প্রায় দুই বছরের অস্থিরতা শেষে মালদ্বীপের রাজনৈতিক সংকট দূর হয়েছে! গত ১৬ নভেম্বর দ্বিতীয় দফা ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট পেয়েছে দেশটির জনগণ। বহু প্রতীক্ষিত এই নির্বাচনে সবাইকে অবাক করে জয়ী হয়েছেন আবদুল্লাহ ইয়ামিন। যিনি মালদ্বীপের সাবেক স্বৈরশাসক মামুন আব্দুল গাইয়ুমের সত্ ভাই। ইয়ামিন ৫১ দশমিক ৩ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। অপরদিকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ পেয়েছেন ৪৮ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট।
যদিও এর আগে গত ৯ নভেম্বর অনুষ্ঠিত প্রথম দফা নির্বাচনে মোহাম্মদ নাশিদই জিতেছিলেন। সর্বোচ্চ ৪৭ শতাংশ ভোট পান তিনি। কিন্তু বিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ৫০ শতাংশ ভোট না পাওয়ায় তাকে দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে লড়তে হয়। ঐ নির্বাচনে নাশিদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আবদুল্লাহ ইয়ামিন। প্রথম দফা নির্বাচনে তিনি ২৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন। দ্বিতীয় দফা ভোটের আগে নতুন করে প্রচার চালাতে আব্দুল্লাহ ইয়ামিন সময় চাওয়ায় এ ভোট গ্রহণের সময় কিছুটা পিছিয়ে যায়। এর সাথে সাথে বদলে যায় মালদ্বীপের জনগণের সকল হিসাব-নিকাশ। বিশেষ করে বদলেছে নাশিদের কপাল। তবে হতাশ নন গণতন্ত্রে বিশ্বাসী এই মানুষটি। বরং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সমর্থন ও সম্মান করে পরাজয় মেনে নিয়েছেন তিনি। রাজনৈতিক পরিণতি ও বাস্তবতা সম্পর্কে জেনেও সচেতনভাবে নাশিদ তার সমর্থকদের উদ্দেশ্য বলেছেন, ভোটের ফলাফলকে সম্মান করা উচিত। চলার পথে পড়ে গেলে তখন উঠে দাঁড়ানোটা জরুরি। এর পরে দৌড়াতে হবে। আর যখন তুমি পরাজিত হও তখন সাহস সঞ্চার কর জয়ের জন্য।
২০০৮ সালে মালদ্বীপে প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডন্ট হন মোহাম্মদ নাশিদ। ২০১২ সালে এক অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হন তিনি। এরপর থেকে দেশটিতে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলে আসছে। গত সেপ্টেম্বরে একবার নির্বাচন হলেও অনিয়মের অভিযোগে তা বাতিল করে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত। এরপর গত ১৯ অক্টোবর নির্বাচনের তারিখ থাকলেও ভোটার তালিকা নিয়ে জটিলতার কারণে তা স্থগিত করে দেয় দেশটির পুলিশ। আর সর্বশেষ সেই গাইয়ুম পরিবার।
প্রেসিডেন্ট ইয়ামিনের সত্ ভাই আব্দুল গাইয়ুম ১৯৭৮ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত একটানা ৩০ বছর মালদ্বীপ শাসন করেন। নতুন প্রেসিডেন্টের সরকারে ঠাঁই পেয়েছেন গাইয়ুমের মেয়ে দুনিয়া মামুন। যাকে নতুন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিযুক্ত করা হয়েছে। ৪৩ বছর বয়সী দুনিয়া অন্তর্বর্তীকালীন মামুন মোহাম্মদ ওয়াহিদের সরকারে উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। তাঁর এ নিয়োগকে মালদ্বীপে নতুন করে গাইয়ুম পরিবারের প্রভাব বিস্তারের ঘটনা হিসেবেই দেখছেন অনেকে।
ধারণা করা হয়, ৫৪ বছর বয়সী আবদুল্লাহ ইয়ামিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেও ৭৫ বছর বয়সী গাইয়ুমই তাঁর দল প্রগ্রেসিভ পার্টি অব মালদ্বীপের (পিপিএম) নিয়ন্ত্রণ করেন। তবে ইয়ামিনের সমর্থকরা বলছেন, দেশের অর্থনীতিকে অগ্রগতির পথে এগিয়ে নেয়ার মতো যোগ্যতা ইয়ামিনের রয়েছে। কারণ রাজনীতিতে আসার আগে রাষ্ট্র পরিচালিত অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। যদিও প্রতিপক্ষ সমর্থকদের মতে, এ জয়ের কারণে গণতন্ত্র বাতাসে মিলিয়ে যাবে আর মালদ্বীপ আবারো স্বৈরতন্ত্রের পথে অগ্রসর হবে।
ইয়ামিনের জয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছেন রিসোর্ট টাইকুন গাসিম ইব্রাহিম। গাইয়ুমের সময় এই গাসিম ইব্রাহিম অর্থমন্ত্রী ছিলেন। যে কারণে সন্দেহের তীরটা এখনো গাইয়ুম পরিবারের দিকে তাক করা রয়েছে।
কিন্তু এ সন্দেহ দূর করতে চান ১৭ নভেম্বর প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেয়া ইয়ামিন। তিনি বলেন, একটি জনপ্রিয় পর্যটনের দেশ হিসেবে মালদ্বীপের অবস্থান ধরে রাখা হবে। এ অঞ্চলের সবচেয়ে নিরাপদ ও উন্নত দেশ হিসেবে মালদ্বীপকে গড়ে তোলা হবে। তাই মালদ্বীপের এখন স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। তিনি আশা করেন, এজন্য বিরোধী দল তাকে সহায়তা করবে। তিনি আরো বলেন, আমরা আশা করি পার্লামেন্টের মাধ্যমে বিরোধী দলের কাছ থেকে যথাযথ সহযোগিতা পাবো। বিরোধী দলের সঙ্গে আমরা বিরোধ চাই না বরং সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে দেশের সামনে আসা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে চাই।
আশার বাণীও শুনিয়েছেন তিনি। বলেছেন, সকল তরুণকে চাকরি দেয়া হবে। কৃষক ও জেলেদের মজুরি বৃদ্ধি করা হবে। রাজস্বের বণ্টন সমভাবে সকল দ্বীপপুঞ্জে প্রদান করা হবে। পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে তিনি বলেছেন, প্রতিবেশী ও আরব রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপন করবেন তিনি। তবে তার পররাষ্ট্রনীতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নমুখী হবে না। নিজেরাই নিজেদের সম্পর্ক নির্ধারণ করবেন। স্বৈরতন্ত্রের বলয়ে বেড়ে ওঠা ইয়ামিন শেষ পর্যন্ত কতদিন গণতন্ত্রের পথে থাকবেন সেটা শুধু সময়ই বলে দিতে পারবে।
