ইউক্রেনে যুদ্ধের দামামা

আপডেট : ০২ মার্চ ২০১৪, ২২:০৫
ব্যাপক গণ-আন্দোলনে প্রেসিডেন্টের অপসারণের পর ইউক্রেন দুই ভাগে বিভক্ত হওয়ারও আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। রাশিয়ার কার্যকলাপ দেখে মনে হচ্ছে, ক্রিমিয়া যুদ্ধের দামামা বাজছে! ইতোমধ্যে ক্রিমিয়ায় সৈন্য পাঠিয়েছে রাশিয়া। এমনকি দেশটির পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষেও ইউক্রেনে সৈন্য পাঠানোর বিষয়টিতে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা রাশিয়ার প্রতি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইউক্রেনে সামরিক হস্তক্ষেপ হলে রাশিয়াকে চরম মূল্য দিতে হবে। কিন্তু তাতে কর্ণপাত না করেই আরো সৈন্য পাঠায় রাশিয়া। দুই পরাশক্তির দাবার ঘুঁটি হিসেবে যেমন ইউক্রেন ব্যবহূত হচ্ছে তেমনি রাশিয়া দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করছে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চল ক্রিমিয়াকে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে একটি সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক চুক্তি ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ বাতিল করে দেয়ার পর দেশটিতে গোলযোগের সূচনা হয়। ইউক্রেনে রাশিয়াপন্থী প্রেসিডেন্টের ক্ষমতাচ্যুতির পর ক্ষমতা এখন পশ্চিমাপন্থী ইউক্রেনের জাতীয়তাবাদী নেতাদের হাতে। তারা আশঙ্কা করছেন, দেশটির অন্তর্ভুক্ত ক্রিমিয়া রাশিয়াপন্থী সৈন্য এবং ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর মধ্যে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে। ইতোমধ্যে ক্রিমিয়ার সরকারি ভবনগুলোতে রাশিয়ার পতাকা উড়তে দেখা গেছে। তারা ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত বলে দাবি করেছে। এছাড়া দুটি বিমান বন্দরেরও নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। যদিও পরে ইউক্রেন সেনারা সেগুলো নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। তবে রাশিয়া বিমান বন্দর দখল করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ক্রিমিয়ায় ইউক্রেনপন্থী এবং বিচ্ছিন্নতবাদীদের মধ্যে রাস্তায়ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। ক্রিমিয়া কী সত্যি ইউক্রেনের: গত ২শ’ বছর ধরে রাশিয়া ক্রিমিয়া শাসন করছে। ১৭৮৩ সালে এটি দখল করে রাশিয়া। এরপর ১৯৫৪ সালে রাশিয়া ক্রিমিয়াকে ইউক্রেনের কাছে হস্তান্তর করে। আদিবাসী রাশিয়ানরা এটিকে একটি ‘ভুল’ পদক্ষেপ হিসেবে দেখেন। ১৯৯৪ সালে একটি চুক্তির মাধ্যমে ক্রিমিয়ার স্বায়ত্তশাসন দেয়া হয়। ২০১০ সালে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে একটি চুক্তি হয় যাতে রাশিয়াকে গেভারদিকায়াসকা এবং কাছা বিমান বন্দরে ১৬১ টি বিমান স্টেশন করা, ইউক্রেনের সীমানার পানিতে ৩৮৮ টি যুদ্ধজাহাজ এবং সিভাস্তোপোল এবং ফিওডোসিয়ায় ২৫ হাজার নাবিক ও কর্মকর্তা রাখতে পারবে। ক্রিমিয়ার সংখ্যালঘু মুসলিম তাতারসরা জানায়, তারা এক সময় এই এলাকায় সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন। কিন্তু সোভিয়েত নেতা জোসেফ স্টালিনের কারণে একটি বৃহত্ অংশ এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নািসদের সহায়তা করেছিলেন।২০০১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী আদি ইউক্রেনের জনসংখ্যা ২৪ শতাংশ। সেখানে রাশিয়ার ৫৮ শতাংশ। তাতারস আছে মাত্র ১২ শতাংশ। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাবার পর তাতারসরা আবার ফিরে আসতে শুরু করেন। এরপর থেকে রাশিয়ানদের সঙ্গে তাদের জমি নিয়ে বিরোধের মুখোমুখি হতে হয়। তাতারসরা এখনো ১৯৪৪ সালের স্মৃতি স্মরণ করেন এবং তারা হুমকি দিয়েছিলেন ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার কাছে হস্তান্তরে যে কোনো প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করবেন তারা। কারণ তারা মনে করছেন,এখানে সব ক্ষেত্রে দুর্নীতি বিরাজ করছে। বৈধ স্বীকৃতি আছে কি: ১৯৫৪ সালে রাশিয়া ইউক্রেনের কাছে ক্রিমিয়াকে হস্তান্তর করে। ১৯৯৪ সালে করা চুক্তিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং ফ্রান্স স্বাক্ষর করে। এর নিজস্ব একটি পার্লামেন্ট আছে। চুক্তির পর রাশিয়াপন্থী একজন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৯৫ সালে এটি বিলুপ্ত করা হয়। এখন ক্রিমিয়ায় প্রেসিডেন্টের একজন প্রতিনিধি থাকেন এবং একজন প্রধানমন্ত্রী থাকেন। তবে উভয়কেই নিয়োগ দেয় কিয়েভের কেন্দ্রীয় সরকার। ইউক্রেনের সিভাস্তাপোলের ব্লাক সি পোর্টে ২০৪২ সাল পর্যন্ত রাশিয়ার মিসাইল ক্রুজার ‘মস্কভা’ নিয়োজিত থাকতে পারবে। ক্রিমিয়ার সিভাস্তোপোল শহরে রাশিয়ার ব্লাক সি ফ্লিট নিয়োজিত আছে। রাশিয়াকে দেয়া বরাদ্দ চুক্তির শর্ত অনুযায়ী রাশিয়ার সেনারা ইউক্রেনের অনুমতি ছাড়া বাইরে থেকে যন্ত্রপাতি আনতে পারবে না। অন্যদিকে ইউক্রেনের অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার তুর্কিনোভ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন এই বলে যে, রাশিয়া যদি ক্রিমিয়ায় সেনাবাহিনীর মহড়া দেয় তাহলে এটা ‘সামরিক আগ্রাসন’ বলে বিবেচনা করা হবে। খবর আছে, সীমান্তে রাশিয়ার পাসপোর্ট সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা আইনে বিদেশে তাদের নাগরিকদের রক্ষায় সামরিক আক্রমণ চালানোর অনুমতি দেয়া আছে। এটাই ইউক্রেনবাসীকে ভীত করেছে যে রাশিয়া যে কোনো সময় আক্রমণ করতে পারে ক্রিমিয়ায়। আর এ ধরনের ইতিহাস আছে রাশিয়ার। ২০০৮ সালে জর্জিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন সাউথ ওসেটিয়া ও আবখাজিয়া এলাকায় সেনা পাঠিয়েছিল রাশিয়া। জর্জিয়ার সেনারা ওই এলাকার নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিল। এরপর ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ন্যাটো আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু পরে কোনো কারণে ন্যাটো সাউথ ওসেটিয়ায় প্রতিরোধ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে আসে। ইউক্রেনের অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার তুকির্েনাভও সেই বিষয়টি স্মরণ করেছেন। তিনি কিয়েভে এক টেলিভিশন ভাষণে বলেন, রাশিয়া ২০০৮ সালে জর্জিয়ায় সেনা পাঠিয়ে যে আচরণ করেছিল আবারও তারা একই আচরণ করছে। ক্রিমিয়া সাউথ ওসেটিয়া থেকে আরো বড়। ইউক্রেন জর্জিয়া থেকে বড়। তাছাড়া সাউথ ওসেটিয়ায় যে পরিমাণ সমর্থন রাশিয়ার ছিল তার চেয়েও বেশি সমর্থন আছে ইউক্রেনে। আর এই সব দিক আশঙ্কা জাগাচ্ছে যে, রাশিয়া ইউক্রেনে আক্রমণ করতে পারে। তাছাড়া এখানে রাশিয়াপন্থী নাগরিকরা সভা-সমাবেশ করে পশ্চিমাদের ‘ফ্যাসিস্ট’ আখ্যায়িত করে রাশিয়াকে ভূমিকা নেয়ার আহবান জানাচ্ছেন। শনিবার ক্রিমিয়ার নতুন প্রধানমন্ত্রী সের্গেই আকসিওনভ এক বার্তায় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের কাছে সাহায্যের আবেদন করেছেন। তার ভাষায়- শান্ত পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনতে তিনি ওই আবেদন করছেন। অন্যদিকে ক্রেমলিন বলেছে, তারা আকসিওনভের এই আহবানকে উপেক্ষা করবে না। গত বৃহস্পতিবার রাশিয়াপন্থী বন্দুকধারীরা ক্রাইমিয়ার পার্লামেন্ট দখল করে নিলে আকসিওনভ ক্ষমতাসীন হন। আর অনেকের হয়তো ক্রিমিয়ার যুদ্ধের কথা শুনে থাকবেন। সেটি ছিল ১৮৫৩ থেকে ১৮৫৬ সালের যুদ্ধ। আন্তর্জাতিক যুদ্ধের খাতায় এর তাত্পর্য কিন্তু কম নয়। ওই যুদ্ধে ব্রিটেন এবং ফ্রান্সের কাছে হেরে গিয়েছিল রাশিয়া। ক্রিমিয়ার কারচ শহরে ইউক্রেনের পতাকার পরিবর্তে রাশিয়ার তিন রঙের পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে গত সপ্তাহে। ওবামার হুঁশিয়ারি প্রত্যাখ্যান রাশিয়ার: রুশ অধ্যুষিত ক্রিমিয়ার আঞ্চলিক পার্লামেন্ট ও সরকারি সদর দপ্তরগুলো অস্ত্রধারীরা দখল করে নেয়ার পর সীমান্তে রাশিয়ার সামরিক মহড়া বাড়ানোর খবর পাওয়া যায়। এতে উদ্বেগ প্রকাশ করে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, ইউক্রেনে কোন সামরিক হস্তক্ষেপ হলে রাশিয়াকে এর জন্য মূল্য দিতে হবে। তবে ওবামার এই হুঁশিয়ারি কর্ণপাতই করেনি। শনিবারই পার্লামেন্টে ক্রিমিয়ায় সৈন্য পাঠানোর বিষয়ে রাশিয়ার পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষে ভোটাভুটি হয়। প্রেসিডেন্ট ক্রিমিয়ার জন্য সৈন্য পাঠানোর অনুরোধ করলে সেটা অনুমোদন দেয়া হয়। ক্রিমিয়াতে শান্ত পরিস্থিতি ফিরে না আসা পর্যন্ত সৈন্য অবস্থান করবে। ক্রিমিয়ার রাজধানী সিমফেরোপোলের কেন্দ্রস্থলে মুখোশধারী বন্দুকধারীদের ঘুরে বেড়াতে দেখা যাচ্ছে যারা সামরিক ইউনিফর্ম পরা, কিন্তু কোন বাহিনীর নামাঙ্কিত ব্যাজ নেই। ইউক্রেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইগোর তেনুখ জানিয়েছেন, রাশিয়া ক্রিমিয়ায় ৬ হাজার সৈন্য ও ৩০টি সাঁজোয়া যান পাঠিয়েছে।