কুমড়োর কেরামতি!

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০১৩, ২১:৩৫
চকলেট, ক্রিস্প, কেক ও গুরু দুষ্পাচ্য খাবার বিশেষ পছন্দ ছিল ডাউনের। রান্নাকরা একটি বড় সাইজের আস্ত মুরগি খেয়ে নিতেন এক বসাতেই। এক পাউন্ডের পাউরুটি শেষ করে ভাগ বসাতেন দ্বিতীয়টিতেও। সঙ্গে আরো অনেক কিছুর পাশাপাশি ডিম থাকতে হত অন্তত ডজন খানেক। এর কয়েকঘন্টা পরেই আবার ভিন্ন খাবার খুঁজতেন। চর্বি ও তেলযুক্ত খাবার পেলেই খেয়ে নিতেন যত ইচ্ছা তত। মোদ্দাকথা পেটটাকে খাবারের ছোটখাটো একটা গুদাম বানিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। স্বামী বুঝেও না বোঝার ভান করতেন। ঠিকই টের পেতেন স্ত্রী তার সঙ্গে খাবার নিয়ে লুকোচুরি খেলছে। দু’জন রাতের খাবার খেতে বসতেন একসঙ্গেই; কিন্তু স্ত্রী ডন চ্যাডিক প্রতিদিনই ভাবটা দেখাতেন এরকম, মুখে তেমন একটা রুচি নেই। কিন্তু পরের ঘটনাগুলো ঘটতো এরকম— নৈশপ্রহরী স্বামী বেরিয়ে যেতেই ফ্রিজের ওপর হামলে পড়তেন; তন্নতন্ন করে খুঁজতেন খাবার এবং সেগুলো শেষ করতেন খুব একটা সময় না নিয়েই। ক্রিস কাজ শেষে বাড়ি ফিরে দেখতেন, কোনো খাবারই আর অবশিষ্ট নেই; সব সাবাড় করে ফেলা হয়েছে। দিনের পর দিন এভাবে চলতে থাকায় ডাউনের ওজন গিয়ে ঠেকেছিল ৩৭ স্টোনে (প্রায় ৬ মণ)। তার রাক্ষুসে ভাবে ভাটা পড়তে শুরু করে সেদিনই, যেদিন ডাক্তার সরাসরিই বলে দিয়েছিলেন, আরো মোটা হলে যে কোনো দিন ইহলীলা সাঙ্গ হয়ে যেতে পারে। সেইসঙ্গে পরামর্শ দেয়া হয়েছিল গ্যাস্ট্রিক বাইপাস করানোর। ব্রিটেনের সবচে’ স্থূল রমণীদের একজন ডাউন চ্যাডিক। যখন বুঝলেন আর উপায় নেই তখন ওজন কমানোর উপায় খুঁজছিলেন তিনি। পেয়েও যান খুব তাড়াতাড়ি। একজনের পরামর্শে সবকিছু প্রায় ছেড়ে দিয়ে মিষ্টিকুমড়ো খেতে শুরু করেন তিনি। তাতেই ফল পেতে শুরু করেন হাতেনাতে। প্রায় ৩ বছরে ২০ স্টোন ওজন কমিয়ে ফেলেছেন তিনি। ইচ্ছে রয়েছে আরো তিন-চার স্টোন কমানোর, তবে এর বেশি নয়। কারণ স্ত্রীকে হাড্ডিচর্মসার দেখতে চান না ক্রিস। এমনকি এই বলে হুমকিও দিয়ে রেখেছেন যে, খুব বেশি চিকন হয়ে গেলে তাকে ছেড়ে দিতেও দ্বিধা করবেন না। চতুর্থ স্বামীর সঙ্গেও ছাড়াছাড়ি হোক, এটি অবশ্য মনেপ্রাণেই কামনা করেন না ডাউন; যে কোনোভাবেই হোক টিকিয়ে রাখতে চান বর্তমান সংসারকে। ওজন কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়ার পর প্রথমে ভেবেছিলেন, খাবার কমানো তার পক্ষে হয়ত সম্ভব হবে না। কিন্তু এ ব্যাপারে মিষ্টিকুমড়ো টনিকের মতো কাজ করেছে। ব্রিটেনের ডেইলি মিরর পত্রিকাকে দেয়া সাক্ষাত্কারে তিনি বলছিলেন, ‘আমি এখন মিষ্টিকুমড়ো ভালবাসি। সারাদিনই কাটিয়ে দিতে পারি এটি খেয়ে। খুব বেশি ক্ষুধা লাগলে খেয়ে নিই রান্নাকরা একফালি মিষ্টিকুমড়ো। অথচ আগে হলে এক্ষেত্রে ৯টি স্ন্যাকস বেছে নিতাম। মিষ্টিকুমড়োর সব স্বাদই আমার ভাল লাগে। সেদ্ধ, ভাজা, স্যুপ এমনকি কাঁচাও খেতে পারি। এতে ক্যালোরি ও ফ্যাট এতোই কম যে, যতো ইচ্ছা তেমন একটা ক্ষতির সম্ভাবনা নেই। কেক ও চকলেটের প্রতি আসক্তির স্থানটি এখন দখল করে নিয়েছে এ বস্তুটি। একদিন না থাকলেই অস্থির হয়ে পড়ি। তবে এমন খুব কমই হয়। আমার বাবা নিজেই মিষ্টিকুমড়ো চাষ করেন।’ স্থ্থূলতা নিয়ে ডাউনের সমস্যা আজীবনের। মাত্র ৯ মাস বয়সে তার ওজন ছিল প্রায় ৩ পাউন্ড। স্কুলের ক্লাসে তার চেয়ে মোটা কেউই ছিল না। সবাই তাকে নিয়ে হাসি-তামাশা করত বলে নিজেকে সবসময় গুটিয়ে রাখতেন। ১৬ বছর বয়সেই ওজন হয়ে গিয়েছিল ১৯ স্টোন। অষ্টাদশী হবার পর এক বয়ফ্রেন্ডের দেয়া বিয়ের প্রস্তাব লুফে নিয়েছিলেন তিনি, ‘আমি সত্যিই ভেবেছিলাম বিয়ে করার জন্য এটিই আমার একমাত্র সুযোগ, কেউ আমাকে পছন্দ করবে এটি আমার ধারণাতেই ছিল না। কিন্তু আমার মা আমাকে নিরুত্সাহিত করছিলেন এই বলে যে, এ বিয়ে টিকবে না। কিন্তু আমি ছিলাম প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। বিয়ে উপলক্ষে ওজন ১৭ স্টোনে নামিয়ে আনলেও শেষ পর্যন্ত মায়ের কথাই সত্য হয়েছিল। ১৮ মাস পর আমরা আর একসঙ্গে থাকতে পারিনি।’ পরের দুই বিয়েও খুব বেশিদিন টেকেনি। তৃতীয় বিয়ের সময় তার কোমরের মাপ ছিল ৬০ ইঞ্চি এবং পরতেন ৫৬ এল সাইজের বক্ষবন্ধনী। ২০০৬ সালে এক চ্যাটরুমে ক্রিসের সঙ্গে প্রথম দেখা হয়েছিল ডাউনের। মাত্র ১০ স্টোন ওজন ও ছিপছিপে গড়নের ক্রিস তাকে বলেছিলেন, বৃহদাকারের নারীদেরই তার বিশেষ পছন্দ। কিন্তু এমন কথায় আর আশ্বস্ত হতে পারছিলেন না ডাউন। প্রায় দুই বছর বাজিয়ে দেখে বুঝতে পেরেছিলেন, সত্যিই তার প্রতি বিশেষ আকর্ষণ অনুভব করছে ক্রিস। বিয়ের বছর দুয়েক পর তিনি স্ত্রীকে আহবান জানিয়েছিলেন ওজনটা একটু মেপে দেখতে। ততোদিনে ৩৭ স্টোনে পৌঁছে যান ডাউন আর ক্রিস তখন তার চার ভাগের এক ভাগ। তা সত্ত্বেও স্ত্রীর প্রতি অবহেলা দেখাননি ক্রিস, ‘তার বিশাল শরীর দেখেই তো আমি আকৃষ্ট হয়েছিলাম। অতএব এ বিষয়টি নিয়ে তাকে তাচ্ছিল্য করাটাকে অবিচারই মনে করি আমি।’ কেনা কোনো তৈরি পোশাকই পরতে পারতেন না ডন। ঢুঁ মারতে গেলেও দোকানিরা হাসাহাসি শুরু করত। কেউ কেউ এমনও বলত, আপনার পোশাক মঙ্গল গ্রহে খোঁজ করেন, সেখানে পেলেও পেতে পারেন। বর্তমানে ওরকম পরিস্থিতিতে পড়তে হয় না। সবকিছুতেই তিনি স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করেন। তবে খুশি হবেন আরো তিন-চার স্টোন ওজন কমাতে পারলে। আগের দিনগুলোর কথা মনে পড়লে এখন হাসি পায় ডাউনের, ‘কীভাবে বেঁচেছিলাম তা চিন্তা করলেই অবাক লাগে। খাওয়াই ছিল আমার একমাত্র সাধনা। ‘মিষ্টিকুমড়ো থেরাপি’ চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি অতিসম্প্রতি একটি জিমে যোগ দিয়েছেন ৪৭ বছর বয়স্কা ডাউন। নিয়মিতভাবে সাঁতার কাটেন আর সকালবেলায় প্রিয় কুকুরটাকে নিয়ে হাঁটতে বেরোন।