বিচারে কেউ ২০/২৫/৩০/৩৫ বছর সাজা খেটেছেন। কারো বা দেয়া হয়েছিল মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু তারপরে জানলেন তারা নির্দোষ, রায়টা ভুল ছিল! মুক্তি পেলেন কারাপ্রকোষ্ঠ থেকে। কিন্তু ততদিনে জেলের ভেতর কেটেছে কয়েকটি বছর... কারো বা কয়েক দশক! যুক্তরাষ্ট্রে সবচে’ সাড়া জাগানো এমন কয়েকটি ভুল সাজার ঘটনা তুলে ধরা হলো—
যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অতঃপর...
১৯৯২ সালে ১১ বছরের এক মেয়েকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে ধরে আনা হয়েছিল জুয়ান রিভেরাকে। পুলিশের জেরার মুখে এক পর্যায়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে সে এবং হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে বসে। যেতে হয় তাকে জেলে। দু’দুবার ডিএনএ পরীক্ষা নেয়ার পরও তাকে দোষী বলেই মনে হয়েছে সংশ্লিষ্টদের। তবে তৃতীয়বার ডিএনএ পরীক্ষা শেষে ফলাফল দেখে বিচারক তাকে নির্দোষ বলে রায় দেন। মুক্তি পান রিভেরা। তবে মাঝে জেলে কেটে গেছে তার ২০টি বছর।
নিজের সাত সন্তান খুনের অভিযোগে ২১ বছর...
বীমার টাকার লোভে নিজের ৭ ছেলে-মেয়েকে খুন করার অভিযোগে ১৯৬৭ সালে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক জেমস রিচার্ডসনের। ছেলে-মেয়েদের হত্যাকারীর জঘন্য অপবাদ মাথায় নিয়ে দীর্ঘ ২১ বছর জেলের ঘানি টেনেছেন তিনি। এরপর সেই সন্তানদের খুনি এক বৃদ্ধার স্বীকারোক্তির পর লজ্জায় জিব কাটেন সবাই। জেমসের ৭ সন্তানের দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন ঐ মহিলা (বেবিসিটার)। জেমস ও তার স্ত্রীর অনুপস্থিতিতে তিনিই সবাইকে মেরে ফেলেন বলে আদালতে স্বীকারোক্তি দেন। এরপর মুক্তি পেয়ে নিজ শহর আর্কেডিয়ায় ফিরে গেলেন তিনি। জেমস রিচার্ডসন এখন ৭৭ বছর বয়সী বৃদ্ধ।
মৃত্যুদণ্ডের পর...
১৯৮৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাল্টিমোরে ৯ বছরের এক মেয়েকে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয় কার্ক ব্লাডসওয়ার্থকে। ভাগ্য ভাল তার। ডিএনএ প্রযুক্তির কল্যাণে বেঁচে গেলেন তিনি। ডিএনএ টেস্টে প্রমাণ হয় ঐ হত্যার সঙ্গে কার্ক মোটেই জড়িত ছিলেন না। মৃত্যুর প্রহর গুণতে গুণতে জীবন নিয়ে বাড়ি ফেরেন তিনি। তবে তার আগে ৯ বছর জেল খাটেন তিনি।
৫০ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ!
গৃহপরিচারিকাকে ধর্ষণের দায়ে ২০ বছর জেল হয়ে যায় ল্যারি ডেভিস ও অ্যালান নর্থরাপের। সময়টা ছিল ১৯৯৩ সাল। ল্যারি ও অ্যালানের দুর্ভাগ্য ডিএনএ প্রযুক্তি তখন পর্যন্ত সহজলভ্য হয়ে ওঠেনি। ১৮ বছর পর ডিএনএ পরীক্ষায় দু’জনের নির্দোষিতা প্রমাণ হলে মুক্তি পান তারা। রাষ্ট্রের তরফ থেকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে পান ৫০ লক্ষ ডলার।
বোকামির ‘পুরস্কার স্বরূপ’ মৃত্যুদণ্ড স্থগিত!
১৯৮২ সালে শিকাগো শহরের ওয়াশিংটন পার্কে দুই যুবককে গুলি করে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় অ্যান্টনি পোর্টারকে। দণ্ড কার্যকরের ঠিক ৫০ ঘন্টা আগে রাজ্য সুপ্রিম কোর্ট এক স্থগিতাদেশ দেয়। আদেশে বলা হয়, পোর্টার এতই বোকা যে ওর পক্ষে ঐ হত্যাকাণ্ড ঘটানো সম্ভব কিনা সে ব্যাপারে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে এবং এ ব্যাপারে অধিকতর তদন্তের প্রয়োজন। ধন্যবাদ সুপ্রিম কোর্টকে। ১৯৯৯ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি একজন এসে সাক্ষী দিলেন- ১৭ বছর আগে ওয়াশিংটন পার্কে দুই যুবককে পোর্টার নয়, অন্য কেউ গুলি করে মারে। তার বক্তব্যের স্বপক্ষে আসল খুনির ভিডিও টেপ করা স্বীকারোক্তিও আদালতে জমা দেন তিনি। ফলে মুক্তি পান পোর্টার।
\
সতীর্থ খেলোয়াড়ের মিথ্যা সাক্ষ্যে যাবজ্জীবন
১৯৮১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় এক হত্যা মামলায় গ্রেফতার হন তরুণ প্রতিভাবান বেসবল খেলোয়াড় উইলিয়াম ডিলন। ফ্লোরিডার সাগর তীরে পাওয়া গিয়েছিল লাশটি এবং এর আগে ডিলনকে সেখানে ঘোরাফেরা করতে দেখা গিয়েছিল বলে তার বিরুদ্ধেই ঐ হত্যায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়। ডিলন যে নির্দোষ তা বোঝাতে সক্ষম হন। কিন্তু সব ভেস্তে যায় সতীর্থ এক খেলোয়াড়ের মিথ্যা সাক্ষ্যের কারণে। সে সাক্ষ্য দেয় যে বিচার চলাকালীন সময়ে ডিলন তাকে বলেছিল যে হত্যাকাণ্ডটা সেই ঘটিয়েছে। আর তাতে ডিলনের হয়ে যায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। আধুনিক ডিএনএ প্রযুক্তিকে ধন্যবাদ। কয়েক বছর আগে ডিএনএ টেস্টে প্রমাণিত হয় যে ডিলন ঐ খুন করেনি। ফলে মুক্তি পায় ডিলন। তবে বিনা অপরাধে ২৭ বছর জেল খাটার পর।
কামড়ের দাগে যাবজ্জীবন, ডিএনএ টেস্টে নির্দোষ
১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে ১৯ বছরের এক তরুণীকে হত্যার দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয় গেরার্ড রিচার্ডসনকে। বিচারে গেরার্ডের গায়ে ফুটে ওঠা কামড়ের দাগকে তার বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে দেখান সরকার পক্ষের আইনজীবীরা। ২০ বছর জেলও খাটেন বেচারা। এখানেও মুক্তিদাতা হিসেবে হাজির হয় ডিএনএ প্রযুক্তি। চলতি বছর ডিএনএ টেস্টে প্রমাণিত হয় গেরার্ডের গায়ের সেই কামড়ের দাগ কোন তরুণীর নয়, এক পুরুষের। আর কি? মুক্তি পেয়ে যান তিনি।
বিনাদোষে দীর্ঘতম সময় জেল খাটার বিশ্বরেকর্ড
বিনাদোষে ৩৫ বছর জেল খেটে মুক্তি পেলেন ফ্লোরিডার জেমস বেইন। ১৯৭৪ সালে এক তরুণীকে অপহরণের পর ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে যাবজ্জীবন জেল হয় তার। কয়েক বছর আগে বেইনের সাহায্যে এগিয়ে আসে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ‘ইনোসেন্স প্রোজেক্ট ফ্লোরিডা’। ডিএনএ টেস্টে প্রমাণ হয় বেইন সম্পূর্ণ নির্দোষ। অপহরণ, ধর্ষণ বা হত্যা- কোনটির সাথেই তিনি জড়িত ছিলেন না। মুক্তি পান বেইন। আর একজন নির্দোষ হিসেবে দীর্ঘতম সময় জেলখাটা প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ইতিহাসের খাতায় নাম লেখান তিনি। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাকে ক্ষতিপূরণ বাবদ দেয়া হয় ১৭ লাখ ডলার।
