ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘদিনের। এই কর্মসূচি চালাতে গিয়ে দেশটিকে অনেক মূল্য দিতে হচ্ছে। কিন্তু তারপরও নিজেদের অধিকারকে বিসর্জন না দেয়ার অঙ্গীকার করে দেশটি। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব চায় ইরানকে পরমাণু কর্মসূচি থেকে বিরত রাখতে। কারণ তা না হলে বিপদ বাড়বেই। তাই ক্ষমতাশালী ছয়টি দেশ জেনেভায় ইরানের সঙ্গে আলোচনা শুরু করে। ছয়দিনের আলোচনা শেষে এক সমঝোতায় পৌছাতে সম্ভব হয়েছেন তারা। এতো সহজে সমস্যার সমাধান হয়েছে ইরানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্র আগের চেয়ে নমনীয় হওয়ার কারনে। আর এজন্য সৌদি আরব এবং ইসরাইলের সঙ্গে সৃষ্টি হয়েছে দূরত্ব।
ইরানের সঙ্গে গত বুধবার থেকে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় দ্বিতীয় দফার আলোচনা শুরু করে জাতিসংঘের পাঁচ স্থায়ী সদস্যদেশ যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ব্রিটেন, রাশিয়া, চীন। আরো আছে জার্মানি। প্রথম দিনের আলোচনায় এই ছয়টি দেশ ইরানকে যেসব দাবি জানায় সেগুলোর মধ্যে তেহরান থেকে সমৃদ্ধ সব ইউরেনিয়াম সরিয়ে ফেলা, অস্ত্র তৈরির জন্য ২০ ভাগ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ বন্ধ করা, কোম-এ ভূ-গর্ভস্থ পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ এবং প্লুটোনিয়াম চুল্লির নির্মাণ কাজ বন্ধ করা। এছাড়া জাতিসংঘ পারমাণবিক সংস্থা আইএইএ যাতে শিগগিরই ইরানের ঘোষিত সব পারমাণবিক স্থাপনা পরিদর্শনের অনুমতি পায় সেই ব্যবস্থা করা। নভেম্বরের শুরুর দিকে প্রথম জেনেভা বৈঠকে ছয় জাতির সঙ্গে সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছেছিল ইরান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইরানের পরমাণু অধিকারের স্বীকৃতি দাবি এবং ফ্রান্সের কট্টর অবস্থানের কারণে চুক্তি করা সম্ভব হয়নি। ইরান বারবার বলে আসছিল তারা পরমাণু কার্যক্রমের ব্যাপারে কোনো ছাড় দেবে না। এটা তাদের অধিকার। তাদের পারমাণবিক জ্বালানি কাউকে ভয় দেখানোর জন্য নয় বা কোনো বিশেষ ক্লাবে যোগ দেয়ার জন্য নয়। এ সমঝোতা খুব কঠিন হবে বলে সতর্ক করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন পরমাণু চুক্তি করার জন্য সত্যিকারের সময় এসেছে বলে মন্তব্য করেছেন।
ইরান সংকট পুরোপুরি মিটে যাওয়ার অবাস্তব প্রত্যাশা কারো ছিল না। তবে ইরানকে পুরোপুরি হতাশ করে ফেরত পাঠাতেও চায় না পি-ফাইভ প্লাস ওয়ান। দুই পক্ষই কিছু ছাড় দেয়ায় পারস্পরিক আস্থা আরও জোরালো হয়, যার উপর ভিত্তি করে সমঝোতা সম্ভব হয়। কারণ শুধু পরমাণু কর্মসূচি নয়, এই মুহূর্তে গোটা অঞ্চলে ইরানের ভূমিকা নানা কারণে বাড়তি গুরুত্ব পাচ্ছে। সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের প্রশাসনের প্রতি সমর্থন, লেবাননে হিজবুল্লাহর উপর নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাব খাটিয়ে চলছে তেহরান। এই অবস্থায় আলোচনা ব্যর্থ হলে ইরান সত্যি পরমাণু অস্ত্র তৈরি করার পথে এগিয়ে যেতো। তখন আর দেশটির উপর কোনো রকম প্রভাব খাটানো সম্ভব হোত না।
ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র আগের চেয়ে অনেক নমনীয় ভূমিকা পালন করেছে। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি জে কার্নি এক বিবৃতিতে বলেছিলেন, ওবামা সিনেটরদের বলেছেন, ইরান ছয় জাতি আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় রাজি না হলে বা সমঝোতার শর্ত পালনে ব্যর্থ হলেই কেবল নতুন করে অবরোধ আরোপ করা হবে। বিবৃতিতে বলা হয়, আমরা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির অগ্রগতি বন্ধ করার সুযোগ পেয়েছি। এর মাধ্যমে সমন্বিত একটি প্রস্তাব অর্জন করা সম্ভব হতে পারে। আলোচনার মাধ্যমে প্রাথমিক সমঝোতা না হলে ইরান ইউরেনিয়ামের মজুদ বৃদ্ধি করবে, পারমাণবিক কেন্দ্রে নতুন সেন্ট্রিফিউজ যুক্ত করবে এবং আরাক শহরে একটি প্লুটোনিয়াম চুল্লি স্থাপন করবে। সম্প্রতি মার্কিন কিছুসংখ্যক আইন প্রণেতা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, ইরানের বিষয়ে হোয়াইট হাউস তাড়াহুড়ো করে সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এ ইস্যুতে আরও কঠোর হওয়া উচিত। হোয়াইট হাউসের একজন মুখপাত্র আশঙ্কা প্রকাশ করেন, আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় রাজি করাতে না পারলে তেহরান তার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধিকরণ কর্মসূচি অব্যাহত রাখতে পারে। আর ইউরেনিয়াম ধাতুকে একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় সমৃদ্ধ করতে পারলে তা পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণে কাজে লাগানো সম্ভব। ইরান তার কাছাকাছি পর্যায়ে রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র এখন মনে করে, অবরোধ আরোপটা খুব একটা কার্যকর নয়। বরং সমঝোতার মাধ্যমে যদি ইরানকে এই কর্মসূচি থেকে ফেরানো যায় তাহলে সেটাই বরং ভাল। তাছাড়া ইরানের আগের প্রেসিডেন্টের মতো বর্তমান প্রেসিডেন্ট কট্টরপন্থী নন, অনেকটা আধুনিকমনা। সকলেই মনে করে এখন আলোচনার দরজা খুলেছে। এর মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের একটা উপায় খুঁজে বের করা সম্ভব হবে। সমঝোতা হতে পারে এক থেকে তিন বছরের মধ্যে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি আশা প্রকাশ করে বলেছেন, আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি চূড়ান্ত হয়ে যেতে পারে।
ইরানের প্রতি পশ্চিমা জগতের নরম মনোভাবের কড়া সমালোচনা শোনা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের দুই ঘনিষ্ঠ সহযোগী ইসরায়েল ও সৌদি আরবের পক্ষ থেকে। তাদের মতে, কিছু না দিয়েই ইরান কেবল নিতেই সচেষ্ট। ইসরায়েল এ নিয়ে বেশ সোচ্চার থাকলেও মুসলিম সুন্নি প্রধান সৌদি আরব ইরানের সম্ভাব্য পুনর্বাসন নিয়ে প্রকাশ্যে তেমন বক্তব্য রাখছে না। তবে সৌদি চায় না গোটা অঞ্চলে ইরানের শিয়া রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রভাব আরও বেড়ে যাক। ইরানকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা দেশগুলির মধ্যেও বিভাজন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ব্রিটেন বর্তমান প্রক্রিয়ার প্রেক্ষাপটে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক মজবুত করতে চাইছে। এমনকি সব শর্ত মানলে ইরানের উপর থেকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার সম্ভাবনাও কথাও বলছে ব্রিটেন। আর তাই ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানিকে গত মঙ্গলবার ফোন করেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে এই প্রথম কোনো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ইরানের কোনো প্রেসিডেন্টকে ফোন করলেন। ফোনালাপে দুই নেতাই ছয় জাতির সঙ্গে ইরানের আলোচনাকে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ বলে স্বীকৃতি দেন। তবে রুহানি বলেছেন, শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহারের জন্য পারমাণবিক কর্মসূচি অব্যাহত রাখার অধিকার ইরানের রয়েছে। অন্যদিকে ফ্রান্স তেহরানের প্রতি অত্যন্ত কড়া মনোভাব দেখাচ্ছে। এমনকি ইরানের সংবাদ মাধ্যম জেনেভা আলোচনায় সাফল্যের অভাবের জন্য সরাসরি ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী লোরঁ ফাবিউসকে দায়ী করছে।
যুক্তরাষ্ট্রকে বুঝাতে ব্যর্থ হয়ে এখন রাশিয়ার পথ ধরেছে ইসরাইল। জেনেভায় যখন ইরানের সঙ্গে ছয় জাতিগোষ্ঠী একটি চুক্তি করার দ্বারপ্রান্তে ছিল, তখন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু রাশিয়ায় গেলেন। জেনেভায় ইরানের সঙ্গে ছয় জাতিগোষ্ঠী একটি খারাপ চুক্তি করতে যাচ্ছে বলে ইসরাইলের অভিযোগ। এই চুক্তি ঠেকাতেই নেতানিয়াহুর রাশিয়া সফর। নেতানিয়াহু বুধবার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন। পরমাণু ইস্যুর ব্যাপারে ইরানকে যাতে কঠোরতর শর্ত আরোপ করা হয় সেজন্য রাশিয়ার কাছে তদবির করছে ইসরাইল। ইসরাইলের ধারণা, ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরির খুব কাছাকাছি চলে গেছে। ইরানকে এখনোই থামানো না গেলে বিপদ আসন্ন। তবে রাশিয়ায় নেতানিয়াহু কতটা সুবিধা করতে পারবেন তা নিয়ে সন্দেহ আছে। কেননা মস্কোর সঙ্গে তেহরানে সম্পর্ক বেশ জোরালো ও অনেক পুরনো। কেননা ইরানের প্রথম পরমাণু চুল্লিটি নির্মিত হয়েছে রাশিয়ার সহযোগিতায়।
মার্কিন রিপাবলিকানরাও ইরানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা শিথিল করার বিপক্ষে। অন্যদিকে রাশিয়া ও চীন ওই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা থেকে নিজেরাই লাভবান হয়েছে। কাজেই তারা ইরান এবং পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে শিগগিরই আপোষে বিশেষ আগ্রহী নয়। চীন ইরানের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক সহযোগী। অন্যদিকে রাশিয়ার ভয়, ইরান ইউরোপে তেল ও গ্যাস সরবরাহ শুরু করলে রাশিয়ার নিজের ব্যবসার ক্ষতি হতে পারে।
গত ৬০ বছর ধরে ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি চালাচ্ছে। ১৯৫৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে পরমাণু সমঝোতা করেছিল। তখন শাহ ইরান শাসন করেন। তখন তারা ছিল পরস্পর বন্ধু। ৭০-এর দশকের মধ্যভাগে ইরান তার পরমাণু কর্মসূচির উন্নতি ঘটায়। ১৯৭৯ সালে এক ইসলামি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শাহ ক্ষমতাচ্যুত হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক খারাপ হয়। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়। এরপর থেকে পশ্চিমা দেশগুলো আতঙ্কিত হয়ে পড়ে যে ইরান তার ইউরেনিয়াম কর্মসূচি বাড়াতে পারে। ২০০৩ সালে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানায়, তারা ইরানের নাতানজ প্লান্টে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার প্রমাণ পেয়েছেন। এর মাধ্যমে ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে পারে। সাময়িকভাবে ইরান সেই কর্মসূচি স্থগিত করে। ২০০৬ সালে তারা আবার এই কর্মসূিচ চালু করে। তারা জানায়, তারা আইইএএর অনুমতিক্রমেই এই কর্মসূচি চালাচ্ছে। এরপর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ২০০৬ সালে ইরানের ওপর অবরোধ আরোপ করে। পরবর্তী সাত বছর যাতে ইরান এদিক থেকে এগিয়ে নিতে না পারে সেজন্য পরিষদ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবরোধ আরোপ করে। ইরানের তেলের ওপর, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির উপর ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ২০০৭ সালে ইরানে ইউরেনিয়ামের সেন্ট্রিফিউজ ছিল তিন হাজার। এখন সেগুলো ১৯ হাজারে উন্নীত হয়েছে। পরমাণু বিশেষজ্ঞ মার্ক হিবস এ তথ্য জানান। দেশটিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এগিয়ে চললেও পিছিয়ে পড়েছে অর্থনীতিতে। দেশটিতে তেল বিক্রি কমে গেছে। বাড়ছে বেকারত্ব ও মুদ্রাস্ফীতি।
