখে পদত্যাগ করেন তেজপাল। কিন্তু ঘটনা জানাজানি হওয়ায় সমঝোতার সুযোগ নষ্ট হয়ে যায়। দায়ের করা হয় ধর্ষণ চেষ্টার মামলা। এই মামলার তদন্ত করতে দিল্লিতে গেছে গোয়ার একদল পুলিশ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, একসময় তরুণ তেজপালের পত্রিকার ‘হুল ফুটানো বা স্টিং অপারেশন’ নাড়িয়ে দিয়েছিল বিজেপিকে। তেলেকার সংবাদের সূত্র ধরে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে বঙ্গারু লক্ষণের। বিজেপি কেবল নয়, কংগ্রেসসহ আরো কয়েকটি দলের বেশ কয়েকজন রাজনীতিককে অবসর নিতে বাধ্য করেছে তেলেকার প্রচারিত খবর। সাজা খাটছেন অনেকে। কথায় বলে সুনাম অর্জন করতে বছরের পর বছর লাগতে পারে। কিন্তু দুর্নাম কিনতে কত সময় লাগতে পারে? মাত্র এক সেকেন্ডের একটা ভুল কিংবা মতিভ্রমই যথেষ্ট। ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গোয়া সরকারের কাছে এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে। এছাড়া তরুণ তেজপালের বিরুদ্ধে এফআইআর দাখিল করার জন্য গোয়া পুলিশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ভারতের ন্যাশনাল কমিশন ফর উইমেন। ধারণা করা হচ্ছে মুখ লুকানোর আর কোনো সুযোগ নেই তেজপালের সামনে। যে কোনও সময় গ্রেফতার হতে পারেন তিনি। কারণ, ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগে জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা দায়ের করেছে গোয়া পুলিশ।
যৌন কেলেঙ্কারি মাথায় নিয়ে তেজপাল পদত্যাগ করার পর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হয়েছেন সোমা চৌধুরী। তিনি দাবি করেন, ওই তরুণী মামলা করতে চাননি। তিনি শুধু দাবি জানিয়েছিলেন তেজপাল যেন লিখিতভাবে তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। সেখানে তেজপাল ক্ষমা প্রার্থনাই শুধু করেননি, পদত্যাগও করেছিলেন। কিন্তু সোমার এই বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ছেন ওই তরুণী সাংবাদিক। তিনি একটি টিভি চ্যানেলকে বলেন, আমি মোটেও আপোষ করতে চাইনি। ন্যায়বিচার চেয়েছি।
জাতীয় মহিলা কমিশনের চেয়ারপার্সন মমতা শর্মা বলেন, তেজপাল তো ঈশ্বর নন যে নিজের অপরাধের জন্য তিনি নিজেই নিজেকে শাস্তি দেবেন। দেশে বিচারব্যবস্থা রয়েছে। কাজেই আইনের পথে তাকে যেতেই হবে। এই মারাত্মক অপরাধের জন্য তিনি বিনা সাজায় পার পেতে পারেন না। তেজপাল ভারতে অত্যন্ত ডাকসাইটে ও সুপরিচিত সাংবাদিক। নৈতিকতা ও সততার পরাকাষ্ঠা নিয়ে এতদিন বহু সংবাদ প্রকাশ করেছেন। এখন কোন পরিস্থিতিতে তিনি তার অনেক কষ্টে অর্জন করা নৈতিকতাকে বিসর্জন দিলেন সোস্যাল মিডিয়াতে সেই প্রশ্ন করে ফিরছেন লাখ লাখ মানুষ।
