চলতি সপ্তাহেই ভারতের আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে। যদিও তফসিলের অপেক্ষায় বসে নেই রাজনৈতিক দলগুলো। সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রীর নাম ঘোষণা করে ইতিমধ্যেই কড়া প্রচারণায় নেমেছে বিরোধীদল বিজেপি। ক্ষমতাসীন কংগ্রেসও চালিয়ে যাচ্ছে নানামুখী প্রচারণা। অবস্থান ধরে রাখতে চেষ্টা চালাচ্ছে দলটি। যদিও কৌশলগত কারণে তারা এখন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেনি। ছোট ছোট দলগুলো মানে আঞ্চলিক দলগুলোও নির্বাচনী প্রচারণার মাঠে। ইতিমধ্যে কয়েকটি দল তাদের কিছু কিছু প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। এ প্রচেষ্টা এখনো চলছে।
এরই মধ্যে ভারতের বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান নির্বাচন পূর্ব জরিপের ফল প্রকাশ করেছে। এসব জরিপের ফলাফল বিশ্লেষণে কিছুটা গরমিল চোখে পড়লেও একটি বিষয় স্পষ্ট, তা হলো ক্ষমতাসীন কংগ্রেসের প্রতি জনসমর্থন কমেছে। আর ক্ষমতায় আসার জোর সম্ভাবনা হিন্দুত্ববাদী বিরোধী দল বিজেপির। বিভিন্ন জরিপের ফল বলছে, একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবেই আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসতে পারে তারা। এছাড়া ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিজেপি’র প্রার্থী নরেন্দ্র মোদিকে চায় দেশটির বেশিরভাগ মানুষ। বিজেপি যদি এনডিএ জোটের পুরনো শরিকদের ফিরিয়ে আনতে পারে এবং টিআরএস’র মতো নতুন শরিকদের কাছে টানতে পারে, তাহলে মোদির প্রধানমন্ত্রী হওয়া কঠিন কোনো বিষয় হবে না।
দুর্নীতি, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, দলীয় কোন্দল ও নারীদের নিরাপত্তাহীনতাসহ নানা ইস্যুতে কংগ্রেসের অবস্থা নাজুক। উল্টো দিকে সুশাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মোদি তার প্রচারে ভোটারদের উপর প্রভাব ফেলেছেন। তবে একটি বিষয় স্বীকার করতে হবে, ভারতের নির্বাচনে মুসলিম সম্প্রদায়ের ভোট এখনো গুরুত্বপূর্ণ। ২০০২ সালে গুজরাট দাঙ্গায় নরেন্দ্র মোদির নেতিবাচক ভূমিকা ছিলো এমনটা সর্বজনজ্ঞাত। যে কারণে বিজেপিকে আক্রমণ করে মুসলিম ভোট ব্যাংক দখলে রাখতে চাইছে কংগ্রেস। আর এ ব্যাপারে যে বিজেপি স্বস্তিতে নেই তা সহজেই বোধগম্য। এখন মুসলিমদের মধ্যে আস্থার সংকট কাটাতে চায় দলটি। ইতিমধ্যে তারা জানিয়েছে, অতীতের যেকোন ভুলের জন্য ক্ষমা চাইতে প্রস্তুত রয়েছে। মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে একটি বারের জন্য সুযোগ চায় তারা। গত সপ্তাহে এক সমাবেশে বিজেপির সভাপতি রাজনাথ সিং এমনই অনুরোধ করেছেন।
তিনি বিজেপিকে একবারের জন্য সুযোগ দেয়ার অনুরোধ করে বলেন প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলে আর সুযোগ দেয়ার দরকার নেই। অতীতে দল যদি কোনো ভুল করে থাকে তার জন্য মাথা নুইয়ে ক্ষমা চাইতেও প্রস্তুত রয়েছে তারা। রাজনাথ সিংয়ের মতে, বিজেপি মুসলিম বিরোধী বা বিদ্বেষী দল এমন মনোভাব সৃষ্টির প্রচারণা চলছে। তারই পাল্টা জবাব হিসেবে প্রচারণা চালাতে হবে বিজেপিকে। গুজরাট দাঙ্গার বিষয়ে তিনি বলেছেন, মুসলিমদের বিরুদ্ধে সহিংসতার জন্য বিজেপির প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী নরেন্দ্র মোদি দায়ী বলে জনমত সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। কিন্তু এটা শুধুই কংগ্রেসের অপপ্রচার। বিজেপি কখনোই মুসলিমদের বিরুদ্ধে ছিল না এবং মুসলিমরাও এ অপপ্রচার বিশ্বাস করে না। এই ইস্যু নিয়ে কংগ্রেস ভোট ব্যাংকের রাজনীতি করছে। অপর বিজেপি নেতা অরুণ জেটলিও একই ধরনের মত প্রকাশ করেছেন। তার মতে, ভারতের সকল মানুষের সমান অধিকার ও নিরাপত্তার নীতিতে বিশ্বাস করে বিজেপি। বিগত কয়েক বছর ধরে বিজেপির বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে প্রচারণা চালানো হয়েছে। দাঙ্গামুক্ত ভারত গড়ে তুলতে মুসলমানদেরও উচিত বিজেপিকে সহায়তা করা। মুসলমানদের ভুল ধারণা পাল্টাতে বিজেপি এ ধরনের হাজার খানেক সামবেশ করার পরিকল্পনা করছে। তবে কংগ্রেস বলছে, নির্বাচন এগিয়ে আসায় সংখ্যালঘুদের জন্য বিজেপি’র এই মায়াকান্না। এটা সুযোগবাদিতা ছাড়া কিছু নয়। বিজেপির বক্তব্য প্রমাণ করে তারা যেকোন মূল্যে ক্ষমতায় যেতে চায়।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপি কিংবা কংগ্রেসের কাছ থেকে ক্ষমা প্রার্থনার চেয়ে বেশি কিছু আশা করে ভারতের মুসলিমরা। এখন আর তারা শুধু ভোট ব্যাংক হিসেবে বিবেচিত হতে চায় না। ভারতের কোনো রাজনৈতিক দলই সত্ভাবে ও জোর দিয়ে বলতে পারবে না যে, তারা মুসলমানদের জন্য দৃষ্টান্তমূলক কিছু করেছে। স্বাধীনতা পরবর্তী ও আধুনিক ভারতে এখনো ভালো অবস্থায় নেই বেশিরভাগ মুসলিম। এর পেছনে হয়তো অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক কারণ রয়েছে। তবে নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর হিসাব নিকাশে তারা শুধু ভোট ব্যাংকই। আর এ আগ্রহ নির্বাচনের পরপরই শেষ হয়ে যায়। শুধু মিষ্টি কথায় তাদের ভোট পাওয়ার চেষ্টা করে। মুসলমানদের সমস্যা একমাত্র রাজনৈতিকভাবে সামনে আনা ও সমাধান করা সম্ভব। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা বড় প্রয়োজন। কোনো একক দলের প্রতি সমর্থন নেই মুসলিমদের। তাই গুজরাট দাঙ্গাকে কাজে লাগিয়ে হয়তো পুরোপুরি সফল নাও হতে পারে কংগ্রেস। আর মোদিও তার দাঙ্গাবাজ ইমেজ অনেকখানি কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছেন। কারণ এতোসব অভিযোগ সত্ত্বেও ২০১২ সালে গুজরাটের বিধানসভার নির্বাচনে মোদির পক্ষে ৩১ শতাংশ মুসলিম ভোট পড়ে। খোদ গুজরাটে এ অবস্থা হলে অন্যান্য রাজ্যেও ভালো করবে বিজেপি সেটা সহজেই বলা চলে।
