সেনা কমাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র!

আপডেট : ০২ মার্চ ২০১৪, ২২:০৭
বিশ্বের সবচেয়ে দুর্ধর্ষ ও শক্তিধর বাহিনী মার্কিন সামরিক দল। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে তাদের রয়েছে জানা-অজানা অসংখ্য ঘাঁটি। তাদের দাপটে ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে কারও মুখ খুলবার জো নেই। এ জন্য যুক্তরাষ্ট্রের খরচও কম নয়। বছরে ছয়শ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। আর্থিক মন্দার মধ্যেও এই পরিমাণ অর্থ খরচে তাদের কোন দ্বিধা নেই। বরং প্রতিবছরই প্রতিরক্ষা খাতে অর্থ বরাদ্দ বৃদ্ধির সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে সৈন্য সংখ্যা। এভাবেই বিশ্বে সবার উপরে থাকার অহমিকা ধরে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে গত মঙ্গলবার মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী চাক হেগেল জানান, সৈন্য সংখ্যা কমানোর কথা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ঠিক যে পরিমাণ সৈন্য ছিলো, সেনা বাহিনীর পরিধি তার চেয়েও কমানো হবে বলে জানান তিনি। ১৯৪০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় সৈন্য সংখ্যা ছিলো দুই লাখ সাতষট্টি হাজার সাতশ সাতষট্টি জন। ১৯৪১ সালে পার্ল হারবার আক্রমণের শিকার হলে এই সৈন্য সংখ্যা বাড়ানো শুরু হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ নাগাদ সেই সংখ্যা দেখা যায় একাশি লাখ। একইভাবে ২০০০ সালের যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় সৈন্য সংখ্যা ছিলো চার লাখ বিরাশি হাজারে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসী হামলার শিকার হলে সৈন্য সংখ্যা এক লাফে পাঁচ লাখ ছেষট্টি হাজারে দাঁড়ায়। আমেরিকায় প্রতিবছরই বাজেটের আগে কিছু চমক থাকে। সম্ভবত এরই অংশ হিসেবে চাক হেগেল জানান, মার্কিন প্রতিরক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ কমানোর কথা। বাজেট পরিকল্পনা অনুসারে তিনি আরো জানান, সক্রিয় সেনা সদস্য পাঁচ লাখ বিশ হাজার থেকে কমিয়ে চার লাখ চল্লিশ হাজার বা সাড়ে চার লাখে কমিয়ে আনার কথা। বিশ্বের সব গণমাধ্যমে চাক হেগেলের এই ঘোষণা ফলাও করে প্রচার পায়। তাতে বলা হয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে এ পর্যন্ত বা বিগত ৭৪ বছরের মধ্যে মার্কিন সেনা বাহিনীকে ক্ষুদ্রতর বাহিনীতে নামিয়ে আনার ঘোষণা দিলেন চাক হেগেল। একই সাথে তিনি জানান, গোয়েন্দা বিমান ইউ-টু এবং এ-১০ জঙ্গিবিমানসহ স্নায়ু যুদ্ধকালের বিমান সরঞ্জামগুলো আর সেনাবাহিনীর অন্তর্ভুক্ত থাকবে না। এতে আমেরিকার কোন ধরনের ঝুঁকি নেই বলেও দাবি করেন মার্কিন প্রতিরক্ষা। তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর পরিধি কমালেও একই সাথে একাধিক যুদ্ধ চালিয়ে যাবার ক্ষমতা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। যে কোন আগ্রাসী শক্তিকে পরাস্থ করতে ওয়াশিংটন আত্মবিশ্বাস রাখে বলেও জানান চাক হেগেল। নাইন ইলেভেনের হামলার ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ করে। কিন্তু এর পরপরই বিশ্ব মন্দায় অর্থ সংকট দেখা দিলে ধীরে ধীরে ঐ বরাদ্দ কমিয়ে আনার পরিকল্পনা নেয়া হয়। তবে চাক হেগেল জানান, ইরাক বা আফগানিস্তানের মতো দীর্ঘ মেয়াদে এবং ব্যয়বহুল কোন যুদ্ধাভিযান বা সংঘর্ষে জড়ানোর ইচ্ছে নেই যুক্তরাষ্ট্রের। মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী চাক হেগেলের এসব বক্তব্যকে ভালভাবে নেয়নি খোদ যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ। এরই মধ্যে তার ঐ পরিকল্পনার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে উঠতে শুরু করেছে। বিশ্লেষকরা অবশ্য এর সাথে বাস্তবতার মিল-অমিল খুঁজে দেখছেন। তাদের মতে, সেনাবাহিনীর জন্য অর্থ বরাদ্দ কমালেও তা স্নায়ু যুদ্ধকালের তুলনায় সবচেয়ে বেশিই থেকে যাচ্ছে। তবে সরকারি ভাষ্যমতে, বাজেট কমানো কেবলমাত্র একটি আর্থিক ইস্যু নয় যে সেনাবাহিনীকে কাটছাট করতে হচ্ছে। বরং এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধ ও প্রাণহানিতে আমেরিকার মানুষ বিশেষ করে সেনা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে এক ধরনের ক্লান্তি আর বিষণ্নতা দেখা দেয়। আর তা থেকে মুক্তি পেতেই এই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন জরুরি। এ লক্ষ্যে চলতি বছরেই সক্রিয় সেনা সদস্যদের সংখ্যা চার লাখ নব্বুই হাজারে কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওয়াশিংটন। ২০১৭ সাল নাগাদ আভ্যন্তরিন একাধিক সেনা ঘাঁটি বন্ধ করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন চাক হেগেল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বাজেট বিশ্লেষক উইনস্লো হুইলার অবশ্য এই প্রস্তাবকে অতিরঞ্জিত বলে নিন্দা জানিয়েছেন। তার মতে, বাজেট বরাদ্দ ও সেনাবাহিনীর পরিধি কমানো সত্বেও প্রতিরক্ষা ব্যয় মূলত থাকবে ২০০৫ সালের প্রতিরক্ষা ব্যয়ের সমান। এমনকি ঐ পরিমাণও প্রতিরক্ষা খাতে চীন ও রাশিয়ার মোট ব্যয়ের কয়েক গুণ। হুইলার মনে করেন, ধীরে ধীরে ব্যয় কমানোর যে নীতি নেয়া হয়েছে, তাতে ক্যাপিটল হিলও উত্তপ্ত হবে বিতর্ক বিতণ্ডায়। এর ফলে নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবিও চাঙ্গা হয়ে উঠতে পারে। তবে বিরোধী দল রিপাবলিকানের পক্ষ থেকে নিন্দার ঝড় ওঠে একটু অন্যভাবে। রিপাবলিকান নেতা মাইকেল টার্নারের মতে, পিছিয়ে আসার কোন সুযোগ নেই। সেনা সংখ্যা কমানোর সময়ও এটা নয় এবং এর ফলে সেনা সক্ষমতা কমবে বলে মনে করেন তিনি।