চোখ দুটো টকটকে লাল, নাকের ডগায় বিন্দু বিন্দু ঘাম, থমথম করছে মুখটা; যে কেউ দেখলেই বুঝবে রাগ আর হতাশায় ফেটে পড়ছে মানুষটা। যেভাবে আস্তে আস্তে মাথা নিচু করে এসে চেয়ারে বসলেন, দেখলে মনে হয়, মাত্রই স্বজন হারানোর মতো কোনো যন্ত্রণা সহ্য করে এসেছেন।
মুশফিকুর রহিম মাথা নিচু করে এই সব ভাবনারই স্বীকৃতি দিলেন, ‘হতাশ, লজ্জিত, বিব্রত; যা যা বিশেষণ যোগ করতে চান করতে পারেন। শুধু আমার ক্যারিয়ারে নয়, বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে এমন বাজে দিন আর আসেনি।’
মুশফিকের কথা বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, এটা সত্যি যে, ২০০৩ সালের সেই ভয়াবহ বিশ্বকাপ বিপর্যয়ের পর বাংলাদেশের ক্রিকেট এমন চোরাবালিতে এর আগে পড়েনি। ২০০৭ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ আয়ারল্যান্ডের কাছে হেরেছে; তার আগে ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়েছে। ২০১১ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ৫৮ ও ৭৮ রানে অলআউট হয়েছিল; সে দুঃখ খানিকটা হলেও ভুলেছিল তারা ইংল্যান্ডকে হারিয়ে।
কিন্তু এবার?
শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে একটার পর একটা কাছে গিয়ে পরাজয়ের পর ভারতের বিপক্ষে হার। সে পর্যন্তও সহ্য করা যেত। কিন্তু সবকিছু ছাড়িয়ে গেল ইতিহাসে মাত্র চতুর্থবারের মতো টেস্ট খেলুড়ে দেশের বিপক্ষে ওয়ানডে খেলতে নামা আফগানিস্তানের বিপক্ষে পরাজয়। এই পরাজয়ের যন্ত্রণা এতোটাই তীব্র যে ম্যাচের পরই সংবাদ সম্মেলনে মুশফিক বলেছেন, ‘এরপরও যে ক্রিকেটার লজ্জা পাবে না, এরপরও যার কষ্ট লাগবে না; তার জীবনের মতো ক্রিকেট খেলা ছেড়ে দেয়া উচিত।’
এই পরাজয়ের তীব্রতা শুধু খেলোয়াড়দের বা সমর্থকদের কষ্টের মধ্যেই আটকে আছে, ব্যাপারটা তা নয়। আফগানিস্তানের সঙ্গে এই পরাজয় একই সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য এক অশনি সংকেত প্রকাশ করে দিয়েছেন এবং একই সঙ্গে অঙুর হয়ে উড়তে থাকা গুঞ্জনগুলো এবার ডালাপালা মেলে বিকশিত হতে শুরু করেছে। এখন আশঙ্কাটা হল, এই ফলাফলের ধাক্কায় বিধ্বস্ত আত্মবিশ্বাস নিয়ে কিভাবে ঘরের মাটির টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে কোমর সোজা করে দাঁড়াবে বাংলাদেশ! আর গুঞ্জনটা হল, তাহলে কী সত্যিই ‘টীম বাংলাদেশ’ সুতোটা কোথাও ছিড়ে গেছে?
এই দুটো প্রশ্ন নিয়ে ক্রিকেটাররা ভাবিত, পুরো বাংলাদেশ ভাবিত; ভাবিত ক্রিকেট বোর্ডও। যতোদূর জানা গেল, গত কিছুদিন ধরেই বাংলাদেশ দলের নানা বিষয় নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকা বিসিবি এই পরাজয়টাকে একেবারে ‘রেড অ্যালার্ট’ হিসেবেই নিয়েছে। তারা বর্তমান সব জটিলতা নিয়ে আর খুব বেশি কালক্ষেপণ করতে রাজি নন। ভেতরের কিছু সূত্র বলছে, দলকে উজ্জীবিত করতে ঠিক কী করা দরকার, কী হলে এই অবস্থা থেকে বাংলাদেশ দলের উত্তর হবে; এগুলো বুঝতে কোচ-অধিনায়কের সঙ্গে বসতে যাচ্ছেন স্বয়ং বোর্ড সভাপতি। এছাড়াও নানা ধরনের গুঞ্জন আছে, কিছু সংস্কার প্রস্তাবও বাতাসে ঘুরছে। কিন্তু এসবের কিছুতেই কাজ হবে না, যদি না মাঠে থাকা খেলোয়াড়রাই ঘুরে না দাঁড়ান।
মুশফিকই যেমন বলছিলেন, বাইরের কোনো কিছুই আসলে প্রভাব ফেলবে না যতোক্ষণ না খেলোয়াড়রা নিজেদের দায়িত্বটা বুঝতে পারছেন, ‘বাইরে যাই হোক, কোনো কিছুতে কাজ হওয়ার নয়। বাইরের কথাবার্তাও কোনো অজুহাত নয়। মাঠে আমাদের কাজটা আমাদের করতে হবে; এটাই শেষ কথা।’
কিন্তু সেই কাজটা করতেই কেন এতো সমস্যা। যে দলটা ক দিন আগে নিউজিল্যান্ডকে অসহায় করে হোয়াইট ওয়াশ করে দেয়, যে দলটা প্রবল শক্তিশালী ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ছেলেখেলা করে হারায়, যে দলটা আগের এশিয়া কাপেই ভারত-শ্রীলঙ্কাকে শিশু বানিয়ে ফাইনালে চলে যায়; তারা কিভাবে এমন অসহায় হয়ে পড়ে! যে বাংলাদেশের ‘কিলার ইনস্টিংক্ট’ নিয়ে গর্ব করে সবাই, সেই বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের শরীরি ভাষা কী করে এমন নির্জীব হয়ে পড়ে!
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে চলেছেন সবাই। মুশফিকরাও খোঁজ করছেন। কোনো উত্তর খুঁজে পাচ্ছেন। শুধু বুঝতে পারছেন, ‘আমরা এই উত্তরগুলো জানলে তো মাঠে এমনটা হত না। আমি শুধু বুঝি, সবাইকে দায়িত্ব নিতে হবে। আর সেটা বলে-বুঝিয়ে সম্ভব না। আপনি ১১ জনকে খাবার মুখে তুলে খাওয়াতে পারবেন না।’
কিন্তু খাবারটা তো খেতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।
